মাঝবয়সী ওয়েফার বিক্রেতার বিরাট অভিনেতা হওয়ার অবিশ্বাস্য গল্প

শৈশবে বোমান ইরানী নাকি বেশ ভীতু প্রকৃতির ছিলেন। তা হওয়ারই কথা। জন্মের আগেই বাবাকে হারিয়েছেন। বড় করার দায়িত্বটা পুরোপুরি মায়ের একার দায়িত্ব ছিল। মা ছোট্ট একটা ওয়েফারের দোকান চালাতেন। বোনরা স্কুলে যেত। বোমানকে উপাসনালয়ে রেখে মা যেতেন দোকানে। সময়টায় বলা যায় একাই কাটাতে হত ছোট্ট বোমানকে।

তার ওপর, বোমানের কথা বলায় সমস্যা ছিল। কথা আটকে যেত।

এই সমস্যাটা বোমান ইরানী জয় করেছিলেন স্রেফ একটা গান গেয়ে। কথা বলার সমস্যার জন্যই গানের চর্চা করতে। একবার মঞ্চে উঠে গান গেয়ে হাজারো মানুষের তালি পেয়েছিলেন। মা ছেলেকে স্বাভাবিক করতে এতটাই মরিয়া ছিলেন যে সেই তালির শব্দ রেকর্ড করে রেখেছিলেন। আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগলেই রেকর্ডটা শুনতেন ইরানী। ফিরে আসতো তার আত্মবিশ্বাস।

  • দোকানদার থেকে অভিনেতা

স্কুলে ইরানী মূলত বিজ্ঞান বিভাগেই পড়তেন। যদিও, তার আগ্রহ বেশি ছিল আর্টস আর থিয়েটারে। পরিবারের আয় বাড়ানোর একটু তাগিদ ছিল। তাই রুম-সার্ভিস অ্যাটেনডেন্টের কাজ করতেন। পরে ফাইভ স্টার হোটেলের ওয়েটার অবধি হয়েছিলেন। মায়ের একটা অ্যাক্সিডেন্ট হওয়ার পর বাধ্য হয়ে পারিবারিক দোকানটা সামলাতে কাজে লেগে যেতে হয় বোমানকে।

১৪ বছর সেই দোকান সামলান বোমান। সেই দোকানেই স্ত্রী জেনোবিয়ার সাথে প্রথম দেখা হয়। তাঁদের বিয়ে হয়। সন্তানের বাবা-মাও বনে যান। বোমানের জীবনের এই অংশটা আর ১০ জন সাদা-মাটা মধ্যবিত্তের মতই।

 

এরপরই তাঁর জীবনের প্রথম টার্নিং পয়েন্ট আসে।

 

পরিচিতরা বোমানের আগ্রহের জায়গাটা জানতেন। তাই, স্ত্রী আর এক ঘণিষ্ট বন্ধু প্রায় জোর করে একটা বিজ্ঞাপনের অডিশন দিতে পাঠিয়েছিলেন। বোমান টিকে যান। আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই ১৮০ টার মত বিজ্ঞাপন করে ফেলেন তিনি।

  • স্বপ্নের মত অভিষেক

বিজ্ঞাপনের জগতে তখন বোমান বেশ ব্যস্ত একজন ‘অভিনেতা’। তখনই একটা শর্ট ফিল্মের জন্য প্রস্তাব পান। প্রযোজক-পরিচালক বিধু বিনোদ চোপড়া সেটা দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়ে গেলেন যে সোজা একটা চেক নিয়ে চলে গেলেন বোমানের সাথে দেখা করতে। চেকটা তাকে দিলেন।

বোমান তো চেক দেখে অবাক – ‘এ কি! এ তো দু’লাখ রুপি!’ বিস্ময় কাটিয়ে বোমান জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, ছবিটা কি?’ বিনোদ তার স্বভাব-সুলভ সাধারণ এক্সপ্রেশন চেহারায় ধরে রেখে জবাব দিলেন, ‘আমি চাই না তুমি এত বেশি ফেমাস হয়ে যাও যে আমাকে আর সময়ই দিতে না পারো!’

 

এটা বোমানের ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টার্নিং পয়েন্ট।

সেই ছবিটা আসে দু’বছরের মধ্যেই। রাজকুমার হিরানীর ‘মুন্না ভাই এমবিবিএস’-এর সাফল্যের পর সবার মুখে মুখে বোমান ইরানীর নামটা পরিচিত হয়ে যায়। ৩৫ বছর বয়সে অভিষেকেই ডাক্তার জে.আস্থানা’র চরিত্রটা বোমানের জন্য একটা দারুণ ও মজবুত ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তা এনে দেয়।

রাম মাধভানি’র ‘লেটস টক’ বা প্রাওয়াল রামানের ‘ডারনা মানা হ্যায়’ ছবিতে ছোট ছোট রোল করেছিলেন এক সময়। সেখান থেকে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বায়োপিকে করেছেন রতন টাটার চরিত্র।

এই প্রায় ২০ বছরের যাত্রাটা ঠিক কতটা অনুপ্রেরণাদায়ক সেটা আসলে লিখে প্রকাশ করা যাবে না। বোমান ইরানীর ক্যারিয়ার থেকে শুধু এটুকু বলা যায় যে – স্বপ্ন দেখার জন্য বয়স কোনো সমস্যাই না! হতে পারে আপনি ৩৫ বছর বয়সী এক ভদ্রলোক যিনি সামান্য একটা ওয়েফারের দোকান চালান, কিন্তু নিজের স্বপ্নের ওপর ভরসা রাখলে একদিন আপনিও হতে পারেন বোমান ইরানী!

– ইনউথ.কম অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।