ব্রায়ান অ্যাডামস টিল আই ডাই

২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সেদিন তিনি বাংলাদেশে। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের মঞ্চে উঠলেন। নিজের দল নিয়ে গাইলেন সেই বিশ্বকাঁপানো গান ‘সামার অব সিক্সটি নাইন’।  সেদিন সেই গানের ছন্দে নেচেছিল পুরো বাংলাদেশ।

তিনি হলেন ব্রায়ান অ্যাডামস। খ্যাতনামা এই পপতারকাকে বোঝাতে আসলে কোনো বিশেষণই ধোপে টিকবে না। ১৯৫৯ সালের ছয় নভেম্বর এই ব্রিটিশ বংশদ্ভুত কানাডিয়ানের জন্ম অন্টারিও’র কিংস্টনে।

তাঁর শৈশবটা কেটেছে ভবগুরের মত। কখনো পর্তুগাল, কখনো অস্ট্রিয়া, কখনো ইসরায়েল বা জাপান। কারণ বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীতে। জাতিসংঘের মিশনের জন্যই পরিবার নিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে বেড়াতেন তিনি।

বয়স যখন মাত্র ১২, তখন বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এরপর থেকে বাবার সাথে যোগাযোগ একদম বন্ধই হয়ে যায় ব্রায়ানের। এরপর নব্বই দশকে যখন জাপানে আবারো বাবার সাথে দেখা হয়, তখন রীতিমত তারকা বনে গেছেন তিনি।

এই সময়ের মধ্যে রকস্টার হওয়ার জন্য অবশ্য কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি তাকে। গিটার কেনার টাকা ছিল না। ডিশ ওয়াশিংয়ের কাজ নিয়ে সেই টাকাটা যোগাড় করেন। কিশোর বয়সে ঘুরে ঘুরে অনেকগুলো ব্যান্ডে গিটার বাজাতেন। একটা সময় স্কুল ছেড়ে দেন, কারণ তিনি বড় মিউজিশিয়ান হতে চেয়েছিলেন।

প্রথম গানটি গাওয়ার জন্য তিনি যখন চুক্তিবদ্ধ হন তখন প্রতিষ্ঠানটি তাঁকে কোনো অর্থই দিতে রাজি ছিল না। নতুন এক অচেনা গায়ককে আবার টাকা-পয়সা দিতে হয় নাকি! স্রেফ নিয়মের খাতিরে দেওয়া হয়েছিল এক ডলার। হ্যা, মাত্র এক ডলার থেকে শুরু করেছিলেন ব্র্রায়ান অ্যাডামস। সেটা ১৯৭৮ সালের কথা!

ব্রায়ান অ্যাডামস বেশি পরিচিত তাঁর ১৯৮৪ সালের অ্যালবাম ‘রেকলেস’-এর জন্য। এই অ্যালবামে ‘সামার অব সিক্সটি নাইন’ তো ছিলই, আরো ছিল ‘হেভেন’, ‘রান টু ইউ’, ‘অ্যান্ড, অফকোর্স’-এর হিট গান। সেবারই প্রথমবারের মত কোনো কানাডিয়ান গায়কের অ্যালবামের কপি ১০ লাখের বেশি বিক্রি হয়। আমেরিকার বিলবোর্ড চার্টের শীর্ষে অ্যালবামটা দুই সপ্তাহ টিকেছিল।

গ্র্যামি জয়ী এই রকস্টার সেই দিন পেছনে ফেলে এলেও আজো মাসের ১০ টা দিন নিয়মিত বিশ্ব ঘুরে বেড়ান, কনসার্ট করেন। আজো তাঁর কনসার্ট হলে রাজ্যের লোক এসে ভিড় করে। গানগুলো একালের তরুণদের কণ্ঠেও সমান ভাবে জনপ্রিয়। এটাকেই নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন ব্রায়ান অ্যাডামস।

তিনি বলেন, ‘যখন কাউকে আমার গানগুলো গাইতে দেখি তখনই নিজের জীবনটাকে স্বার্থক বলে মনে হয়। গান লেখা একটা মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিই বা হতে পারে। এটা আমার জন্য এতটাই স্বস্তিদায়ক যে, তার পেছনে কি পরিশ্রম করলাম সেসব মাথায়ই থাকে না।’

অ্যাডামসের ক্যারিয়ারের আরেকটি বড় হিট হল ‘এভ্রিথিঙ আই ডু’। ১৯৯১ সালের সিনেমা ‘রবিন হুড: প্রিন্স অব থিভস’ সিনেমায় ব্যবহৃত হয়েছিল এই গান। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে প্রযোজক মাট ল্যাঞ্জকে সাথে নিয়ে গানটা মাত্র ৪৫ মিনিটে লিখেছিলেন অ্যাডামস!

সিনেমায় কেবল গানই গাননি অ্যাডামস, অভিনয়ও করেছিলেন। নব্বই দশকের জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ ‘বেওয়াচ’ ছাড়াও ওই রবিন হুডের সিনেমাতেই ছোট একটি চরিত্র করেছিলেন। যদিও, সিনেমায় তাঁর প্রথম কাজ ১৯৮৯ সালে। সেবার ‘পিংক ক্যাডিল্যাক’-এ কিছু মুহূর্তের জন্য দেখা যায় ব্রায়ান অ্যাডামসকে।

অ্যাডামস হলেন বহুমূখী এক প্রতিভা। গানবাজনার বাইরে তাঁর একটা বড় পরিচয় হল তিনি একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার। না যেন তেন নয়, ‘গেজ জিন্স’, ‘কনভার্স’-এর মত বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের সাথে কাজ করেন তিনি। তাঁর তোলা ছবি ছাপা হয় ‘ভোগ’, ‘হার্পার’স বাজার’, ‘ইন্টারভিউ’, ‘জু’-এর মত ম্যাগাজিনে।

২০০২ সালে তিনি স্বয়ং রানী এলিজাবেথ এর সাথে পাঁচ মিনিটের একটি পোট্রেট সেশন করেন। সেবার বাকিংহ্যাম প্যালেসে তাঁর তোলা রানীর একটি ছবি পরে কানাডার একটি পোস্টাল স্ট্যাম্পে ব্যবহৃত হয়। এমনকি ২০০৯ সালে অ্যাডামসের নিজের একটা ছবি দিয়েও কানাডায় স্ট্যাম্প বানানো হয়। দেশটির সঙ্গীতাঙ্গনে তিনিই যে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় তারকা!

– দ্য টেলিগ্রাফ, বুক মাই শো ও দ্য ফেমাস পিপল অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।