বড় বাপের পোলায় খায়: সুস্বাদু নাকি ওভার হাইপড!

বড় বাপের পোলায় খায়,

ঠোঙ্গায় ভইরা লইয়া যায়,

ধনী-গরীব সবায় খায়,

মজা পাইয়া লইয়া যায়

রমজানের সময় পুরান ঢাকার চকবাজারে এমন একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়। লোকে বলে, এই খাবার খেলেও পস্তাতে হয়, না খেলেও পস্তাতে হয়। তাই খেয়ে পস্তানোই ভাল। বোঝাই যাচ্ছে, চকের ইফতারের সবচেয়ে বেশি হাইপ তোলা খাবার হল ‘বড় বাপের পোলায় খায়’।

যদিও, এর চেয়ে ওভাররেটেড খাবার ঢাকার ইতিহাসে আর দ্বিতীয়টি নেই। যদি কেউ খেতে চান, খেয়ে দেখেন, একবার খেলে আর দ্বিতীয়বার খাবেন না। আমার নিজের অভিজ্ঞতাটাই বলি।

একবার আমি চকবাজারের ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ এনেছিলাম। পড়েছিলাম তাতে পোলাওয়ের সাথে  মেশানো থাকে মুরগি, গরু, খাসী, কলিজা ভুনা, মগজ ভুনা, চিড়া, কোয়েল পাখি, ডিম, নানারকম মসলা ইত্যাদি। এনে ইফতারের সময় দেখি তাতে মুরগীর গলা, ডানা, গরুর মাংসের ছিড়া টুকরা, কলিজার ফ্যাপশা – এসব চিড়ার মধ্যে মাখানো! তাতে তীব্র ঘামের গন্ধ! তখনই কানে ধরেছি – আর নয় ‘বড় বাপের পোলায় খায়’।

কেউ কেউ বলেন, এই ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ পুরান ঢাকার নিজস্ব খাবার নয়, আবার কেউ বলেন আগে এই খাবারটা যেমন ছিল এখন সেই মানের ছিটেফোটাও নেই। এটা নিয়ে অনেকরকম ইতিহাস প্রচলিত আছে, অনেক রকম তর্ক-বিতর্ক আছে।

ইতিহাস ঘাটলে এই খাবারের দু’জন আবিষ্কারকের নাম পাওয়া যায়। এক হলেন মোহাম্মদ কামাল মাহমুদ নামের এক বাবুর্চি। প্রায় ৯০ বছর আগে তৈরির পর বটপাতার ডালায় করে বিক্রিও করতেন। তবে, অধিকাংশই এই মতের সাথে একমত নন, তাদের দাবী এটা আবিষ্কার করেন শেখ সুবাহ।

শেখ সুবাহ ছিলে বকশীবাজারের বাসিন্দা। বাঙালি নন, উর্দুভাষী। তিনি পেশায় বাবুর্চি ছিলেন। তার সময়ে আহসান মঞ্জিলে নবাবদের জন্য ইফতারে মোঘল খাবার বানানো হত। নবাবদের খাওয়া শেষে চাকর-বাকররা বাকি খাবার এক সাথে মেখে খেত। তাতে পোলাও, খাসী, মুরগীর রোস্ট, বিরিয়ানি, ভাজা-ভুজি সহ অনেক রকম কিছু থাকতো। শেখ সুবাহ পরে এতে অভিনবত্ব আনেন। যোগ করেন মসলা, মুরগির গিলা-কলিজা, সরিষার তেল, সুতি কাবাব, গরুর মগজ, ডিম সহ আরো অনেক কিছু। সব মিলিয়ে এখানে ১৫ থেকে ২০ রকমের খাবারের মিশেল থাকে।

কিছুদিন বাদে নবাব পরিবারে এই খাবারের সমঝদার বাড়ে। আবার পরে রমজান মাসেই চকে চলে আসে এই খাবার। চক মসজিদের ছোট মিনারের কোনায় শেখ সুবাহ নিজেই এই খাবার নিয়ে বসতেন। দুই আনা করে বিক্রি করতেন। লোকে তখন একে ‘শেখ চূড়া’ বলে ডাকতো। পরে কালের বিবর্তনে নাম পরিবর্তন হয়ে যায়। শেখের বংশধররা এই ব্যবসা ধরে রেখেছিলেন। এখন তাঁদের আর কেউ নেই বললেই চলে।

এখন সেই ইতিহাস অনেকটাই বিকৃত হয়েছে। খাবারের স্বাদও বিকৃত হয়েছে। রমজান এলেই অনেকেই হাজির হন, নিজেদের পূর্বপুরুষকে ‘বড় বাপের পোলায় খায়’-এর আবিষ্কারক বলে দাবী করেন। যদিও, কারো বানানো এই ঐতিহ্যবাহী খাবারেই আগের সেই স্বাদ পাওয়া যায় না। ফলে, আর কেউ এই খাবার না খেয়ে পস্তায় না।

চকবাজারের ইফতার অবশ্যই আপনি কিনে খাবেন। তবে, সেটা আর যাই হোক ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ না!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।