বলিউড-আন্ডারওয়ার্ল্ড, মিথ্যার বসতি ও ফায়দা লোটার ইতিবৃত্ত

বলিউড আর আন্ডারওয়ার্ল্ডের সম্পর্ক অনেক পুরোনো কিন্তু, সবসময়ই কানামাছি খেলার মত। সবাই জানে, ডনরা আছেন, কিন্তু সবসময়ই মুখে তালা। অনেকটা অবৈধ সম্পর্কের মত। ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক ডনের সাথে হিরোইনের প্রেমে জড়িয়ে পরা বা অমুক ডন আমার বন্ধু সেটা বুঝিয়ে অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা কিংবা প্রভাব খাটিয়ে আকর্ষণীয় কোনো মুভিতে জায়গা করে নেয়া – সবই চলে আসছে বছরের পর।

আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনদের বরাবরই আকর্ষণের জায়গা ছিল বলিউড। বলিউড তারকাদের জীবনযাপন বরাবরই তাদের টানতো। সাধারন মানুষের মত তারাও তাদের স্বপ্নের তারকা হিসাবেই দেখে। অনেক ক্ষেত্রে সেই সুযোগ বলিউডের অনেকে নিয়েছে।

সুনীল দত্তর সাথে হাজি মাস্তান

বলিউডের সাথে গ্যাংস্টারের সম্পর্কের কথা বললে মনে হয় শুরুর দিকেই আসবে প্রেমের কথা। বলিউড হিরোইন রা বরাবরই অস্ত্র, বারুদ বা রক্তের হোলি খেলা মানুষ গুলার ভিতরের নরম দিকটা জাগিয়ে তুলেছে। সেটা সেই ৬০-এর দশকের হাজি মাস্তান আর সোনার প্রেম দিয়েই বোধহয় শুরু।

সেই সময়ে বোম্বে মানে আজকের মুম্বাইয়ের অনেক মানুষের কাছে মাসিহা হাজি মাস্তান এর হৃদয় পুড়েছিল সোনার জন্য। যে কাহিনী অনেক বছর পর মিলান লুথারিয়া তুলে এনেছিলেন ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন মুম্বাই’ ছবিতে। অজয় দেবগন আর কঙ্গনা রনৌত ছিলেন চরিত্র দুটিতে।

দাউদের চরিত্রে ইমরান হাশমি (ওয়ান্স আপন অ্যা টাইম ইন মুম্বাই)

এরপর বিভিন্ন সময়ে মমতা-বিক্রম গোস্বামি, মন্দাকিনী-দাউদ ইব্রাহিম বা মনিকা বেদি-আবু সালেম এর কাহিনী ৮০ বা ৯০-এর দশকে ট্যাবলয়েড এ ঝড় তুলতো। বলিউডের অনেক তারকাই বিশেষত যারা বলিউড ফ্যামিলি থেকে আসা এক ধরনের কৌতুহল থেকেই গ্যাংস্টার দের সাথে জড়িয়ে পরেন।

যেমন সঞ্জয় দত্ত মুম্বাইয়ের বড় একজন ডনের কাছ থেকেই অস্ত্র নিয়েছিলেন। গুলশান কুমার হত্যার সময় শাহরুখ খানের নামও এসেছিল গ্যাংস্টার দের সাথে যোগাযোগ থাকার। যদিও কখনো প্রমান হয়নি। যদিও, শাহরুখ একবার বলেছিলেন একবার ছোটা শাকিল নাকি ফোন করে ‘বিশেষ’ একটা ছবিতে জোর করে অভিনয় করানোর জন্য চেষ্টা করেছিলেন। আবার ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ ছবি মুক্তির পর তিনি নাকি আবু সালেমের কাছ থেকে ফোন পেয়েছিলেন। না, অভিনন্দন জানাতে হয়, মৃত্যুর হুমকি দিতে।

