স্যালাইন-কনডমের বার্গার ও চিকন চিকন বেগুন

অ্যান্টাসিড কেনার জন্য হুট করে ফার্মেসিতে ঢুকছি আমাকে দেখেই ফার্মেসির লোক হাত পেছনে নিয়ে গেল। বুঝলাম হাতে কনডম। ক্রেতা এক আঙ্কেল। আমাকে দেখে আঙ্কেল এদিক ওদিক তাকায়ে বললেন, ‘স্যালাইন দাও তো দুইটা।’

আমি শিওর এই লোকের আজকে স্যালাইনের কোনো দরকার নাই। সে বাসায় স্যালাইন নিয়ে গিয়ে বলবে, ‘যে গরম পড়তেছে! তাই ভাবলাম এই টাইমে স্যালাইন খাওয়া ভালো।’

আমি আড়চোখে দেখলাম ফার্মেসির লোক দুইটা স্যালাইনের প্যাকেটের মাঝে কনডমটা বার্গারের মাংসের মত ঢুকায়ে আস্তে করে আঙ্কেলের হাতে দিয়ে দিল। আঙ্কেল চোরের মত সেটারে পকেটস্থ করলেন। যেন কনডম না, ইয়াবা কেনাবেচা হচ্ছে। আর আমি পুলিশের লোক। এই হলো দেশের অবস্থা। সেক্স কি পরিমানে ট্যাবু ভাবা যায় না। অথচ দেশের জনসংখ্যা আঠারো কোটি। ধর্ষন হচ্ছে প্রতিদিন কয়েকটা। মেয়েরা প্রথম সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের শিকার হয় আঙ্কেল, মামা, চাচা, খালু, টিচারের হাতে।

ছোটবেলায় মনে আছে একবার এক ফ্রেন্ড দৌড়ে এসে উত্তেজিত গলায় বললো, ‘সাদের আব্বু দোকান থেকে কনডম কিনেছে। আমি দেয়ালের পেছনে লুকায় দেখছি।’

আমাদের মধ্যে তাই নিয়ে কি তোলপাড়। কিছুক্ষনের মধ্যেই এলাকার সব ছেলে জেনে গেলো যে সাদের আব্বু কনডম কিনেছে। সাদ লজ্জায় বাসা থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিলো। শুনলাম পরদিন সে কুমিল্লা খালাবাড়ি চলে গেছে বেড়াতে।

অথচ যে পোলা এই খবর এনেছে তারা সাত ভাইবোন। চার ভাই তিন বোন। ওরা তিন ভাই একসাথে এক খাটে গাদাগাদি করে ঘুমায়।আমাদের তখন ঐ পোলারে বলা উচিত ছিলো যে, ‘এই কনডমটা সাদের আব্বুর বদলে টাইমমত তোর আব্বু কিনলে এই গরমে এক খাটে তিনজন ঘুমানো লাগতো না।’

সবাই গোপনে গোপনে সব জানে, কিন্তু মুখ ফুটে কেউ সেক্স শব্দটা উচ্চারণও করবে না। সেক্স বুঝানোর জন্য ডুয়েল মিনিং এর কি পরিমান ক্রিয়াপদ যে আছে, ভাবা যায় না। তালিকা করলে বিশাল লিস্ট দাঁড়াবে। খেলা, খাওয়া, দেয়া, খেয়ে দেয়া, করা, নেয়া, লাগানো, ঢুকানো, বের করা, আউট করা, শোয়া, ঘুমানো, মারা, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই যুগে কোনো বৈয়াকরণিক ভার্ব চ্যাপ্টার লিখতে গেলে কনফিউজড হয়ে যেতো। ব্যকরণ লিখতেছি নাকি কামসূত্র!

কেউ এসে, দোস্ত খেলে আসলাম, বললে চিন্তায় পড়ে যেতে হয়। পরের প্রশ্ন কি করবো! কি খেললি? নাকি কাকে!

