চৌধুরী জাফরউল্লাহ শরাফত: বিস্ময়কর নাকি বিরক্তিকর?

ধরা যাক আপনি টেলিভিশনে বা রেডিওতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলা দেখেন বা শোনেন, বয়স আরেকটু বেশি হলে ৯০ এর দশকের শুরুর দিকে আবাহনী- মোহামেডানের ফুটবল খেলাও দেখতেন টিভিতে; সেই আপনাকেই করছি প্রশ্নটি- চৌধুরী জাফরউল্লাহ শরাফত নামটি কোনো ব্যক্তি, নাকি ক্যারেক্টারকে প্রতিনিধিত্ব করে? আমি নিজেও এর যথার্থ উত্তর পাই না।

আচমকাই ‘চৌধুরী জাফরউল্লাহ শরাফত বলছি’ বইটি পেয়ে গেলাম, যেটি লিখেছে চৌধুরী জাফরউল্লাহ শরাফত স্বয়ং! একটা বই পড়ার পর কেমন লেগেছে এটা নিতান্তই শিশুতোষ প্রশ্ন লাগে আমার, বরং বইটি পড়ে উপলব্ধি কী, কেন পড়েছিলাম, এবং আমি নিজে হলে বইটি কীভাবে লিখতাম- মূলত এই তিনটি প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দাঁড় করানোই লক্ষ্য হয়ে উঠে।

ছায়া লেখক, অনুলেখক, ভূতলেখক প্রভৃতি কনসেপ্টগুলো বাইরের দেশে প্রচলিত হলেও আমাদের গড়বাঙালি মনে প্রকাশ্যে এই পেশাগুলোকে স্বীকার করে নিতে কোথায় যেন অহমে আঘাত হানে। বরং বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ভেবে সিংহভাগ বাঙালিই পুলক বোধ করে কানের লতিতে চিমটি কেটে কৃত্রিম লাজুকতার ভান করে। ব্যবসায়ী, খেলোয়াড়, আমলা, ডাক্তার পেশার সাথে লেখনী প্রতিভা যুক্ত হলে হয়তোবা ঠাঁট-বাট বাড়ে অপরের চোখে, না বাড়লেও অন্তত আত্মতৃপ্তির সুখ পাওয়া যায়।

সাকিব আল হাসান বা তাহসান যদি বই লিখে, বইয়ের কনটেন্ট মোটেই বিচার্য হবে না, ভক্তদের লাইন পড়ে যাবে সেই বই সংগ্রহের। স্টারডম আর ফ্যান-ফলোয়ারের বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর সকল দেশেই কম- বেশি অভিন্ন। ফলোয়ারেরা বই কিনে না, কিনে ব্র্যান্ড। ভাবুন, জেমস একটা বই লিখেছে; জীবনেও বইয়ের ধারে-কাছে যায় না এমন হাজারো মানুষের বাড়িতে সেই বইয়ের একটা কপি পাওয়া যাবে। এন্টারটেইনারদের প্রতি ভোক্তাশ্রেণীর কৌতূহল বরারবই নিয়ন্ত্রণহীন, এবং একে নিয়ন্ত্রণের খুব প্রয়োজনও দেখি না।

এন্টারটেইমেন্ট ভ্যালু অনেকটা ভাইরাসের মতোই। কিন্তু আমার প্রশ্নটা অন্যত্র; সাকিব আল হাসানের নিজের কেন বই লিখতে হবে. জেমস তার জীবনি নিজে কেন লিখবে। লেখালিখিতে আগ্রহ বা প্রতিভা থাকলে ভিন্ন আলাপ, কিন্তু লেখার প্রতিভা নেই একদমই, স্রেফ ব্র্যান্ড ইমেজের সদ্ব্যবহার করে নিজে বই লেখাটা ইথিকালি ইনকারেক্ট একটা মুভ মনে হয় আমার। এতে পাঠকের কৌতূহলও নিবৃত্ত হয় না, এন্টারটেইনারের ব্যক্তিসত্তাও বিকশিত হয় না লেখায়; দুই দৃষ্টিকোণ থেকেই এ এক নিদারুণ অপচয়। এখানেই প্রাসঙ্গিক হয় ছায়ালেখক, শ্রুতিলেখক কনসেপ্ট।

