শতক কাব্য!

‘সেঞ্চুরি’ শব্দটা ক্রিকেটে কতটা আবেদন রাখে? মর্যাদা বলুন অথবা মাইলফলক, ক্রিকেটে যুগ যুগ ধরে শব্দটা স্বমহিমায় উজ্জ্বল! সাধারনের কাতার থেকে অসাধারনের এলিট লিস্টে প্রবেশের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যাটসম্যানদের পাখির চোখ বরাবরই ওই সেঞ্চুরি শব্দের দিকে!

হাজারো দর্শক পরিবেস্টিত স্টেডিয়ামে কাঙ্ক্ষিত মাইলফলকে পৌছে ক্যাপ অথবা হেলমেট খুলে, ব্যাট উঁচিয়ে দর্শকদের অভিবাদনের জবাব দেবার সময়টা প্রতিটা ব্যাটসম্যানই তার ক্যারিয়ারের শুরুতে কল্পনা করেন! এই সুখ, এই আবেশের মূল্য শুধু একজন ব্যাটসম্যানই বোঝেন!

লেখার শুরুটা কেমন হল?

যাই হোক, যে উদ্দেশ্যে এত বড় ইন্ট্রো টেনেছি, সেটায় ফেরা যাক। ১০০ সেঞ্চুরি করে শতকের শতক উদযাপন হতে দেখেছি শচীনের ব্যাটে। ঝড়ের গতিতে, ডিনারের শুরু শেষের মাঝখানেই সেঞ্চুরি করে ফেলতে দেখেছি ডি ভিলিয়ার্স, গেইল, মিলার, রোহিত শর্মাদের! কিন্তু ক্রিকেটের প্রথম শতক কার ব্যাটে এসেছে, অথবা প্রথম শতরানের জুটি, সেটা কি আমরা জানি?

উনিশ শতকের আগে, ক্রিকেটে মুড়িমুড়কির মত শতরানের ইনিংস বের হত না ব্যাটসম্যানের উইলো থেকে। পিচ একটা বড় অন্তরায় ছিল এবং সেই সাথে উইলোর পার্থক্য।

সর্বপ্রথম সেঞ্চুরি কার ব্যাট থেকে এসেছিল সেটা নিয়ে কিছুটা মতবিভেদ বা ধোঁয়াশা রয়েছে। তবে, জন মিনশালকে সর্বপ্রথম সেঞ্চুরিয়ান বলে করা দাবীটার জোর সবথেকে বেশি। একটি মাইনর ক্রিকেট ম্যাচে রোথামের বিপক্ষে ডিউক অফ ডরসেট’স একাদশের হয়ে তিনি ১০৭ রান করেন। তারিখটা ছিল ৩১ আগস্ট, ১৭৬৯! তবে, টপ ক্লাস লেভেলে প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে জন স্মলের নাম সমাদৃত। ১৭৭৫ সালে হ্যাম্পশায়ারের হয়ে সারের বিপক্ষে তিনি ১৩৬ রান করেন। ঘটনাটি ১৭৭৫ সালের জুলাই মাসের।

ইতিহাসের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি এসেছিল চার্লস ব্যানারম্যানের উইলো থেকে, সেটাও ইতিহাসের সর্বপ্রথম টেস্টে। ভদ্রলোক ১৬৫ রানে রিটায়ার্ড হার্ট হন!

ইতিহাসের প্রথম টেস্টেই প্রথম সেঞ্চুরিয়ানকে পাওয়া গেলেও ওয়ানডে ক্রিকেট তার প্রথম সেঞ্চুরিয়ানকে খুঁজে নিয়েছিল দ্বিতীয় ম্যাচে! ১৯৭২ সালে ইতিহাসের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক একদিবসী ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডেনিস অ্যামিস ১০৩ রানের কাব্যিক ইনিংস খেলেন!

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সবথেকে ছোট ফরম্যাট টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরিয়ানের দেখা পাওয়া গিয়েছিল ফরম্যাটের প্রথম বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই। নান আদার দ্যান দ্য ইউনিভার্স বস ক্রিস্টোফার হেনরি গেইল! দক্ষিন আফ্রিকার বিপক্ষে ২০০৭ সালে ১১৭ রানের দানবীয় ইনিংসেও পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা পায়নি তার দল ওয়েস্ট ইন্ডিজ!

