বলিউড ও আন্ডারওয়ার্ল্ড: একটি গভীর প্রেমের গল্প

বলিউডের রঙিন দুনিয়া উপরে যতটা চকচকে আর উজ্জ্বল, ভিতরে ঠিক ততটাই অন্ধকার। মুম্বাইয়ের এই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বেশ ভালো একটা যোগসাজশ আছে। বলা যায়, বলিউড ইন্ডাষ্ট্রিজপরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় মাফিয়া ডনদের দ্বারাই। একের পর এক অপরাধ-ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছেন অনেক নামি-দামি তারকাও।

এই যোগসূত্রটা কিন্তু আজকের নয়। সেই সত্তরের দশক থেকেই বলিউডে অপরাধজগতের বাদশাদের আনাগোনা। তবে মাফিয়াদের সবচেয়ে বেশি তাণ্ডব ছিলো নব্বইয়ের দশকজুড়ে। ওই সময় নাকি কোনো নায়িকা বলিউডে প্রবেশ করতে চাইলে মাফিয়া ডনদের অনুমতি লাগতো, কিংবা তাদের কথা মেনে চলতে হতো, তা না হলে মৃত্যুর হুমকি আসত! ২০০০ সালের পর বলিউডে মাফিয়া আতঙ্ক কিছুটা কমে যায়। তবে, সম্প্রতি তা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেছে।

তাছাড়া, চিত্রজগতে নিজের নিরাপত্তা ও আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে অনেক শীর্ষ অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও নাকি নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডনদের সাথে। কিংবদন্তি দীলিপ কুমার-অমিতাব বচ্চন থেকে শুরু করে অনিল কাপুর, সঞ্জয় দত্ত কিংবা হালের সালমান খানের সঙ্গেও নাকি মাফিয়া ডনদের বেশ অন্তরঙ্গতা আছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু তা সত্বেও অনেক পরিচালক-প্রযোজক মাফিয়াদের কাছ থেকে নানা ধরণের হুমকি পেয়ে থাকেন। কয়েকটি ঘটনা জানা যাক।

সঞ্জয় দত্ত

মাফিয়াদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে বলে যাদের দিকে অভিযোগের তীর দাঁড় করানো হয়, তার মধ্যে সঞ্জয় দত্তের নামটাই সবার আগে আসে। আসলে মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে সঞ্জয়ের কিছুটা সখ্যতা ছিলো আগে থেকেই। ১৯৯৩ সালে মুম্বাইয়ের রক্তাক্ত সিরিজ বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে দাউদ ইব্রাহিমের নাম জড়িয়ে গেলে বিপাকে পড়ে যান সঞ্জয় দত্ত। ওই সময় তার কাছে একটি নাইনএমএম পিস্তল ও একে-৪৭ রাইফেল পাওয়া যায়।

ফলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়; তিনি ওই সময় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করেছিলেন দাউদ ইব্রাহিমের ভাই আনিস ইব্রাহিমের কাছ থেকে, এবং হামলাতেও জড়িত ছিলেন। এরপর তার বিরুদ্ধে টাডা (টেররিস্ট অ্যান্ড ডিজরাপ্টিভ অ্যাক্টিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট) আইনে মামলা দায়ের করে মুম্বাই পুলিশ। পরবর্তীতে, তার সংরক্ষিত অস্ত্র দাঙ্গায় ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রামাণিত না হলেও লাইসেন্স ছাড়া অস্ত্র রাখার দায়ে তাকে ৫ বছরের কারাদন্ড ভোগ করতে হয়। এমনকি সঞ্জয় দত্তের বাবা ও নামী অভিনেতা-রাজনৈতিক সুনীল দত্তর সাথে হাজি মাস্তানের ছবিও পাওয়া যায়।