টেন্ডুলকারের সাথে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে, তাকে নিয়ে রিসার্স করে বই লিখলে সেটা কোয়ালিটি টেন্ডুলকারকে যেমন উপস্থাপন করে, বছর পঞ্চাশেক পরেও যারা তার সম্বন্ধে জানতে ইচ্ছুক তাদের জন্য মূল্যবান রিসোর্স হবে। নইলে টেন্ডুলকারকে নিয়ে লেখা নিরর্থক। একই কথা প্রযোজ্য জাফরউল্লাহ শরাফতের ক্ষেত্রেও। তাকে যতই কমেডি চরিত্র বলা হোক, তার মেধা- যোগ্যতা নিয়ে যতই ট্রল করা হোক, তবু দিন শেষে সত্যিটা হলো- এই ভদ্রলোক বাংলাদেশ ক্রিকেটের কণ্ঠস্বর; তার একটা হেরিটেজ ভ্যালু আছে। তার জীবন নিয়ে অবশ্যই বই লেখা উচিত, কিন্তু সেই দায়িত্ব সে নিজের কাঁধে তুলে নিলে সেই বই কি আদৌ কোনো অর্থ বহন করবে? করে যে না, সেটা তার বইটি পড়লেই বোঝা যায়।

একজন ধারভাষ্যকারের কাছ থেকে মনোমুগ্ধকর লেখনী আশা বোধহয় কেউই করে না। কিন্তু তার চিন্তা, পর্যবেক্ষণ বা মূল্যায়নে তীক্ষ্মতা- তীব্রতা আশা করতেই পারে। ১৯৯৩ সালে জাফরউল্লাহ শরাফতকে যেভাবে পেয়েছি, ২০১৮ তেও সে তেমনই রয়ে গেছে, কোনো পরিবর্তনই যদি না এলো, সেই ব্যক্তি স্রেফ আবেগ আর ভালোবাসার ভিত্তি দিয়ে শ্রদ্ধা বা সম্মানের জায়গা ধরে রাখতে পারে না দীর্ঘদিন।

যেহেতু সে বিবর্তিত, বিবর্ধিত হয়নি. তার বইতেও নেই ধারাভাষ্য সংক্রান্ত প্রখর কোনো দৃষ্টিভঙ্গি, খেলা, খেলোয়াড় আর দর্শক-শ্রোতার মধ্যে মেলবন্ধন স্থাপন সংক্রান্ত উপলব্ধি। বরং বিভিন্ন ক্রিকেটার, ধারাভাষ্যকারের সাথে একগাঁদা সেলফি তুলে পৃষ্ঠা ভরানোতেই মনোযোগ খরচ হয়েছে বেশি। একজন মানুষ প্রচণ্ড ভালোলাগার জায়গা থেকেই নিশ্চয়ই মাত্র ১৪ বছর বয়সে পেশাদার ধারাভাষ্যে যুক্ত হয়; টানা ৩৫ বছর সেটা চালিয়ে নিতে হলে পর্বতপ্রমাণ প্যাশন আর ডেডিকেশন লাগে, কিন্তু নিজেকে আপগ্রেড না করে, প্রজ্ঞা শাণিত করায় উদাসীন থেকে কেবল বছর বাড়িয়ে যাওয়াটা তামিল সিনেমার কমেডিয়ানের চাইতে তাকে বাড়তি কতটুকু গ্রহণযোগ্যতা দিতে পেরেছে?

সোস্যাল মিডিয়ায় জাফরউল্লাহ শরাফত মানেই ‘কর্দমাক্ত আকাশ মেঘমুক্ত মাঠ’, ‘বোলার শ্রীনাথ তার ট্রাউজার খুলে আম্পায়ারকে দিলেন’, ‘দুর্দান্ত শট কিন্তু বোল্ড আউট’, ‘চোখ জুড়ানো কাভার ড্রাইভ, বল চলে গেলো ডিপ থার্ডম্যান অঞ্চলে, একটি রান’ প্রভৃতি উক্তিমালা। এর কতগুলি সত্যি, কতগুলি অর্ধসত্যি, আর কতগুলি অতিরঞ্জিত জানা নেই আমার, কিন্তু এটা তো অনস্বীকার্য সবকিছুকে বাড়িয়ে বলার বাতিক তার আছে।

তবু বাংলাদেশি ধারাভাষ্যের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস লিখলে সেখানে এই লোকটিকে উপেক্ষা করার সাধ্য কি আছে, নাকি উপেক্ষা করা উচিত? সুতরাং বই একটা তাকে ঘিরে হওয়া আবশ্যক, আপত্তিটা সে নিজেই লেখক বনে যাওয়াতে। সে ১৯৮২ সালে ধারাভাষ্য শুরু করেছে, তার জমজ ছেলে, সে প্রিমিয়ার ব্যাংকের ডিরেক্টর এবং কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান- এই সমস্ত বিসিএস টাইপ তথ্য ছাড়া তার এই বইতে আসলে কী আছে যেজন্য এটা পড়া উচিত।

