ওই দেখা যায় সোনালী ট্রফি…

‘হয়তো ফুটবলের জন্ম ইংল্যান্ডে, কিন্তু ওর বাড়ি এই ব্রাজিলেই’ – বলেছিলেন ব্রাজিলের সাবেক রাষ্ট্রপতি দিলমা রৌসেফ। আর দুয়ারে যখন বিশ্বকাপ তখন ফুটবলের সেই বাসস্থান নিয়ে আলোচনা হবে না, তা কি করে হয়!

আলোচনা হচ্ছে বলতে কি, ব্রাজিলিয়ান ফুটবল সব সময়ই আলোচনার রসদ জোগায়, সেটা বিশ্বকাপ মৌসুম হোক কি না হোক। গত চার বছর যেমন আলোচনা হয়েছে ‘সেভেন আপ’ নিয়ে। সচেতন পাঠকের নিশ্চয়ই গত আসরে সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার স্মৃতি মনে আছে।

ভুলে যাওয়ার কোনো কারণও নেই। মারাকানাজোর ভুত সেই ৫০-এর দশকে যেভাবে ব্রাজিল ফুটবলকে আকড়ে ধরেছিল এই ‘মিনেইরাজো’র ভুতও কম প্রবল নয়। তখনকার কোচ লুই ফিলিপ স্কোলারি তো বলেই দিয়েছিলেন, ‘এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বাজে দিন!’

৭-১-এর সেই দু:সহ স্মৃতি

শুধু তাঁর নয়, হয়তো সব ব্রাজিল সমর্থকদের জন্যেই দিনটা ছিল খুব বাজে। এই চারটা বছর তাই দু:স্বপ্নে সেই স্মৃতি এসেছে, এসেছে ব্রাজিলের অনুশীলনে, এসে বর্তমান কোচ তিতের মনেও। সমস্যাটা আসলে কি ছিল? উত্তরটা সহজ – নেইমারের ওপর অতি নির্ভরশীলতা। অন্তত ওভাবে ভেঙে পড়ার মত দল যে ব্রাজিল নয়, সেটা তো নিন্দুকেরাও বোঝেন।

সেই নির্ভরশীলতার ভুত তাড়ানোর জন্য তিতে চেষ্টার কমতি করেননি। ফরোয়ার্ড লাইনে নেইমারের সহচর গ্যাব্রিয়েল জেসাস কিংবা কৌতিনহো – কেউ কারো চেয়ে কম নয়। আর তারা কতটা কি করতে পারেন সেটা ইউরোপিয়ান ফুটবলেও সাম্প্রতিক সময়ে দেখিয়েছিলেন। বেঞ্চে থাকা উইলিয়ান, রবার্তো ফিরমিনো কিংবা ডগলাস কস্তারাও পরীক্ষিত।

২০১৬ সালের জুনে ব্রাজিলের দায়িত্ব নেন তিতে। এরপর থেকে তিনি দলটি নিয়ে অনেকরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে তিনি মোট ৬৪ জন ফুটবলারকে যাচাই করে দেখেছেন। সেখান থেকে বেছে নিয়েছেন ২৩ জনকে। আরেকটা বিশ্বকাপের জন্য ব্রাজিল কতটা সিরিয়াস সেটা এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়।

আর একই সাথে ব্রাজিল কোচ যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসীও। ২৩ জনের দল ঘোষণার আগেই তিনি একাদশও  জানিয়ে দিয়েছেন। সেটা হল -অ্যালিসন, মার্সেলো, মিরান্ডা. মারকুইনহোস, দানি আলভেজ, পওলিনহো, আগুস্তো, ক্যাশেমিরো, নেইমার, কৌতিনহো ও গ্যাব্রিয়েল জেসাস। আলভেজের ইনজুরি, বড় একটা সুযোগ পেতে যাচ্ছেন দানিলো, কে জানে বিষয়টা শাপেবর হয়ে যায় কি না!