সালমান খান

মাফিয়া ডনদের সাথে উঠবসের অভিযোগ থাকলেও সালমান খান ২০০২ সালে নিজের ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেন। ওই সময় তিনি পুলিশকে জানান, আন্ডারওয়ার্ল্ড থেকে তিনিও নাকি হুমকি পাচ্ছেন।

অনিল কাপুর

অনিল কাপুরের বিরুদ্ধেও মাফিয়া ডনদের সাথে যোগাযোগের অভিযোগ আছে। তাকে ভারতের একটি স্টেডিয়ামে মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিমের পাশে বসে থাকতে দেখা গেছে।

অর্জুন রামপাল

বর্ষীয়ান অভিনেতা অর্জুন রামপালও আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাইরে নন। শোনা যায়, তার সঙ্গে বেশ সখ্যতা রয়েছে মাফিয়া ডন অরুণ গাওলির। ২০০৮ সালে এক ব্যবসায়ীকে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় অরুন গাওলিকে। আর অর্জুন রামপাল নাকি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই ডনের সঙ্গে টানা একঘন্টার মতো নির্ভৃতে কথা বলেছেন।

গুলশান কুমার

সঙ্গীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান টি-সিরিজের কর্ণধার গুলশান কুমারের কাছে ১৯৯৭ সালে ১০ কোটি রুপি চাঁদা দাবী করেছিলো মাফিয়া ডন আবু সালেম। চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে নৃশংসভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে মাফিয়াদের হাতে।

 

শাহরুখ খান

আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন ছোটা শাকিলের সাথে শাহরুখের যোগাযোগ ছিল। যদিও, তিনি দাবী করেন সেটা তাকে নিয়ে একটা সিনেমা বানানোর কাজেই। এমনকি আন্ডারওয়ার্ল্ডের হুমকি থেকে বাদ যাননি বলিউড বাদশা শাহরুখ খানও। ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ ছবিটি মুক্তির কিছুদিন আগে প্রযোজক আলি মোরানির বাড়িতে সন্ত্রাসী হামলা হয়। ওই সময় ঘটনাস্থলে একটি কাগজ পাওয়া গেছে, যেখানে লেখা ছিল- ‘শাহরুখ খান হবেন আমাদের পরের নিশানা।’

এছাড়াও অভিনেতা অক্ষয় কুমার, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ খ্যাত বোমান ইরানি, প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী সোনু নিগম, প্রযোজক মহেশ ভাট, করণ জোহর, ফারাহ খান, মধুর ভান্ডারকার, রাম গোপাল ভার্মা এবং সাজিদ নাদিয়াদওয়ালা-সহ আরও অনেকেই মাফিয়া ডনদের কাছ থেকে প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন।

———-

চিত্রজগতে বিনিয়োগ করতে গিয়ে বলিউডের অনেক নায়িকার প্রেমেই হাবুডুবু খেয়েছেন খোদ দাউদ ইব্রাহিম থেকে আবু সালেম সহ অনেক আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনরা। এসব ডনদেরকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করে অনেক সুন্দরী নিজেদেরকে নিয়ে গেছেন শীর্ষ অবস্থানে। তেমনই কয়েকজন নায়িকা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

হাজি মাস্তান ও সোনা

আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনদের মধ্যে সম্ভবত হাজি মাস্তানই সর্বপ্রথম বলিউডে অর্থলগ্নি করেন। যাই হোক, হাজি মাস্তান ছিলেন বিখ্যাত নায়িকা মধুবালার বড় ভক্ত। আশির দশকের বি গ্রেড সিনেমার নায়িকা সোনা ওরফে হিনা কাউসারের মুখের আদলের অসম্ভব মিল ছিলো মধুবালার সঙ্গে। চেহারার এই মিলের কারণেই সোনার প্রেমে পড়েন মাস্তান। ১৯৮৪ সালে সোনাকে বিয়ের করেন তিনি, এবং সোনার জন্য কয়েকটি সিনেমা প্রযোজনাও করেন। ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন মুম্বাই’ ছবিতে ফুটে উঠেছে হাজি মাস্তানের জীবন-কাহিনী।