অপ্রযোজনে বিভিন্ন ম্যাচের স্কোরকার্ড তুলে দিয়ে সে আসলে কোন্ মেসেজটা ডেলিভার করতে চেয়েছে সেটাও স্পষ্ট নয়। সম্ভবত তার উদ্দেশ্য ছিলো, বাংলাদেশের জয়-পরাজয়, সুসময়- দুঃসময় প্রতিক্ষেত্রেই সে পাশে ছিলো এটা বোঝানো বা সে যে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সত্যিকারের অনুরাগী, স্পোর্টসের প্রতি তার প্রেম নিখাঁদ; তথ্য-উপাত্তসহ সেটা প্রতিষ্ঠা করা। কিসের তথ্য, কোথায় উপাত্ত – এ তো দুর্বল বাক্যবিন্যাসে লেখা ম্যাচের স্কোরকার্ড; এ দিয়ে কি ফুটে উঠে অনুরাগীতা? কিংবা যে ব্যক্তি আইসিসি ট্রফির ম্যাচগুলো সেই মালয়েশিয়া থেকে ধারাবিবরণীতে আমাদের শুনিয়েছেন, তার কি অনুরাগীতা প্রমাণের কিছু বাকি আছে?

বরং ধারাভাষ্য ভাবনা, ধারভাষ্যের ক্রমবিবর্তন, ম্যাচের বাইরেও ধারাভাষ্যকারদের মধ্যে চলা অন্য স্নায়ুবিক ম্যাচ, ইংরেজি ধারাভাষ্যকারদের চাইতে বাংলা ধারাভাষ্য কেন গ্ল্যামারহীন প্রভৃতি বিষয়ে তার নিশ্চয়ই গভীর ভাবনা ও অভিমত আছে। সেগুলোই যদি না পাওয়া গেল, ৩৫ বছর তবে খরচ হলো কীভাবে!

১৯৯৩ সালে আমার বয়স ছিলো ৭ বছর, সেই সময় থেকে যার কণ্ঠস্বর শুনে বড় হয়েছি, তার চিন্তাধারাকে আরেকটু পরিশীলিত এবং পরিণত পন্থায় উপস্থাপনের একটা চ্যালেঞ্জ বোধ করছি। জাফরউল্লাহ শরাফত বর্তমানে যেরকম কমেডি ক্যারেক্টার হয়ে উঠেছে সোস্যাল মিডিয়াতে, সে অবশ্যই এর চাইতে আরো গ্রেটার মূল্যায়ন পাওয়ার দাবি এবং যোগ্যতা রাখে। তাকে ঘিরে নির্মোহ এবং ক্রিটিকাল অ্যানালাইসিস সেভাবে হয়নি বলেই তার কথা এবং আচরণের ইন্টারপ্রেটেশন একটা সংকীর্ণ জায়গা থেকেই চর্বিত চর্বন হয়ে আছে।

তাকে আপনার ভাঁড় কিংবা কার্টুন মনে হতেই পারে, তবু তার অবদানকে, নিবেদনকে নিঃসংঙ্কোচে সম্মান জানাতেই হবে, সরি বাট নো অপশন লেফট মেট! জীবনে ৩৫০০ এর বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার নেয়া একজন মানুষের সাথে গল্প করতে সে হয়তোবা অস্বস্তি বোধ করবে না। এতে আমার চাইতে তারই লাভ বেশি হওয়ার কথা। সে বলতে পছন্দ করে, আমি ক্ষুধা-তৃষ্ণা ভুলে পারি শুনতে। বলা এবং শোনার যুগলবদ্ধতা থেকে পুনর্লিখিত হতে পারে ইতিহাস এবং ইমপ্রেসন।

জাফরউল্লাহ শরাফতের প্রতি আমার ইমপ্রেশন তিন ধাপে বিবর্তিত হয়েছে। প্রথম ইমপ্রেসন ছিলো, অবাক হওয়ার। রেডিওতে যখন তার কণ্ঠ শুনতাম, নিশ্চিত ছিলাম এক লাখ মানুষের কণ্ঠ থেকেও তার কণ্ঠ আলাদা করা যাবে। যদিও তার ডেলিভারির ভঙ্গিমাতে যাত্রা ফ্লেভার আছে, তথাপি কণ্ঠটা কানে বাজতো।

