‘সেভেন আপ’-এর মোক্ষম প্রতিশোধ হল বিশ্বকাপ জয়

ব্রাজিল ও জার্মানির মধ্যকার ম্যাচ সামনে রেখে দুই কিংবদন্তি পেলে এবং রোনালদো ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। বুঝা যাচ্ছে তারা খুবই উত্তেজিত ম্যাচটা নিয়ে। কারণ আর কিছুইনা, বিশ্বকাপে ৭-১ গোলে হারার পর ব্রাজিল আবার মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির। এবার প্রতিশোধের পালা।

পেলে আর রোনালদোর পোস্ট দেখে নিশ্চিতভাবে বলে দেয়া যায় ব্রাজিলিয়ানরাও প্রীতি ম্যাচটাকে খুব সিরিয়াসলি নিচ্ছে। কিন্তু জার্মান কোচ তাদের নিয়মিত একাদশের দুই খেলোয়াড় ওজিল এবং মুলারকে বিশ্রাম দিচ্ছে এই ম্যাচে, যারা স্পেনের সাথে দলে ছিল। এটা দ্বারা কি তারা ব্রাজিলকে হালকা ভাবে নিচ্ছে ধরা উচিত? নাকি প্রীতি ম্যাচে যত বেশি সম্ভব ফুটবলারকে যাচাই নেয়া যায় তই দদলের জন্য মঙ্গল, এটা পরবর্তিতে ম্যাচ পরিকল্পনার জন্য কাজে লাগতে পারে । তাহলে প্রতিদ্বন্দিতার কি হবে? প্রীতি ম্যাচে আবার প্রতিদ্বন্দিতা কিসের? যেহেতু এটা প্রীতি ম্যাচ, এখানে জয় পরাজয় মূখ্য না।

জার্মানি তাদের দুই সেরা প্লেয়ার খেলবেনা, এদিকে গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো এই ম্যাচও নেইমারকে ছাড়া খেলবে ব্রাজিল, তবে ২০১৪ এর সাথে এই দলের পার্থক্য হচ্ছে খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়া। প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় বেশিরভাগ প্লেয়ার দলে নিয়মিত ছিল। জাতীয় দলের সাফল্যের এটা জরুরি। কারণ ক্লাবের মতো সপ্তাহে তিনটা করে ম্যাচ খেলিয়ে বা প্রতিদিন একসাথে ট্রেইনিং এর মাধ্যমে প্লেয়ারদের মধ্যে বোঝাপড়ার ব্যাপারটা ঝালিয়ে নেয়ার সুযোগ এখানে নাই।

জাতীয় দলে বিভিন্ন ক্লাব থেকে প্লেয়ার আসে কয়েকদিনের জন্য। এভাবে অনেকবার একসাথে খেলতে খেলতে বোঝাপড়াটা তৈরি হয় এবং জাতীয় দলে এটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। অনেকটা ভার্সিটির মতো, বিভিন্ন কলেজ থেকে স্টুডেন্ট আসবে। প্রথম বছরে কয়েকজনের সাথে খাতির হবে, পরের বছর পুরা ক্লাসের সবার সাথে খাতির হবে, এর পরের বছর সবার সাথেই খাতির হবে – কে কি চিন্তা করে, কার দৌড় কতদুর সেটা জানা হয়ে যায়। ফাইনাল ইয়ারে সবাই-ই বন্ধুতে পরিণত হয়।

২০১৪ বিশ্বকাপে স্কলারির দলের প্লেয়াররা সেকেন্ড ইয়ারে যাওয়ার আগেই দলনেতা থিয়াগো সিলভা আর প্রধাণ প্লেয়ার নেইমারকে হারিয়ে জার্মানির সাথে পড়ে গিয়েছিল সেমিফাইনালে। অন্যদিকে জার্মানরা অনেকটা পুরা চারবছরের কোর্স একসাথে শেষ করে মাস্টার্স করার পর্যায়ে ছিল । ডিফারেন্সটা অনেক।

বর্তমান ব্রাজিল কোচ তিতের দলের প্লেয়াররা স্কলারির তুলনাই অনেক বেশি ম্যাচ একসাথে খেলার সুযোগ পেয়েছে – বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে দলের কঠিণ সময়ে খেলছে, সে দুঃসময় থেকে বের হয়ে একেবারে র‍্যাঙ্কিং এ এক এও উঠতে সক্ষম হয়েছে । একসাথে এরকম সময়ে খেলার কারণে প্লেয়ারদের প্রতি প্লেয়ারদের আস্থা বেড়েছে। আলভেজ যদি ভুল করে তাহলে কাসেমিরো জানে ওর কি করতে হবে – কারণ কাসেমিরো অভ্যস্ত আলভেজের ভুলের ব্যাপারে।

