বলিউডের সত্যিকারের ‘চকোলেট বয়’

আবির্ভাবেই বিস্ময় সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। সেটা ১৯৭৩ সালের কথা। সেদিন মুম্বাই কাঁপিয়েছিল ‘ববি’। মুম্বাই না কেবল, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশই সেদিন মুখরিত উঠেছিল নতুন এক রোম্যান্টিক তারকার পদধ্বনিতে। প্রথম সেই ছবি দিয়েই ফিল্ম ফেয়ারের সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়ে গিয়েছিলেন।

যদিও, পুরস্কার ব্যাপারটা ওই ছোকড়ার জন্য নতুন কিছু নয়। বছর তিন-চারেক আগেই ‘মেরা নাম জোকার’ ছবির জন্য রীতিমত জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বাগিয়ে এসেছেন সেরা শিশু শিল্পীর ক্যাটাগরিতে। ক্যারিয়ারের একেবারে প্রথমদিকেই তাঁর মত আর কেউ এত আলোচিত হন নি।

মুগ্ধ করা চেহারা, দারুণ নাচ আর অভিনয় জানা চটপটে এক তরুণ ছিলেন তিনি। আর সে তিনি হবেন নাই বা কেন, তিনি তো স্বয়ং পৃথ্বীরাজ কাপুরের নাতি। রাজ কাপুরের মেঝ ছেলে তিনি। রণধীর কাপুরের ছোট ভাই। সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মানো বলতে যা বোঝায়, তার আদর্শ উদাহরণ ছিলেন তিনি। তিনি হলেন ঋষি কাপুর। ৭০ কিংবা ৮০’র দশক থেকে চলতি সময়ে কাপুর বংশের অভিনয় নৈপুণ্যের পতাকাবাহী ছিলেন তিনি।

‘ববি’ কেবল সুপারহিট ছবিই ছিল না, ছবিটা পপ কালচার ও সিনেমা নির্মানে যুগান্তকারী কিছু পরিবর্তন এনেছিল। ওই সময় ঋষি আর ডিম্পল কাপাডিয়ার ফ্যাশন অনুকরন করতো তরুণ প্রজন্ম। ছবির নির্মান চলাকালে অভূতপূর্ব এক ঘটনা ঘটে। পরিচালক ছিলেন ঋষির বাবা রাজকাপুর।

তিনি গানের দৃশ্যায়নের ছেলেকে বলেছিলেন, ‘গানের সাথে শুধু ঠোঁট মেলাবে না। জোরে জোরে গান গাইবে।’ ঋষি বিরক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু বাবার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। এজন্যই তো ছবি দেখে মনে হয়েছিল যেন ঋষি আক্ষরিক অর্থেই গানগুলো নিজে গাইছেন।

রোম্যান্টিক হিরোর চরিত্র একচেটিয়ে দাপট দেখিয়েছেন আশির দশকে। শিশুসুলভ চেহারার জন্য পেয়েছেন ‘চকোলেট বয়’-এর তকমা। তার পর থেকে শুরু করে শহীদ কাপুর, ইমরান খান বা ঋষিরই ছেলে রণবীর কাপুররা এই তকমা পেয়েছেন। তবে, বলিউডের প্রথম ও সত্যিকারের চকোলেট বয় ছিলেন ঋষি কাপুর।

ঋষি ও স্ত্রী নীতু

ডিম্পল কাপাডিয়ার সাথে প্রেমে জড়িয়েছে – ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ঋষিকে ঘিরে মিডিয়া পাড়ায় এমন গুজব ছিল। তবে, সেটা স্থায়ী হয়নি। তবে, তার সাথে নীতু সিংয়ের প্রেম নিয়ে চাইলে দিস্তার পর দিস্তা কাগজ খরচ করা যাবে। দু’জনে এক সাথে ১৫ টা ছবি করেন।

‘জ্যাহরিলা ইনসান’, ‘খেল খেল মেয়’, ‘রাফু চাকার’, ‘কাভি কাভি’, ‘দুসরা আদমি’, ‘অমর আকবর অ্যান্থনি’, ‘ঝুটা কাহি কা’, ‘ধান দৌলত’ – পর্দার এত সব রসায়নই বাস্তবে তাঁদের কাছে নিয়ে আসে।

