রুপালি পর্দায় মাঠের সংগ্রাম

ভারতে খেলাধুলা আর রুপালি জগত পাশাপাশি হাঁটে। স্পোর্টস পার্সোনালিটিরা দেশটিতে যেমন সমর্থকদের কাছেপরম শ্রদ্ধার পাত্র, তেমনি অফফর্মে থাকলে সেই সমর্থকরাই তাঁদের ছেড়ে কথা বলে না। সাম্প্রতিক সময়ে তাই মাঠের সংগ্রাম ও গল্প নিয়ে বেশ কয়েকটি সিনেমা নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে আমাদের চোখে সেরা পাঁচটি সিনেমা নিয়েই এই আয়োজন।

  • চাক দে ইন্ডিয়া (২০০৭)

কোচ কবির খানের চরিত্রের জন্য পরিচালক শিমিত আমিনের প্রথম পছন্দ ছিল সালমান খান। কিন্তু সালমান সহ আরো অনেকেই না করে দেয়ায় চিন্তায় পরেন তিনি। তখন আদিত্য চোপড়া শাহরুখের নাম বললে তিনি তার সাথে একমত হতে পারেননি।  নিজের কষ্ট, নিজের আবেগ প্রকাশ না করা কবিরের সাথে শাহরুখকে মানানো যায় না। তারপরও শাহরুখের সাথে কয়েক দফা বৈঠক করে তাকেই নির্বাচন করা হয়।

বাকিটা ইতিহাস। ব্যাক্তিগত ভাবে শাহরুখের সেরা অভিনয় মনে হয় এটা। কমনওয়েলথ স্বর্নজয়ী ভারতীয় নারী হকি দলের কোচ মীর রঞ্জন নেগি থেকে অনুপ্রানিত হয়ে এই স্ক্রিপ্ট লিখেন জয়দ্বীপ সাহানি। পাকিস্তানের সাথে ম্যাচ হারার দায় নিয়ে দেশবাসীর কাছে বিশ্বাসঘাতক বনে যান কবির খান। বাড়ি থেকে নিজের মা-কে নিয়ে বের হয়ে যেতে হয়।

তারপর আপনি অবহেলিত নারী দলের কোচ হয়ে সাফল্য এনে দেয়া সব মিলিয়ে টান টান উত্তেজনায় ভরপুর হকি নিয়ে বানানো মুভিটি। শাহরুখের পাশাপাশি সাগরিকা ঘাটকে,শিল্পা শুক্লা,চিত্রসি রাওয়াতরা ও ছিলেন দূর্দান্ত। আর সেলিম সুলেমানের টাইটেল ট্র্যাকটি এখন অনেকটা ভারতীয় স্পোর্টস এনথেমের মত। এই সিনেমা পপুলার ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ সিনেমার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে।

  • লগন (২০০১)

লগন শুধু একটি সিনেমাই নয়, এটা এখন ইতিহাসের অংশ। আশুতোষ গোয়ারিকরের প্রথম পছন্দ ছিলেন অভিষেক বচ্চন, তিনি রাজি না হওয়ায় বন্ধু আমির খানের কাছে যান আশু। আমির শুধু অভিনয়ই রাজি হননি। সহ-প্রযোজকও হয়ে যান। ব্রিটিশ আর্মি ও ভারতীয় গ্রামবাসীদের মধ্যকার প্রথম ক্রিকেট যুদ্ধের কাহিনী অনুপম ভাবে তুলে ধরা হয়।

নায়িকা চরিত্রে প্রীতি জিনতা, রানী মুখার্জী, সোনালী বেন্দ্রে, নন্দিতা দাসসহ অনেক কে ভাবা হলেও নতুন মুখ নেয়ার কথা বলেন আমির। চলে আসেন গ্রেসি সিং। ভূজ নামের অজপাড়াগায়ে শুটিং হয় মুভির। যে জায়গাটি আবার শুটিং চলাকালীন ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সব মিলিয়ে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা মুভি হয়েই থাকবে। মাদার ইন্ডিয়া ও সালাম বোম্বের পর তৃতীয় সিনেমা হিসাবে অস্কারে বিদেশি ভাষার সিনেমার তালিকায় স্থান পায়।

  • ম্যারিকম (২০১৪)

