ব্ল্যাক ডায়মন্ড বিপাশা বসু

১.

গ্ল্যামার জগতে কাজ করার কথা ছিল না তাঁর। গায়ের রঙ কিছুটা কালো হওয়ায় শৈশবে অনেকের কাছে কদাকার বলেই বিবেচিত হতো সে। একই সাথে পড়াশোনায় ভালো থাকায় সেখানেই ক্যারিয়ার গড়ার ইচ্ছেটা ছিল। লক্ষ্য ছিল পড়াশোনা শেষ করে ডাক্তার হবার। দিল্লীর একটা বাঙালি পরিবারে জন্ম নেওয়া পরিবারের মেয়ের এমন ভাবাটা অমূলক ছিল না।

কিন্তু বিধাতা কপালে যা লিখে রাখে সেটা খন্ডানোর সাধ্য কার? কলকাতার এক হোটেলে সাবেক সুপার মডেল মেহের জেসিয়ার সাথে দেখা হবার পরেই তার গতিপথ পাল্টে যায়। জেসিয়া তাকে একটা সুপার মডেল প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণের পরামর্শ দেয়। ১৯৯৬ সালে ফোর্ড আয়োজিত ‘গডরেজ সিনথোল সুপারমডেল কনটেস্ট’ এ সে বিজয়ী হয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়।

ফলশ্রুতিতে নিউইয়র্কে একটা মডেলিং প্রতিযোগীতায় ভারতের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায় ছোট বেলা থেকেই তার আচার আচরণের জন্য সবার কাছে টমবয় হিসেবে পরিচিত বিপাশা বসু নামের এই বাঙালি মেয়ে।

২.

সুপার মডেল প্রতিযোগীতায় ভাল পারফর্মেন্সের দরুন বিচারকদের নজর কাড়েন বিপাশা। বিনোদ খান্না যিনি কিনা প্রতিযোগীতার একজন বিচারক ছিলেন, তার ছেলে অক্ষয় খান্নার বিপরীতে ‘হিমালয় পুত্র’ চলচ্চিত্রের জন্য বিপাশাকে নেওয়ার চিন্তা করেন। কিন্তু বিপাশা নিজেই প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যান করেন কারণ চলচ্চিত্র করার জন্য তিনি আরো কিছুটা সময় নিতে চাচ্ছিলেন।

তবে, বাড়ি ফেরার পর জয়া বচ্চন তাকে জে.পি.দত্তর চলচ্চিত্র ‘আখেরি মুঘল’-এ অভিষেক বচ্চনের বিপরীতে অভিনয় করতে রাজি করান। যদিও, পরবর্তীতে চলচ্চিত্রটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তিনি রিফিউজি চলচ্চিত্রে সুনীল শেঠির বিপরীতে অভিনয় করার সুযোগ পেলে সেটাও প্রত্যাখ্যান করেন।

এরই মাঝে টেলিভিশনের কিছু বিজ্ঞাপনে তিনি মডেল হিসেবে কাজ করে পরিচিত পান। তবে ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে ব্রেকটা পান ১৯৯৮ সালে সনু নিগামের ‘কিসমত’ অ্যালবামের ‘তু’ গানের মিউজিক ভিডিও মডেলে পারফর্ম করে। ডিশ এন্টেনার আগ্রাসনের সময়ে মিউজিক ভিডিওটা তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং বিপাশা বসুও সাধারণ মানুষের দৃষ্টি কাড়েন।

খুব দ্রুতই তিনি বলিউডেও সুযোগ পেয়ে যান। ২০০১ সালে আব্বাস মাস্তানের আজনবী চলচ্চিত্রে তার অভিষেক হয়। যদিও তার চরিত্রটি ছিল নেগেটিভ কিন্তু এরপরেও তার অভিনয় ব্যাপক প্রশংসিত হয়। এই সিনেমার জন্য তিনি ‘ফিল্মফেয়ার নবাগতা অভিনেত্রী’র পুরস্কার পান। এছাড়া সমালোচকরাও তার অভিনয়ের প্রশংসা করেন। শুরু হয় বলিউডে তার পথচলা।

৩.

