ব্রাজিলের এই একাদশটা বিশ্বকাপে নেই!

সমর্থকদের অযাচিৎ আস্ফালন নয়, খোদ ফুটবল পন্ডিতরাই মানছেন যে এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলটা বেশ ভারসাম্যপূর্ণ। অন্যতম ফেবারিটও তারা। আর ব্রাজিলের ফুটবলে এখন এত বেশি প্রতিভার ছড়াছড়ি যে তারা চাইলে একটি অসাধারণ একাদশ বাড়িতে রেখেই অন্য একটি একাদশ নিয়ে বিশ্বকাপে খেলতে পারে অনায়াসে।

ব্রাজিল ব্যতীত অন্য কোন দেশের ফিফা বিশ্বকাপের সাথে এমন গভীর সম্পর্ক নেই। তারাই এই টুর্নামেন্টের ইতিহাসে সবচাইতে সফল দল। এবং তারাই একমাত্র দল যারা প্রতিবার এই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছে।

রাশিয়ায় ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দল

‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-এর ইতিহাসের সেরা পারফর্মারদের মধ্যেও ব্রাজিলিয়ানদেরই রাজত্ব যেমন পেলে, গারিঞ্চা এবং রোনালদো নাজারিও।

কিন্তু দুঃখজনক ভাবে নিজেদের দেশের বিশ্বকাপ আয়োজনের বেলায় তাদের সঙ্গী হয়েছে হতাশা। ১৯৫০ সালে তারা প্রায় দুই লাখ মানুষের সামনে ফাইনাল হেরেছিল আর চার বছর আগে জার্মানীর কাছে ৭-১ এ বিধ্বস্ত হয়েছে সেমিফাইনালে।

কোচ তিতে ইতোমধ্যেই সেলেকাওদের চূড়ান্ত দল ঘোষণা করে দিয়েছেন। এখন যেহেতু ব্রাজিলে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের অভাব হয়না কখনই তাই কিছু বিশ্বের ভাল ভাল খেলোয়াড়ও ব্রাজিলের হয়ে বিশ্বকাপ মিস করতে যাচ্ছেন। সেই বাদ পড়াদের নিয়েও চাইলে একটা মান সম্পন্ন একাদশ গঠন করা যায়।

  • গোলরক্ষক: নেতো

বহু বছর পর ব্রাজিলে একটি নয় বরং দুটি অসাধারণ গোলরক্ষক খেলছেন। রোমার অ্যালিসন বেকার তিতের পছন্দের একনম্বর গোলরক্ষক যেখানে ম্যানচেস্টার সিটির এডারসন আছে তার ব্যাক আপ হিসেবে দ্বিতীয় গোলরক্ষক।

নেতো

তৃতীয় অপশনে তিতে বেছে নিয়েছেন কোরিন্থিয়ান্সের ক্যাসিও রামোস কে। টাইটের সিদ্ধান্ত কে প্রশ্ন করা অমূলক তবে ভ্যালেন্সিয়ার নেতো একটা সুযোগ পেতেই পারতেন। যদিও রামোস টাইটের অধীনে খেলেছেন যখন তিনি কোরিন্থিয়ান্সের ম্যানেজার ছিলেন।

২৮ বছর বয়সী নেতো কখনই ব্রাজিলের সিনিয়র টিমের হয়ে মাঠে নামেননি। ২০১৫ সালে কোপা আমেরিকার স্কোয়াডে ডাক পেলেও মাঠে নামা হয়নি তাঁর।

সাবেক ফিওরেন্তিনা ও জুভেন্তাস খেলোয়াড় নেতো এই মৌসুমের শুরুতেই ভ্যালেন্সিয়ায় যোগ দেন। এবং ভ্যালেন্সিয়ার চ্যাম্পিয়ন্স লিগে জায়গা পাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন যেখানে এর আগের দুই মৌসুমে তারা দ্বাদশ স্থানে ছিল।

  • ফুলব্যাক: দানি আলভেজ এবং অ্যালেক্স সান্দ্রো

এই দুইজন ফুলব্যাক বিশ্বকাপ মিস করছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে। যদিও দুজনই বিশ্বের যেকোন দলের হয়ে সন্দেহাতীত ভাবে মাঠে নামার যোগ্যতা রাখেন।

দানি আলভেজ

দানি আলভেজ ব্রাজিলের প্রথম পছন্দের রাইট ব্যাক। কিন্তু অসময়ের ইনজুরি তাকে বাধ্য করেছে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যেতে। তার জায়গায় দলে এসেছেন ওলফসবার্গ এর ডিফেন্ডার ফ্যাগনার তবে মূল একাদশে সম্ভবত দানিলো শুরু করবেন তার জায়গায়।

এ মাসে ৩৫ বছর বয়সে পা দেয়া আলভেজ বিশ্বের সবচাইতে বেশি অলঙ্কিত খেলোয়াড় গুলোর মধ্যে একজন। তিনি সেভিলা, বার্সেলোনা, জুভেন্তাস ও পিএসজি’র হয়ে অনেক ট্রফি জিতেছেন। এবং বিশ্বকাপের উইনার মেডেল নিয়ে তার ক্যারিয়ার শেষ করতেই হয়তো চাইতেন তিনি।

