‘আসুক বিশ্বকাপ, দেখিয়ে দেবো আমরা কাউকে ভয় পাই না’

আফগানদের ভয়ডরহীন মানসিকতার সাথে ক্রিকেট বিশ্ব কম বেশি পরিচিত। হোক সেটা মাঠের খেলায়, কিংবা হোক সংবাদ সম্মেলনে। এবার যেমন এমনই এক মন্তব্য করে খবরের শিরোনাম হলেন দেশটির তারকা লেগ স্পিনার রশিদ খান।

তিনি দাবী করেছেন, আগামী মে মাসে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে তাঁর দল কাউকে ভয় পায় না। উঠতি ক্রিকেট জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া আফগানিস্তান প্রথম টেস্ট জয়ের পর এ কথা বলেন খান। সংক্ষিপ্ত ভার্সনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বোলার খান বলেন কেবলমাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই আয়ারল্যান্ডকে হারানোর পর আফগানিস্তানের আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে।

টি-টোয়েন্টি বোলিং র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ এবং ৫০ ওভার ফর্মেটের তৃতীয় স্থানে থাকা ২০ বছর বয়সী রশিদের ৮২ রানে ৫ উইকেট শিকারের সুবাদে আরেক নবাগত আয়ারল্যান্ডকে দেরাদুন টেস্টে পরাজিত করে আয়ারল্যান্ড।

আগামী ২৩ মার্চ শুরু হতে যাওয়া ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) সানরাইজার্স হায়দারাবাদের হয়ে ভাল করার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী খান বলেন, আফগানিস্তানের ক্রিকেটারদের এখন দরকার কেবলমাত্র আত্মবিশ্বাস। বার্তা সংস্থা এএফপি’কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমাদের মেধা আছে, আমাদের দক্ষতা আছে।’

গত বছরের এশিয়া কাপে ৫০ ওভার ফর্মেটে শক্তিশালী টেস্ট খেলুড়ে বাংলাদেশ ও শ্রীলংকাকে পিছনে ফেলে গ্রুপের শীর্ষ স্থান দখল করেছিল আফগানিস্তান।

  • ‘নিজেদের দক্ষতায় বিশ্বাস রাখো’

এশিয়া কাপ গত আসরে শেষ চার-এর ম্যাচে শক্তিশালী ভারতের টাই করা আফগান তারকা বলেন, ‘এশিয়া কাপে আমরা পুরোপুরি ভিন্ন ধরনের ক্রিকেট খেলেছি এবং প্রমাণ করেছি আমরা যে কোন দলকে হারাতে পারি।’

তিনি বলেন, ‘একমাত্র বিষয় হচ্ছে তোমার দক্ষতায় বিশ্বাস রাখা। বড় ম্যাচে শুধুমাত্র নিরুদ্বেগ থাকো, তোমার খেলাটা উপভোগ করো, এটাই আমাদের মূলমন্ত্র। বিশ্বকাপে আমাদের এমনটাই থাকতে হবে। আসুক বিশ্বকাপ, দেখিয়ে দেবো আমরা কাউকে ভয় পাই না।’

যুদ্ধ বিধ্বস্ত আফগানিস্তান ২০০৯ সালে ওয়ানডে এবং ২০১৭ সালে টেস্ট মর্যাদা লাভ করে। তবে দলটির সাম্প্রতিক উত্থান খানকে একজন বিশ্বমানের স্পিনারে পরিণত করেছে।

মাত্র ১৭ বছর বয়নে ২০১৫ সালে এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় খানের। তবে বোলার হিসেবে এ উত্থানের জন্য তিনি সমস্ত কৃতিত্ব দিচ্ছেন আইপিএলকে।

তবে কেবলমাত্র আইপিএল নয়, রশিদ এখন অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ লিগ, ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ ও পাকিস্তানের সুপার লিগসহ বিশ্ব জুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক টি-টোয়েন্টি লিগ খেলছেন।

