নাম ধরে প্রিয় ডেকো মোরে

‘কল মি বাই ইওর নেম’ যেন অলস এক কবিতার রেশ রেখে যায়। ছবিটা নিয়ে আমার মাঝে অদ্ভুতরকম মুগ্ধতাবোধ থাকলেও, এটা নিয়ে লেখা হয়ে ওঠেনি। কিছুদিন আগে একটা রিভিউ দেখে মনে হলো, ছবিটাকে হয়তো কিছুটা মিসইন্টারপ্রেট করা হচ্ছে। অনেকেই ভালোবাসাকে এরোটিসিজমের সাথে গুলিয়ে ফেলছেন। তাই নিজের ভাবনাগুলো বলার জন্যই লিখতে বসা।

ছবির গল্পটা এলিওকে নিয়ে। এলিও’র বয়স সতেরো, থাকে ইতালিতে। ‘৮৩ সালের এক গ্রীষ্মে তার আর্কিওলজিস্ট বাবাকে গবেষণার কাজে সাহায্য করতে অ্যামেরিকা থেকে এলো অলিভার নামের এক যুবক। এলিও অলিভারের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে, কিন্তু সেটা প্রকাশ করার ভাষা জানে না।

আন্দ্রে অ্যাসিম্যানের উপন্যাস অবলম্বনে এই সিনেমাটি বানিয়েছেন লুকা গুয়াডাগনিনো। আমরা এলিওর সম্পর্কের কিছু পর্যায় দেখতে পাই। প্রাথমিকভাবে সে ছিলো মার্জিয়ার সাথে। এটা যতটা না এক্সপ্লোরেশন অফ সেক্সুয়াল আইডেন্টিটি, তারচেয়ে বেশি অ্যাক্ট অফ সেল্ফ-অ্যাসিওরেন্স। কারণ এর পরে সে বুঝতে পারে সে আসলে অলিভারকে ভালোবাসে।

সমালোচকরা বলেছেন একটা ‘ইউটোপিয়ান’ পরিবেশে নিয়ে চরিত্রগুলোকে ফেলা হয়েছে। সবাই নাচছে, গাইছে, পড়ছে, খেলছে, সাতার কাটছে, ভালোবাসছে, মুগ্ধ চোখে প্রকৃতিকে দেখছে। আমার মনে হয়েছে, পরিচালক যেই জীবনের ছবি দেখিয়েছেন সেটাকে ইউটোপিয়া বলা স্রেফ ন্যূনোক্তি। কারণ প্লেটো বা টমাস মুর ইউটোপিয়ার যে বর্ণনা আমাদের দিয়েছেন, এলিওর চারপাশ তার চেয়েও প্রশান্তিদায়ক, তার চেয়ে বেশি আনন্দময়; অলমোস্ট হেভেনলি। শ্রেণী বা অর্থের (ক্লাস বা ক্যাশ) এখানে কোন ভূমিকাই নেই। ঝর্ণা বইছে, গাছে ফল ঝুলছে, বাসিন্দাদের মাঝে কোন দুঃখ বা যন্ত্রণার অনুভূতি কাজ করছে না, প্রকৃতির অবারিত দ্বার সবার জন্য খোলা। ধর্মীয় গ্রন্থগুলোতে ঠিক যেভাবে স্বর্গের বিবরণ পাওয়া যায়।

এবার আসি প্রকৃতিকে কিভাবে ইনকর্পোরেট করা হয়েছে মুভিতে। বিভিন্ন অংশে আমরা দেখতে পাই এলিও ও অলিভার নিজেদের আবিষ্কার করছে প্রকৃতির মাঝে বসে। তাদের লাভ মেকিং সিনে ক্যামেরা প্যান করে গাছ-পালা (প্রকৃতিকে) দেখাচ্ছে। কিংবা তারা যখন আর্কিওলজিক্যাল এক্সপেডিশনে যায়, সেখানে বেশ কিছু প্রাচীন আর্টিফ্যাক্ট উদ্ধার করে। এটা এমন এক সময়ের নির্দেশ করে যখন হোমোসেক্সুয়ালিটি বিদ্যমান ছিলো। হোমোফোবিকদের দুইটি নিয়মিত অভিযোগ হলো সমকামীতা লাগামবিহীন আধুনিক জীবন-যাপনের ফল আর এটা প্রকৃতিবিরুদ্ধ। এখানে সুকৌশলে এই দুই কথার জবাব দিতে চেয়েছেন পরিচালক। তিনি দেখিয়েছেন সম্পর্কের এমনতর রূপ প্রাচীন ও প্রাকৃতিক।

কিছু রিভিউয়ে এটাকে এস্কেপিস্ট মুভি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। কেননা তাদের মনে হয়েছে, হোমোসেক্সুাল জীবনের কোন দ্বন্দ্ব ছবিতে উঠে আসেনি। বরং এই বন্ধুর পথগুলো থেকে পালিয়ে বাঁচবার একটা প্রবণতা ছিল। এটাকে আমার খুব সীমিত গণ্ডির ভাবনা বলে মনে হয়েছে। মূল চরিত্রের সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন ডিফরেন্ট বলেই যে সর্বদা পরিপার্শ্বে কনফ্লিক্ট থাকবে, এমন ভাবনাও কিছুটা হাস্যকর। গল্পে প্রয়োজন না পড়লে আরোপিত অন্তরায় রাখতে হবে কেন! এলিও’র বাবা ও মা দুজনেই কিন্তু সম্পর্কটা মেনে নেয়, মার্জিয়াও। বাকিদের ভাবনা ক্ষণিকের জন্যও গুরুত্ব পায়নি। কেন এতটা মসৃণভাবে সব হয়েছে? কারণ এটা একটা পিওর রোম্যান্টিক মুভি। একটা নোটবুক কিংবা বিফোর সানরাইজ যতটা রোম্যান্টিক, ঠিক ততটাই। এখানে চরিত্রদ্বয়ের ভালোবাসাটা মুখ্য, জেন্ডার নয়।

ছবিতে প্রথম বেদনা আসে কখন? বিচ্ছেদের সময়ে, অলিভার চলে যাবার পর। এলিও বুঝতে পারে এটা তার জন্য কোন ‘সামার লাভ’ ছিল না। আর তার চেয়েও বেশি করে বেদনা আসে, যখন সেই বিচ্ছেদটা আনুষ্ঠানিকরূপ নেয়। অলিভার যখন ফোন করে নিজের বিয়ের খবর দেয়। আমরা দর্শকরাও বুঝে যাই, যে ‘ভিন্ন পথ’ এলিও ইতোমধ্যে বেছে নিয়েছে, অলিভারকে সেখানে সঙ্গী হিসেবে পাওয়া যবে না। স্বর্গ থেকে এক ধাক্কায় আমরা আছড়ে পড়ি পৃথিবীতে। এই সময় ক্যামেরা দূরে সরে যায় না, মুখও ফিরিয়ে নেয় না। ঠায় বসে থাকে, অনুভব করতে বলে ভালোবাসা হারানোর বেদনা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।