কিন্তু আলভেজের জায়গায় নতুন আরেকজন আসলে কাসেমিরো কিংবা সিলভাকে প্রথমে ওই প্লেয়ারকে রীড করতে হবে, তারপর ম্যাচ। এই কথা বলার কারণ হচ্ছে – সাম্প্রতিক সময়ে সাফল্য পেলেও দল নির্বাচনে তিতে একটু একরোখা ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ আছে।

ক্লাবে খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়ার কাজটা রেগুলার ট্রেইনিং এর মাধ্যমে উন্নতি করা যায় – জাতীয় দলে সেই সুযোগ কম, একেবারেই কম। সুতরাং নতুন কাউকে নিয়ে আসতে হলে তিতেকে আগে আশ্বস্ত হতে হবে যে এই প্লেয়ারটা বর্তমান প্লেয়ারের চেয়ে ভাল খেলতে সক্ষম এবং সে সেটা ধারাবাহিকভাবে করতে পারবে। আবার বর্তমানে যে প্লেয়ারটা ইতিমধ্যে সেটাপের অংশ হয়ে গেসে তাকে বাদ দিয়ে আরেকটা নতুন সেটাপ তৈরি করা মানে শূন্য থেকে শুরু করার সমান । তিতে এই ব্যাপারে বেশি সেন্সিটিভ। স্কলারি ২০১৪ বিশ্বকাপের আগে তার দলে অনেক প্লেয়ারকে খেলিয়েছিল যাদের পরবর্তিতে দলে নেওয়া হয়নাই, এই ব্যাপারে তিতে সতর্ক ।

যাকে নিয়ে সে ভাবছেনা তাকে শুধুশুধু দলে নিয়ে সময় নষ্ট করে নাই। ব্রাজিলের কিছুদিন পরপরই ভাল প্লেয়ার আলোচনায় আসে – সুতরাং নিতে হলে নিতেই থাকতে হবে। আরেকটা ব্যাপার, তিতে তার নিয়মিত দলের সবাইকে একবার করে হলেও নেতৃত্বের দায়িত্ব দিয়েছে, এটা প্লেয়ারদের মধ্যে নেতৃত্ব কিভাবে দিতে হয় সে ব্যাপারে একটু হলেও শৃঙখলা আনতে পারবে ।

ব্রাজিল জার্মানি ম্যাচের প্রাক্কালে সেই ৭-১ এর কথা উঠছে বার বার। জার্মান দৈনিকের প্রথম পাতায়ও ব্যাপারটা উঠে এসেছে। আসলে একটা প্রীতি ম্যাচ নিয়ে একটু বেশিই আবেগ দেখানো হচ্ছে দুই পক্ষ থেকেই। ওই ম্যাচটা ছিল বিশ্বকাপে। আর বিশ্বকাপে ব্রাজিল জার্মানি মোট দুইটা ম্যাচ খেলেছে। একটাতে জার্মানি ব্রাজিলকে ৭-১ এ হারিয়ে ফাইনালে উঠেছে এবং পরে বিশ্বকাপ জিততে সক্ষম হয়েছে । আরেকিটাতে ব্রাজিল জার্মানিকে ফাইনালে ২-০ তে হারিয়ে বিশ্বকাপ হাতে নিয়েছে। বিশ্বকাপের হেড-২-হেড এ ১-১ সমতা।

৭-১ এর ম্যাচে ব্রাজিলের হারের চেয়ে হারের ধরণটা ছিল লজ্জাজনক। এটার কোন প্রতিশোধ হয়না। ব্রাজিলের জন্য ৭-১ টা কলঙ্কের মতো এবং এটা মুছে ফেলার একমাত্র পথ হচ্ছে বিশ্বকাপ জেতা। আজকের প্রীতি ম্যাচ প্রীতি ম্যাচই। এই ম্যাচে একটা খেলোয়াড়কে ব্রাজিলের জার্সিতে অভিষেক করানোর পর গোল দিলেও সে পরদিন আরেক দলের জার্সি গায়ে খেলতে পারবে। এই ম্যাচটা এতোটাই গুরুত্বহীন। ৭-১ এর সঠিক জবাব হচ্ছে বিশ্বকাপ জেতা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।