রং হারানো বিশ্বকাপ

তখন বাংলাদেশ সময় রাত ১২ টা বেজে ৮ মিনিট!

হাজারো মাইল দূরের রাশিয়ায় তখন চলছে ব্রাজিল বনাম বেলজিয়ামের ধ্রুপদী লড়াই। নেইমারের কর্নার থেকে বল সিলভার পায়ে, কিন্তু বিধিবাম! বল জালে ঢোকার বদলে বারে লেগে নিশানা পাল্টায়। ম্যাচে ব্রাজিলের ভাগ্যে প্রথম ধাক্কার শুরু সেখানেই, যার পূর্ন প্রতিফলন ১৩ মিনিটের মাথায়, বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে উল্টো নিজেদের জালেই বল জড়িয়ে ফেলেন ম্যানচেস্টার সিটির ফার্নান্দিনহো। ক্যাসিমারোর বদলে সুযোগ পেয়ে দলকে দিলেন সবচেয়ে বাজে উপহার।

এরপরে একদিকে মার্সেলো বল সামলিয়ে উঠে ত ফলস নাইনে খেলা লুকাকু ঝড়ের গতিতে ব্রাজিলের রক্ষনভাগের সামনে ত্রাস ছড়ায়। ২৬ মিনিটে ডি ব্রুইন ঐ লুকাকুর পাস থেকেই বেলজিয়ামকে সেমিফাইনালের পথে আরেকধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়।

পুরো ম্যাচে বেলজিয়ামের কাউন্টার এট্যাকের সাথে মার্টিনেজের দুর্দান্ত ট্যাকটিসের সাথে ব্রাজিলের যুদ্ধ হয়েছে, বোনাস হিসেবে অতিমানব হয়ে উঠা কোর্তোয়াসের উড়ন্ত পারফর্মেন্স। ৩৭ মিনিটে কোতিনহোর শটে চোখধাধানো সেভ কিংবা ম্যাচের একেবারে শেষ মুহুর্তে নেইমারের ঐ দুরন্ত শট বাজপাখির মতো উড়িয়ে ফিরিয়ে দেওয়া, এই বিশ্বকাপে তৃতীয় গোলকিপার হিসেবে এক ম্যাচে ৯ টা সেভ করেন। কাকতালীয় হলেও এই তিনটা ম্যাচের গোলকিপারেরই তাদের এই সেরাটা দিয়েছে ব্রাজিলের বিপক্ষে, সেলেসাওদের কপাল কেমন পোড়া কে’ই বা জানে?

এবারের বিশ্বকাপ ব্রাজিলের শুরু ইনজুরি নিয়ে, অন্যতম ভরসা হয়ে মাঠ কাপানোর বদলে রাশিয়ায় উড়াল দিতেই পারলেন না দানি আলভেজ। নেইমারের তো ইনজুরির জন্য খেলারই কথা ছিলো না। প্রতি ম্যাচের আগে হয় দানিলো না হয় কস্তা কিংবা মার্সেলো, অন্তত একজন ইনজুরি ছিলোই।

বেলজিয়ামের বিপক্ষে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিলো হয়তো ক্যাসিমারোর না থাকা, কার্ড জনিত কারনে এই ট্যাংকের পজিশন দিয়েই যে বারবার কালো ঘোড়াদের আক্রমনগুলো এসেছে, কে জানে ডি ব্রুইনের ঐ গোলটাও হতো কি না এই মানুষ টা থাকলে। গোটা ম্যাচে ব্রাজিল ভালো খেলেছে, কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখলে সেলেসাওরা যে মিস গুলো করেছে তাতে ভাগ্যের চেয়ে নিজেদেরও দোষও না।

বদলি নেমে অগাস্তো গোল করলেন, সেই তিনিই ফাকা পজিশনে দাড়িয়েও পরের বার দলকে সমতায় ফেরাতে পারলেন না। নেইমারের অ্যাসিস্ট থেকে বল জালে জড়াতে পারলেন না কোতিনহোও! অথচ এবারের বিশ্বকাপের সেলেসাওদের পরের রাউন্ডে উঠার সবচেয়ে বড় কারিগর ছিলেন তিনিই, হিরো থেকে জিরো কি ইহাই?

