‘যতক্ষণ বাঁচবো, শত্রুর দিকে আমার নজর থাকবে!’

নড়াইল নাম শুনলেই চোখের সামনে কি ভেসে আসে? অবশ্যই ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মর্তুজা – জাতির অন্যতম এক শ্রেষ্ঠ সন্তান।

কিন্তু এই যে এই দেশে আমরা বেঁচে আছি, শ্বাস নিচ্ছি, নিজের মতো করে স্বাধীন ভাবে স্বাধীন দেশে স্বাধীন নাগরিক হিসেবে আছি। সেটা কি এমনি এমনি এসেছে? না আসে নাই, এই দেশটা স্বাধীন করে আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন জাতির শ্রেষ্ঠ সাত সন্তান। জাতির এই সাত শ্রেষ্ঠ সন্তানের একজন নূর মোহাম্মদ শেখ এর জন্ম হয়েছিলো এই নড়াইলেই তা হয়তো আমরা খুব মানুষই মনে রেখেছি।

আমাদেরই এই দেশটা কে তিনি প্রচন্ড রকম ভাবে ভালোবাসতেন। ভালোবাসাটা আমাদের ভালোবাসার মতো ছিলো না, সারাদিন গলা ছেড়ে – ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ বললেই দেশ কে ভালোবাসা হয় না। সময়ের টানে নিজেকে প্রমান দিয়েই ভালোবাসতে হয়।

নিজের ছেলের সাথে একদিন বিকেলে তার প্রিয় সাইকেলটা সাথে নিয়ে বের হয়েছেন। সময়টা ১৯৭১ এর মার্চ মাস। সারাদেশ উত্তাল। মাত্রই কিছুদিন আগে ল্যান্স নায়েক পদে উন্নীত হয়ে কর্মস্থল যশোরের পূর্ব পাকিস্থান রাইফেলস তৎকালীন ইপিআর এর হেড কোয়ার্টার থেকে বাড়ি আসছেন ছেলের সাথে দেখা করতে। হঠাৎ করেই হাতে থাকা একটা কঞ্চির আঘাতে কপাল কেটে গিয়ে রক্ত ঝড়তে থাকে।

তাই দেখে ছেলে বলে উঠে, ‘বাবা দেখো কত রক্ত!’ উত্তরে নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘আরো কত রক্ত ঝরবে!’ ছোট ছেলে তখন হয়তো বাবার এই কথার মানে ধরতে পারেন নি কিন্তু বাবা নূর মোহাম্মদের মনের মাঝে সব সময় দেশ ও দেশের মানুষের কথা থাকতো।

কিন্তু ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ কিন্তু জীবনের শুরুতে এমন ছিলেন না। অবস্থাপন্ন ঘরের বাবা মোহাম্মদ আমানত শেখ, ও মা মোসাম্মত জিন্নাতুন্নেসা খানম এর একমাত্র সন্তান নূর মোহাম্মদ শেখ। এরকম ঘরের আদরে অর্থে আরামে আয়েশে বেড়ে উঠেছেন তিনি। অনেকটাই বাউন্ডুলে গোছের নূর মোহাম্মদের পড়াশুনা তেমন ভালো লাগতো না তার চেয়ে বরং তিনি গান বাজনা, নাটক, জারিগান নিয়ে থাকেই বেশি পছন্দ করতেন।

গানের গলাও ভালো ছিলো তাঁর, দারুণ গাইতে পারতেন। শখ করে একটা গ্রামোফোনও কিনেছিলেন তিনি। এছাড়াও খেলাধুলা আর দুরন্তপনায় সবার কাছে সাহসী হিসেবেও একটা পরিচয় পান তিনি । এভাবেই বেড়ে উঠতেছিলেন তিনি কিন্তু বিধিবাম এরই মধ্যে কিশোর বয়সেই বাবা মা হারিয়ে এতিম হয়ে যান তিনি। ওই বয়সেই বাবা মা কে হারিয়ে কি করবেন না করবেন কিছুই ভেবে পাচ্ছিলেন না।

তাঁকে যে সান্ত্বনা বা পরামর্শ দিবেন এমন কেউও ছিলো না তার। নিজের বন্ধুবান্ধবই হয়ে উঠলেন তার সমব্যাথী আর অভিবাবক। বাবা-মার অভাব ঘোচাতে যেন আরও বেশি করে গান-বাজনা নিয়ে মেতে উঠলেন। বন্ধুদের নিয়ে গঠন করলেন যাত্রা আর জারি গানের দল। কিন্তু এসব করতে টাকার প্রয়োজন হলে তিনি তার জমি বিক্রি করে এইসব করতেন। কিন্তু কোন রকম উপার্জন না করে শুধু মাত্র খরচ করে গেলে যা হয় আর কি। এরই মধ্যে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হলে স্ত্রী তোতাল বিবির সাথে ।

