বিপিএল: ফেলে আসা দিনের হারিয়ে যাওয়া দল

বিপিএল মানে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ। তবে মজার ছলে অনেকে এটাকে বিতর্কিত প্রিমিয়ার লিগ হিসেবেও অভিহিত করে থাকেন। বিপিএলকে বিতর্কিত প্রিমিয়ার লিগ বলার পেছনে অবশ্য যৌক্তিক কিছু কারণও রয়েছে।

শুরুর আসর থেকেই বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না টুর্নামেন্টটির যা বর্তমানেও অব্যাহত আছে। ম্যাচ গড়াপেটা, খেলোয়াড়দের বকেয়া পরিশোধ না করা সহ নানা বিতর্কের মাঝে পড়ে অদ্যাবধি বলি হতে হয়েছে বেশকয়েকটি দলকে। বর্তমানে মাঠে চলছে বিপিএলের ষষ্ঠ আসর। প্রথম আসরে মোট ছয়টি দল অংশ নিলেও সময়ের সাথে দলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে এখন দাঁড়িয়েছে সাতে। তবে এ সময়টাতেই অর্থাৎ গেল পাঁচ আসরে টুর্নামেন্ট থেকে হারিয়ে গেছে বেশকয়েকটি দল। সেই দলগুলো এবং তাদের হারিয়ে যাওয়ার নেপথ্যের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আজকের আয়োজন

  • ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্স

এখন পর্যন্ত বিপিএলে সবচেয়ে সফল দল বলা চলে ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সকে। প্রথম দুই আসরের দু’টিতেই শিরোপা বাগিয়ে নেয় তারা। টানা দুটি শিরোপা জয় তো দূরে থাক, এ পর্যন্ত বিপিএলে একাধিক শিরোপার স্বাদও পায়নি অন্য কোন দল। অথচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে এ সফল দলটিই এখন বিলুপ্ত।

২০১৩ সালে বিপিএলের দ্বিতীয় আসরে চিটাগং কিংসের বিপক্ষে একটি ম্যাচ গড়াপেটায় জড়িয়ে যান ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিহাব চৌধুরী এবং দলের দুই সদস্য মোহাম্মদ আশরাফুল ও কৌশল লকুয়ারাচ্চি। শাস্তিস্বরূপ ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সকে আজীবন ও শিহাব চৌধুরিকে ক্রিকেট সংক্রান্ত সকল কর্মকাণ্ড থেকে দশ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। অন্যদিকে আইসিসির দুর্নীতি বিরোধী ট্রাইব্যুনাল আশরাফুলকে আট বছর ও লকুয়ারাচ্চিকে আঠারো মাসের জন্য নিষিদ্ধ করে। পরবর্তীতে আপিল করে শাস্তির মাত্রা কমিয়ে পাঁচ বছরে আনেন মোহাম্মদ আশরাফুল।

  • বরিশাল বার্নার্স

বিপিএলের প্রথম আসরের রানার্স-আপ তাঁরা। সেবার টুর্নামেন্টের ফাইনাল অবধি গেলেও লিগ পর্বে ঠিক সেইভাবে নিজেদের মেলে ধরতে পারেনি বরিশাল বার্নার্স। লিগ পর্বে চিটাগং কিংসের বিপক্ষে নিজেদের শেষ ম্যাচ জিতে নেট রান রেটে তাদেরকে পেছনে ফেলে কোনরকমে সেমিফাইনালে ওঠে তারা। সেখানে দুরন্ত রাজশাহীকে আট উইকেটের বড় ব্যবধানে হারিয়ে প্রথম আসরেই ফাইনাল নিশ্চিত করে বরিশাল। আর ফাইনালে ঠিক একই ব্যবধানে ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সের কাছে বিধ্বস্ত হয় দলটি।

পরবর্তী আসরে ১২ ম্যাচে মাত্র পাঁচ জয়ে লিগ পর্ব থেকেই বাদ পড়ে যায় গেল আসরের রানার্স-আপ দলটি। তারপর দুই বছর বিরতি দিয়ে ২০১৫ সালে বিপিএলের তৃতীয় আসর শুরু হলে ফ্র্যাঞ্চাইজিটির সত্ত্বাধিকারী আলিফ গ্রুপ সিলেট ফ্র্যাঞ্চাইজি কিনলে এগিয়ে আসে অ্যক্সিওম টেকনোলজিস। তারা বরিশাল ফ্র্যাঞ্চাইজি কেনার পাশাপাশি দলটির নাম পরিবর্তন করে রাখে বরিশাল বুলস। এভাবে হারিয়ে যায় বিপিএলের প্রথম আসরের রানার্স-আপ দলটি।