উপরে বলেছিলাম বেলজিয়াম কোচ মার্টিনেজের ট্যাকটিসের কথা, ৩-৪-৩ ফরমেশন দেখে যে কেউই বলবে ডিফেন্স ত অনেকটাই দুর্বল, কিন্তু আসলেই কি তাই? ব্রাজিলের বিপক্ষে পরের হাফে ৫-৩-২ এ খেললো বেলজিয়াম, গোল তো করেই ফেলেছে এবার না হয় ডিফেন্স সামলানো যাক। জাপানের বিপক্ষেও এভাবে মাঠের মধ্যেই ফরমেশন বদলে হঠাৎ করে কাউন্টার অ্যাট্যাকে জয় তুলে নেয় বেলজিয়াম, আগে গোল দিয়ে পরে ডিফেন্স সামলানো, মার্টিনেজ হয়তো কিংবদন্তি স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের বিখ্যাত উক্তি,  ‘আক্রমণ ম্যাচ জেতায়, রক্ষন জেতায় শিরোপা’ – এই মন্ত্রের বড় ভক্ত।

ব্রাজিলের এই দলটায় বিশ্বকাপ জেতার সব রসদই ছিলো, আক্রমণভাগ থেকে রক্ষণ, সব পজিশনেই পরিক্ষিত রা, কিন্তু সঠিক সময়েই ক্লিক করতে পারে নি অনেকেই। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে দুরন্ত মৌসুম সিজন শেষ করা গ্যাব্রিয়েল জেসাস ত ৫ ম্যাচেই শুরুতে নেমেও একখানা গোল আদায় করতে পারে নি, ক্যাসিমারোর বদলে চান্স পেয়ে ফার্নান্দিনহো ভরসা রক্ষা পারে নি ছিটেফোঁটাও, প্রথমে বিপক্ষে গোল উপহার দিয়েছেন, পরে নিজের পজিশনে নড়বড়ে ছিলেন, বড় ম্যাচে এত ভুলে কি আর শিরোপার স্বাদ পাওয়া যায়?

২০০২ সালে খুব ছোট ছিলাম, ফাইনালের শেষ মুহুর্তগুলোই কেবল মনে আছে, সেলেসাওদের হাতে শিরোপা উল্লাস দেখার সুখস্মৃতি অতটুকুই। এরপরে আমরা কোপা থেকে কনফেডারেশন কাপ জিতেছি, গলায় চড়িয়েছি অলিম্পিকের সোনার মেডেলটাও, কিন্তু আরাধ্যের সোনার হরিন টা আর উঁচু করতে পারে নি। ০৬ এ এক জিদানের কাছেই হেরে গিয়েছিলেন, ১০ বিশ্বকাপে নিজেদের ফিলিপে মেলোর পর স্নাইডারের বিষাক্ত ছুরির আঘাত, আর গতবার কুখ্যাত ৭-১! বড় দলগুলোর বিদায়্ব ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সুযোগ ছিলো এবারের শিরোপা টাই বাগিয়ে নেওয়ার।

আমার কাছে বিশ্বকাপ মানে ব্রাজিল, জোগো বনিতার সেলেসাও। গতকালকের কোয়াটার দেখেও তাই আলাদা করে উল্লাস করতে পারে নি। মড্রিচের জন্য চাই ক্রোয়েশিয়া কাপ নিক ত ইডেন হ্যাজার্ডদের সোনালী প্রজন্মটাই কাপের সবচেয়ে বড় দাবীদার। কিন্তু আলাদা করে আর বিশ্বকাপে টানছে না, ব্রাজিল ছাড়া বিশ্বকাপ নিতে পারছিনা যে!

গতকাল অনেক ব্রাজিলের ফ্যানকে দেখলাম ক্রোয়েশিয়ার জয়ে উল্লাস করতে, ঐদিকে আর্জেন্টিনার ফ্যানরা করেছিলো বেলজিয়ামের জয়ের দিন। আলবেসিলেস্তারা উদযাপন করতেই পারে ব্রাজিলের হার দেখে, আবার অনেকেই করেছে কাল ক্রোয়াট দের জয় দেখে।

কিন্তু আমি আর ভিতর থেকে পারছিনা, মড্রিচ, রাকিটিচ, কিংবা হেজার্ড, কেইন, এম্বাপ্পেদের খেলা স্রেফ উপভোগ করে যাবো। আর খুব করে চাইছি আবারো ক্লাব মৌসুম শুরু হয়ে যাক, আমার দল ছাড়া বিশ্বকাপ রং হারা লাগছে যে!

চারবছর পর জানিনা অদৌ বাচবো কি’না, ১৬ টা বছর ধরে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জেতা দেখার জন্য মুখিয়ে আছি, থাকবো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত! আমার কাছে আন্তর্জাতিক ফুটবলে দল একটাই, জোগো বনিতার ব্রাজিল!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।