মানুষের বাহ্যিক চেহারা আমাকে কখনোই আকৃষ্ট করে না, কিন্তু কণ্ঠের প্রতি আমার আকর্ষণ চুম্বকের বিপরীত মেরুদ্বয়ের চাইতেও বেশি। স্রেফ কণ্ঠ সুন্দর হওয়ার কারণে বহু মানুষের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করেছি। জাফরউল্লাহ শরাফতের কণ্ঠ মুগ্ধতা ছড়ায় না, কিন্তু কণ্ঠটা ইউনিক। একারণে তার প্রতি কৌতূহল বাড়তে বাড়তে অস্বাভাবিক এক উচ্চতায় উঠে গিয়েছিলো।

দ্বিতীয় ইমপ্রেশন হতাশা আর বিরক্তির। টেলিভিশনে তাকে দেখেই অস্বস্তি বাড়ে আমার। উইগ জিনিসটা কখনোই রুচিশীল লাগে না আমার। চুল না থাকা নিশ্চয়ই অপরাধ হতে পারে না, উইগ চাপানো কাউকে দেখলে সঙ মনে হয়। জাফরউল্লাহ শরাফতের প্রতি কৌতূহলের উচ্চতা মুহূর্তের মধ্যে স্পর্শযোগ্য মাত্রায় নেমে আসে। বিরক্তির মাত্রা বাড়ে তার বাঁচালপনা এবং নির্বোধ উপস্থাপনে। সুপ্রিয় দর্শক আমাদের মাঝে আজ উপস্থিত আছেন এককালের প্রখ্যাত ক্রিকেটার, খুবই জনপ্রিয় ক্রিকেটার, যার নাম শুনলে বোলারদের হার্টবিট বেড়ে যেত, দর্শক যার ব্যাটিং দেখার জন্য মুখিয়ে থাকতো, সেই জননন্দিত ক্রিকেটার সেলিম শাহেদ!

এরকমই তার উপস্থাপনের ধরণ, যাকে পরিচিত করা হয় সেও বিব্রত আর দর্শকদের জন্য বিনোদনের খোরাক অফুরন্ত। কারণ সাধারণ দর্শক ট্রলের মধ্যেই বিনোদন খূঁজে; সেলিম শাহেদ, হান্নান সরকার, সানোয়ার হোসেন, এহসানুল হক সেজানের মতো ক্রিকেটারদের যদি এইসব গালভরা বাক্য- বিশেষণে উপস্থাপন করা হয়, মানুষ হাসবে না তো কী করবে! তবু এতো বছরেও স্বভাব বদলালো না তার।

তৃতীয় ইমপ্রেশন প্রশংসার। ভারতীয় ক্রিকেটার নবোজাত সিং সিধু বাংলাদেশ ক্রিকেটের সমালোচক নয়, নিন্দুক। সমালোচনা সুন্দর, নিন্দা অপমানজনক। সোস্যাল মিডিয়াতে সিধুকে নিয়ে নানা কথা বলেও মেইনস্ট্রিম মিডিয়াতে সিধুকে সিধুর স্টাইলেই কটাক্ষ করা ব্যক্তিত্ব এই জাফরউল্লাহ শারাফাত। সাব্বির, সৌম্য ইস্যুতেও টকশোগুলোতে বেশ সাহসী বক্তব্য তার। কিন্তু কমেডি ইমেজের কারণে তার সিরিয়াস বক্তব্যকেও মানুষ সিরিয়াসলি না নিয়ে হাসি-তামাশার উপকরণ হিসেবে দেখে। কেন দেখে, তার বইয়ের প্রচ্ছদই এর জবাব দিয়ে দিচ্ছে।

জাফরউল্লাহ শরাফত কি অনন্ত জলিল, এটিএন বাংলার মাহফুজুর রহমানের মতো একই ক্যাটেগরির কমেডি ক্যারেক্টার? আমি সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারিনি। তার বাচনভঙ্গি প্রচুর পরিমাণে মিমিক্রি হয় কলেজ-ভার্সিটির অনুষ্ঠানগুলোতে। আমি নিজে বুয়েটের তিনটা প্রোগ্রামে তার বাচনভঙ্গির মিমিক্রি দেখেছি, ইউটিউব ঘাঁটলে হয়তোবা আরো পাওয়া যাবে। অনন্ত জলিলের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখার সময় বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে একটা বিরাট দল পেয়েছিলাম যারা বাদ্য বাজনা নিয়ে এসেছিলো, অনন্ত জলিল সংলাপ বলে আর তারা ভুভুজেলা বাজায়, রেফারির বাঁশি বাজায়; এক অদ্ভুত উৎসবঘন পরিবেশ। জাফরউল্লাহ শরাফতকে মিমিক্রি করাটাও কি একই উদ্দেশ্য থেকে কিনা জানি না।