গান বাজনা, জারিগান এইসব করতে করতে একদিন তিনি দেখলেন নিজের বাড়ির ভিটে ব্যাতিত আর কিছু নাই বিক্রি করার মতো। যদিও তিনি বিয়ের পর থেকেই শ্বশুরবাড়িতেই থাকতেন। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? একদিন চিন্তা করলেন সংসার হয়েছে এবার তো নিজের উপার্জন করতে হবে। এই ভেবে তিনি স্থানীয় আনসার বাহিনী তে যোগ দিলেন কিন্তু তাতেও দেখলেন সংসার চলে না। বেড়িয়ে গেলেন চাকুরীর সন্ধানে কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতা সেভাবে না থাকলেও সুঠাম দেহ, উদ্যমী, সাহসী আর আনসার বাহিনীর অভিজ্ঞতার কারনে ১৯৫৯ সালের ১৪ মার্চ যোগ দিলেন তৎকালীন পুর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বা ইপিআর। প্রাথমিক ট্রেনিং শেষে তাঁকে পোস্টিং দেয়া হয় দিনাজপুর সেক্টরে যেখানে তিনি ১৯৭০ সালের এক জুলাই পর্যন্ত ছিলেন। পরে তিনি ল্যান্স নায়েক হয়ে চলে আসেন যশোরের হেড কোয়ার্টারে ।

২৫ শে মার্চের বর্বর হত্যাকাণ্ডের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিলেন। দেশের ডাকে সঙ্গে সঙ্গেই সাড়া দিলেন ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ। তিনি তখন ছুটিতে ছিলেন। ছুটিতে থাকা অবস্থাতেই যোগ দিলেন মুক্তিযুদ্ধে, ৮ নং সেক্টরে (কুস্টিয়া-যশোর থেকে শুরু করে খুলনা-সাতক্ষীরা পর্যন্ত)। এই কোম্পানিটি মুলত গঠিত হয়েছিলো ইপিআর-এর বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে।

এদের মধ্যে বেশি অভিজ্ঞতা থাকায় নূর মোহাম্মদ শেখ কে অধিনায়ক করে সুতিপুরের গোয়ালহাটি গ্রামের সামনে স্থায়ী টহলে বসানো হয়। টহলের মূল উদ্দেশ্য ছিল, কাছেই যে পাকিস্তানিদের ক্যাম্প আছে, সেদিকে নজর রাখা আর সুতিপুরের নিজস্ব প্রতিরক্ষার জন্যই ওই টহল ছিলো। সাথে আছে নান্নু মিয়া আর মোস্তফা কামাল নামের দুই সহযোদ্ধা।

৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সকাল সাড়ে নয়টা। শত্রুর গতিবিধির উপর নজর রাখতে রাখতে উল্টো নিজেরাই শত্রুর নজরে পরে যান। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তাদের তিন দিক দিয়ে ঘিরে ফেলে গুলি করতে করতে এগোতে থাকে। তাদের কাছে আছে একটা হালকা মেশিনগান আর দুইটা রাইফেল।

এই বিশাল পাকিস্তানি সৈন্যদলের বিপক্ষে এই অস্ত্র দিয়ে মোকাবেলা করা প্রায় অসম্ভব। এমতাবস্তায় তারা ওই স্থান ত্যাগ করলে হয়তো মুক্তিবাহিনীর স্থানীয় ঘাঁটিতে পৌছানো সম্ভব। এদিকে গুলিও তেমন নেই। এর মধ্যে নূর মোহাম্মদের ভাবনায় এলো তারা যদি পেছনে ফিরে যায় তাহলে হানাদার বাহিনী তাদের মুক্তিবাহিনীর মূল ক্যাম্পে পৌছানোর সুযোগ পেয়ে যাবে যা মোটেও করা ঠিক হবে না।

যতক্ষণ পারা যায় প্রতিরোধ করে যেতে হবে যাতে করে মুক্তিবাহিনীর মূল ঘাটির যোদ্ধারা লড়াই করার কিংবা তার পিছু হটার সুযোগ পাব। গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন সহযোদ্ধা নান্নু মিয়া । এক হাত দিয়ে খুব দ্রুততার সাথে নান্নু মিয়া কে কাধে তুলে নিয়ে ডানে বামে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে লাগলেন নূর মোহাম্মদ। এতে করে শত্রুরা কিছুটা থেমে যায়।

এবার নূর মোহাম্মদ হানাদার বাহিনীকে দিকভ্রান্ত করার উদ্দ্যেশে কৌশল অবলম্বন করেন। এক জায়গা থেকে মেশিনগান চালিয়ে আবার অন্য জায়গা থেকে মেশিনগান চালাতে থাকেন। এই স্থান পরিবর্তন করে গুলি চালানোর ফলে হানাদার বাহিনী ভড়কে যায় ভাবে এখানে অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও সাথে অস্ত্রশস্ত্রও আছে।

