সৃজিত মুখোপাধ্যায়: কোথায় হারালো সেই ম্যাজিক!

তাঁর হাজারটা পরিচয়। বলছি ভারতের খ্যাতনামা পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের কথা। পরিচালনার পাশাপাশি অভিনয়, চিত্রনাট্য ও অর্থনীতিবিদ হিসেবেও সুপরিচিত। পরিচালক হিসেবে এক দশক পূর্ণ করতে চলেছেন সৃজিত মুখার্জি।

২০১০ সালে ক্যারিয়ার শুরু করা মানুষটি এই দশ বছরে ষোলটি সিনেমা পরিচালনা করেছেন এবং এর মধ্যে বারোটি সিনেমাই বক্স অফিসে সফলতা পেয়েছে। এবং এই দশ বছরে তার পরিচালিত সিনেমাগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে প্রায় ১৭৫ টি পুরস্কার ঘরে তুলেছে তিনি এবং তার টিম। এর মধ্যে কয়েকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্তি সৃজিতকে এই সময়ের কলকাতার অন্যতম সেরা এক দক্ষ এবং জনপ্রিয় নির্মাতার স্বীকৃতি এনে দিয়েছে।

২০১০ সালে পরিচালনার মধ্যে দিয়ে রুপালি জগতে পদার্পন করা সৃজিত মুখোপাধ্যায় অন্যভাবে বলা যায় কলকাতার সিনেমাকে আলাদা এক স্বতন্ত্র জায়গায় নিয়ে গেছেন। বানিজ্যিক এবং আর্ট৷ এই দুই মাধ্যমের সংমিশ্রণে এক ভিন্নধারার সূচনা করেছেন তিনি তা বলা যায় নিঃসন্দেহে।

একদিকে ‘অটোগ্রাফ’, ‘বাইশে শ্রাবন’, ‘চতুস্কোণ’ বা ‘ভিঞ্চিদা’র মতো থ্রিলার উপহার দিয়েছেন তিনি, অন্যদিকে ‘রাজকাহিনী’, ‘এক যে ছিল রাজা’ বা ‘গুমনামী’র মতো ইতিহাস নির্ভর গল্পকে তুলে ধরেছেন নিজস্ব মুন্সিয়ানায়। তাঁর সিনেমায় সংলাপ, চিত্রনাট্য, গান, সিনেমাটোগ্রাফি এবং দক্ষ শিল্পীদের অভিনয় প্রতিভার দেখা মিলেছে সবসময়ই।

২০১০ সালে সৃজিত পরিচালিত ‘অটোগ্রাফ’ সিনেমাটি সিনেমাপাড়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপর ২০১১ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘বাইশে শ্রাবণ’ ২০১২ সালে ‘হেমলক সোসাইটি’, ২০১৩ সালে ‘মিশর রহস্য’, ২০১৪ সালে ‘জাতিস্মর ও চতুষ্কোণ’, ২০১৫ সালে ‘নির্বাক’, ও ‘রাজকাহিনী’, ২০১৬ সালে ‘জুলফিকার’, ২০১৭ সালে ‘বেগমজান’- হিন্দি ‘ইয়েতি অভিযান’, ২০১৮ সালে ‘উমা’, ‘এক যে ছিল রাজা’, ২০১৯ সালে ‘শাহজাহান রিজেন্সি’, ‘ভিঞ্চিদা’, ‘গুমনামী’। সামনে মুক্তি পেতে চলেছে ‘দ্বিতীয় পুরুষ’।

ভারতের ৬১তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সৃজিত পরিচালিত ‘জাতিস্মর’ ছবিটি চারটি পুরস্কার জিতে নেয়। এরপর ৬২ তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানে তার পরিচালিত ‘চতুষ্কোণ’ সিনেমাটির জন্য তিনি সেরা পরিচালক এবং সেরা চিত্রনাট্য বিভাগে পুরস্কার জিতে নেন।

তিনি সেই সময় এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘পুরস্কার-প্রত্যাশী হয়ে কোনওদিন সিনেমা তৈরি করিনি৷‌ আমি দর্শককে আমার ছবি দেখাতে চাই৷‌ নিজেকে আমি একজন কথক হিসেবেই দেখি৷‌ দর্শককে আমার গল্প শোনাতে চাই৷‌ পুরস্কার অবশ্যই একটা বাড়তি উদ্দীপনা দেয়৷‌ জাতীয় পুরস্কার তো বটেই৷‌ কিন্তু শেষ পর্যম্ত তোমাকে চাই বলতে আমি বুঝি দর্শকদেরই৷‌’

এছাড়াও চলচ্চিত্রের ২০১৫-য় তিনটি সেরার পুরস্কার পেয়েছে ‘চতুষ্কোণ’৷‌ সেরা পরিচালকের পুরস্কার ছাড়াও সৃজিত পেলেন ‘চতুষ্কোণ’-এর জন্যই সেরা মৌলিক চিত্রনাট্যকারের পুরস্কারও৷‌ এই ছবির জন্যেই সেরা সিনেমাটোগ্রাফারের পুরস্কার পেয়েছেন সুদীপ চট্টোপাধ্যায়৷‌ এর আগে ২০১৪ সালে জাতিস্মর কয়েকটি জাতীয় পুরস্কার পেলেও সৃজিত নিজে কোনও পুরস্কার পাননি। তবে ২০১৮ সালের সিনেমা নিয়ে ৬৬ তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তার পরিচালিত ‘এক যে ছিল রাজা’ আটটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জয় করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে সবাইকে।

‘দ্বিতীয় পুরুষ’ অবশ্য সেই অর্থে আলোচিত হয়নি। ব্যবসা সাফল্য পেলেও সেটা ২০১১ সালের প্রথম কিস্তি ‘বাইশে শ্রাবন’ সিনেমাটির ধারের কাছেও যায়নি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ইদানিং তাঁর ছবিগুলো আগের মত নজর কাড়তে পারছে না। ব্যবসা সাফল্য আসছে, কিন্তু সেই ম্যাজিকটা নেই। হয়তো শিগগিরই বড় কোনো ছবি দিয়ে এই ঘাটতি পুষিয়ে দেবেন সৃজিত।

তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। বাবা সমরেশ মুখোপাধ্যায় স্থাপত্যবিদ্যার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং মা শরীরবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক। সৃজিত প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক পাস করেন। পরে তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম.ফিল ও পিএইচডি শেষ করেন।

তারপরেই সিনেমার প্রতি ভালোবাসা থেকেই এই মাধ্যমে আগমন। এবং প্রথম সিনেমাতেই তার সফলতা ‘এলেন, দেখলেন, জয় করলেন’ এই প্রবাদটির সাথে মানিয়ে যায় অনেকভাবেই। পেশাগত জীবনে সফল এই কৃতি মানুষটি কিছুদিন আগে ভালোবেসে বিয়ে করেন আমাদের বাংলাদেশের আলোচিত অভিনেত্রী মিথিলাকে। নতুন জীবন, নতুন অনেক গল্প এবং নতুন সিনেমা নিয়ে ভালোই কাটছে তার সময় বলে আশা করা যায়। সামনে আরো অনেক ভালো এবং মানসম্মত কাজ উপহার দিবেন তিনি সেই কামনা রইলো।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।