সঙ্গীত পরিচালক জুটি নাদিম-শ্রাবনের সাথে গুলশান কুমার (মাঝে)।

নাম এসেছিল সুপার হিট মিউজিক ডিরেক্টর ডুয়ো নাদিম শ্রাবনের নাদিমের। তারপরই নাদিম বিদেশ চলে যাওয়ায় এই জুটি ভেঙে যায়। এমনকি সালমান খানের সাথেও বেশ কয়েকবার আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনদের সাক্ষাৎ হয়েছিল। বিশেষ করে দাউদ ইব্রাহিমের সাথে তাঁর ছবিটা ইন্টারনেটের জগতে খুঁজলে আজো পাওয়া যায়।

আরব আমিরাতের শারজাহ স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়ে অনিল কাপুর আর দাউদের মিটিংয়ের খবর ও বেশ আলোচনায় ছিল। সাম্প্রতিক কালে শুরু হয়েছে গ্যাংস্টার দের বায়োপিক বানানো। হাজি মাস্তান আর দাউদকে নিয়ে ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম মুম্বাই’, মানিয়া সুরভেকে নিয়ে ‘শুট আউট অ্যাট ওয়াদালা’ বা দাউদের বোন হাসিনা পারকারকে নিয়ে ‘হাসিনা’।

সামনে আসছে আরেকটি সত্য ঘটনা নিয়ে ‘মুম্বাই সাগা’। আর এই মুভি গুলোতে অনেক ক্ষেত্রেই গ্যাংস্টারদের গ্লোরিফাই করা হয়। তাতে ধরে নেয়া যায় এই মুভিগুলা প্রোডাকশন এর সাথে তারা জড়িত থাকতেও পারেন। আর গ্যাংস্টার দের কালো ‘টাকা সাদা করার’ বহুল চর্চিত খাত হল বলিউড।

সবসময়ই মনে হয় দাউদ ইব্রাহিম বলিউডের অন্যতম আকাঙ্ক্ষিত সাবজেক্ট। ডি কোম্পানি, ডি, কফি উইথ ডি অনেক মুভিই তাঁকে নিয়ে হয়েছে। এর বাদে অনেকগুলো ছবিতেও অল্প সময়ের জন্য তার চরিত্রের উপস্থিতি দেখা যায়। এই ধরনের মুভিতে সাধারণত তাঁদের মানবিক দিক গুলো বা কি কারণে তাঁরা এ পথে – তাই তুলে ধরা হয়। ধারনা করা হয় ওই গ্যাংস্টার বা তার পরিবারের লোকেরাই এই মুভি গুলার প্রোডাকশনে জড়িত। এই ছবিগুলোর মধ্যে অপরাধ জগতের এই হোতাদের চরিত্রগুলোকে গ্লোরিফাই করার অহেতুক ও অযৌক্তিক প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়।

অভিনেত্রী মন্দাকিনির সাথে দাউদ ইব্রাহিম, ডি কোম্পানির প্রধান

আবার ডনদের নাম ভাঙিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা থাকে। যেমন সুভাস ঘাইয়ের সিনেমা ‘ত্রিমুর্তি’-তে অনিল কাপুরের রোলে প্রথম পছন্দ ছিলেন সঞ্জয় দত্ত। তিনি সে সময় জেলে যাবার পর ওই রোলটি নেবার জন্য খ্যাতনামা আদিত্য পাঞ্চোলি এক ডনের পরিচয় দিয়ে ফোন করে বসেন। এক পর্যায়ে ব্যাপারটা প্রকাশ্যেও চলে আসে। এই ঘটনা থেকেই বোঝাই যায়, ওই সময় ডনদের সময় বলিউডও ভয়ে কাঁপতো। ব্যক্তি জীবনেও অসাধু পাঞ্চোলি সেই ভয়টাকেই ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন।

তবে এখন বলিউডের প্রোডাকশনে কর্পোরেটদের যেমন প্রভাব তেমনি আন্ডারওয়ার্ল্ড ও সরাসরি না কর্পোরেট এর মাধ্যমে চলে। এভাবেই যুগে যুগে বলিউড আন্ডারওয়ার্ল্ড হাতে হাতে বা লুকোচুরির সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। ভবিষ্যতেও চলবে।

ডি কোম্পানির মূল হোতারা।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।