কাউরে গিয়ে দোস্ত খাইছি, বললে সে কেমন কেমন করে তাকায়। জিজ্ঞেস করে, ‘খাওয়ার পর গোসল করে আসছস তো?’

এছাড়াও আরো কতধরনের জিনিস দিয়ে যে সেক্স বুঝায় এই বাংলার জনগন তার কোনো ইয়ত্তা নেই।

এলাকার এক বড়ভাই বিয়ে করেছে। পরদিন আরেক বড়ভাই তারে জিজ্ঞেস করতেছে, ‘ভাই, লগইন কি সাকসেসফুলি হইছে? তালা খুলছেন? কয়বার গোল দিলেন? পিচ নিউ ছিলো নাকি সেকেন্ডহ্যান্ড?’

ভাবনার গভীরতা দেখেন একবার। কোন লেভেলে গেছে। এই জাতীর মাথার মধ্যে সপ্তায় সাতদিন, দিনে চব্বিশ ঘন্টা সেক্স ঘুরে। জীবনে টেক্সট বইএ থাকার কল্যানে রবীন্দ্রনাথের একটা মাত্র গল্প পড়লেও, রসময় গুপ্তের সবকয়টা গল্পই পড়া। এদের সার্চ দেয়ার কারনেই এখন গুগলের মন মানসিকতা হয়ে গেছে খারাপ। যা ই লিখে সার্চ দিবেন না কেন, সে ঘুরেফুরে এডাল্ট লিংকে নিয়ে যাবে। ইঞ্জিনিয়ারিং লিখে সার্চ দিলে আসবে, ‘ডাক্তার মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সেক্স ভিডিও।’

বাঙালি যে সেক্স দেখলেই শুধুমাত্র ইন্টারেস্টেড হয় তার সবচাইতে বড় প্রমান হলো তাদেরকে কোনো লিংকে ক্লিক করানোর জন্য বহুকাল ধরেই সেই পুরানো টেকনিক ইউজ হয়ে আসতেছে সফলভাবে। ফাকা বাসায় এ কী করলেন পরীমনি। দেখুন ভিডিও সহ।

আর এতোকিছুর পরও আপনি কারো সামনে সেক্স শব্দটা উচ্চারণ করলে সে এমনভাবে তাকাবে যেন, আপনি এইমাত্র প্যাকেজে দুইটা খুন আর একটা রেপ করে আসলেন।

এডাল্ট গল্প কবিতা লেখা রাইটারকে এরা রেপিস্ট থেকেও বেশি ঘৃণা করে। তবে কমেন্ট টা করার আগে লেখাটা তিনবার পড়ে বাথরুমে গিয়ে হালকা হয়ে এসে বলে, ‘নাউজুবিল্লাহ। এসব লেখা কঠিন পাপ।’

এদেরকে ফেসবুকে গল্প পড়ানোর জন্য গল্পের মধ্যে হালকা আঠারো প্লাস কন্টেন্ট ঢুকায় দেন। গল্প হিট। তবে সাবধান, হালকা ঢুকাবেন। ডোজ বেশি হয়ে গেলে এদের কাছে আপনি তখন চটি লেখক। গল্প পড়ে বাথরুমে যাবে, বাথরুম থেকে বের হয়ে রিপোর্ট মেরে আইডি খেয়ে দিবে।

সেক্স এডুকেশনের নাম শুনলে এদের হিস্টিরিয়া শুরু হয়। ছি ছি, ছেলেমেয়েকে ধ্বংস হয়ে যাবে। দেশের এখন কি হবে। সোনার বাংলাদেশ তো তামা হয়ে গেল। সেক্স এডুকেশন মানেও এরা জানে না। চটি পড়া বাঙালীর ধারণা সেক্স এডুকেশন অর্থ ক্লাসে সেক্সের গল্প পড়ানো। সেক্স করতে উৎসাহ দেয়া।

