‘চকলেট বয়’ তকমা ভাঙার অনবদ্য মিশন

২০১৪ সাল। শেক্সপিয়রের ‘হ্যামলেট’-কে ভারতীয় সংস্করণে রুপালী পর্দায় তুলে আনলেন নির্মাতা বিশাল ভরদ্বাজ। কাশ্মীরের রাজনৈতিক পটভূমিতে নির্মিত এই ছবিটি সাম্প্রতিক কালের অন্যতম সেরা ছবি হিসেবে বিবেচিত। দর্শকদের প্রশংসা যেমন পেয়েছে,তেমনি বেশ কয়েকটি শাখায় অর্জন করে নিয়েছিল জাতীয় পুরস্কার।

ডেনমার্কের হ্যামলেটকে নির্মাতা সাজিয়ে তুললেন কাশ্মীরের হায়দার রুপে। এই চরিত্রে তিনি বেছে নিলেন তাঁরই একজন আস্থাভাজন নায়ককে, অনেকে সন্দিহান থাকার পরও। কিন্তু মুক্তির পর সবাই এক বাক্যে মেনে নিলেন হায়দার চরিত্রে তিনিই সেরা। সিনেমার পাশাপাশি নায়ক প্রশংসায় সবাই একীভূত হয়েছিলেন। নিজের রোমান্টিক ইমেজ ছাপিয়ে এমন অনন্য অসাধারণ অভিনয় করা নায়কটিই হলেন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক শহীদ কাপুর।

বাবা প্রখ্যাত অভিনেতা পঙ্কজ কাপুর। মা নৃত্যশিল্পী নীলিমা আজিম। নানা হলেন বিহারের মার্কসবাদী সাংবাদিক ও লেখক আনোয়ার আজিম। নানার বাবাও ছিলেন বিখ্যাত মানুষ। চলচ্চিত্র পরিচালনা, স্ক্রিন রাইটার, লেখক ও সাংবাদিক – হাজারো পরিচয়ের মানুষটির নাম খাজা আহমেদ আব্বাস। তিনি পরিচিত ছিলে কেএ আব্বাস নামে।

শহীদের জন্ম ১৯৮১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। মাত্র তিন বছর বয়সেই বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ দেখেন। মায়ের সঙ্গে থেকে জীবন বাস্তবতা সময়ের আগেই বুঝে নিয়েছিলেন। বলিউডে শুরুটা মোটেই মসৃণ ছিল না। জনপ্রিয় তারকাদের সাথে ব্যাক ড্যান্সার হিসেবেও কাজ করেছেন কিছু ছবিতে। মিউজিক ভিডিও ও পেপসির বিজ্ঞাপনে শাহরুখ খান, কাজল ও রানী মুখার্জির সাথে কাজ করার সুবাদে বড় পর্দায় আসার আগেই শহীদ কাপুরের চেহারাটা দর্শকদের কাছে পরিচিতি পেয়ে যায়।

যদিও, বড় পর্দায় সুযোগ পাওয়াটা খুব সহজ হয়নি শহীদের। হ্যা, সেটা স্টারকিড হওয়ার পরও। একটা ব্রেক পেতে কম করে হলেও ১০০ বার পরিচালকদের মুখ থেকে ‘না’ শুনতে হয়েছে। শহীদ নিজেই এই কথাগুলো এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন।

নায়ক হিসেবে বর্ণিল সুযোগটা এলো উমাঙ কুমারের হাত ধরে। ২০০৩ সালের ‘ইশক ভিশক’ সিনেমাটি নিয়ে। তারুণ্যপ্রেমের এই ছবিটি ব্যবসায়িক ভাবে হয়তো সেভাবে সাফল্য না পেলেও সেই বছরের অন্যতম আলোচিত সিনেমা ছিল। নবাগত নায়ক হিসেবে শহীদ কাপুর সবার নজরে এসেছিলেন, প্রচুর আলোচনাতেও এনেছিলেন। অনেকেই বলেছিলেন শহীদই হবে পরবর্তী শাহরুখ খান। এত এত প্রশংসা, আলোচনা সইলো না বিধাতার। একে একে মুক্তি পাওয়া পরবর্তী সিনেমাগুলো ফ্লপ হল। ‘ফিদা’, ‘চুপকে চুপকে’, ‘৩৬ চায়না টাউন’-সহ কোনো ছবিই আলো ছড়ালো না।

অবশেষে সুরুজ বারজাতিয়ার ‘প্রেম কুমার’ হয়ে ব্যর্থতার বেড়াজাল পেরিয়ে পেলেন প্রথম সফলতা দেখা। হিট বা সুপারহিট নয়, একেবারে ব্লকব্লাস্টার। সঙ্গে নিজের প্রথম নায়িকা অমৃতা রাও। সিনেমার নাম ‘বিবাহ’। পারিবারিক ধারার সিনেমাটিও চমৎকার, শহীদ কাপুর আবার আলোচনায় এলেন।

এর ঠিক পরের বছরেই পেলেন ক্যারিয়ারের আরেক সেরা সিনেমা ‘জাব উই মেট’। কারিনা কাপুরের সঙ্গে তখন জুটি ভেঙে গেছে, তখনই ইমতিয়াজ আলীর এই ছবিটি পুরো বলিউড প্রেমীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়লো। প্রাণোচ্ছল গীতের সংস্পর্শে এসে বিষন্ন ব্যবসায়ীর আদিত্যের জীবন পালটে দেয়ার গল্পটি এখনো দর্শকদের খুব প্রিয়, সুদূর ভবিষ্যতেও এই সিনেমাটি এমনই দর্শকপ্রিয় হয়ে থাকবে।

