দেশটার নাম উত্তর কোরিয়া বলেই এসব সম্ভব!

বাইরের বিশ্বের কাছে উত্তর কোরিয়া একটা ভুতুড়ে জায়গা, কখনো মিথিকাল কোনো দেশ। দেশটির ব্যাপারে জানা যায় খুব কম, তাই অনেকরকম কানাঘুষা আছে একনায়কতান্ত্রিক দেশটির ব্যাপারে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এর কোনোটা সত্যও বটে।

এই যেমন দেশটিতে কিছু ভুতুড়ে নিষেধাজ্ঞা চালু আছে। চলুন বিস্তারিত জেনে আসা যাক।

  • নীল জিন্স

ফ্যাশনেবল একজন তরুণের নীল রঙা জিন্স বা ডেনিম জিন্স থাকবে  – তা কী হয় নাকি। হয়, তবে সেটা শুধু উত্তর কোরিয়ায়। টুরিস্ট হলে অবশ্য কেউ তাতে আপত্তি করবে না। তবে, কিম ইল সাং ও কিম জং ইলের সমাধিতে যেতে চাইলে ডেনিম জিন্স পাল্টেই যেতে হবে।

  • ডব্লিউডব্লিউডব্লিউ-এর বাইরে

উত্তর কোরিয়ায় কম্পিউটার বা ইন্টারনেট – সবই আছে। তবে, এই ইন্টারনেট ঠিক আমাদের মত নয়। ওদেরটার নাম ‘কওয়াংমওং’। সেখানে এক হাজার থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার ওয়েবসাইট আছে। তবে, সেটা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (ডব্লিউডব্লিউডব্লিউ) এর অন্তর্গত না। মানে, আন্তর্জাতিক সব ওয়েবসাইট বন্ধ। কেবল উচ্চপদস্থরাই সেখানে যেতে পারে।

রেড স্টার নামের লোকাল অপারেটিং সিস্টেম আছে। তাদের নতুন ভার্সন হল MacOS X, সংস্থাটি জানিয়েছেন এই নতুন ভার্সন আনা সম্ভব হয়েছে কিম জং উনের অ্যাপল ব্র্যান্ডের প্রতি আসক্তির কারণে।

তবে, ওখানকার মোবাইল ডিভাইসগুলোতে ইন্টারনেট মানে, কওয়াংমওং সুবিধা নেই। এমনকি ওয়াই-ফাইও নেই। যেসব চাইনিজ ট্যাব উত্তর কোরিয়ায় রপ্তানি হয় সেখানে ওয়াই-ফাই ও ব্লুটুথ মোডিউলই নেই; সেখানে ও জিনিস থাকলেও কোনো কাজে আসে না।

  • বিদেশিরা স্থানীয় মূদ্রা ব্যবহার করতে পারেননা

উত্তর কোরিয়ায় বিদেশিরা স্থানীয় মূদ্রা ব্যবহার করতে পারে না। কেনাকাটার ক্ষেত্রে তাই তাদের ইউরো, ইয়ান, দক্ষিণ কোরিয়ার ওউন কিংবা মার্কিন ডলার ব্যবহার করতে হয। এমনকি সব দোকানে বিদেশিদের প্রবেশাধিকারও নেই।

  • কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তির অস্তিত্ব নেই

উত্তর কোরিয়ায় কেউ কোনো বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট কিনতে পারে না। সব কিছুর মালিক সরকার। সরকার সবাইকে নিজেদের বাড়িতে থাকতে দেয়। কেউ চাইলেই হঠাৎ করে শহর ছেড়ে গ্রামে চলেও যেতে পারে না। তবে, হ্যা কালোবাজারিদের কাছ থেকে চাইলে ফ্ল্যাট কেন যায়। খরচ আসে ৭০ থেকে ৯০ হাজার মার্কিন ডলার। যদিও, শরণার্থীদের দাবী দক্ষিণ কোরিয়ানদের এক মাসে মাথাপিছু আয় মোটে চার মার্কিন ডলার।

