এখনই তো ভারতকে ট্রল করার আদর্শ সময়!

ভারতের অনেক কিছুই পছন্দ না, অনেক কিছুই ভাল না। একটি দেশের সবকিছু ভাল হয় ও না; অনেক দিক দিয়েই তারা বিভিন্ন সূচকে বেশ পিছিয়ে আছে। তার মানে এই না যে আপনি ভারতের সবকিছুর বিরুদ্ধে বলা শুরু করবেন, কিংবা গালি-গালাজ বা ট্রল করবেন!

তার আগে নিজের পেছনের কাপড়টা ঠিকমত আছে কিনা পরখ করে নেয়ার অনুরোধ থাকবে। আমরা ভারতের ধর্ষণ নিয়ে কথা বলি, টয়লেট ব্যবহার না করা নিয়ে কথা বলি, জোর করে গো-মূত্র খাওয়ানো নিয়ে কথা বলি, সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কথা বলি- সেই ফাঁকে তারা ঠিকই চাঁদে চলে যাচ্ছে!

আর আমরা ছোটোলোকের মত তামাশা আর নোংরামির পসরা সাজিয়ে বসেছি। আমরা ভারতের চন্দ্রাভিযান নিয়ে করা বিভিন্ন নিউজলিঙ্কে গিয়ে ভারতকে ব্যর্থ বলে কমেন্ট করছি, পাল্টা তারা আমাদের এই বাংলাদেশকে উল্লেখ করে অপমানজনক রিপ্লাই করছে। আমরা কবে যে বুঝবো!

আসলে কি করেছে ভারত; শুনুন এবার-  ভোররাতে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ধীরে অবতরণের (সফট ল্যান্ডিং) কথা ছিল চন্দ্রযান-২ নামক নভোযানের। গত ২৩ জুলাই, ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় চন্দ্রযান-২।

দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় এক মিনিটের মধ্যে সেটিকে উৎক্ষেপণ করা হয়। তার এক সপ্তাহ আগে প্রথমবারের উৎক্ষেপণ বাতিল হয়। চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২.১ কিলোমিটার দূরে থাকাবস্থায় এর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

কন্ট্রোল রুমের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় চন্দ্রযান-২ এর ল্যান্ডার, বিক্রম এর। শেষ পর্যন্ত, চাঁদে অবতরণ করার আগ দিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ভারতের চন্দ্রযান-২ এর ল্যান্ডারের খোঁজ মিলেছে চাঁদের পৃষ্ঠেই।

ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অরগানাইজেশনের (ইসরো) প্রধান ড. কে শিভান রোববার স্থানীয় গণমাধ্যমের কাছে চন্দ্রযানের ল্যান্ডার খুঁজে পাওয়ার কথা জানান। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া চন্দ্রবিজয় করেছে। তবে তা চাঁদের অন্য অঞ্চলে।

ভারতের নভোযান চাঁদে অবতরণ করলে তারা চন্দ্রবিজয়ী চতুর্থ দেশ হিসেবে তালিকায় উঠে আসত। এটিই হতো চাঁদের দক্ষিণ প্রান্তের সবচেয়ে কাছাকাছি যাওয়া প্রথম নভোযান। এ অভিযান পরিচালনা করতে ভারতের ব্যয় হয়েছে এক হাজার কোটি রুপি। এ অর্থ এর আগে পরিচালিত যেকোনো দেশের চন্দ্রাভিযানের খরচের তুলনায় বহু গুণ কম।

ইসরো বলছে, একই ধরনের অভিযানে মার্কিন সংস্থা নাসার ২০ গুণ অর্থ খরচ হয়ে থাকে। যখন চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণের নির্ধারিত সময়ের কিছুক্ষণ আগে শনিবার মধ্যরাতে চন্দ্রযান-২ এর ল্যান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল; ঐতিহাসিক এই মুহূর্তের সাক্ষী হতে ইসরোর সদর দপ্তরে তখন উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

কিন্তু শেষ পর্যায়ে এসে গড়বড় হয়ে যাওয়ায় ব্যর্থ মনোরথে সেদিন তিনি দিল্লি ফিরে যান। ড. কে শিভান ল্যান্ডারের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেছেন!

আপনি জানেন, রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে চন্দ্রাভিযানের পরিকল্পনা ছিল ভারতের। কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে বোঝাপড়া না হওয়ায় চুক্তি হয়নি। পরে ভারত একাই চন্দ্রাভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়। এবং সবটুকুই তারা নিজেরা করে, উৎক্ষেপণ থেকে শুরু করে নিয়ন্ত্রণের প্রত্যেকটা পর্যায় এবং কম খরচে!

কথা ছিল, ঠিকঠাক পৌঁছাতে পারলে চন্দ্রযান-২ এর রোভার প্রজ্ঞান নতুন তথ্য পাঠাবে পৃথিবীতে। সেখান থেকে হয়ত জানা যেত চাঁদের বুকে কতটা পানি কী অবস্থায় আছে। ভারতের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি মহাকাশযান চন্দ্রযান-২ চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করেছিল গত ২০ আগস্ট।

চন্দ্রযানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর নিয়ন্ত্রণকক্ষে বিজ্ঞানী ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দেন মোদি। তিনি বলেন, ‘আপনারা যা করেছেন সেটা কম নয়। হাল ছাড়বেন না। এই অভিযান মোটেও ব্যর্থ হয়নি। ভারতের মহাকাশ বিজ্ঞানকে আরেক ধাপ উপরে নিয়ে যাবে এই অভিযান। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের ইচ্ছাশক্তি আরও প্রবল হল। সংকল্প আরো দৃঢ় হল!’

ইন্সপায়েরেশন কি জিনিস, শিখে নিন! মাত্র এক হাজার কোটি রূপি খরচে এই চন্দ্রযান-২ অভিযানটা চালিয়েছে ভারত। বেশি না, বাংলাদেশী মুদ্রায় হিসেব করতে গেলে বারশো কোটি টাকার মতো খরচ হয়েছে। আমাদের জাতীয় বাজেটের দিকে তাকালে এই বারশো কোটি টাকা খুব বেশি টাকা নয়, তাহলে পার্থক্যটা কোথায়! ভেবে দেখুন।

তারপরও আমরা বেহায়ার মত করে চন্দ্রযানের অভিযান ব্যর্থ হবার অজুহাতে ভারতকে ট্রল করছি। তাতে আমরা যে নিজেরাই নিজেদের ছোট করছি সেটা বুঝতে পারছি না। কি জানি, ‘লজ্জা’নামক শব্দটার সাথে হয়ত আমাদের এখন আর পরিচয় নেই!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।