বিঞ্জ ও বিনোদন জগতে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের নবজাগরণ

দেশের নতুন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বিঞ্জ। যাত্রা শুরু করেছে এখনো এক মাসও হয়নি, তবে এরই মধ্যে বেশ সাড়া জাগিয়েছে বহুল আলোচিত ওয়েব সিরিজ ‘আগস্ট ১৪’, ‘সদরঘাটের টাইগার’ ইত্যাদির জন্য। শুরুতে গুগল প্লেস্টোরে কেবল অ্যান্ড্রয়েড টিভির জন্য বিঞ্জের অ্যাপ পাওয়া গেলেও, এখন পাওয়া যাচ্ছে অ্যান্ড্রয়েড ফোনের জন্যও। সেখানে প্রথম সপ্তাহ ফ্রি, এরপর ডেইলি প্যাক ১০ টাকা, উইকলি প্যাক ৩০ টাকা, আর মান্থলি প্যাক ৯৯ টাকা।

এখনই হয়তো বিঞ্জকে বাংলাদেশের নেটফ্লিক্স জাতীয় কোনো গালভরা তকমা দেয়ার সময় আসেনি, কিন্তু নিঃসন্দেহে এটি বেশ সম্ভাবনাময় একটি ডিজিটাল এন্টারটেইনমেন্ট প্ল্যাটফর্ম। এবং যেভাবে এটি এসেই সবাইকে চমকে দিয়েছে, সে ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশি অনলাইন কনটেন্টের ক্ষেত্রে নবজাগরণের সৃষ্টি করা খুবই সম্ভব।

যেকোনো ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি যে জিনিসটি তা হলো সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। বিশেষত নেটফ্লিক্স, অ্যামাজনের মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো বিনোদনপ্রেমীদের এত পছন্দনীয় হওয়ার কারণ সেগুলোর বিশাল লাইব্রেরিই। সেগুলোতে এত এত কনটেন্ট থাকে, তা-ও আবার বিভিন্ন ঘরানার যে, কোনটা ছেড়ে কোনটা দেখব জাতীয় বিভ্রান্তিতে পড়ে যেতে হয় ব্যবহারকারীদের। কিন্তু ওটিটি প্ল্যাটফর্মে এমন বিভ্রান্তিতে পড়তেই যেন পছন্দ সবার। তারা চায়, হাতে যেন অপশন থাকে অনেক বেশি। বিপুল সংখ্যক কনটেন্টের মাঝখান থেকে নিজের পছন্দের নির্দিষ্ট কিছু কনটেন্ট দেখতে পাওয়ার মধ্যে একটা অন্য ধরনের তৃপ্তি কাজ করে।

বাংলাদেশে বিঞ্জই প্রথম ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নয়। এর আগেও বেশ কিছু প্ল্যাটফর্ম এসেছে ঠিকই। সেগুলোর মধ্যে বায়োস্কোপ, বঙ্গ আর আইফ্লিক্সকেই যা মোটামুটি চলনসই বলা যায়। বাকিগুলোতে কনটেন্টের পরিমাণ একেবারে নগণ্য। এদিকে বায়োস্কোপ, বঙ্গ, আইফ্লিক্সেও যে কনটেন্ট খুব বেশি, তা না।

মাঝেমধ্যে দুই-একটা ভালো অরিজিনাল কনটেন্ট হয়তো তারা আনে, কিন্তু চাহিদার তুলনায় তা কিছুই না। এছাড়া নতুন বিভিন্ন মুভির প্রিমিয়ারও তারা করে ঠিকই, কিন্তু তা-ও দীর্ঘ বিরতি পরপর। তাহলে এসব প্ল্যাটফর্মে কিসের আশায় টাকা খরচ করে সাবস্ক্রাইব করবে দর্শকরা? এরচেয়ে ইউটিউবে ফ্রিতে পাওয়া কনটেন্ট দেখাই কি ভালো না?

