বোরজাহ ইয়াঙ্কি: বাঙালিকে হাসানোতেই তাঁর আনন্দ!

ওই দিন কি জানি হঠাৎ করে ফেসবুকে একটি ভিডিও চোখে পড়লো। আমার ফ্রেন্ডলিস্টের কেউ ভিডিওটি শেয়ার করেছে।
ভিডিওতে দেখলাম – কালো মতন একটা বিদেশি ছেলে, ২৪-২৫ বছর বয়স হবে বোধ হয়, সম্ভবত আফ্রিকার হবে, ছেলেটি হাসি মুখে বলছে— ‘নোখালী বিভাগ চাই, নোখালী বিভাগ চাই, নোখালী বিভাগ চাই!’

আমি তো অবাক, কি বলছে সে; নোয়াখালী কে সে নোখালী বলছে! সেও নাকি নোয়াখালী বিভাগ চাই। কৌতূহলবশত তার ফেসবুকে পেজে ঢুকলাম, ঢুকেই তো অবাক। তার অনেকগুলো ভিডিও চোখে পড়লো যার অনেকগুলো বাংলায় বলা।

সেখানে তিনি ইদানিং বাংলা কিছু ‘জনপ্রিয়’ সংলাপের মিমিক্রি করে আপলোড করছেন। যেমন- ‘আমার সোনার বাংলা, ‘আমি তোমায় ভালবাসি’ বলে জাতীয় সংগীত গাইছেন, আবার বলছেন ‘আমরা করোনার চাইতেও শক্তিশালী’, বলছেন ‘মদ খাবি, মানুষ হবি’।

আবার কখনও ‘আহো ভাতিজা আহো’ বলে ডায়লগ ঝাড়ছেন, আবার মাহফুজুর রহমানের গানের লাইন রিডিং পড়ছেন ‘ঘুমাতে পারি না সারারাত ধরে, বুকের ভেতরটা হাহাকার করে’ !

বিশ্বাস না হয় আপনি ‘Borzah Yankey’ নামে সার্চ দিয়ে দেখুন, দেখতে পাবেন ভিডিওগুলো! বিরাট আগ্রহ জন্মালো বোরজাহকে নিয়ে, দেখি তার সম্পর্কে কিছু জানতে পারি কিনা!

আফ্রিকান বংশোদ্ভূত এই তরুণের নাম তার বোরজাহ ইয়াঙ্কি। তাঁর বাবা-মা কানাডায় এসেছিলেন ঘানা থেকে, তবে তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা কানাডার উইনিপেগে। বোরজাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টিকটক আর ফেসবুকে সক্রিয়। এই দুটো প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে তার প্রায় সাড়ে আট লাখ ফলোয়ার।

আর এটা করেই বাংলাদেশি ফেসবুক ইউজারদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছেন এই তরুণ। ফেসবুকের নিউজফিড জুড়ে এখন কেবল বোরজাহ ইয়ানকিকেই দেখি। বন্ধুরা তার ভিডিও শেয়ার করছেন, ভীনদেশি একটা লোক তাদের মুখে হাসি ফোটাচ্ছে, আনন্দ দিচ্ছে কয়েকটা সেকেন্ডের জন্য, তাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে চারপাশে।

যতটুকু জানা যায়, তিনি কানাডার কেলভিন হাইস্কুল থেকে ডিপ্লোমা পাশ করে এখন তিনি টরেন্টোর কিংসওয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছেন!

বোরজা বাংলা কোত্থেকে শিখেছে, জানেন? কোন ইউটিউব চ্যানেল দেখে নয়, ডিপ্লোমা কোর্স করার সময় প্রবাসী একজন বাংলাদেশি তাঁর বন্ধু, তার কাছ থেকে বাংলা কথা শুনে শুনে শিখেছেন!