লেফট ব্যাক মার্সেলো এই ‍মুহূর্তে বিশ্বসেরাদের একজন। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে তিতে বলছেন মিরান্ডা ও মারকুইনহোসকে খেলাবেন। চাইলে থিয়াগো সিলভার মত অভিজ্ঞকেও সুযোগ দিতে পারেন। মধ্যমাঠে ক্যাসেমিরো, পওলিনহো আর রেনাতো আগুস্তো খেলবেন। ব্যাকআপ হিসেবে থাকছেন ফার্নান্দিনহো।

ব্রাজিলের গোলবারের দায়িত্বে এবার অ্যালিসন। এই জায়গায় তিনি রীতিমত বিশ্বসেরাদের কাতারে। সব মিলিয়ে অন্তত ২০০২-২০০৬ সালের পর এটাই ব্রাজিলের সবচেয়ে ভাল দল। অনেকেই তো দলটাকে রীতিমত ১৯৭০ কিংবা ১৯৮২ সালের ব্রাজিলের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। এমনকি ব্রাজিল যাদের রেখে গেছে, তাঁদের নিয়েও বেশ ভাল মানের একটা একাদশ গঠন করে ফেলা যায়।

অপরাজিত বাছাইপর্ব পার করা ব্রাজিল ১৮টি ম্যাচের মধ্যে জিতেছে ১৬টিতেই। ড্র হয়েছে বাকি দু’টি ম্যাচ। গোল হজম করেছে মাত্র তিনটি। মূলত বাছাইপর্বের এই পারফর‌ম্যান্স আর খেলোয়াড়দের সাম্প্রতিক ফর্ম বিবেচনা করেই সবাই ফেবারিটের তালিকায় ব্রাজিলকে রাখছে।

যদিও, চূড়ান্ত পর্বের লড়াইয়ে কখন কোনটা কাজে লাগবে বলা যায় না। যেমন, ২০০২ সালের বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে তো কানের কাছ দিয়ে গুলি গেছে ব্রাজিলের। একদম শেষ মুহূর্তে বিশ্বকাপের টিকেট পাওয়া সেলেসাওরাই সেবার এক তরফা ভাবে বিশ্বকাপ জিতে নিয়েছিল।

সেটাই শেষ। পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের পর এরপর আরো ১৬ টা বছর কেটে গেছে। হেক্সা ট্রফির জন্য প্রতিটি বিশ্বকাপের সময়ই টেলিভিশনের পর্দায় অধীর আগ্রহ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে বসেছেন সমর্থক। কখনোই হাসিমুখে শেষ করতে পারেননি। এবার কি পারবেন?

সম্প্রতি একটা কলামে ব্রাজিলের কোচ তিতে লিখেছেন, ‘১৯৭০ সালে আমি যেভাবে নিজের মনে জয়সূচক গোলটার ছবি নিজের মত করে আঁকছিলাম, একই ভাবে ২০১৮ সালেও লাখো ব্রাজিলিয়ান শিশু টিভি কিংবা রেডিওর সামনে বসে নিজের মনের মত করে জয়সূচক গোলটার ছবি আঁকতে থাকবে। এই আঁকাআঁকি চলতে থাকবে জয় আসার আগ পর্যন্ত বারবার।’

এবার হোক সেই অপেক্ষার অবসান। ওই দেখা যায় সোনালী ট্রফ্রি… ওখানেই ব্রাজিলের বাস। মারাকানার কান্না থেমেছিল ১৯৫৮ সালে। মিনেইরার কান্না কি থামবে ২০১৮-তে? ‘কিছু দেশ ফুটবল ভাল খেলে। আর ব্রাজিল হল সেই ফুটবল’ – এবার এই ধ্রুব সত্য কথাটাকেই নতুন করে প্রমাণের পালা। তবেই তো সেই কান্না সোনালী ট্রফি হয়ে হাসবে!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।