বিশাল ভরদ্বাজের সঙ্গে শহীদ কাপুরের প্রথম কাজ ‘কামিনে’। সিনেমায় মুক্তির আগে মূল আলোচনায় প্রিয়াঙ্কা চোপড়া থাকলেও দ্বৈত চরিত্রে শহীদ কাপুরের অভিনয় ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছিল। মূলত এই ছবিটি দিয়েই নিজের ভেঙে নতুনভাবে আলোচিত হয়েছিলেন।

এই জুটির মানে ভরদ্বাজের সাথে শহীদের দ্বিতীয় সিনেমা ‘হায়দার’,এই সিনেমা অনবদ্য অভিনয় দেখে সবাই মন্তব্য করেছিল এটিই তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা সিনেমা। ‘হায়দার’-এ শহীদ কাপুরের অভিনয় এই দশকের সেরা অভিনেতাদের তালিকায় একদম প্রথমদিকেই থাকবে, এই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য তিনি এক রুপিও পারিশ্রমিক নেননি। অবশ্য এই জুটির শেষ সিনেমা ‘রেঙ্গুন’ দর্শকদের হতাশ করেছে।

কামিনে থেকে হায়দারের মাঝে বেশ কয়েকটি সিনেমাতেই অভিনয় করেছিলেন। তবে কোনোটাই পরিপূর্ণ ভাবে আলো ছড়ায় নি। বাবার সিনেমা ‘মৌসুম’ বেশ আলোচনায় থাকলেও, মুক্তির পর সন্তোষজনক ছিল না, তবে সবাই শহীদের প্রশংসা করেছিলেন।

প্রভুদেবার মশালদার সিনেমা ‘আর রাজকুমার’ এর গান হিট হলেও ব্যবসায়িক ভাবে সফল ছিল না। এছাড়া মুক্তি পাওয়া ছবিগুলোর মধ্যে ‘বদমাশ কোম্পানি’ অন্যতম। ‘কামিনে’র আগে মুক্তি পাওয়া বিদ্যা বালানের সাথে ‘কিসমত কানেকশন’ এর গান হিট হলেও ছবি পেয়েছিল ফ্লপের তকমা।

‘হায়দার’ এর পর যখন আরো উজ্জ্বল ভাবে বিকশিত হবার কথা তখনই ‘শানদার’ এর মত ব্যর্থ ও সমালোচিত সিনেমা যেন বাধা হয়ে দাঁড়ালো। পরবর্তীতে ‘উড়তা পাঞ্জাব’-এ আবারো নিজের আলো ছড়ালেন। সঞ্জয় লীলা বানশালির ‘পদ্মাবত’ ব্লকব্লাস্টার হলেও রণবীর সিং এর কাছে ম্লান হয়ে গিয়েছিলেন। মুক্তি পাওয়া সর্বশেষ সিনেমা ‘বাত্তি গুল মিটার চালু’ ও তেমন সন্তোষজনক নয়।

সাম্প্রতিক কালের তেলেগু ইন্ডাস্ট্রির মাইলস্টোন সিনেমা অর্জুন রেড্ডির বলিউড সংস্করণ ‘কবির সিং’-এ আছেন প্রধান ভূমিকায়,সব কিছু ঠিকঠাক হলে এই সিনেমাটিই হতে পারে ক্যারিয়ারের আরেক টার্নিং পয়েন্ট। তারকা হিসেবে শহীদ কাপুর প্রথম থেকেই জনপ্রিয় ছিলেন, কিন্তু ভাগ্য সেভাবে সুপ্রসন্ন হয়নি সঙ্গে নিজের কিছু সিনেমা নির্বাচন ও ভুল ছিল। সেই সব শুধরে নিজেকে আরো বিকশিত করবেন এই আশা রাখি।

‘ইশক ভিশক’-এর জন্য ফিল্মফেরারে সেরা নবাগত পুরস্কার পেয়েছিলেন, ‘হায়দার’ দিয়ে পেয়েছেন সেরা অভিনেতার পুরস্কার, ‘উড়তা পাঞ্জাব’ দিয়ে পেয়েছেন সমালোচক পুরস্কার। ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন মীরা রাজপুতকে, রয়েছে দুই সন্তান। ভাই ঈশান খাত্তারও এসেছেন চলচ্চিত্রে, সাফল্যও পাচ্ছেন। ‘শানদার’ দিয়ে অভিষেক হয়ে গেছে বোন সানাহ কাপুরেরও।

বলিউডে শহীদের ক্যারিয়ারটাকে চাইলে অনুপ্রেরণা হিসেবেও দেখা যায়। চকলেট বয় হয়ে শুরু করেছিলেন। সেখান থেকে নিজেকে পুরস্কারজয়ী অভিনেতাদের কাতারে নিয়ে গেছেন। ভিন্নধারার দারুণ সব চরিত্র করেছেন। তবে, একটা আক্ষেপ নিশ্চয়ই থাকবে। যেভাবে ক্যারিয়ারের শুরু করেছিলেন, সেই গতিটা থাকলে আজ তাঁর নাম রণবীর সিং বা রণবীর কাপুরের সাথেই উচ্চারিত হওয়ার কথা ছিল।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।