বিশ্বসেরা হওয়ার শেষ সুযোগ ও ‘ম্যারাডোনার সমকক্ষতা’ নামক মিথ

আসছে সপ্তাহান্তে জীবনের ৩১ বসন্তে পা ফেলতে যাওয়া লিওনেল মেসির জন্য এ যেন চূড়ান্ত সংকেত। আর্জেন্টাইন কিংবদন্তী ম্যারাডোনার সমকক্ষ হতে রাশিয়া বিশ্বকাপই হতে পারে তাঁর অন্তিম সুযোগ। ছোটখাট গড়নের আর্জেন্টাইন দলনেতা পরিচিত ‘লা পুলগা’ (নীল মাছি) নামে।

বার্সেলোনার হয়ে সম্ভাব্য প্রায় সব ট্রফিই হাতে নিয়েছেন মেসি। কাগজে কলমে ১৪ টি মৌসুমে তাঁর শিরোপার সংখ্যা ৩২ টি। কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক শিরোপা তার অধরা রয়ে গেছে, বিশ্বকাপ হোক কিংবা হোক কোপা আমেরিকা।

অধিকাংশ আর্জেন্টাইন মনে করেন মেসি বিশ্বের সেরা ফুটবলার হতে পারেন, কিন্তু তিনি ম্যারাডোনার সমকক্ষ নয়। যাঁকে ‘এল পিবে’ (শিশু) বলে অভিহিত করা হয়, তাঁর হাত ধরেই তো এসেছিল ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনা অনেকটা ধুঁকে ধুঁকে কোয়ালিফাইং রাউন্ড পার হয়েছে। তবুও আর্জেন্টিনার হয়ে তৃতীয় বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নটা মেসি দেখছেন, ব্যাপক আকারেই।

মেসির স্বপ্নটা কঠিন হয়ে পড়ে যখন এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে তিনি ৬৪ মিনিটে পেনাল্টি মিস করে বসলেন, কিংবা বলা চলে তার শট ঠেকিয়ে দিলেন আইসল্যান্ডের গোলর। গ্যালারিতে বসে ম্যারাডোনা প্রায় উচ্চকিত স্বরেই কি ‘ডিয়েগোওওও’ বলে চিৎকার উঠেছিলেন?

৫৭ বছর বয়সী ম্যারাডোনা মেসিকে সান্তনা দিয়েছেন মেসি টানা পাঁচটি পেনাল্টি মিস করার পরেও। আইসল্যান্ডের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র দলগত ব্যর্থতা, যাকে অশনি সংকেত ধরাই যায়।

আর্জেন্টাইন এক সমর্থক গিলার্মো আগুইরে বলেন, ‘দেখুন আমি মেসিকে ভালোবাসি, আমরা সবাই ভালোবাসি। কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি ক্লিক করছেন না মাত্র। আমি চাই মেসি কাপটা জিতুক, ম্যারাডোনা বিতর্ক তাহলে শেষ হবে যেটি তার প্রতি অবিচার করছে। কিন্তু যদি আমি বাস্তবতা ভেবে বলি, তাহলে ব্রাজিলের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে কাপ জেতার।’

উদাহরণ হিসেবে তিনি জানান গত বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে ০-১ গোলে হেরে যাবার কথা। অনেকেই মনে করেন মেসি রাশিয়া বিশ্বকাপের পর অবসরে যাবেন। তিনি ‘অবসর’-এ গিয়েছিলেন ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকায় চিলির সাথে পেনাল্টি মিস করেই। যদিও দলের স্বার্থে সেটি ভেঙে ফিরেও এসেছেন।

মেসির ক্লাব জীবন বেশিই জমকালো। টানা পাঁচবছর তিনি জিতে নিয়েছেন বিশ্বের সেরা ফুটবলারের খেতাব, লা লিগা ও উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের শিরোপাও ছুঁয়ে দেখা হয়েছে তার।

দ্য স্পোর্টসম্যানে লেখা আর্টিকেল লন্ডন ভিত্তিক ক্রীড়ালেখক গ্রেগ লিয়া দাবী করেন, ‘এটা সত্য মেসির যে লিগেসি এবং ফুটবল বিশ্বে অবস্থান সেটি খানিক বাড়বে এবারের গ্রীস্মের বিশ্বকাপ জয়ে, কিন্তু ম্যারাডোনার সমকক্ষ হতে তার বিশ্বকাপ জয় করার প্রয়োজন নেই। বর্তমানে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ দিয়ে খেলার মান বিচার করা হয়, মেসি তা জয় করেছেন একাধিকবার।’

মনে রাখতে হবে গত ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসি গোল্ডেন বল পেয়েছিলেন সেরা খেলোয়াড় হয়ে, গঞ্জালো হিগুয়েন ঠিকমতো শেষ করতে পারলে হয়তো শিরোপাটাও পেতেন তিনি।

দেশে বিলবোর্ডে, মুখোশে, শার্টে মেসির ছবি নিয়মিত দেখা গেলেও তার প্রতি ম্যারাডোনার মতো সহানুভূতি নেই। কারণ ম্যারাডোনা উঠে এসেছিলেন নোংরা বস্তি থেকে। ড্রাগ ও অ্যালকোহলের প্রতি নেশাগ্রস্থ থেকে জীবনের কঠিন বাস্তবতাকেও তুলে ধরেছিলেন তিনি।

অন্যদিকে অন্তর্মূখী মেসি মাত্র ১১ বছর বয়সে স্পেনে পাড়ি জমিয়েছিলেন, মডেল ফ্যামিলি ইমেজও আছে তার। কিন্তু তিনি যদি এবার রাশিয়ায়ও ব্যর্থ হন তাহলে সহানুভূতি পাবেন আশেপাশের অনেকের কাছ থেকেই। কারণ তাঁরা  জানেন মেসির সতীর্থরা ও সমস্যা জর্জরিত জাতীয় দল কর্তৃপক্ষ তার এ ব্যর্থতার জন্য দায়ী। অথচ তার ভক্তরা জাতীয় দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা হবার পরও ভুলে যাবে মেসি নামটিকে।

আর্জেন্টিনার সাবেক ফরোয়ার্ড ক্লওডিও ক্যানিজিয়া বলেছেন, ‘আপনি মেসিকে সব দায়িত্ব দিতে পারেন না। তাহলে আপনি দলে কেন আছেন? ম্যারাডোনা সতীর্থদের কাছে যে সহযোগীতা পেয়েছিলেন মেসি তা পাচ্ছেন না।’

বিশ্বসেরা হতে কি মেসির বিশ্বকাপ জিততেই হবে? – এই প্রশ্নটা এক পুরনো বিতর্ক। এর জবাবে সাবেক আর্জেন্টাইন স্ট্রাইকার হার্নান ক্রেসপো বলেন, ‘অনেক তারকা ফুটবলাররা বিশ্বকাপ না জেতার পরও আমাদের মনে জায়গা পেয়েছেন। মেসি দারুণ একজন খেলোয়াড়। ওকে খেলতে দেখাটা একটা দারুণ অভিজ্ঞতা। ওর বিশ্বকাপ জেতা উচিৎ। জিতলে ও গ্রেটদের কাতারে থাকবে, না জিতলেও থাকবে।’

– টাইমস অব ইন্ডিয়া ও বিবিসি অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।