  • গাড়ী কেনা অসম্ভব

দেশটিতে গাড়ী কেনা প্রায় অসম্ভব। কারণ গাড়ীর দাম আকাশচুম্বি। খরচ আসে আনুমানিক ৪০ হাজার মার্কিন ডলার। এমনকি সামান্য একটা বাইসাইকেলের দামও নেহায়েৎ কম নয়। শহরের বাইরে তাই সাইকেল খুব একটা দেখা যায় না। মজার ব্যাপার হল, সাইকেলেও আছে নাম্বার প্লেট।

  • সংবাদপত্রের সংকট

ওখানে কয়েকবছর আগের খবরের কাগজও লাইব্রেরির আর্কাইভে খুঁজে পাওয়া যায় না। সব কিছুই আসলে নিয়ন্ত্রণ করে দেশটির ওয়ার্কার’স পার্টি। তবে, বিদেশি পত্রপত্রিকা-ম্যাগাজিন আর্কাইভে পাওয়া যায়। ওখানে অবশ্য কেউ স্থানীয় খবরের কাগজ কিনে পড়ে না। কারণ, সাবওয়ে, রাস্তা কিংবা স্টেশনে বিলবোর্ডের মত বোর্ডে সংবাদপত্র এঁটে দেওয়া থাকে। প্রয়োজন পড়লে লোকে ওখান থেকেই খবর জেনে নেয়।

  • ধর্ম বলতে নেই কিছু

উত্তর কোরিয়া শতভাগ বেসামরিক একটি দেশ। অন্তত আইন দিয়ে ধর্মের ওপর কোনো বিধিনিষেধ জারি নেই। কেউ অবশ্য ধর্মীয় পুস্তিকা কিনতে পারেন না। তবে, ওখানে সরকারের নিজস্ব একটা ধর্ম আছে – জিউচে! এটা ক্রিশ্চিয়ানিটির সাথে পাল্লা দিয়ে এগোচ্ছে। বুদ্ধিজম আছে, তবে সেটা অনেকটা ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মত করে টিকে থাকা আর কি!

  • বিদেশে ফোন কল করা যায় না

মোবাইল ফোন উত্তর কোরিয়ায় ‘দুর্লভ’ কিছু নয়। তবে, স্থানীয়রা চাইলেই নিজেদের মোবাইল থেকে বিদেশে ফোন করতে পারেন না। বিদেশিরাও পারে না উত্তর কোরিয়ায় ফোন করতে। স্থানীয় সিম কার্ডগুলো শুধু দেশের মধ্যে ফোন করারই সুবিধা দেয়।

  • গরম পানির গোসল নিষিদ্ধ

দেশটিতে নিজের বাসায়ও চাইলেই কেউ গরম পানিতে গোসল করতে পারবেন না। বাসায় গরম পানি তো দূরের কথা, কোনো পানিরই সরবরাহ নেই। ঘর গরম করারও কোনো বৈদ্যতিক উপায় নেই। এমনকি রাজধানী পিয়ং ইয়াংয়েও কাজ জড়ো করো উত্তাপ পোহাতে হয় তাদের। মূলত বিদ্যুতের সমস্যা থেকেই এই ব্যবস্থা। গোসলের জন্য তাদের গণ গোসলখানায় যেতে হয়।

  • কোকাকোলাহীন জীবন

২০১৫ সালের আগে দু’টি দেশে কোকাকোলা নিষিদ্ধ ছিল। দেশ দু’টি হল কিউবা ও উত্তর কোরিয়া। তবে, কিউবার দুয়ার কোকাকোলার জন্য খুলে গেলেও উত্তর কোরিয়ার দুয়ার খোলেনি। পৃথিবীর একমাত্র এই দেশটির মানুষই কখনও নীতিগত কারণে কোকাকোলার স্বাদ নিতে পারেননি।