একজন ক্রীড়া ধারাভাষ্যকারের কমেডি ক্যারেক্টারে পরিণত হওয়াটা কি সমর্থনযোগ্য, নাকি দৈন্যের বহিঃপ্রকাশ? সাম্প্রতিককালে সাবেক নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটার ড্যানি মরিসন নিজের একটা সিগনেচার টোন তৈরি করে নিয়েছে, যেটা কমেডিনির্ভর। আম্পায়ার বিলি বাউডেনও স্বভাবজাত কমেডিয়ান। তাদের কমেডিতে বিনোদন পাওয়া যায়, কিন্তু জাফরউল্লাহ শরাফত কি কমেডির উদ্দেশ্যে বলে ‘শতরান করার গৌরব অর্জন করলেন’ কিংবা ‘অনেকদিন মনে রাখার মতো শট’? তার শব্দভাণ্ডার সীমিত, ক্রিকেট পর্যবেক্ষণ উচ্চমানের নয়; সেই সীমাবদ্ধতা ঢাকতেই কি কমেডির আশ্রয় নেয়া? আমরা যারা হাসি তারা নিশ্চিত হিউমারের আভাসে হাসি না, মেধাহীনতার উপহাসসূচক হাসি, যেমনটা হাসি বাংলা সিনেমার সংলাপ শুনে বা ইলিয়াস কাঞ্চনের নাচ দেখে।

আমি যদি বইটা লিখতাম, জাফরউল্লাহ শরাফতের সাথে টনি গ্রেগ, মাইকেল হোল্ডিং এই দুজনকেও চরিত্র হিসেবে রাখতাম। যত ইংরেজি কমেন্ট্রি শুনেছি, টনি গ্রেগ আর মাইকেল হোল্ডিংয়ের মতো ইউনিক কণ্ঠস্বর পাইনি কারো। তারা মূলত ইংরেজি কমেন্ট্রিকে রিপ্রেজেন্ট করতো; সমান্তরালে চলতো জাফরউল্লাহ শারাফাতের গল্প। ফলে বইটা হয়ে উঠতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট পরিক্রমার এক দলিল যা আমরা জাফরউল্লাহ শারাফাতের চোখ দিয়ে দেখবো।

সে ধারাভাষ্যে ঢুকেছে ১৯৮২ সালে, রকিবুল হাসানরা তখনো খেলে, আশরাফুল-মাশরাফি দুধের শিশু, সাকিব-তামিম-মুশফিকের জন্মই হয়নি; আকরাম খান-বুলবুলরা জাতীয় দলে ঢুকেনি। ফলে বাংলাদেশ ক্রিকেটের পটপরিবর্তনের ধ্রুবসাক্ষ্মী হিসেবেও তাকে উপস্থাপন এবং উপলব্ধির অবকাশ রয়েছে প্রচুর। ক্যারিবিয় ক্রিকেটে টনি কোয়েটজারের যা ভূমিকা, বাংলাদেশ ক্রিকেটে জাফরউল্লাহ শরাফতের ভূমিকা হয়তো তার চাইতেও বহু বেশি। কিন্তু উদ্ভট মেধাহীনতা আর বাচালসর্বস্বতায় সে নিজের অবস্থান হারিয়েছে; এক্ষেত্রে তার দায়টাই বোধহয় বেশি।

তবুও জাফরউল্লাহ শরাফতকে সম্মান জানাতে হবে যখন আপনি জানবেন তার উদ্যোগেই ধারাভাষ্যকার হান্ট প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়েছে। মাঠের ক্রিকেটে স্মার্টনেসের সাথে সাথে মাঠের বাইরের ক্রিকেটেও স্মার্টনেস জরুরী। আন্তর্জাতিক ম্যাচে বাংলা ধারাভাষ্য প্রচার করা হয় না, ইংরেজিতেই নিজেদের ক্রিকেটকে উপস্থাপন করতে হবে।