অ্যালেক্স সান্দ্রো

অ্যালেক্স সান্দ্রোর ব্যাপারটি আলাদা। তিনি বাদ পরেছেন কারণ দলের অন্য দুটি লেফট ব্যাক হলে মার্সেলো এবং ফিলিপ লুইস।

মার্সেলো ব্রাজিলের প্রথম লেফট ব্যাক এবং তিতের দ্বিতীয় পছন্দ লুইস। সান্দ্রো দলে জায়গা পেলে বাদ পরতেন লুইস। কিন্তু লুইস ৩২ বছর বয়সী এবং সান্দো’র বয়স ২৭ বছর। তাই লুইস আর বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ না পেলেও সান্দ্রোর সামনে সুযোগ আছে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ খেলার।

  • সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার: ডেভিড লুইজ আর জেমারসন

লুইজ এ জেমারসন কে বাদ দিয়েও ব্রাজিলের সেন্ট্রাল ডিফেন্সে আছেন থিয়াগো সিলভা, মারকুইনোস, মিরান্ডা এবং পেদ্রো জেরোমেল।

ডেভিড লুইজ

এখন তর্কের খাতিরে ধরা যায় যে লুইজ এই জেরোমেলের থেকে ভাল অপশন। কিন্তু লুইজ এই মৌসুমে কোন্তের চেলসিতে ব্যর্থতার পর খেলতেই পারেননি বলা চলে। তিনি সমর্থক দের প্রিয় এবং তার তৈরি করা ইতিবাচক মানসিকতাকে মিস করবে এবার ব্রাজিল সমর্থকেরা।

অপরদিকে, জেমারসন নিজেকে দুর্ভাগ্যবান মন করতেই পারেন কারণ তিনি দুটি অসাধারণ মৌসুম কাটিয়েছেন মোনাকোর সাথে। মোনাকো যে অবিশ্বাস্যভাবে গত মৌসুমে লিগ শিরোপা জিতলো তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন জেমারসন।

জেমারসন

যাই হোক, ম্যানেজারদের নিজস্ব খেলোয়াড়দের একটা সেট থাকে যা তারা খেলিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আর এটিই হয়তো জেরোমেলকে দলে নেয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা।

  • মিডফিল্ডারঃ ফ্যাবিনহো, অস্কার এবং অ্যান্ডারসন তালিস্কা

এই একাদশের জন্য মিডফিল্ডার বেছে নেয়ার আগে বলে রাখা প্রয়োজন যে ব্রাজিলে এত বেশি প্রতিভাবান মিডফিল্ডার রয়েছেন যে তিতের মূল একাদশ এবং এই বাদ পড়া একদশের বাইরেও রয়েছেন আর্থার, রামিরেজ, গিউলিয়ানো, লুকাস লেইভা এবং দিয়েগোর মতন মিডফিল্ডার।

ফ্যাবিনহো

আমার মতে, সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতন খেলোয়াড় যিনি বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ পড়েছেন এবার তিনি হলেন মোনাকোর ফ্যাবিনহো।

ফ্যাবিনহো গত দুই বছর ধরেই ইউরোপের সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের একজন এবং ইউরোপের বেশ কিছু বড় দল তাকে নিজেদের দলে ভেড়াতে চাইছেন এই গ্রিষ্মে। কিন্তু তিতে কখনই ফ্যাবিনহোকে জাতীয় দলে ডাকেন নি! যদিও এটা বুঝতে সমস্যা হওয়ার কথা না কারণ তাঁর জায়গায় ডাক পাওয়া দুজন খেলোয়াড়ের নাম যে ক্যাসেমিরো এবং ফার্নানদিনহো!

অস্কার

গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল দানি আলভেজ এর ইনজুরির জন্য ফ্যাবিনহো কে তার জায়গায় ডাকা হতে পারে কারণ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে সফলতা অর্জনের পূর্বে তিনি রাইট ব্যাকেই খেলতেন। তবে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে তিতে এত বড় ঝুঁকি নেবেন না সেটাই স্বাভাবিক।

অস্কার ব্রাজিলের শেষ বিশ্বকাপে স্কোরার দের একজন। জার্মারির কাছে সাত গোল হজমের সেমিফাইনাল ম্যাচে একমাত্র স্বান্ত্বনার গোলটি তাঁরই করা ছিল।

অস্কারের বাদ পড়া খুব একটা বিস্ময়কর নয়। তার জায়গায় দলে সুযোগ পেয়েছেন রেনাতো অওগাস্তো যিনি কোরিন্থিয়ান্সের সময়কালে তিতের অধীনে খেলেছেন।

অ্যান্ডারসন তালিস্কা

এই লিস্টের শেষ মিডফিল্ডার হলে অ্যান্ডারসন তালিস্কা যে এখনো ব্রাজিলের সিনিয়র দলের হয়ে খেলেনি। তালিস্কা গত দুই মৌসুম ধরে বেনিফিকা থেকে লোনে বেসিকতারসের হয়ে খেলছেন। ৭৭ ম্যাচে ৩৬টি গোল করেছেন!