১৯৭৪ সালে এই জুটির প্রথম সিনেমা ‘জ্যাহেরিলা ইনসান’। দু’জনের মধ্যে খুনসুটি ছিল, ভাল বন্ধু ছিলেন তখন, এর বেশি কিছু নয়। এরপর ১৯৭৬ সালের সিনেমা প্রমোদ চক্রবর্তীর ‘বারুদ’-এর শুটিংয়ের জন্য প্যারিস চলে যান ঋষি। সেখানে বসে তিনি নীতুর অভাব বোধ করতে থাকেন।

তখন নাকি নীতুকে একটা টেলিগ্রাম পাঠান। তাতে লেখা ছিল – ‘একটা মেয়েকে খুব মিস করছি!’ কথিত আছে, এই বার্তা পেয়ে নীতু এতটাই উচ্ছ্বসিত ছিলেন যে কাশ্মীরে ‘কাভি কাভি’র শুটিং চলাকালেই সেটা দেখিয়ে ফেলেন সিনেমাটির নির্মাতা পরিচালক যশ চোপড়া ও তাঁর স্ত্রী পাম্মিকে।

সিনেমাপাড়ায় একটা গল্প প্রচলিত আছে। রাত আটটার পর কোনো শিডিউল রাখতেন না ঋষি। একবার সন্ধ্যার পর ‘কালা পাথর’ (১৯৭৯) সিনেমার ‘ধুম মাচে ধুম’ সিনেমার শুটিং চলছিল।

পরিচালক যশ চোপড়া কিংবা অমিতাভ বচ্চন, সবাই খুব তটস্থ ছিলেন যেন কোনো ভাবেই ঋষি-নীতুর ডেট না মিস হয়। প্রেমিককে সামলাতে সেদিন নাকি কস্টিউম না পাল্টেই চলে যান নীতু সিং।

পাঁচ বছর প্রেম করার পার ১৯৭৯ সালে নীতুকে বিয়ের প্রস্তাব দেন ঋষি। ১৯৮০ সালের ২২ জানুয়ারি তাঁদের বিয়ে হয়। এটা ছিল বলিউডের ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত আর জমকালো এক বিয়ে। চেম্বুরের বোম্বে প্রেসিডেন্সি গলফ ক্লাবে তাদের বিয়ে হয়। রিসেপশন হয় আরকে স্টুডিওতে। পুরো ইন্ডাস্ট্রি এসে হাজির হয়ে সেই বিয়ের উৎসবে।

মজার ব্যাপার হল, ১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমা ‘প্রেম রোগ’-এ রাজ কাপুর এই দু’জনের বিয়ের মণ্ডপটাই ব্যবহার করেন।

ঋষি-নীতুর বিয়ে

ঋষির ক্যারিয়ারের আরেকটি বড় ছবি হল ১৯৮৯ সালের ‘চান্দনী’। শ্রীদেবীর সাথে করা এই ছবিটি আকাশচুম্বি সাফল্য পায়। ছবিটি আরো অনেক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই ছবিতেই প্রথমবারের মত সুপার স্টারডম পান শ্রীদেবী। আর টানা কয়েকটা ফ্লপের পর যশ রাজ ফিল্মসও যেন প্রাণ ফিরে পায়।

ঋষি কাপুর ছিলেন স্পষ্টবাদী। মুখে তাঁর কোনো কিছুই আটকাতো না। হোক সেটা টুইটার কিংবা নিজের আত্মজীবনী। নিজেকে ‘গরুর মাংসভোজী হিন্দু’ বলে দাবী করতেন। আত্মজীবনীর নাম দিয়েছিলেন ‘খুল্লাম খুল্লা: ঋষি কাপুর আনসেন্সরড’। সেই বইয়ে পরিবার ও নিজের ক্যারিয়ারের অসংখ্য অন্ধকার অধ্যায়ের অকপট বিবরণ দিয়েছেন তিনি।