অর্থাৎ ইতোমধ্যে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন ব্যবহার করে মজা পেয়ে যাওয়া দর্শকদের আশানুরূপ ছিল না ইতঃপূর্বে দেশে বিদ্যমান ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর সার্ভিস। এবং তাদের মাঝে উন্নতির খুব একটা চেষ্টাও এতদিন লক্ষণীয় ছিল না। কেননা তারা তো ওই প্রবাদ জানতই যে বনগাঁয়ে শেয়াল রাজা! তাই যতদিন না ভালো কোনো প্রতিযোগী বাজারে এসেছে, ততদিন নিজেদের উন্নতির খুব বেশি তাগিদ বা তাড়নাও তারা পায়নি। ভেবেছে, যেমন চলছে তেমনই চলুক না।

কিন্তু বিঞ্জ একদম শুরুতেই বেশ বড় ধামাকা নিয়ে হাজির হয়েছে। অধিকাংশ দর্শক হয়তো তাদের কিছু ওয়েব সিরিজের ১৮+ কনটেন্ট নিয়ে বিতর্কের কারণেই তাদের কথা জানতে পেরেছে। তবে যে জিনিসটা নিয়ে কথাবার্তা খুব কম হচ্ছে তা হলো প্রথম দফাতেই বিঞ্জের বেশ অনেকগুলো অরিজিনাল ওয়েব সিরিজ নিয়ে আসা। ‘আগস্ট ১৪’ কিংবা ‘সদরঘাটের টাইগার’ ছাড়াও সে তালিকায় আছে ‘ঘোর’, ‘বুমেরাং’, ‘ভয়ের গল্প’, ‘ব্ল্যাকমেইল’, ‘কুপন’, ‘নক নক – হু ইজ দেয়ার’ এর মতো দারুণ কিছু সিরিজ।

এছাড়া বিঞ্জের লাইব্রেরিতে আছে বঙ্গের কিছু ওয়েব সিরিজ, ‘শিকারী’, ‘পাসওয়ার্ড’, ‘মনের মতো মানুষ’-এর মতো সাম্প্রতিক চলচ্চিত্রসহ জি সিরিজের ব্যানারের বেশ কিছু চলচ্চিত্র (যেগুলো বঙ্গতেও পাওয়া যায়) এবং অনেকগুলো ভিন্টেজ নাটক-টেলিফিল্ম।

সব মিলিয়ে প্রথম সাত দিন ফ্রি ব্যবহারের পরও আরো অন্তত কিছুদিন দর্শক ধরে রাখার মতো কনটেন্ট ইতোমধ্যেই রয়েছে বিঞ্জের লাইব্রেরিতে। তাই আন্দাজ করা যেতে পারে, প্রথম সাতদিনে বিঞ্জের অরিজিনাল সিরিজ এবং নতুন অনলাইনে আসা মুভিগুলো দেখে যারা সন্তুষ্ট হবে, তাদের একটা বড় অংশ আরো সপ্তাহ বা মাসখানেকের জন্য পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতেও উদ্বুদ্ধ হবে। তবে এরপরও তারা সাবস্ক্রিপশন ধরে রাখবে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন।

নতুন সাবস্ক্রাইবার টানার পাশাপাশি পুরনো সাবস্ক্রাইবার ধরে রাখার জন্য ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রয়োজন নিয়মিত নতুন নতুন কনটেন্ট তাদের লাইব্রেরিতে যোগ করা। এই কাজটি দেশের অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলো ধারাবাহিকভাবে করতে পারেনি। কিন্তু বিঞ্জ যদি অন্যদের থেকে নিজেদের আলাদা করতে চায়, তাহলে তাদের প্রয়োজন হবে প্রতি সপ্তাহে অন্তত একটি নতুন সিরিজ, একটি মুভি, এবং কয়েকটি নাটক যোগ করা। কিন্তু তা না করে যদি তারা শুরুর ধামাকার পরেই থেমে যায়, তাহলে তাদের ঘিরে দর্শকমনে যে সাময়িক উন্মাদনা সৃষ্টি হয়েছে, সেটিও এক পর্যায়ে থিতিয়ে যাবে।