২৪ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডারের সামনে অনেক সময় আছে জাতীয় দলে খেলার। তবে এর জন্য তাঁকে আরো প্রতিদ্বন্দ্বিতা পূর্ণ লিগে যেয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে।

  • ফরোয়ার্ড : লুকাস মৌরা, উইলিয়ান হোসে আর ম্যালকম

ব্রাজিলের এবারের বিশ্বকাপে আক্রমণ ভাগে আছেন নেইমার, রবার্তো ফিরিমিনো, গ্যাব্রিয়েল জেসাস, ফিলিপ কৌতিনহো, উইলিয়ান, ডগলাস কস্তা আর টাইসন! তাই বলা যায় তিতে সবচেয়ে সেরা খেলোয়াড়দেরই বেছে নিয়েছেন।

লুকাস মৌরা

টটেনহামের লুকাস মৌরাকে বলা হচ্ছিল নেইমারের মতনই ভাল ভবিষ্যতের যাত্রী। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড থেকে পিএসজিতে তাকে বেশ মোটা অঙ্কের ফি ফিয়ে দলেও ভেড়ানো হয়। তবে তার ক্যারিরারের গ্রাফটি ঠিক আকাঙ্খা মোতাবেক হয়নি।

টটেনহ্যামে  তিনি গিয়েছিলেন আরও বেশি সময় খেলার জন্য কিন্তু তিনি তা করতে পারেন নি। তবে তিনি মাত্র ২৫ বছর বয়সী। তার সামনে সুযোগ আছে তাঁর ক্যারিয়ারকে পুনর্জন্ম দেয়ার যদি তিনি ২০২২ সালে কাতারে খেলতে চান।

রিয়াল সোসিয়েদাদের উইলিয়ান হোসে চার বছর আগে ফ্রেড এবং জো-এর সাথে ব্রাজিলের স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেছেন বিশ্বকাপ। এবার ব্রাজিলে তার পরিবর্তে দলে জায়গা পেয়েছেন রবার্টো ফিরিমিনো এবং গ্যাব্রিয়েল জেসাস, যারা কিনা এই সময়ে ইংলিশ লিগের এবং ইউরোপের দু’জন সেরা স্ট্রাইকার।

উইলিয়ান হোসে

হোসে ৩৩টি খেলায় ১৮ গোল করেছেন রিয়েল সোসিয়েদাদের হয়ে যা গ্যাব্রিয়েল জেসাসের ৪২ খেলায় ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে করা গোল সংখ্যা থেকে বেশি। তারপরও জেসাস ব্রাজিলের প্রথম দলের স্ট্রাইকার।

কারণ শুধু এই পরিসংখ্যান দিয়ে জেসাসকে মাপা যাবেনা। জেসাস এই কম বয়সেই ব্রাজিলের হয়ে ১৫ খেলায় ৯ গোল করার রেকর্ড করেছেন। তিতে অবশ্য বলেছেন যে ফিরিমিনো জেসাসের চাইতে ভালো মৌসুম কাটিয়েছেন। কিন্তু জেসাসই থাকবেন ব্রাজিলের শুরুর একাদশে।

তিতে বলেন, ‘এটা সত্যি যে ফিরিমিনো জেসাস থেকে ভালো করেছে, যে মৌসুমজুড়ে ইনজুরিতে ছিল। কিন্তু গ্যাব্রিয়েল এই দলের হয়ে অনেক ভাল খেলে। তাই আজ সে-ই আমাদের ৯ নম্বর।’

ম্যালকম

এই একাদশের শেষ খেলোয়াড় বোর্ডেক্সের ম্যালকম, যার সাথে তিতে পূর্বপরিচিত। কিশোর ম্যালকম তিতের কোরিন্থিয়ান্স দলের সদস্য ছিলেন। এই দলটা ক্যাম্পেওনাতো ব্রাসিলেইরো সিরি আ জেতে ২০১৫ সালে।

ম্যালকমের এই মৌসুম অসাধারণ কেটেছে । তিনি ১১ টি গোল ও ৬ টি অ্যাসিস্ট বাগিয়ে নিয়েছেন। গুঞ্জন আছে তিতে তাঁকে পরবর্তীতে ডেকে নিতেও পারেন যা এখনো ঘটে নি।

এই ২১ বছর বয়সীকে নিয়ে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে দলবদলের। যদি তিনি এই মৌসুমের ভালো ফর্ম অন্য দলেও অব্যাহত রাখতে পারেন তবে ভবিষ্যতে জাতীয় দলে ডাক পেয়ে যাবেন, বিশেষ করে যদি দলের দায়িত্বে তিতেই থেকে যান। যদিও, তার আগে অন্তত বিশ্বকাপটা জিতে নিতে হবে তাঁকে।

– স্পোর্টসকিডা অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।