শতকের গোরাপত্তনের ইতিহাস তো জানা হল। কিন্তু গতিময়তার যুগে দ্রুততম শব্দটাকে তো আর অবহেলা করা যায় না! চলুন জেনে নেয়া যাক, সবথেকে দ্রুততম সময়ে (বল) কে বা কারা ম্যাজিক ফিগার স্পর্শ করে গৌরবের চুড়ায় উঠে আছেন।

টেস্ট ক্রিকেটে রেকর্ডটা ব্রেন্ডন ম্যাককালামের দখলে! ক্যারিয়ারের শেষ টেস্টের জন্যই হয়ত দানবীয় ইনিংসটা জমিয়ে রেখেছিলেন বাজ! অজি এটাকের বিপক্ষে ৫৪ বলে শতক স্পর্শে পেছনে ফেলেন স্যার ভিভ রিচার্ডস এবং মিসবাহ উল হকের ৫৬ বলের শতককে! সালটা ২০১৬, ভেন্যু ক্রাইস্টচার্চ।

আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে রেকর্ডটি এবি ডি ভিলিয়ার্সের দখলে! ৩১ বলে পূরন করা শতকের রিসিভিং এন্ডে ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা! কোরি অ্যান্ডারসনের পাতা থেকে এবির পাতায় পৌছে যেন পরম নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে রেকর্ডটি!

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে দ্রুততম সেঞ্চুরির ভাগিদার তিন জন!

সুদেশ বিক্রামাসেকারা

‘তিন’ শব্দটা দেখে ভ্রু কুচকে গেলে কস্ট করে বাকি অংশ পড়ুন! ২০১৭ সালের ২৯ অক্টোবর বাংলাদেশের বিপক্ষে ডেভিড মিলার ৩৫ বলে শতক পূর্ণ করেন। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে মিলারের গৌরবে ভাগ বসান ভারতের রোহিত শর্মা। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তিনিও ৩৫ বলে শতক হাঁকান একই বছরের ডিসেম্বরে!

এবারে তালিকায় তৃতীয় জন, যার কথা ভেবে হয়ত আপনার ভ্রু কুচকে উঠেছিল। ‘সুদেশ বিক্রমাসেকারা’- তিনি চেক রিপাবলিকের ক্রিকেটার! জি, এবার চাইলে আপনি একটু চমকে নিতে পারেন! ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে তুরস্কের বিপক্ষে সুদেশ ৩৫ বলে সেঞ্চুরি করে রোহিত এবং মিলারের সাথে রেকর্ড ডিনারে জয়েন করেন!

আইপিএল ক্রিকেটে ২০১৩ সালে ৩০ বলে সেঞ্চুরি করে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে দ্রুততম সেঞ্চুরির মালিক হয়ে আছেন ক্রিস গেইল। এছাড়া ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে গ্লোচেস্টাশায়ার সেকেন্ড ইলেভেনের হয়ে মাত্র ২৫ বলে ম্যাজিক ফিগারে পৌছে ক্রিকেট বিশ্বের চোখ কপাল থেকে মাথায় উঠিয়ে দিয়েছিলেন স্কটিশ ক্রিকেটার জর্জ মুনশে!

অনেক লিখিত লেকচার হল, এবারে বিদায় নেবার পালা। যেতে যেতে শেষ তথ্যটি শেয়ার করে যাচ্ছি। ১৯৮২ সালে অজি ক্রিকেটার ডেভিড হুকস ৩৪ বলে ১০২ রান করেন! প্রথম শ্রেনির ক্রিকেটে এটাই দ্রুততম সেঞ্চুরি এবং খুব সম্ভবত আনব্রেকেবল হয়ে থাকবে! সাউথ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে এই কীর্তি গড়েন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আফসোস খ্যাত প্রয়াত লেফটি! ওহ, আরেকটি তথ্য- ডেভিড হুকস মারা গিয়েছিলেন বার বাউন্সারের ছোড়া একটি মাত্র ঘুষিতে! অবশ্য, সে এক ভিন্ন গল্প, অন্য সবার মত ডেভিড হুকসেরও একটি গল্প রয়েছে, কিন্তু গতানুগতিক নয়, একটু আলাদা, হয়ত একটু বেশিই আলাদা!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।