সময়ের বাঁধা না মানা বলিউড ছবি

‘বলিউড’ পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মুভি ইন্ডাস্ট্রি। যেখানে প্রতি শুক্রবার পর্দার বিভিন্ন গল্পসমূহ একমাত্র দর্শকদের বিনোদনের উদ্দেশ্যে তৈরি এবং উপস্থাপন হয়। সিনেমা একটা শিল্পবাণিজ্য, দিনশেষে প্রযোজকদের লগ্নিকৃত টাকাটা যেন কামাই হয় সেই দায়িত্ব মাথায় রেখেই তৈরি হয় মুভি। যেই দায়িত্বের খাতিরে অমিতাভ বচ্চন, অনুপম খেরদের মত অভিনেতাদেরো কোমর দুলাতে হয় নায়িকার সাথে এবং সেটার ক্লোজ শটও নেয়া হয়।

সেই টিপিকাল মুভির সিনেমাহল থেকে আপনি বিনোদিত হয়ে বের হবেন, বড়জোর কিছু স্মৃতি নিয়েই বের হবেন এটাই কাম্য। তখনকার মুভিগুলোকে মোটা দাগে দুই ভাগে ভাগ করা যেত, প্রথমত তারকা অভিনেতা-অভিনেত্রী, নাচ-গানে ঠাসা ব্যবসায়িক সিনেমা, যেগুলো কেবল ব্যবসা করার জন্যই তৈরী। আর কিছু হতো আর্ট-ফিল্ম, যেগুলো অ্যাওয়ার্ড কুড়াবার জন্য বানানো হত, সিনেমা হলে কখনো মুক্তিই পেতো না।

জীবন বদলানোর চিন্তা জাগ্রতকারী গল্প বা চলতি বাণিজ্যিক মুভির ফ্রেম থেকে বের হয়ে ভিন্নতা নিয়ে আসাটা তখন কদাচিৎ ঘটতো। এই হার্ডকোর বাণিজ্যিক ছবির চৌকাঠ পেরিয়ে কিছু সিনেমা পর্দায় এসেছিল আকাশে উড়ার স্বপ্ন দেখে। মাঝে মাঝে তা মেঘের কবলেও পড়েছিল আবার কিছু ডানা দিয়ে ঝাপ্টা মেরে দাগ ও লাগিয়ে এসেছিল আকাশে।পরিচিত হই এমন কিছু গল্পের যা তখনকার সময়কে পেরিয়ে তৈরি হয়েছিল।

  • নো স্মোকিং (২০০৭)

পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ। গ্যাঙস্টার, গালাগালি আর অস্বাস্থ্যকর সব দৃশ্যের জন্য ভারতীয় সিনেমাবোর্ডের সাথে তার প্রায় প্রতিটা ছব মুক্তির আগেই দ্বন্দ্ব হয়। এই ছবিটি তাঁর ক্যারিয়ারের তৃতীয় পরিচালিত মুভি। একটু ব্যতিক্রমধর্মী পরিচালনায় তিনি বেশি অভ্যস্ত এবং এই ব্যতিক্রম-ধর্মীতা তিনি এই ছবিতেও দেখিয়েছেন। স্টোরি লেখার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই তিনি। বেশ গোছালো ভাবে তিনি এই সিনেমার গল্প দাড় করিয়েছেন।

মুভিটা আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করলেও ভারতীয় দর্শক আর সিনেমা বোদ্ধাদের তখন মন কাড়েনি। সিনেমার কাহিনী আবর্তিত হয় ‘কে’ (জন আব্রাহাম) নামে ‘মোর দ্যান আ চেইন স্মোকার’কে নিয়ে, ‘কে’ ব্যক্তি জীবনে মোটামুটি সুখি একজন মানুষ, স্ত্রীকে (আয়শা টাকিয়া) নিয়ে ভালো মত-ই কাটছিলো তাদের দাম্পত্য জীবন কিন্তু অতিরিক্ত ধুমপানের নেশা-ই তাঁর কাল হয়ে দাঁড়ায়।

