বিক্রম: অনিন্দ্য এক অভিনেতা

তামিল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সেরা দুই নির্মাতা হলেন মানি রত্নম ও এস শঙ্কর। দু’জনই কাস্টিংয়ের ব্যাপারে খুব খুতখুতে। কিন্তু, সাম্প্রতিক সময়ে দু’জনেরই প্রিয় অভিনেতা হলেন একজন – চিয়া বিক্রম। দু’জনের ছবিতেই সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার হাজির হয়েছেন এই অভিনেতা। ভবিষ্যতের কয়েকটা ছবির জন্যও চুক্তিবদ্ধ হয়ে আছেন।

এটুকু বললেই বোঝা যায়, তামিল ইন্ডাস্ট্রিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও পরিপূর্ণ অভিনেতা হলেন বিক্রম। তিনি হলেন পানির মত। যখন যে পাত্রে যান তারই আকার ধারণ করেন। মানে তিনি যেকোনো চরিত্রেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন।

বিক্রমের জন্ম ১৯৬৬ সালের ১৭ এপ্রিল। মাদ্রাজের তামিল নাড়ুর এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তার জন্ম হয়। বাবা খ্রিষ্টান, মা হিন্দু। বিক্রমের পারিবারিক নাম হল কেনেডি জন ভিক্টর। সবাই ডাকে কেনি বলে। যদিও পর্দায় তিনি আসেন বিক্রম নামেই। তিনি মনে করেন এই নামে তার বাবা ভিক্টর মা রাজেশ্বরী – দু’জনের নামই আছে।

বিক্রমের বাবা হলেন জন ভিক্টর। সিনেমার জন্য তিনি বাড়ি ছেড়েছিরেন। বিনোদ রাজ নাম নিয়ে তিনি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করলেও কখনোই বড় কোনো কিছু করতে পারেননি। বিক্রমও শুরুতে বড় কিছু ছিলেন না। তিনি ডাবিং আর্টিস্ট হিসেবে আসেন ইন্ডাস্ট্রিতে। প্রভু দেবা, অজিত কুমারদের চরিত্রগুলোতে কণ্ঠ দিতেন। কালক্রমে হয়ে ওঠেন মহীরূহ।

১৯৯০ সালের ছবি ‘এন কাধাল কানমনি’ ছবি দিয়ে তিনি প্রথম রূপালি পর্দায় আসেন। এর আগে টুকটাক বিজ্ঞাপনের কাজ করতেন। ক্যারিয়ারের প্রথম তিনটা ছবির কোনোটাতেই নিজেকে ঠিক মেলে ধরতে পারেননি। ১৯৯২ সালে ‘মিরা’ ও ‘কাভাল গিথাম’ দিয়ে একটু একটু করে নিজের জায়গা পেতে শুরু করেন তিনি।

১৯৯৩ সালটা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বছর হতে পারতো। সেবার মানি রত্মমের ‘বোম্বে’র জন্য চুক্তিবদ্ধ হন তিনি। মনিষা কৈরালার সাছে ছবির প্রাথমিক ফটো শ্যুটেও অংশ নেন। কিন্তু, এরপর পরিচালক রত্মম বিক্রমকে ক্লিন শেভ করতে বলেন। কিন্তু, অন্য একটা ছবির প্রয়োজনে ক্লিন শেভ হওয়া তখন সম্ভব ছিল না বিক্রমে। তাই বিক্রমের এই কালজয়ী ছবিতে কাজ করা হয়নি। বিক্রমের জায়গায় তাই আসেন অরবিন্দ স্বামী।

বিক্রমের এই ‘স্ট্রাগলির পিরিয়ড’ চলে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত। এই সময় টিকে থাকার প্রয়োজনে তিনি ছোট ছোট চরিত্র ও সহ-অভিনেতার চরিত্রও করেছেন। ১৯৯৯ সালের ‘সেথু’ ছবিতে তিনি বিস্ময়ের উপহার দেন। মাথা কামিয়ে ফেলেন। শরীরের ওজন কমান ২১ কেজি।