তবে এটা ঠিক, সে বাংলাদেশি প্রতিবেশি মজার ছলে তাকে এসব কথা শিখিয়ে ভিডিও বানাতে উদ্বুদ্ধ করছে, তা নাহলে লিজেন্ডারি এসব সংলাপের খোঁজ বের করাটাও তার একার পক্ষে অসম্ভব।

বোরজাহ সম্ভবত গোমড়া মুখে থাকতেই পারেন না। এই লোকটা সারাক্ষণ হাসিমুখে থাকেন, মনে হয় না বিরক্তি কখনও তার মধ্যে বাসা বাঁধতে পেরেছে। জীবনটাকে বোরজাহ যেভাবে দেখেন, তাতে হতাশা জিনিসটা তাকে আক্রমণ করতে পারবেও না।

তার চোখে জীবনটা মানে আনন্দে থাকা, মানুষজনকে আনন্দ দেয়া, তাইতো তিনি বলেন-ও জীবনটা খুব ছোট, দুঃখ-শোকে কাটানোর কোন মানে নেই।

বোরজাহ ইয়ানকির ফেসবুক পেজের কভার ফটো নিজের ফেসবুক পেজের কভারে বোরজাহ লিখে রেখেছেন, ‘মেক দ্য ওয়ার্ল্ড স্মাইল।’ তিনি সব জায়গায় হাসি ছড়িয়ে দিতে চান, তাইতো বর্তমানে তাকে বলা হয় – ‘মোস্ট হ্যাপিয়েস্ট গাই অন আর্থ!’

সবাইকে হাসি-আনন্দে মাতিয়ে রাখা বোরজাহ স্কুল লেভেলে অসাধারণ অ্যাথলেট ছিলেন, কানাডিয়ান জুনিয়র সামার মিটে জ্যাভেলিন থ্রো- বিভাগে রেকর্ডও করেছিলেন। একসময় পার্ট টাইম জব হিসেবে ন্যানি/বেবিসিটারের কাজ করতেন।

অলিম্পিকে খেলার স্বপ্ন দেখেন তিনি, সপ্তাহে পাঁচদিন প্র‍্যাকটিস করেন। বোরজাহ নিশ্চিত, একদিন তিনি কানাডার পতাকা গায়ে জড়িয়ে অলিম্পিকে নামার সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি আরেকটা স্বপ্ন আছে বোরজাহ’র, ফিল্ম এবং ভিডিও মেকিং নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা তাঁর।

হাসি দিয়ে নাকি বিশ্ব জয় করা যায়। বোরজাহকে দেখে এই কথাটাকে সত্যি মনে হবে যে কারো। এই মুহূর্তে কানাডার অন্যতম সেরা সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার হিসেবে ধরা হচ্ছে তাকে, শুধু হাসি দিয়েই এই অসাধ্য সাধন করেছেন তিনি।

কানাডা, আফ্রিকা, বাংলাদেশ- সব জায়গাতেই তিনি জনপ্রিয়। আমরা নিজেরা হা-হুতাশে ভুগি, ক্লান্তি-অবসাদ-বিষন্নতায় জর্জরিত হয়ে রাতের বেলা বিছানায় ঘুমোতে যায় এই ভেবে যে, সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখবো সব মুশকিল আসান হয়ে যাবে!
আর আমরা ঠোঁটের কোনে এক চিলতে হাসি আনতে পারি না, হাসতে ও পারি না!

নিজেরাই হাসতে পারি না, হাসি ছড়িয়ে দিবো কিভাবে? অথচ আফ্রিকার এক ছেলে নিজের চেহেরা দেখিয়ে ভাঙা ভাঙা বাংলা বলে আমাদের মধ্যে আনন্দ ছড়িয়ে দিচ্ছে। অদ্ভুত ভঙ্গিতে আমাদের কে জানিয়ে দিচ্ছে – ‘জীবনটা খুব ছোট, দুঃখ-কান্নায়-হতাশায় কাটানোর কোন মানে নেই।’

ইটস চিল টাইম, নিরাপদে হাসুন প্রাণ খুলে, ছড়িয়ে দিন সবার মাঝে!

ধন্যবাদ বোরজাহ, বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।