ভারতে সাম্প্রতিক কালে জাতীয় গর্বকে তুলে ধরার জন্য বায়োপিক ও ইতিহাস নির্ভর সিনেমা নির্মানের যে হিড়িক পরেছে সেই তালিকায় প্রথম দিককার সিনেমা এটি। এর সবচেয়ে বড় শক্তি প্রিয়াংকা চোপড়া। অসামান্য অনবদ্য পারফরমেন্স করেছেন এই সিনেমায়। ম্যারি কম-এর চরিত্রের জন্য ৪৫ দিনের বিশেষ ট্রেইনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।

বিশেষ ডায়েট চার্ট ফলো করেছেন। মেক আপ আর্টিস্ট ও ব্যাপক পরিশ্রম করেছেন অনিন্দ্যসুন্দর প্রিয়াংকাকে পাহাড়ি পোড় খাওয়া ম্যারিকম বানাতে। এমনকি রোদে পোড়া মেছতার দাগটাও বাদ ছিল না। প্রিয়াংকাও যেন ম্যারিকম এর সংগ্রাম, কষ্ট, দারিদ্রতা আর প্রতিকূলতার সাথে লড়ার হিংস্রতা সবই নিজের মধ্যে ধারন করেছেন।

তিন সন্তানের মা হয়েও দমে যাননি ম্যারি কম। ৩৫ বছর বয়সেও জিতেছেন কমনওয়েলথ গোল্ড। সব মিলিয়ে এই যুগেও যখন নারীরা নানা ভাবে অপদস্থ বা নির্যাতিত সেই সময় ম্যারি কম যেন সেই পৃথিবীতে এক পশলা বৃষ্টির মত। সব মিলিয়ে মনে রাখার মত, জীবনযুদ্ধের অনুপ্রেরনা হিসাবে নেয়ার মত সিনেমা। প্রযোজনা করেছেন সঞ্জয় লীলা বনসালি ও ভায়াকম ১৮। ব্ল্যাক, সাওয়ারিয়ার প্রোডাকশন ডিজাইনার হিসাবে কাজ করা ওমাং কুমার নিজের প্রথম সিনেমাতেই দেখিয়েছেন নিজস্বতার ছাপ।

১৮ কোটি বাজেটের মুভিটি বিশ্বজুড়ে ১০০ কোটির বেশি আয় করেছে। ২০১৪ জাতীয় পুরস্কারে পপুলার ক্যাটাগরিতে সেরা সিনেমা নির্মাচিত হয়েছে। প্রিয়াংকা সেরা অভিনেত্রীর স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন।

  • অ্যাহসাস (২০০১)

ইনজুরির কারণে বাবার ক্যারিয়ার থেমে যায়। তাই বাবা ছেলেকে বেস্ট বানাতে চায়। অনেক পরিশ্রম করান। নিজের সব শখ,সব আনন্দ বিসর্জন দিয়ে ছেলের পিছনে লেগে থাকেন। কিন্তু বাবার অতি শাসনের কারণে ছেলে হাপিয়ে ওঠে। ছেলের মনে বাবার জন্য তৈরি হয় তীব্র ঘৃনা।

ছেলের গুরুত্বপূর্ণ রেসের আগে ঘটে এক দুর্ঘটনা। তারপর কি ঘটে – সেটা নিয়েই এই সিনেমা। সুনীল শেঠি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয় করেছেন এখানে। সব মিলিয়ে কোনো সত্য গল্প অবলম্বনে না হলেও, বা খুব হাইপ তোলা কোনো মুভি না হলেও মহেশ মাঞ্জরেকারের এই সিনেমাটিতে দারুণ ভাবে খেলার বিষয়টি এসেছে।

  • এম এস ধোনি: দ্য আনটোল্ড স্টোরি (২০১৬)

নীরাজ পান্ডের পরিচালনায় ভারতের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনির জীবনী দারুণ ভাবে সেলুলয়েডের পর্দায় তুলে এনেছেন। ক্রিকেটার হিসেবে পুরোটা না আসলেও, খুব ডিটেইলিংয়ের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে ব্যক্তিগত তাঁর জীবন। সেই সাথে ভিএফএক্সের মাধ্যমে সুশান্তের মুখ ছোট থেকেই ব্যবহার করা, সুশান্তের ক্রিকেট কোচিং নিয়ে পেশাদার ভাবেই পর্দায় নিজেকে উপস্থাপন করা সব মিলিয়ে বলিউডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা সিনেমা হয়ে থাকবে।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।