২০০২ সালে বিপাশা বসু একক নায়িকা চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। বিক্রম ভাটের থ্রিলার সিনেমা ‘রাজ’ সেই বছরের অন্যতম সফল ছিল। এই সিনেমার জন্য বিপাশা বসু ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পান এবং বলিউডে নিজের একটা অবস্থান গড়ে নেন। সেই বছরেও আরো কয়েকটা সিনেমা মুক্তি পেলেও সেগুলো বক্স অফিসে খুব বেশী সাড়া জাগাতে পারেনি।

পরের বছর পুজা ভাটের ‘জিসম’ সিনেমার মাধ্যমে আবার আলোচনায় আসেন বিপাশা। এই সিনেমায় তিনি একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন যেখানে তিনি তার স্বামীকে খুন করার পরিকল্পনা করেন। সিনেমাটির জন্য তিনি ‘ফিল্মফেয়ার ভিলেন অ্যাওয়ার্ড’ এর জন্য মনোনীত হন।

জিসম সিনেমার পরপরই তিনি বলিউডে নিয়মিত হতে থাকেন। ২০০৪ সালে তার ৪ টি সিনেমা মুক্তি পায়। বিক্রম ভাটের ‘অ্যায়তবার’ সিনেমাতে তিনি অমিতাভ বচ্চনের মেয়ের ভুমিকায় অভিনয় করেন। সিনেমাটা সমালোচকদের দৃষ্টি কাড়তে ব্যর্থ হয়। পরপরই ‘রামায়ান’ এর অবলম্বনে নির্মিত মনি শংকরের ‘রুদ্রাক্ষ’ বক্স অফিসে খুব বাজে ভাবে ব্যর্থ হয়। পরের সিনেমা ‘রক্ত’ এ বিপাশার চরিত্রটি অবশ্য প্রশংসিত হয়। বছরের শেষ ভাগে ‘মাদহোশি’ তেও অভিনেত্রী হিসেবে উতরে যায়।

৪.

বিপাশা ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় হিট সিনেমার দেখা পান ২০০৫ সালে ‘নো এন্ট্রি’ সিনেমার মাধ্যমে। সিনেমাটা সেই বছরের সবচেয়ে ব্যবসা সফল সিনেমার তালিকায় নাম লেখায় এবং বিপাশা সেই বছরের ‘ফিল্মফেয়ার সহ অভিনেত্রী পুরস্কার’ এর জন্য মনোনয়ন পান। ২০০৬ সালে তার ৪ টি সিনেমা মুক্তি পায় এবং প্রতিটাতেই তিনি সাফল্যের দেখা পান।

কমেডি মুভি ‘ফির হেরাফেরি’ সেই বছরের অন্যতম হিট। এরপর মধুর ভান্ডারকারের ‘কর্পোরেট’ সিনেমাতে কর্পোরেট কালচারে একজন নারীর ভুমিকা খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলেন। বিশাল ভারাদওয়াজের ‘ওমকারা’ সিনেমাতে একটা আইটেম গানে অংশ নেন যা কিনা ভারত এবং ভারতের বাইরেও প্রশংসিত হয়। বছরের শেষ ভাগে ‘ধুম ২’ সিনেমাতে তিনি একজন পুলিশ অফিসারের ভুমিকায় অভিনয় করেন।

২০০৮ সালে আব্বাস মাস্তানের ‘রেস’ সিনেমা তার ক্যারিয়ারের আরেকটা সুপার হিট সিনেমা। একই বছরে ‘বাচনা অ্যাই হাসিনো’ সিনেমায় তিনি একজন সুপার মডেলের চরিত্রে অভিনয় করেন এবং এই পারফর্মেন্সের জন্য তিনি দ্বিতীয় বারের মতো ‘ফিল্মফেয়ার সহ অভিনেত্রী পুরস্কার’ এর মনোনয়ন পান।

বিপাশার ক্যারিয়ারের আরেকটা উল্লেখযোগ্য সিনেমা হচ্ছে ‘রাজ থ্রি’। সিনেমাটা ব্লকবাস্টার হিটের তকমা অর্জন করে।

৫.