  • বিদেশভ্রমণ নিষিদ্ধ

উত্তর কোরিয়ান নাগরিকরা বিদেশ ভ্রমণের জন্য বিমানের টিকেট কিনতে পারেন না। দামের জন্য নয়, এটা তাদের জন্য নিষিদ্ধ। এমনকি দেশের মধ্যে ভ্রমণ করতেও তাদের ওপর কড়া বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

গ্রামে থাকা আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যেতে চাইলেও তাদের অনুমতির দরকার হয়। যদিও, আইনের ফাঁকফোকর দিযে কোনো কোনো নাগরিক অর্থ উপার্জন করার জন্য চীন কিংবা রাশিয়ায় গিয়ে থাকেন।

  • উত্তর কোরিয়ায় কোনো চেইন ফাস্টফুড শপ নেই

উত্তর কোরিয়ায় বিশ্বখ্যাত কোনো চেইন ফাস্ট ফুড শপ যেমন – কেএফসি, পিজা হাট বা ম্যাকডোনাল্ডস নেই। তবে, ঐতিহ্যবাহী কোরিয়ান খাবারের সাথে স্ট্রিট কিওস্ক সেখানে খুব জনপ্রিয়। সবার প্রিয় খাবার কিমচি, সাথে খুব ঝাল-মশলাদার বাধাকপি।

  • উত্তর কোরিয়া ভ্রমণ করতে চান?

স্থানীয় কেউ বিদেশি কারো সাথে কথা বললেই তার জেল বা ফাঁসি হয়ে যাবে, বিষয়টা এমন নয়। তবে, যদি কথা বলেই ফেলে তাকে সরকারী গোয়েন্দাদের জেরার মুখে পড়তে হবে। তাই কোনো বিদেশি ছবি তুলতে বা কথা বলতে গেলেই উত্তর কোরিয়ানরা দৌঁড়ে পালিয়ে যান।

আসলে, ওখানে ছবি তোলাই নিষেধ। বিদেশিদের সাথে গাইড থাকে। তারাই ছবি তুলতে দেয় না, বিশেষ করে আশেপাশে সামরিক কোনো বিষয়বস্তু থাকলে তো কথাই নেই।

  • কনডম-স্যানিট্যারি ন্যাপকিন কেনা যায় না

বলা হয় যে, উত্তর কোরিয়ানরা জানেনই না যে, কনডম বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব যে আদৌ আছে। কয়েক যুগ আগে কালোবাজারে কিছু পাওয়া যেত, যদিও খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। আর এখন দেশের মধ্যে থেকে ওসব কেনা প্রায় অসম্ভব। এমনকি স্থানীয়দের দোকানে স্যানিটারি ন্যাপকিনেরও কোনো অস্তিত্ব নেই।

  • ফ্যাশনেবল কেশবিন্যাস বলে কিছু নেই

সেলুন গুলোতে আমরা নাটক-সিনেমার তারকাদের নানা রকম কেশবিন্যাসের ছবি দেখতে অভ্যস্ত। উত্তর কোরিয়ায় সেই তারকাদের জায়গাটা দখল কেরে রেখেছেন সরকারি নেতারা। অধিকাংশ লোকই কিম জং উনের মত করে চুল কাটাতে পছন্দ করেন।

মেয়েরা চিবুক পর্যন্ত লম্বা বব কাট রাখেন। এখানেও অবদান আছে কিং জং উনের। কারণ, তিনি মনে করেন এমন চুলেই কোরিয়ান মেয়েদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দেখায়।

  • রেডিও-টেলিভিশনে বিধি-নিষেধ 

উত্তর কোরিয়ায় সামান্য কয়েকটা টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেল আসে। সেখানে নানারকম অনুষ্ঠান, সিনেমা, নাটক দেখানোও হয়। যদিও, অধিকাংশই থাকে রাজনীতি ও সরকার ঘেষা। আর দেশের খবর মানেই সরকারের জন্য প্রশংসাবার্তা।

ব্রাইট সাইড অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।