লম্বা দৌঁড়ের ঘোড়া হতে পারবেন সাইফউদ্দিন?

২০০৭ সালের ঢাকা টেস্ট। বাংলাদেশর প্রতিপক্ষ ভারত।

প্রতাপশালী দলটির বিপক্ষে ৭০ রানের এক ইনিংস খেলে ফিরলেন বাংলাদেশি এক পেসার। আগের টেস্টেই ৫ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ৭৯ রানের ইনিংস খেলেছেন। দিনশেষে হতাশ ভারতীয় অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড় সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘এমন একজন পেস বোলিং অলরাউন্ডার পেলে অধিনায়ক হিসেবে আমি বর্তে যেতাম।’

সেই পেস বোলিং অলরাউন্ডারটির নাম মাশরাফি বিন মুর্তজা। সময় কতটা বদলে যায়। সেই মাশরাফি আজো আছেন। কিন্তু বাংলাদেশ একজন পেস বোলিং অলরাউন্ডারকে এখনও খুঁজে ফেরে। ইনজুরি জর্জতায় মাশরাফি কখনোই ব্যাটিংয়ে তাঁর পুরো দক্ষতাটা কাজে লাগাতে পারেননি।

‘পেস বোলিং অলরাউন্ডার’ হওয়াটা ছেলের হাতের মোয়া নয়। বিশ্বের বড় বড় দল রাতদিন, বছরের পর বছর সময় পর পর পায় এমন একেকটি রত্ন। ইমরান খান, ইয়ান বোথাম, অ্যান্ড্রু ফ্লিনটফ কিংবা কপিল দেবের মত ক্রিকেটারদের তাই রোজ রোজ দেখা যায় না।

বাংলাদেশেও তাই একজন পেস বোলিং অলরাউন্ডার নিয়ে হাহাকার অনেকদিনের। এই ‘পদ’-এ কখনো ফরহাদ রেজা, কখনো মুশফিকুর রহমান বাবু, কখনো মুক্তার আলী বা জিয়াউর রহমানকে দিয়ে চেষ্টা করা হয়েছে। তবে কেউ নিজেদের বিশ্বমানের বলে পরিচিত করতে পারেননি। এমনকি ‘মন্দের ভাল’ হিসেবে আবুল হাসান রাজু কিংবা সৌম্য সরকাদের নিয়েও চেষ্টা করা হচ্ছে। এখন অবধি সেখান থেকে বলার মত কোনো সাফল্য নেই।

সবচেয়ে কাছাকাছি ওই মাশরাফিই পৌঁছাতে পেরেছিলেন। এর আগে কিছুটা করতে পেরেছিলেন খালেদ মাহমুদ সুজন। তারও আগে মাঝারী মানের পেস বোলিং অলরাউন্ডার ছিলেন আতহার আলী খান। তবে, বলাই বাহুল্য যে, এদের কাউকে দিয়েই আজ অবধি চূড়ান্ত কোনো সাফল্য আসেনি।

বাংলাদেশের সম্ভাব্য এই পেস বোলিং অলরাউন্ডার হয়ে ওঠার মিছিলে সর্বশেষ সংযোজন হলেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন এই সাইফকে মাশরাফি বিন মুর্তজার উত্তরসুরী হিসেবেও অনেকে দেখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু, সব আলোচনা যেন থামিয়ে দিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার ডেভিড মিলারের বিপক্ষে করা একটি ওভার। কারণ, এক ওভারেই তিনি হজম করেছিলেন ৩১ টি রান। ম্যাচ শেষে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ অবশ্য সদ্য জাতীয় দলে পা রাখা খেলোয়াড়টিকে আগলেই রেখেছিলেন। বলেছিলেন, ‘খেলতে খেলতেই শিখবে, অসুবিধা নেই। সাইফউদ্দিন একদিন ম্যাচ জেতাবে বাংলাদেশকে, এটাই বিশ্বাস করি। ভুলগুলো থেকে যদি শিখতে পারে, ওর জন্য ভালো, দলের জন্যও ভালো।’

ইতিবাচক ব্যাপার হল, সাইফ ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিতে পেরেছেন। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুই ম্যাচে সব ধরনের পরীক্ষাই দিয়েছেন এই তরুণ। প্রথম ম্যাচে ১৩৯ রানে ছয় উইকেট পড়ার পর ইমরুলের সঙ্গে ১২৭ রানের জুটি গড়েছেন। ক্যারিয়ারের প্রথম হাফ সেঞ্চুরি করেছেন দলের সবচেয়ে প্রয়োজনের মুহূর্তে ব্যাটিং করে।

চট্টগ্রামে বল হাতে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার আস্থার প্রতিদানও দিয়েছেন সাইফউদ্দিন। নতুন বলে বোলিং করেছেন। শেষ দিকে স্লগ ওভারেও মাশরাফি বল তুলে দিয়েছেন তার হাতে। ইনিংসের পঞ্চম ওভারে বোলিংয়ে এসেই ব্রেক থ্রু এনে দিয়েছেন সাইফউদ্দিন। মুশফিকের ক্যাচ বানিয়ে ফিরিয়েছেন মাসাকাদজাকে (১৪)।

ব্রেন্ডন টেইলর-শন উইলিয়ামসের ৭৭ রানের জুটি ভেঙেছিলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। টেইলর ৭৫ রানে ফেরার পর ৩৮তম ওভারে শন উইলিয়ামসকে (৪৭) ফেরান ২১ বছর বয়সী এই তরুণ। ৪৮তম ওভারে চিগুম্বুরাকেও (৩) নিজের শিকার বানান তিনি।

জাতীয় দলে ফেরার আগেও কিন্তু সাইফউদ্দিনকে এক গাদা পরীক্ষা দিয়েই আসতে হয়েছিল। আয়ারল্যান্ড সফরে ‘এ’ দলের হয়ে চার টি-টোয়েন্টিতে নয় উইকেট নিয়েছিলেন সাইফউদ্দিন। আবার জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচে ৩২ রানে তিন উইকেট নিয়েছিলেন।

তাই তো বিশ্বকাপের আগে পেস বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে নির্ভরযোগ্য কাউকে পাওয়ার চেষ্টাতেই আরিফুল হক দলে থাকার পরও ডাকা হয়েছিল সাইফউদ্দিনকে। টিম ম্যানেজমেন্টের সেই চেষ্টাটাকে সফল বলেই প্রমাণ করলেন সাইফউদ্দিন। এবার এর ধারাবাহিকতা ধরে রাখার পালা।

আরেকটা চেষ্টা টিম ম্যানেজমেন্টকেও করতে হবে। সেটা হল পরিচর্যা করা এবং আস্থা রাখা। সাইফের গতি এখন ১৩৫-এর আশেপাশে। ঠিক মত পরিচর্যা করলে এটা বাড়ানোও সম্ভব। সেই কাজটার দায়িত্ব তো কোচিং স্টাফদের ওপরই বর্তায়। ঠিক মত কাজ করা গেলে এই সাইফ লম্বা সময় সার্ভিস দিতে পারবেন জাতীয় দলকে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।