তাঁর স্ত্রী সিদ্ধান্ত নেয় যদি সে স্মোকিং না ছাড়ে তাহলে সে তাকে ছেড়ে চলে যাবে। তাই আর কোনো কিনারা করতে না পেরে ‘কে’ সিদ্ধান্ত নেয় স্মোকিং ছেড়ে দিবে, এর আগে তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাকে একটি ঠিকানা দেয় এবং বলে যে এই ঠিকানায় যে ব্যক্তি ‘জাস্ট ভিজিট’ করেছে সে আর কোনোদিন কোনো রকম বাজে নেশা করেনি। এরপর ‘কে’ তার বন্ধুর দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী সেই জায়গায় যায়। যাওয়ার পর থেকে-ই ঘটতে থাকে একের পর এক বিপত্তি।

জনের চরিত্রে প্রথমে শাহরুখ খানকে নেয়ার কথা ছিলো কিন্তু ব্যক্তিগত কিছু কারণে শাহরুখ খান চরিত্রটি ফিরিয়ে দেন, অবশেষে জন আব্রাহাম কাজটি করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। ফলাফল স্বরূপ, ব্যাপক দক্ষতার সহিত তার চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলেন। জন আব্রাহাম তার চরিত্রকে ভালো ভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য প্রতিদিন নব্বই-টির মত সিগারেট পান করতেন, ফলে তাঁর ফুসফুসে সমস্যা দেখা দেয়।

 

  • জানে ভি দো ইয়ারো (১৯৮৩)

কুন্দন শাহ’র প্রথম হিন্দি ছবি এটা। হিন্দি সিনেমা জগতের অন্যতম সেরা স্যাটায়ার কমেডি ছবি। ১৯৮৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবি তখন ব্যবসা সফল ও হয়েছিল।

কমেডি আর স্যাটায়ারের এরকম মিশ্রন হিন্দি সিনেমায় আগে হয়ত ঘটেনি। দুই বন্ধুর গল্প। তাঁদের ইচ্ছা একটা ছবি তোলার স্টুডিও করা। করলো। তারপরেই তারা মুখোমুখি হলো খুন, দুর্নীতি, রাজনৈতিক শঠতা আর বাস্তবতার সঙ্গে। কি নেই এটার মধ্যে?রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি, পত্রিকার দুর্নীতি, ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি আর ভাল মানুষের সাজা – সব কিছুই আছে। এর চেয়ে ভাল কমেডি হিন্দি সিনেমায় হয়েছে আমার জানা নাই।

‘আন্দাজ আপনা আপনা’ যদি নব্বই দশকের কাল্ট হয়ে থাকে তবে ‘জানে ভি দো ইয়ারো’ ৮০ দশকের সুপার কাল্ট। অভিনয়ে ছিলেন নাসিরুদ্দিন শাহ, ওম পুরি, সতীশ কৌশিক, পঙ্কজ কাপুর, নিনা গুপ্তা’র মত ক্লাসিক অভিনয় শিল্পীরা। মুভিটা তখনকার সময় থেকে স্ক্রিপ্টভিত্তিক অনেক এগিয়ে ছিল। ছবিটাকে ২০১২ সালে নির্দিষ্ট কিছু হলে পুনরায় মুক্তি দেয়া হয়েছিল।

  • মেরা নাম জোকার (১৯৭০)

১৯ শতকে হিন্দি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বলা গেলে কয়েকটি বংশ বা পরিবার দ্বারা পরিচালিত হত।তার মধ্যে অন্যতম উল্লেখ্যযোগ্য ছিল কাপুর বংশ। ভারতীয় থিয়েটার এবং হিন্দি সিনেমা শিল্পের অগ্রদূত ছিলেন এই বংশের প্রথম উত্তরাধিকারী পৃথ্বীরাজ কাপুর। তাঁর ছেলে রাজ কাপুর ১৯৭০ সালে তৈরি করেছিলেন মেরা নাম জোকার। ছয় বছর ধরে (১৯৬৪ সাল থেকে) মেরা নাম জোকারের প্রযোজনা চলছিলো, শুটিং শুরু হয় ১৯৬৭ সালে এবং শেষ হয় ৬৯-এ।

ছবিটি ৪ ঘন্টা ১৫ মিনিট (৪ ঘন্টা ৪ মিনিট) সময় নিয়ে ইতিহাসের চতুর্থ দীর্ঘতম ছবি। ছবিটি তখন ১৬ কোটি (বর্তমান ৮৪৬ কোটি) বাজেট নিয়ে নির্মিত হয়েছিল। গল্পটা একজন পেশাদার জোকারের যার জীবনে তিন জন নারী আসে, তাঁদের সাথে প্রেম হয়, বুড়ো বয়সে তাদের তিনজনকে তার সার্কাসে আমন্ত্রণ জানায় এবং তারা প্রোগ্রাম দেখতে আসে।