  • দুরন্ত রাজশাহী

বিপিএলে নিজেদের নামের মতই দুরন্ত যাত্রা শুরু করে দুরন্ত রাজশাহী। ২০১২ সালে টুর্নামেন্টটির প্রথম আসরের লিগ পর্বে ১০ ম্যাচে সাত জয়ে ১৪ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষে থেকে সেমিফাইনালে ওঠে পদ্মা পারের দলটি। তবে তাদের সে দুরন্ত যাত্রা থমকে যায় সেমিফাইনালে বরিশালের বিপক্ষে ৮ উইকেটে হারার মাধ্যমে।

যদিও প্রথম আসরের পারফরম্যান্সের ধারাটা পরের আসরে পুরোপুরি বয়ে নিতে পারেনি রাজশাহী। সেবার লিগ পর্বে চতুর্থ হয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মত শেষ চারে গেলেও এলিমিনেটরের বাধা টপকাতে ব্যর্থ হয় তারা। ওই আসরেই পাওনা সংক্রান্ত জটিলতায় জড়িয়ে যায় দুরন্ত রাজশাহীর সত্ত্বাধিকারী ডিজিটাল অটো কেয়ার।

বিসিবির পাওনা সময়মত মেটাতে না পারায় বিপিএলের তৃতীয় আসরে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি ধরে রাখতে পারেনি তারা। ওই আসরে রাজশাহী ফ্র্যাঞ্চাইজি অংশ নিতে পারেনি। তবে ২০১৬ বিপিএলে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি নতুন মালিকানা ম্যাঙ্গো এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেডের অধীনে রাজশাহী কিংস নামে আবির্ভূত হয়।

  • চিটাগং কিংস

বিপিএলের দ্বিতীয় আসরের রানার্স-আপ দল অথচ পরের আসরে অংশগ্রহন করারই কিনা সুযোগ পায়নি চিটাগং কিংস। বড় অঙ্কের বকেয়া পরিশোধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় এস কিউ স্পোর্টসের মালিকানাধীন এ দলটি অংশ নিতে পারেনি বিপিএলের তৃতীয় আসরে। বকেয়ার পরিমাণ ছিল ১৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

তারপর ২০১৫ বিপিএলে চিটাগং ফ্র্যাঞ্চাইজিটি কিনে নেয় ডিবিবিএল গ্রুপ। পুরনো নাম ছেটে ফেলে চিটাগং ফ্র্যাঞ্চাইজি আবির্ভূত হয় নতুন নামে, চিটাগং ভাইকিংস হিসেবে। ফলে বিপিএলের ইতিহাস থেকে আরো একটি দল হিসেবে হারিয়ে যায় চিটাগং কিংস।

  • খুলনা রয়্যাল বেঙ্গলস

প্রথম আসরেই সাকিব আল হাসানকে ও দেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে নাসির হোসেনকে সর্বোচ্চ দামে দলে ভিড়িয়ে সাড়া ফেলে দেয় খুলনা রয়্যাল বেঙ্গলস। মাঠের পারফরম্যান্সেও সে সাড়া অব্যাহত থাকে। লিগ পর্বে ১০ ম্যাচে ছয় জয় নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে তারা। তবে শেষ চারে ঢাকার বিপক্ষে হোচট খায় খুলনা।

মাত্র নয় রানে হেরে শিরোপা জেতার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায় তাদের। তবে খুলনা সবচেয়ে বড় হোচটটা খায় ঠিক এর পরের আসরে। একের পর এক বাজে পারফরম্যান্সে টেবিলের তলানিতে থেকে আসর শেষ করে তারা। এমন ফলাফলে পরের আসরে আর ফ্র্যাঞ্চাইজিটি ধরে রাখতে আগ্রহী ছিল না খুলনা কর্তৃপক্ষ ওরিয়ন গ্রুপ।

পরে অন্য কোন মালিকানা না পাওয়ায় বিপিএলের তৃতীয় আসরে অংশ নিতে পারেনি খুলনা। তারপর ২০১৬ বিপিএলে ফ্র্যাঞ্চাইজিটির স্বত্ত্ব কিনে নেয় জেমকন গ্রুপ। তাদের মালিকানায় পুরনো নাম বদলে খুলনা টাইটান্স নামে বিপিএলের চতুর্থ আসর থেকে এখন পর্যন্ত খেলে যাচ্ছে রূপসা পারের দলটি।