এতে হানাদার বাহিনী গুলি চালানো কমিয়ে দেয়। এই সুযোগে আহত নান্নু মিয়াকে নিয়ে কিছুটা পিছু হটলেন তিনি কিন্তু শেষ রক্ষা হয় না। মর্টারের একটা গোলা এসে পড়লো তার ডান পাশে, স্প্লিন্টারের আঘাতে ভেঙে গেলো নূর মোহাম্মদের হাটু। সারা শরীর রক্তে ভিজে গেলো। মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেই অধিনায়কের দায়িত্ব মোস্তফা কামাল কে দিয়ে তার হাতে এলএমজিটা দিয়ে নিজের কাছে সামান্য রাইফেলটা রাখলেন।

মুক্তিযুদ্ধের এই সময়টা তে একটু ভালো কোন অস্ত্র নিজেদের থাকুক এটাই চেয়েছিলেন তিনি তাই এলএমজি টা সহযোদ্ধা কে দিয়ে বললেন ‘মোস্তফা, তুমি আহত নান্নু মিয়া কে নিয়ে দ্রুত পিছনে যেতে থাকো, আমি যতক্ষন পারি ওদের ঠেকিয়ে রাখতেছি।’

মোস্তফা কামাল এরকম কথা শুনে বললেন ‘আপনাকে এই অবস্থায় ফেলে আমরা যাই কি করে?’। এই বলেই মোস্তফা নূর মোহাম্মদ কে কাধে তুলে নিতে গেলে নূর মোহাম্মদ পাশের গাছের শিকড় আকড়ে ধরে বলে উঠলেন, ‘আরে একি! থামো থামো উঁহু’।

কড়া ধমক দিয়ে বললেন, ‘সরো মোস্তফা।আল্লাহর দোহাই মোস্তফা হুঁশ করে শোন, আমার দিকে তাকিয়ে দেখো, যেভাবে যখম হয়েছি তাতে আমার আর বাচার সম্ভবনা নাই । যেভাবে রক্তপাত হচ্ছে, তাতে এখনই আমার সারা শরীর ঝিমঝিম করছে, চোখে ঝাপসা দেখতেছি। আমাকেসহ নিতে গেলে তোমরাও মারা পড়বে। তিন জন মরার চেয়ে একজন মরা ভালো নয় কি!? দেশের স্বাধীনতা আনার জন্য তোমাদের বাঁচতে হবে । আমি নির্দেশ দিচ্ছি, তোমরা সরে যাও। যতক্ষণ বাঁচবো, শত্রুর দিকে আমার নজর থাকবে!’

সিপাহী মোস্তফা অধিনায়কের আদেশ শুনে হাত সরিয়ে নিয়ে নান্নু মিয়াকে নিয়ে পিছু হটলেন। একদিকে হানাদার বিশাল বাহিনী, অন্যদিকে মৃত্যুর পথে ধাবিত রক্তাক্ত আর ভিষণ জেদী একজন যোদ্ধা। হাতে একটি মাত্র রাইফেল। এই অবস্থায়ই লড়াই চালিয়ে গেলেন নূর মোহাম্মদ। আস্তে আস্তে রক্তক্ষরণে শরীর নিস্তেজ হয়ে এলো তবু হানাদার বাহিনীর দিকে বন্দুক উঁচিয়ে ধরে ট্রিগার চেপে গেলেন। একটা সময় মারা গেলেন আর বাঁচিয়ে দিলেন নিজের সহযোদ্ধাদের আর পুরো একটা মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প। দেশের স্বাধীনতাকে আরেকটু কাছে টেনে আনলেন, নিজের জীবন দিয়ে।

ঘন্টাখানেক পড়ে নান্নু মিয়া ও মোস্তফা কামাল মূল ঘাঁটির মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে এসে হানাদার বাহিনীর উপড় আক্রমণ চালায়  হানাদার বাহিনী পিছু হটলো। এরপর পাগলের মতো সবাই নূর মোহাম্মদ কে খুঁজতে লাগলো সবাই। নূর মোহাম্মদের মৃতদেহ পাওয়া গেলো ঝোপের পাশে। এমনিতেই মৃত্যুপথযাত্রী নূর মোহাম্মদ কে হানাদার বাহিনী বেয়নেটের আঘাতে আরো বেশি করে ক্ষতবিক্ষত করে ঊপড়ে ফেলেছে তার দুটি চোখ।

নূর মোহাম্মদ শেখ আমাদের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ দের একজন। তিনি একরকম একাই লড়েছিলেন পাকবাহিনীর পুরো একটি দলের বিরুদ্ধে। নিজের জীবন উৎসর্গ করে বাঁচিয়েছিলেন তার অধীনস্ত মুক্তিযোদ্ধার জীবন। শুধু এ কারণেই নয়, বরং তাকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করা হয়েছে তার স্পিরিটের জন্য।

যে স্পিরিটের জন্য তিনি সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধার জীবনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, দেশের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় নির্দ্বিধায় নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, মৃত্যুমুখে থেকেও আগে দেশের কথা চিন্তা করে এলএমজি সঙ্গীদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, সেই স্পিরিট আসলে গোটা মুক্তিবাহিনীরই স্পিরিট। আর সেই স্পিরিটের প্রতিনিধি হিসেবেই তিনি বীরশ্রেষ্ঠ।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।