শামীম আশরাফ চৌধুরী, আতাহার আলী খানের নিবেদনে সমস্যা না থাকলেও তাদের ধারাভাষ্যে আবেদন জিনিসটার মারাত্মক অভাব; অনেকটা ট্রাকের কাজ ঠেলাগাড়ি দিয়ে পূরণ করার মতো। এই পরিস্থিতিতে নতুন কিছু ক্রিকেটমনস্ক মানুষকে যদি ধারাভাষ্যে আগ্রহী করা যায়, ব্যাপারটা প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু সেইসব ধারাভাষ্যকার বর্তমানে কোথায় কী করছে তা জানা যায়নি অবশ্য। রেডিও স্বাধীন এ কয়েকজন ধারাভাষ্য দিয়েছিলো, এটুকুই তথ্য পাওয়া যায় বই থেকে।

ক্রিকেটে বা সিনেমায় যেমন জুটি হয় ধারাভাষ্যেও সুন্দর এক জুটি ছিলো খোদাবক্স মৃধা আর জাফরউল্লাহ শরাফত। আমাদের শৈশবে বরং খোদাবক্স মৃধাই সিনিয়র হওয়ার সুবাদে কিছুটা বেশি জনপ্রিয় ছিলো। খোদাবক্স মৃধার মৃত্যুকালে শারাফাতের কোনো একটা মন্তব্য নিয়ে বেশ লেখালিখি হয়েছিলো মিডিয়াতে, যার প্রেক্ষিতে শরাফতকে আত্মপক্ষ সমর্থন করে বিবৃতি দিতে হয়েছিলো পত্রিকায়।

জাফরউল্লাহ শরাফত ব্যক্তিমানুষ হিসেবে কেমন হতে পারে? আমার ধারণা মিশুক, অমায়িক, একইসাথে যথেষ্ট এটেনসন সিকিং মানসিকতার সমণ্বয়ে একটা প্যাকেজ হবে। তার ব্যক্তিমানস নিয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বাস নেই আমার মধ্যে, সে যদি ধারাভাষ্যে না আসতো তাকে নিয়ে কেউ কথা বলারই প্রয়োজন বোধ করতো না, যেমন করে না আমাদের মতো আটপৌরে জীবন বয়ে চলা মানুষদের নিয়ে।

সুতরাং ধারাভাষ্য প্ল্যাটফরম দিয়েই তাকে পরিমাপ করতে চাই। তার বইটা যে একেবারেই কোনো চাওয়া পূরণ করতে পারলো না আমার, এতে তার যতটুকু দায়, তাকে নিয়ে অদ্যাবধি কেন লিখলো না কেউ এটাই বরং আক্ষেপ জাগায় বেশি পরিমাণে। তার বইয়ের একটা লাইনই সবচাইতে সিম্বলিক, যেখানে সে সুনীল গাভাস্কারের ছেলে রোহান গাভাস্কারকে বলছে আমি তোমার ছেলের খেলারও ধারাভাষ্য দিতে চাই। রোহান বলেছে- তুমি অবশ্যই পারবে। তুমি বাবার সাথে ধারাভাষ্য দিয়েছো, আমার সাথে দিচ্ছো, আমার ছেলের খেলার ধারাভাষ্য দিতে বয়সজনিত বাধা দেখি না তো’। আদতে সে কিন্তু এই কাজটাই করেছে।

আকরাম খান, নাফিস ইকবাল, তামিম ইকবাল – এদের ম্যাচগুলো চিন্তা করুন, আর রেডিওতে ধারাভাষ্য শুনুন। সময় পাল্টেছে, খেলোয়াড় পাল্টে যাচ্ছে, কিন্তু ধারাভাষ্যের কণ্ঠটা স্থির, এবং অভিন্ন। এই নিবেদনকে কি হালকা ভাবা যায় আদৌ? ক্রিকেট সেন্স, রুচি, প্রতিভা, বিচক্ষণতা সবকিছুতেই যোজন যোজন পিছিয়ে থেকেও এই নিবেদন যোগ্যতাতেই জাফরউল্লাহ শরাফত ব্যক্তির চাইতেও বড় এক চরিত্র; হোক সেটা সাদা-কালো, কিংবা ধূসর। চরিত্র তার চিত্রের গুণেই মহিমা পায়; আমরা মহিমা খুঁজে কালিমা হারাই, সৌকর্য বাড়াই, আর অবারিত সৌন্দর্য্য ছড়াই।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।