স্যার ক্লাসে এসে বলবে, ‘কাল সবাইকে ‘পাশের বাসার বৌদি’ চ্যাপ্টারটা পড়ে আসতে বলেছিলাম। কে কে পড়ে এসেছো তোলো। হাত তুলতে বলছি গাধার বাচ্চারা।’

অথচ হাইস্কুলের এমন কোনো ছেলে নাই যে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানে না। নাইন টেনের পোলারা যা যা জানে, সেসব স্বয়ং জনি সিন্সেরও ধারণার বাইরে। সমস্যা হলো, সবই জানে কিন্তু ভুল পদ্ধতিতে।

আমি ফার্স্ট সেক্স সম্পর্কে কিভাবে জেনেছি সেটা বলি।

তখন ক্লাস ফাইভ অথবা সিক্সে পড়ি। বৃষ্টির দিন ক্লাস হচ্ছে না। চারপাঁচজন একসাথে হয়ে গল্প করতেছে। আমি পাশে বসে শুনতেছি।

গল্পের বিষয় তাদের বাসার পাশের মহিলা হোস্টেলের ছাত্রীরা বাজার থেকে বেগুন কিনে নিয়ে যায়। গল্পের চাইতেও হাসাহাসি বেশি হচ্ছে।

আমি সরল বিশ্বাসে গল্পের মাঝখানে বললাম, ‘এতে এতো হাসির কি আছে? বেগুন তো আমার আব্বুও কিনে আনে।’

একজন চোখ টিপ দিয়ে বললো, ‘আরে সেগুলা যে সে বেগুন না। কালো বেগুন। চিকন চিকন সাইজ।’

আমি বললাম, ‘হ্যা, ওগুলাও তো আমার আব্বু কিনে আনে। গোল গোল করে কেটে ভাজি করলে রুটি দিয়ে খেতে অনেক ভালোলাগে।’

আমার কথা শুনে ওরা হাসতে হাসতে অজ্ঞান। একজন আমাকে যা বুঝালো তার অর্থ বেগুন দিয়ে সেক্স করা হয়।

তখন থেকে বেশ কিছুদিন আমার ধারণা ছিলো বিয়ের পর স্বামী স্ত্রীও বেগুন দিয়েই সেক্স করে।

ভাগ্যিস আজ আর সে ধারণা নাই। নাহলে সেক্সের মত ননভেজ একটা জিনিস আমার কাছে ভেজিটেবলই থেকে যেত সারাজীবন।

অথচ টিচারদের মাধ্যমে ক্লাসে সঠিক জ্ঞান দেয়ার সিস্টেম চালু করলেই জাত গেল জাত গেল রব উঠবে। এরা যেভাবে সেক্সকে ট্যাবু হিসাবে জেনে একেকজন চার পাঁচটা বাচ্চা জন্ম দিয়েছে, এদের চাওয়া এদের ছেলেমেয়েরাও এভাবেই জীবন কাটাক।

বড় মেয়েকে আঙ্কেল হ্যারাস করার পরও সে বুঝতেই না পারুক যে তার সাথে খারাপ কিছু হয়েছে। বুঝতে পারলেও চেপে যাক। ছি ছি, এগুলা মানুষের সামনে বলা যায়? বাবা মায়ের সামনে এসব উচ্চারণ করা যায়? নাউজুবিল্লাহ, নাউজুবিল্লাহ।

ছোট ছেলে পাশের বাসার আঙ্কেলের কনডম কেনা দেখে উল্লসিত হয়ে ফ্রেন্ডদের সাথে কানাকানি করে বেড়াক। যেখানে তারা নিজের ভাইবোন মোট সাতটা!

এরাই বড় হয়ে লাগানো আর খেয়ে ছেড়ে দেয়া শিখবে। ভালোবাসাবাসি শিখবে না কখনো!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।