চাঁদপুরের ইলিশ বিলাস ও অন্যান্য

নিত্যদিনের যান্ত্রিকতা আর ধুলাবালি খেতে খেতে যারা ক্লান্ত হয়ে গেছেন, সময় স্বল্পতার জন্য যারা ঘুরতে যেতে পারছেন না, এক দিনের মধ্যে একখান মিনি ট্যুর দিতে ইচ্ছুক, এবং যারা চাচ্ছেন এই শীতে একবার লঞ্চভ্রমন করতে- তাঁরা স্ক্রল করে পরে ফেলুন এই লেখাটি।

এই ট্যুরটি শেষ করতে সর্বোচ্চ নয় ঘন্টা সময় লাগবে আপনার। সাত জন নিয়ে লঞ্চভ্রমনে আমরা গিয়েছিলাম চাঁদপুর, ঘুরতে এবং খেতে আমাদের খরচ হয়েছিল ৩৫০০/- টাকার কাছাকাছি।

ইলিশের স্বাদ-গুন আর ইতিহাস নিয়ে কোনো গল্প বুনবো না। কারণ আমরা বাঙালি, ইলিশের স্বাদ থেকে শুরু করে এর ইতিহাস-পাতিহাস সবই আমাদের জানা। সামান্য তেল আর নুন ছিটিয়ে ভেঁজে ফেললে- কবজি ডুবিয়ে ভাত খাওয়া যায় এক টুকরো ইলিশ দিয়ে। ইলিশ ভাঁজা আর ঐতিহ্যবাহী ব্রিটিশ সময়কার মিষ্টির দোকান ‘ওয়ান মিনিট’ এর আইসক্রিম খেতে আমি গিয়েছিলাম চাঁদপুর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ক্যাম্পাস শ্যাডো’র আইসক্রিমের মতই এটা, তবে এর স্বাদ তার থেকে আলাদা। ভ্যানিলার মধ্যে কিছুটা বানানা ফ্লেভার যোগ করলে যা হয় আরকি, একবার খেলে সারাদিন এর স্বাদ আপনার জিভে লেগে থাকবে। যদি কখনো চাঁদপুর যাওয়া হয়- তাহলে এই জিনিস ভুলেও মিস করবেন না। কিভাবে গেলাম তা খুব সহজভাবে নিচে তুলে ধরলাম।

  • লঞ্চভ্রমন ঢাকা টু চাঁদপুর

ঢাকা থেকে চাঁদপুর যেতে সময় লাগে তিন ঘন্টা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রতি ঘন্টায় আপনি লঞ্চ পাবেন।

ঢাকার যেকোন জায়গা থেকে চলে আসুন সদরঘাট টার্মিনালে। এরপর কাউন্টার থেকে এন্ট্রি পাশের জন্য টিকেট কাটুন (জন প্রতি পাঁচ টাকা)। ১০ নম্বর গেট দিয়ে টার্মিনালের ভেতরে প্রবেশ করুন। এবার চাঁদপুরের লঞ্চে উঠে পরুন। স্বল্প খরচে এবং দিনের আলো শেষ হওয়ার পূর্বে যদি ভ্রমন শেষ করতে এবং ঢাকা ফিরতে চান, তাহলে সকাল ৬/৭টার লঞ্চ ধরুন। যদি দাড়িয়ে এবং লঞ্চের ছাদে ঘুরে ৩ঘন্টা সময় পার করতে পারেন, তাহলে চাঁদপুর পৌঁছানোর পর টিকেট কাটুন (জন প্রতি ১০০/-টাকা)।

নোট

যদি বাসের মত সিটে বসে যেতে চান, তাহলে লঞ্চে উঠার সাথে সাথে টিকেট কাটুন (জনপ্রতি ১৫০/-) টাকা। এর বাইরে বিজনেস ক্লাস এবং ভিআইপি সিট/কেবিন এর ব্যবস্থা আছে, ভ্রমনটা বিলাসবহুল করতে চাইলে তা ব্যাবহার করতে পারেন। নাশতা বাইরে থেকে করে নেওয়া ভাল, নইলে চাঁদপুর নেমে আপনি নাশতা করতে পারবেন। লঞ্চের ভেতর সব জিনিসেরই দাম বেশি, চাইলে ভেতর থেকে ১০/-টাকা চা এবং ৫/-টাকার রুটি দিয়ে নাশতা সেরে নিতে পারেন। খিচুড়ি খেতে চাইলে আপনাকে ১৩০/-টাকা খরচ করতে হবে।