কেবল হিন্দি সিনেমাতেই নয়, অন্যান্য ভাষার সিনেমাতেও বিপাশা অভিনয় করেছেন। ২০০২ সালে তেলেগু সিনেমা ‘টাক্কারি ডংগা’, ২০০৫ সালে তামিল সিনেমা ‘শচীন’, ২০০৫ সালে বাংলা সিনেমা ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’ এবং ২০১৩ সালে ইংরেজী সিনেমা ‘দি লাভার্স’ এও অভিনয় করেন। ‘পিংক প্যান্থার টু’ নামের আরেকটা সিনেমাতে অভিনয়ের জন্যেও তিনি প্রস্তাব পান। কিন্তু তিনি প্রস্তাবটা ফিরিয়ে দেন যা কিনা পরবর্তীতে গ্রহণ করেন ঐশ্বরিয়া রাই।

এছাড়া ২০১৫-১৬ সালে টেলিভিশনের জন্য নির্মিত ‘ডর সবকো লাগতা হ্যায়’ এর উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেন।

এগুলো ছাড়াও স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে বিপাশা কিছু কাজ করেছেন। ২০১০ সালে তার ফিটনেস বিষয়ক প্রথম ডিভিডি ‘লাভ ইউর সেলফ’ মুক্তি পায়। ডিভিডিটাতে ওজন কমানোর জন্য ৬০ দিনের একটা রুটিন দেওয়া হয়েছে। ২০১১ সালে মুক্তি পায় তার দ্বিতীয় ডিভিডি ‘ব্রেক ফ্রি’ এবং ২০১৪ সালে মুক্তি পায় তৃতীয় ডিভিডি ‘আনলিশ’।

৬.

ক্যারিয়ারের শুরুতে সম্পর্কে জড়ান দিনো মারিওর সাথে। এই সম্পর্ক চলে ৬ বছর। এরপর সম্পর্কে ধীরে ধীরে ভাটা আসে। পরবর্তীতে ‘জিসম’ সিনেমায় অভিনয় করতে গিয়ে জন আব্রাহামের সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠে। এই জুটি কয়েকটি সিনেমাতেও এক সাথে অভিনয় করেন। দীর্ঘ ৮ বছর পর এই জুটিও ভেঙ্গে যায়।

অবশেষে ২০১৬ সালে সহ অভিনেতা করণ সিং গ্রোভারের সাথে তার বিয়ে হয়। এই অনুষ্ঠানে সালমান খান, শাহরুখ খান, দিনো মারিও, বচ্চন পরিবার, সঞ্জয় দত্ত, রানবির কাপুর, প্রীতি জিনতা, সুস্মিতা সেনদের মতো সেলিব্রেটিরা উপস্থিত ছিলেন।

৭.

টাইমস অফ ইন্ডিয়ার আয়োজিত বছরের কাংখিত নারীর তালিকায় ২০১১ সালে তার অবস্থান ছিল ৮ম, ২০১২ সালে ১৩ তম এবং ২০১৩ সালে ৭ম। ইউ. কে ম্যাগাজিন ‘ইস্টার্ন আই’ ২০০৫ এবং ২০০৭ সালে বিপাশা বসুকে ‘এশিয়ার সেরা যৌন আবেদনময়ী নারী’ নির্বাচন করেন।

তবে সবচেয়ে মর্যাদা সম্পন্ন পুরস্কারটা পান সম্ভবত কলকাতা থেকেই। ২০১৩ সালে ১৯তম চলচিত্র উৎসবের শেষ দিনে পশ্চিম বাংলার পাচজন অভিনেত্রীকে ‘পঞ্চকন্যা’ উপাধি দিয়ে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। রানী মুখার্জি, সুস্মিতা সেন, কোয়েল মল্লিক এবং মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় এর সাথে আরেকজন ছিলেন বিপাশা বসু।

বাবা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার এবং মা গৃহবধু হওয়া সত্বেও মিডিয়াতে এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা কিছুটা ঝুকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল। তবে এখন পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তে বিপাশা বসু সফল সেটা বলাই যায়।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।