‘ববি’র জীবনে বিতর্কও কম আসেনি। ক্যারিয়ারের প্রথম ফিল্মফেয়ার পুরস্কারটা তিনি অর্থের বিনিময়ে কিনেছিলেন – এটা বলিউডের ওপেন সিক্রেট। আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিমের সাথে যে তিনি দেখা করেছিলেন, সেই কথা নিজেই স্বীকার করেছিলেন।

ব্যক্তি জীবনে ছিলেন বেশ রগচটা, এর জের ধরে স্ত্রী নীতু সিংয়ের সাথে তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েনের খবরও ছাপা হয়েছে বিস্তর। তবে, এটা ঠিক যে একটা ব্যাপার নিয়ে কখনোই তাঁর জীবনে প্রশ্ন ওঠেনি। সেটা হল পর্দায় তাঁর অভিনয়। তরুণ কিংবা বৃদ্ধ – যখন যে বয়সেই তিনি অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন, নিজের শতভাগ দিয়েছেন ঋষি কাপুর।

পুরস্কার আর অভিনয়ের বিবেচনায় তিনি বরং বুড়ো বয়সেই বেশি সফল। ২০১০ সালে তিনি ‘দো দুনি চার’ দিয়ে ফিল্ম ফেয়ারে সমালোচকদের দৃষ্টিতে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পান। ২০১৬ সালে ‘কাপুর অ্যান্ড সন্স’-এর জন্য পান সেরা সহ-অভিনেতার পুরস্কার।

২০১২ সালে ‘অগ্নিপথ’-এ ‘রউফ লালা’ নামে এক নৃশংস ভিলেনের চরিত্র করেন। একই সময়ে করেন ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’-এর রসিক অধ্যক্ষ ‘ইয়োগিন্দর ব্যাশিষ্ট’-এর চরিত্র। যখন যেটা করেছেন সামর্থ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহারটাই করেছেন। ক্যারিয়ারের শেষ ভাগে এসে ‘১০২ নট আউট’, ‘মুলক’ কিংবা ‘রাজমা চাওল’-এর মত ভিন্নধর্মী ছবিতেও তিনি ছিলেন প্রশংসিত। যত পুরনো হয়েছেন, ততই যেন নিজের আবেদন বাড়িয়েছেন বলিউডের প্রথম চকোলেট বয়।

২০১৮ সালে তার অস্থি মজ্জায় ক্যান্সার ধরা পড়ে। নিউ ইয়র্কে এক বছর ধরে তার চিকিৎসা চলে। ২০১৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ফিরে আসেন ভারতে। এরপর থেকে আর জনসম্মুখে আসেননি বললেই চলে। তবে, সরব ছিলেন টুইটারে। তবে, ২০২০ সালের দুই এপ্রিলের পর সেটাও বন্ধ।

২৯ এপ্রিল শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন মুম্বাইয়ের স্যার এইচ.এন রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন হাসপাতালে। ঠিক পরদিনই খবর আসে, তিনি চলে গেছেন জীবন নদীর ওপারে। বলিউডের বর্ণাঢ্য এক অধ্যায়ের ইতি হল।

ঋষির ছেলে রণবীরই এখন বলিউডের অন্যতম সেরা নায়কদের একজন। ঠিক যেন, বাবার ঐতিহ্যটাই ধরে রেখেছিলেন তিনি। যদিও, একটা সময় বাবার সাথে একদমই বনিবনা হত না তাঁর। ছোট বেলায় একবার বাড়িতে পুজার মণ্ডপে জুতো পায়ে যাওয়ায় ঋষি চড় দিয়ে বসেছিলেন রণবীরকে। তাই, একটা সময় পারতপক্ষে বাবা-ছেলের মধ্যে কথাই হত না। সেতুটা ধরে রেখেছিলেন মা নীতু।

তবে, জীবনের শেষ বেলায় ছেলের সাথে দূরত্বটা কমিয়ে এনেছিলেন। হয়তো ‘চিন্টু জি’ বুঝতে পেরেছিলেন, এবার তাঁর যাবার সময় হল!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।