  • চাঁদপুর পৌঁছানোর পর

চাঁদপুর পৌছে গেলে লঞ্চের ভেতর থেকেই মুখ হাত ধুয়ে নিন, এরপর বেরিয়ে পরুন। বের হওয়ার সাথে সাথে কাউন্টার থেকে জেনে নিন লঞ্চ এর সিডিউল। বাহিরে অটোগাড়ি পাবেন, উঠে সোজা চলে যান ‘বড় ষ্টেশন’ – ভাড়া পরবে ১০/- টাকা (জনপ্রতি, আসার পথে এই অটো রিজার্ভ করেছিলাম ৪০/- টাকায়)। বড় স্টেশন পৌছে গেলে- আরাম করে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য পাবেন অসাধারণ একটা জায়গা, যেখানে বসার জন্য সুন্দর ব্যবস্থা আছে।

চাইলে এখান থেকে ট্রলার ভাড়া করে আসেপাশের চরে ঘুরতে পারেন। এইটা একখান পর্যটন স্পট, খাওয়ার জন্য এখানে ঝালমুড়ি, ভুনা বুট এবং চানাচুর পাবেন। ট্রাস্ট মি, এখানের ঝালমুড়ি আপনাকে পাগল করে দিবে। না খাইলে মিস টাইপের আইটেম এটি। এখান থেকে ৫/১০মিনিট হাঁটলেই ইলিশের আড়ৎ, আমরা ইলিশে আড়তে পরে ঢুকি – আগে আইসক্রিম খেয়ে আসি।

এরপর এখান থেকে বের হয়ে অটোতে উঠে চলে যান সোজা ‘কালীবাড়ি’, ভাড়া পরবে ০৫/-টাকা (জনপ্রতি)। কালীবাড়ি নেমে যে কাউকে জিগ্যেস করলে দেখায় দিবে ‘ওয়ান মিনিট’ মিষ্টির দোকান। এদের সেই বিখ্যাত আইসক্রিম খাওয়ার জন্য আপনার গুনতে হবে ৪০/- টাকা। চাইলে এর সাথে মিষ্টি খেতে পারেন, সাবধান- ভুলেও ছানা খাবেন না, তাহলে আপনার সকল আনন্দ ওখানেই শেষ।

এরপর আবার বড় ষ্টেশন ফিরে আসুন অটোতে করে। যে কাউকে জিগ্যেস করলেই দেখিয়ে দিবে ইলিশের আরৎ। আড়ৎে ঢুকার পর দেখতে পাবেন কি ভাবে ইলিশ মাছ নিলামে বিক্রি হয়। এখানে ৬৫০-৯৫০/- অথবা ১১৫০/- পর্যন্ত কেজি দরে ইলিশ মাছ কিনতে পারবেন। আমাদের দু’টি মাছের দাম পরেছিল ৮৭২/- টাকা।

মাছ কেনা হয়ে গেলে এর পাশেই, ঘাটের পাশ দিয়ে একটু হাটলেই পাবেন মনা মিয়ার হোটেল। কাটাকুটি এবং ভাঁজার জন্য এরা ১০০/- করে নেয় প্রতি মাছ। দু’টি মাছ কাটাকুটি + ভাঁজা + ১১টা ভাত + ৭ টি আলুভর্তা + ৪ টা লেজ ভর্তা + ডাল = ৪৬৫/- টাকা।

খাওয়া শেষ হয়ে গেলে, পর্যটন স্পটে চলে যান এবং আরাম করে কিছুক্ষন বসুন নদীর পারে। কিছু মুহূর্ত পার হয়ে গেলে বের হয়ে অটোতে উঠে চলে আসুন লঞ্চঘাটে। এন্ট্রি পাস এর টিকেট কেটে উঠে পরুন লঞ্চে। ব্যাস এরপর ঢাকা এবং যে যার যার বাড়িতে।

জায়গাঃ ঢাকা-চাঁদপুর+বড় স্টেশন+কালীবাড়ি

প্রধান খরচ সমূহ:

লঞ্চ ভাড়া (যাওয়া-আসা)= ১৪০০/- টাকা (৭জনের)

নাশতা: ১০৫/- টাকা (৭টা চা= ৭০/-, ৭টা পিচ্চি রুটি= ৩৫/-)

দুপুরের খাবার:  দু’টি মাছ কাটাকুটি + ভাঁজা + ১১ টা ভাত +৭ টি আলুভর্তা + ৪টা লেজভর্তা+ডাল = ১৩৩৭/- টাকা।

আইসক্রিম: ২৮০/- টাকা (৭ জনের)

মুড়ি: ৭০/- টাকা (৭ জনের)

অটোভাড়া বাবদ: ৭০+৩৫+৩৫+৪০= ১৮০/- টাকা।

দ্রষ্টব্য

আপনি চাঁদপুর নেমে আগে কালীবাড়ি তারপর বড় ষ্টেশন যেতে পারেন। চাঁদপুর শহরটি বেশ পুরনো, একটু ঘুরলে অনেক পূরানো বাড়ি-ঘর পাবেন- যা দেখতে হয়ত আপনার কাছে ভাল লাগবে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।