তিনি বলেন, ‘ভিন্ন ভিন্ন কোচ এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাজ করা সত্যিই আপনার দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক হয়। তাদের ভাবনা ও অভিজ্ঞতা এবং প্রকৃত অর্থেই আপনার খেলার উন্নতিতে সহায়ক হবে।’

বুলাওয়েতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক অভিষেক হওয়ার আগে আফগানিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চল নানগাহার প্রদেশে টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলা শেখেন রশিদ। ১২ ভাই-বোনের পরিবারে সেই সময়টা খুব সহজ ছিল না।

ওয়ানডে ক্রিকেটে দ্রুততম সময়ে (৪৪ ম্যাচে) ১০০ উইকেট শিকারের মাইলফলক স্পর্শ করে ক্রিকেট বিশ্বের নজরে আসেন রশিদ। পরিশ্রম থাকলে যে সবই সম্ভব সেটার সবচেয়ে বড় উদাহরণ তিনি!

  • ‘আমি বাড়তি কোনো চাপ নেই না’

রশিদ খান জানান, তাঁর সাফল্যের মূল বিষয় হচ্ছে – তিনি কেবলমাত্র অনুশীলনে নজর দেন এবং নিজের ওপর বাড়তি কোনো চাপ নেন না।

তিনি বলেন, ‘আমি নিজের ওপর বাড়তি কোনো চাপ নেই না, আমি নিজের খেলাটা উপভোগ করার চেষ্টা করি। উইকেট পাই না পাই নিজের বোলিংটা উপভোগ করি। আমার নজর থাকে কাজটি সঠিকভাবে করা এবং ভাল বোলিং করা। আমি ফলের প্রতি নজর দেই না, নজর দেই নিজের কঠোর পরিশ্রমের প্রতি।

পাকিস্তানী অলরাউন্ডার শহিদ আফ্রিদির একজন বড় ভক্ত খান জানান, দশ বছর যাবত যুদ্ধ চলা একটা দেশে ক্রিকেট শেখাটা ছিল অত্যন্ত কঠিন।

আফগানিস্তানের অনেক ক্রিকেটারই পাকিস্তান সীমান্তে উদ্বাস্ত শিবিরে ক্রিকেট শিখেছেন। দক্ষতা বাড়াতে নিজের সাত ভাইকে নিয়ে খেলতেন খান।

এক ঝলক হাসি দিয়ে স্মৃতি হাঁতড়ে রশিদ খান বলেন, ‘সময়টা খুব কঠিন ছিল। কারণ আমাদের তেমন কোনো সুযোগ সুবিধা ছিল না। না ছিল মাঠ, না ছিল খেলার উপকরণ। তারপরও আমরা ক্রিকেট খেলাটা উপভোগ করতাম।’

বড় ক্রিকেটার হওয়ার পেছনে রশিদ খানের ভাইদের বড় অবদান আছে। তিনি বলেন, ‘এটা কখনো মাথায়ই আসতে দিতাম না যে, আমাদের কোনো সুযোগ সুবিধা নেই। বরং খেলাটাতেই বেশি মনোযোগ দিতাম আমরা। আমার সব ভাই ক্রিকেটের ভক্ত ছিল। সবাই মিলে ক্রিকেট দেখতো। এজন্য আমিও শৈশব থেকেই ক্রিকেটের ভক্ত হয়ে যাই।

র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা ভারতের বিপক্ষে ২০১৮ সালে আফগানিস্তান তাদের অভিষেক টেস্ট খেলে। মাত্র দুই দিনের মধ্যেই ম্যাচটি হেরে যায় নবাগতরা। তবে এক বছর পর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে অনেক উন্নত করা দল হিসেবে ফিরে আসে।

তিনি মনে করেন ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের ফলে আফগানিস্তানে এখন টেস্টের জনপ্রিয়তাও বাড়বে। তিনি বলেন, ‘আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে এ জয় আমাদের প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটারদের অনুপ্রাণীত করবে। জনগণ টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডের চেয়ে টেস্ট ক্রিকেটকে বেশি ভালবাসতে শুরু করবে।’

ডন অবলম্বনে

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।