  • সিলেট রয়্যালস

বিপিএলে সিলেট রয়্যালসের যাত্রাটা শুরু হয় দুঃস্বপ্নের মত। প্রথম আসরে গ্রুপ পর্বের প্রথম সাত ম্যাচ হেরে সবার আগে টুর্ণামেন্ট থেকে বিদায় নেয় তারা। তবে দ্বিতীয় আসরে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় সিলেট। সেবার গ্রুপপর্বে ১২ ম্যাচের নয়টিতে জিতে টেবিলের দ্বিতীয় অবস্থানে থেকে শেষ চার নিশ্চিত করে তারা। যদিও  প্রথম ও দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্স ও চিটাগং কিংসের বিপক্ষে হেরে আর ফাইনালে যাওয়া হয়নি তাদের।

দ্বিতীয় আসরে দল ভাল করার পরও তৃতীয় আসরে সিলেটের মালিকানা ছেড়ে দেয় ওয়ালটন গ্রুপ। সেবার আলিফ গ্রুপের মালিকানায় সিলেট সুপারস্টার্স নামে বিপিএলে অংশগ্রহণ করে সুরমা পারের দলটি।

  • সিলেট সুপারস্টার্স

বিপিএলের প্রথম দুই আসরে সিলেট রয়্যালস নামে অংশ নেয়া সিলেট ফ্র্যাঞ্চাইজি বিপিএলের তৃতীয় আসরে নতুন মালিকানায় নাম পরিবর্তন করে হয় সিলেট সুপারস্টার্স। দলটির সত্ত্বাধিকার কিনে নেয় আলিফ গ্রুপ। তবে নতুন নামে নতুন মালিকের অধীনে বিপিএলের তৃতীয় আসরটি একদমই ভাল যায়নি সিলেটের। লিগ পর্বে ১০ ম্যাচে মাত্র তিন জয়ে ছয় পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের পঞ্চম স্থানে থেকে আসর শেষ করে তারা।

সেবার একটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল দলটি। আসরে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই প্রতিপক্ষ দলের অধিনায়ক তামিম ইকবালের সাথে সিলেটের মালিক আজিজুল ইসলামের অশোভন আচরণের অভিযোগ ওঠে। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে আজিজুল ইসলামের বিপক্ষে মা-বাবা তুলে বাজে গালিগালাজ করার অভিযোগ তুলেন তামিম।

বিষয়টি আমলে নিয়ে খতিয়ে দেখে বিসিবি। তারপর কোড অব কন্ডাক্ট ভঙ্গ করায় এবং দেনা-পাওনা সংক্রান্ত জটিলতায় পরবর্তী আসরে অংশ নিতে পারেনি সুরমা পারের দলটি। যদিও এক আসর বিরতি দিয়ে বিপিএলের পঞ্চম আসরে নতুন মালিকানায় ফ্র্যাঞ্চাইজিটি পুনরায় ফিরে সিলেট সিক্সার্স নামে।

  • বরিশাল বুলস

দুই বছর বিরতি দিয়ে ২০১৫ সালে বিপিএল পুনরায় শুরু হলে নতুন মালিকানায় চলে যায় বরিশাল ফ্র্যাঞ্চাইজি। সত্ত্বাধিকার পায় অ্যক্সিওম টেকনোলজিস। সেইসাথে বরিশাল বার্নার্স নাম পরিবর্তন করে দেয়া হয় বরিশাল বুলস। আর নতুন নামে খেলতে নেমেই বাজিমাত করে বরিশাল। বিপিএলের তৃতীয় আসরে রানার আপ হয় তারা। ফাইনালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের কাছে তাঁদের হার তিন উইকেটে।

তবে এ আসর ঠিক যতটা ভালো কাটে বুলসের ঠিক ততটাই খারাপ কাটে পরবর্তী আসর। লিগ পর্বে ১২ ম্যাচে চার জয়ে আট পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তলানিতে থেকে বিপিএলের চতুর্থ আসর শেষ করে দলটি। পরে ২০১৭ বিপিএলে মুস্তাফিজকে আইকন হিসেবে দলে ভিড়িয়ে দল গুছিয়ে ফেলেও বিসিবিকে ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে না পারায় শেষ মুহূর্তে আসরে অংশ নিতে পারেনি বরিশাল বুলস। দুঃখজনকভাবে গেল আসরের মত চলতি আসরেও অংশ নিচ্ছে না বরিশাল ফ্র্যাঞ্চাইজি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।