শেষ হইয়াও হইল না শেষ

কাহিনী মূলত নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু’র জীবনকে কেন্দ্র করে। ব্রিটিশ সরকারের হাত থেইকা স্বাধীন হওয়ার জন্য গান্ধী যেইখানে বেছে নিয়েছিলো অহিংসা সেখানে বসু’র বিশ্বাস ছিলো অহিংসা কিংবা ভালো মানুষ হইয়া স্বাধীনতা অর্জন কখনোই সম্ভব না।

তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি ব্রিটিশ সরকারের রাতের ঘুম হারাম করেছিলেন। চোখের নিমিষেই ‘হাওয়া’ হয়ে যেতেন। একবার ব্রিটিশ সরকার ইন্ডিয়ান স্পাই দরবারী লাল তাঁর বাড়িতে পাহাড়া জন্য বসায়। এই স্পাই ২৪ ঘন্টা বোসের সাথে আঠার মত লেগে থাকে।

কিন্তু কিছুতেই কোনো কাজ হয় না। ওই স্পাইয়ের চোখেও ধুলো দিয়ে পালিয়ে যান বসু বাবু। কিন্তু মজার ব্যাপার হল বসু পালিয়ে যাওয়ার ১০ দিন পরে স্পাই বুঝতে পারে যে বসু বাবু ঘরে নেই। যিনি আছেন, তিনি বসু’র ভাগ্নে। ততদিনে আফগানিস্তান পেরিয়ে রাশিয়ার পথে চলে গেছে সুভাস চন্দ্র বসু।

সিরিজের শুরু হয় একটা ক্লাসরুমের দৃশ্য দিয়ে। পরীক্ষা চলাকালেই ভারত বর্ষের রীতি তাবিজ কবজ নিয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করেন ব্রিটিশ শিক্ষক। না কোনো, ভদ্র ভাষায় নয়, তিনি রীতিমত গালমন্দই করেন। মেনে নেননি সেই ক্লাসেই থাকা সুভাষ। হঠাৎ করেই পায়ের জুতো খুলে ওই শিক্ষককে পেটানো শুরু করলেন। বসু গ্রেফতার হলেন। পুলিশ তাঁকে থানায় নিয়ে গেল। তবে, ওই শিক্ষক এতটাই ঘাবড়ে যান যে, তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ বা মামলা করতেই অস্বীকৃতি জানান। এটা মুগ্ধ করার মত এক দৃশ্য। হিটলারের সাথেও দেখা হয় সুভাষের। এই দৃশ্যতেও দর্শকদের আমোদিত হওয়ার কথা।

সিরিজটির সংলাপ ‍খুবই চিত্তাকর্ষক। এক জায়গায় সুভাস বলেন, ‘স্বাধীনতা চেয়ে পাওয়া যায় না, ছিনিয়ে নিতে হয়।’ আর তাঁর বিখ্যাত ডায়লো – ‘তোমরা রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দিবো।’

অভিনয়ের কথা তো বলতেই হয়। রাজ কুমার রাও যে ভারতের পরবর্তী সুপার স্টার, সেটা আর বলে না দিলেও চলে। আর এই সিরিজেও তিনি নিজের নামের প্রতি সুবিচার করেই কাজ করেছেন।

ট্র্যাপড, নিউটন,বেরেলি কি বারফি, শাদি মে জারুর আনা – একটার পর একটা অনবদ্য কাজ দিয়া নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তি। আমার বিশ্বাস. নেতাজীর চরিত্রে তাঁর চেয়ে ভাল কেউ করতে পারতো না। তাঁর ক্যারিয়ারেরই এটা অন্যতম সেরা কাজ। এর বাদে নাভিন কাস্তুরিয়া ও স্ট্যানলি অ্যালেনের চরিত্রে এডওয়ার্ড সোনেনব্লিক নিজেদের সক্ষমতা দেখিয়েছেন।

নায়িকা ফরেনার ছিলেন। কারণ নেতাজি এক অস্ট্রিয়া নারীকে বিয়ে করেছিলেন।  ২৩ বছর বয়সী অ্যানা অ্যাডোর এমিলি শেঙ্কেলের চরিত্রে মন্দ করেননি।

সিরিজটি দেখতে দেখতে এক পর্যায়ে আক্ষেপ হবে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদান রাখাদের নিয়ে বিস্তর সিনেমা হয়েছে, সিরিজ হয়েছে। অথচ, আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কোনো কাজ নেই। এই আক্ষেপটা কবে ঘুঁচবে।

এটা সত্যি যে, মহাত্মা গান্ধীর জন্যই স্বাধীনতা পেয়েছিল ভারত। তবে, এই স্বাধীনতার পিছনে নেতাজির অবদান কোনো অংশে কম না। ব্রিটিশদের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। জওহরলাল নেহেরু নন, বরং নেতাজিই ব্রিটিশদের ভীত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এমন অনবদ্য একটা সৃ্ষ্টির জন্য একতা কাপুরকে ধন্যবাদ।

আসলে কি সুভাষ মারা গিয়েছিলেন? – এই প্রশ্নের জবাব নিয়ে বিতর্কের কোনো শেষ নেই। একতা কাপুর অবশ্য তার ফিকশনে দেখাতে চেয়েছেন ভারত স্বাধীন হওয়ার আগে বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়নি। ১৯৬৬ সালে তাসখন্দে ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর সাথে দেখা যায় তাঁকে। আসলে কবে মৃত্যু হয়, তার সূরাহা একতাও করেননি। রহস্যটা তিনি গড়েছেন, খোলাসা করেননি!

রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের মত এই সিরিজ দেইখাও আপনাদের অনুভূতি হবে – শেষ হইয়াও হইল না শেষ!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।