দাউদ ইব্রাহিম ও মন্দাকিনী

দাউদ ইব্রাহিমকে নিয়ে নতুন করে কিছু না বললেও হবে। শুধু মুম্বাইয়ের অপরাধজগত নয়, বরং আন্তর্জাতিক মাফিয়া জগতেও তার ব্যাপক পরিচিতি। শাহরুখ খানের ‘ডন’ সিনেমার সেই বিখ্যাত ডায়ালগ ‘ডনকো পাকাড় না মুশকিল হি নেহি, না মুমকিন হ্যায়’ যেনো পুরোপুরি দাউদ ইব্রাহিমের জন্যই প্রযোজ্য। প্রভাবশালী মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস প্রকাশিত ২০১১ সালের বিশ্বের ভয়াবহ ১০ অপরাধীর তালিকায় তার নাম ছিলো তৃতীয় স্থানে। ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসীদের তালিকায়ও তার নাম শুরুর দিকে। গুঞ্জন রয়েছে, ‘রাম তেরি গঙ্গা মাইলি’ খ্যাত নব্বই দশকের পর্দা কাঁপানো অভিনেত্রী মন্দাকিনীর সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিলো। দুবাইয়ে তারা বিয়ে করেন, এবং তাদের একটি পুত্র সন্তানও রয়েছে। তবে মন্দাকিনী বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

দাউদ ইব্রাহিম ও আনিতা

নব্বই দশকের শুরুর দিকে বলিউড অঙ্গনে পা রেখেছিলেন পাকিস্তানি মডেল ও অভিনেত্রী অানিতা আইয়ুব। দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে নজরকাড়া এই উঠতি মডেলেরও নাকি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। শোনা যায়, ১৯৯৫ সালে পরিচালক জাভেদ সিদ্দিকি তার পরবর্তী সিনেমায় অানিতাকে নায়িকা হিসেবে নিতে অস্বীকৃতি জানান, এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে দাউদ তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। ওই বছরই জাভেদকে গুলি অবস্থায় মৃত পাওয়া যায়।

আবু সালেম ও মনিকা

অভিনেত্রী মনিকা বেদি ও মুম্বাই হামলার অন্যতম প্রধান হোতা আবু সালেমের প্রেমে কোনো লুকোচুরি ছিলো না। সালেম চাইতেন মনিকা যেন বলিউডের শীর্ষ নায়িকার আসন দখল করে। এ জন্য তিনিসুভাষ ঘাই, রাজিভ রায়ের মতো বাঘা বাঘা পরিচালকদেরও হুমকি দিতে দ্বিধাবোধ করেননি। এরপর, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর ২০০২ সালে পর্তুগালের লিসবন শহরে পাসপোর্ট জালিয়াতির অভিযোগে দুজনই গ্রেপ্তার হন। দুই বছর কারাভোগের পর তাদেরকে ভারতে ফেরত পাঠানো হয়। পরবর্তীতে এই যুগলের বিচ্ছেদ হয়ে যায়।

বিক্রম গোস্বামী ও মমতা কুলকার্নি

‘করণ-অর্জুন’ সহ একাধিক হিন্দি ছবিতে অভিনয় করে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন অভিনেত্রী মমতা কুলকার্নি। সিনেমা ছেড়ে কিছুদিন পর দাউদ ইব্রাহিমের সহযোগী বিক্রম গোস্বামীর সঙ্গে মন দেয়া-নেয়ার পাঠ চুকিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তিনি। জানা গেছে, বিয়ের পর ১০ বছর ধরে দক্ষিণ আফ্রিকা ও দুবাইয়ে তারা অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সম্প্রতি, মাদক পাচারের অভিযোগে স্বামী-সহ কেনিয়ায় গ্রেফতার হন নব্বইয়ের এই অভিনেত্রী।

স্কুপহুপ.কম ও টপকাউন্ট.কম অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।