আশা থাকবে, এ আশঙ্কা যেন সত্যি না হয়। বিঞ্জ যেমন দুরন্ত সূচনা করেছে, সেটা যেন জারি থাকে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটা খুবই জরুরি। কেননা দেশি কনটেন্টে ভিন্নতা না পাওয়ায় এবং বিদেশী প্ল্যাটফর্মগুলো সহজেই হাতের নাগালে চলে আসায়, দেশি কনটেন্টের প্রতি দর্শকের আগ্রহ ক্রমশ কমছে। ইউটিউবে যেসব কনটেন্ট আসছে, সেগুলোও একঘেয়ে, বৈচিত্র্যহীন এবং অনেক বেশি ভিউসর্বস্ব। অথচ এখন যুগের চাহিদা হলো নতুন নতুন ঘরানার নাটক, সিরিজ ইত্যাদি।

‘আগস্ট ১৪’ সিরিজে যেমন প্রথমবারের মতো ট্রু ক্রাইম স্টোরি উঠে এসেছে। ফলে লোকজন হামলে পড়ছে সিরিজটি দেখার জন্য। এ থেকেই প্রমাণিত হয়, এ দেশের দর্শক এখন নতুনত্ব চায়। চিরাচরিত প্রেম-ভালোবাসার গল্প থেকে বেরিয়ে এসে নতুন নতুন বিষয় নিয়ে দেশি প্রেক্ষাপটে, দেশি লোকেশনে, দেশি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কাজ দেখতে চায়। সহজ কথায় বলতে গেলে, তারা চায় দেশি নির্মাণগুলোই যেন গুণে-মানে তাদের দেখা বিদেশী সিরিজ-মুভিগুলোর মতো হয়ে ওঠে।

বিঞ্জের কাছে প্রত্যাশা থাকবে তারা যেন এ ধরনের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নির্মাণের নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। কারণ তাতে বাংলাদেশি দর্শকদের চাহিদা যেমন মিটবে, তেমনই দেশি প্রতিশ্রুতিশীল নবীন নির্মাতারাও তাদের ফ্রেশ সব আইডিয়া নিয়ে কাজ করার একটা দেশি প্ল্যাটফর্ম পাবে। ফলে দেশের টাকা দেশেই থাকবে। নতুবা নিজ দেশে যথাযথ প্ল্যাটফর্ম না পেয়ে দেশি গুণী নির্মাতারা ঠিকই ঝুঁকবেন ভারতীয় হইচই কিংবা জি ফাইভের দিকে, কিন্তু নতুন নির্মাতাদের পক্ষে সম্ভব হবে না নিজেদের প্রতিভা উপস্থাপনের ভালো কোনো প্ল্যাটফর্ম পাওয়া। তখন তাদের প্রতিভা অপচয় করতে হবে ইউটিউবের ভিউ সর্বস্ব কনটেন্ট বানিয়েই।

ওটিটি প্ল্যাটফর্মই যে বিনোদনের নতুন ঠিকানা, এতে আর কোনো সন্দেহ নেই। এতদিন পর যেহেতু আমাদের একটি নিজস্ব ভালো মানের ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এসেছে, তাই আমাদের সবার উচিৎ এর পাশে দাঁড়ানো, সমর্থন জোগানো। পাশাপাশি বিঞ্জেরও উচিৎ হবে আমাদেরকে আশাহত না করা, বরং আমাদের প্রত্যাশার যথাযথ প্রতিদান দেয়া।

আমার বিশ্বাস, বিঞ্জ যদি সত্যিই একটা নবজাগরণের সৃষ্টি করতে পারে, তখন বঙ্গ, বায়োস্কোপ, আইফ্লিক্সের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে নিজেদের উন্নতির চেষ্টা করবে। তাতে করে বিঞ্জের সাথে এই প্ল্যাটফর্মগুলোর একটা হেলদি কম্পিটিশন তৈরি হবে, আর সে সুবাদে দারুণ সব মানসম্মত কনটেন্ট উপহার পাবো আমরা সাধারণ দর্শকরা। সামগ্রিকভাবে মাথা তুলে দাঁড়াবে আমাদের ডিজিটাল বিনোদন দুনিয়া।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।