চলচ্চিত্রটিতে যৌনতার উন্মেষ ঘটেছে, বিকিনি এবং অন্তর্বাসের দৃশ্য আছে, আছে নগ্নতাও, অভিনেত্রী সিমি গারেওয়ালকে দিয়ে রাজ কাপুর একটি নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় করিয়েছিলেন। ছবিটি তখন ব্যবসাসফল না হলেও পরে কাল্ট হয়ে দাঁড়ায় বলিউড ইতিহাসে। এমন বৃহৎ প্রোডাকশনে মুভি তৈরি হিন্দি সিনেমার ইতিহাসে বিরল।

  • লাভ সেক্স অওর ধোকা (২০১০)

২০১০ সালে নির্মিত হয় দিবাকর ব্যানার্জীর এই ইরোটিক ড্রামা ছবিটি। আধুনিক চলচিত্রকে আরো আধুনিকতার দিকে নিয়ে যায় এই সিনেমা। হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরায় তোলা ছবি নতুন কিছু নয় । ভারতীয় দর্শকরা আগে দেখেছেন ‘মনসুন ওয়েডিং’-এর মত ছবি।

‘লাভ সেক্স অওর ধোকা-তে তাঁর সাথে আরো যুক্ত হয়েছে ননলিনিয়ার গল্প বলার পদ্ধতি। যা আমরা আগে দেখেছি পাল্প ফিকশন বা মেমেন্টোর মত ছবিতে। ভারতে প্রতিমূহুর্তে বেড়ে চলা এমএমএস স্ক্যান্ডাল এবং ওয়েবক্যাম এবং হ্যান্ডিক্যামে তোলা ব্যক্তিগত পর্ণ ছবির চাহিদা উর্ধ্বমুখী। সাধারণ এন্টারটেনমেন্টে আর মানুষের চাহিদা মিটছে না।

তারই পটভূমিকায় নির্মিত এই ছবি। কাস্টিং কাউচ এবং স্টিং অপারেশনও এ মুভির গল্পের একটা অংশ। সংবাদমাধ্যমও যে কিভাবে এই ক্লিপিংসগুলোকে কিভাবে নিজেদের লাভের জন্য তৈরি করে এবং ব্যবহার করে তাও দেখানো হয়েছে। এই মুভিটিতে তিনটি আলাদা গল্প দেখানো হয় যা পরে এসে মিলে যায়। সিনেমাটি ব্যবসায়িক সফলতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় পুরস্কার অর্জন করে।

  • দিল সে… (১৯৯৮ )

১৯৯৮ সালে তামিল নির্মাতা মণি রত্নম বলিউডে নির্মান করেন ‘দিল সে’। কাস্টিং ছিল অসাধারণ। শাহরুখ খান আর মনীষা কৈরালা ছিলেন, সাথে অভিষেক হয় প্রীতি জিনতার।

সিনেমাটি নির্মিত হয়েছিল বিদ্রোহী এবং ভারতীয় নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর মধ্যে সংঘাতপূর্ণ একটি অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে। দেশপ্রেম ছিল শুধুই একটা প্রেক্ষাপট, সত্যিকারের প্রেমের ছবি এটি। একটা অচেনা মেয়ের ধোঁকা আর ছলনার চূড়ান্ততা সত্ত্বেও অন্ধের মত লেগে থাকা, শুধু কিছু প্রশ্নের জবাব, আর – চাকরি, বিয়ে, দেশ সব কিছু ছেড়ে শুধু তাকেই চাওয়া প্রাণপণ।

বিয়োগাত্মক ক্লাইম্যাক্স দেখে দর্শক তখনো অভ্যস্ত হয়নি। যার কারনে বক্স অফিস ফ্লপ হলো সিনেমাটি। শাহরুখ তখনো কিংখান নয়। এই ছবির দুই মাস পর আসে ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ যা দিয়ে কিং খানের হিট মেশিন চালু হয়।

সঙ্গীত পরিচালনায় ‘দিল সে’-তে ছিলেন এ আর রহমান। সেজন্যই তো এখানে ‘ছাইয়া ছাইয়া, জিয়া জালে কিংবা দিল সে-র মত কালজয়ী সব গানের মিলনমেলা ঘটেছিল।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।