ছবিটি তামিল ইন্ডাস্ট্রিতে একটা মাইলফলক সৃষ্টি করে। সেরা সিনেমার ক্যাটাগরিতে ফিল্ম ফেয়ার ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার দু’টোই পায়। সেবারই প্রথমবারের মত ফিল্ম ফেয়ারে পুরস্কৃত হত বিক্রমও। তিনি পান বিশেষ জুড়ি পুরস্কার।

‘সেথু’ ছবিটি পরে আরো পাঁচবার রিমেক হয় ভিন্ন ভিন্ন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। বলিউডে ‘তেরে নাম’ নামে ছবিটা করেন স্বয়ং সালমান খান। কান্নাড়া, তেলেগু এমনকি বাংলাদেশেও ছবিটা রিমেক হয়।

দক্ষিণী ফিল্ম ফেয়ারে প্রথমবারের মত সেরা অভিনেতার পুরস্কার বিক্রম পান ২০০১ সালে। ছবির নাম ‘কাসি’। ২০০৩ সালের ‘পিথামাগান’-এর জন্য সেরা অভিনেতার ক্যাটাগরিতে পান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, স্বভাবতই সেবার ফিল্ম ফেয়ারেও সেরার পুরস্কার পান তিনি।। এই সময় থেকেই তিনি শীর্ষস্থানীয় তামিল নির্মাতাদের প্রথম পছন্দ।

২০০৫ সালে এস শঙ্করের সাথে করলেন ‘আনিয়ান’, বলিউডে এই ছবিটি মুক্তি পায় ‘আপারাচিত’ নামে। এবার আবারো দক্ষিণী ফিল্ম ফেয়ার পেয়ে গেলেন। ২০১৫ সালে এস শঙ্করের সাথে করলেন ‘আই’। এবার আবারো তিনি ফিল্ম ফেয়ারের বিবেচনায় সেরা।

মানি রত্নম আবারো তাঁর কাছে ফিরলেন। ২০১০ সালে তামিল ভাষায় নির্মিত হল ‘রাভানান’। আর বলিউডে হল ‘রাভান’। এর মধ্যে তামিল ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিলেন বিক্রম। বিক্রমেরটাই বেশি ব্যবসা করে, সমালোচকদের দৃষ্টিও আকর্ষণ করে। আর এই সাফল্যের সুবাদেই আসে ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার। মানে, যতবারই তিনি বড় পরিচালক কিংবা ভার স্ক্রিপ্ট পেয়েছেন ততবারই বাজিমাৎ করেছেন।

বিক্রমের খুব আন্ডাররেটেড ছবি হল ২০১৬ সালের ‘ইরু মুরগান’। দু’টি ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে তিনি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। ‍তিনি একাধারে ছিলে র-এজেন্ট আখিলান ও ধুরন্ধর ভিলেন ‘লাভ। সিনেমার মূল আকর্ষণ এই ভিলেন চরিত্রটি তৃতীয় লিঙ্গের এই ভিলেনের ভূমিকায় বিক্রম দর্শকদের বিরাট ধাঁধায় ফেলতে পেরেছিলেন।

যদিও, বিক্রমের জীবনটা ঠিক এমন হওয়ার কথা ছিল না। কলেজে যখন পড়তেন, তখন বিরাট একটা দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে। টানা তিন বছর তিনি একদমই হাঁটতে পারেননি। ডাক্তাররাও সাফ বলে দিয়েছিলেন, আর কখনোই সাধারণ মানুষের মত হাঁটতে পারবেন না বিক্রম।

কিন্তু, বিক্রম ঠিকই ফিরেছেন। তিনি সব ভবিষ্যদ্বানীকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন। জীবনের মত এই কথাটি তাঁর ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রেও সত্য!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।