বছরের সেরা থ্রিলার

ছবিটি শেষ হওয়ার পর থিয়েটার থেকে যখন বেরিয়ে আসছি তখন মনে মনে একটা কথাই আমি বলেছি, ‘প্রায় চার মাস অপেক্ষা করার পর ২০১৮ সালের সবেচেয়ে ভাল থ্রিলার বাংলা ছবি দেখলাম আজ।’ সিনেমার নাম ‘আলিনগরের গোলকধাঁধা’। পরিচালক সায়ন্তন ঘোষাল।

হ্যাঁ বন্ধুরা, প্রায় চার মাস অপেক্ষা করতে হল একটা ভালো থ্রিলার বাংলা ছবি দেখার জন্য । ছবিটি দৈর্ঘ্য তবে একবারের জন্যও থিয়েটারে বসে ছবিটি দেখতে দেখতে মাঝে মধ্যে ঘড়িতে উঁকি মারতে হয়নি বা মনে মনে বলতে হয়নি , ‘উফ! এই ছবি কখন শেষ হবে।’

ছবিটির শেষ দৃশ্য পর্যন্ত দর্শকরা সিট ছেড়ে উঠতেই পারবেন না। যেমন দুর্ধর্ষ গল্প তেমনি টুইস্ট। বাংলার ইতিহাস কে কাজে লাগিয়ে যেভাবে গল্পটা বোনা হয়েছে তা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে কতটা রিসার্চ ওয়ার্ক ও পরিশ্রম করে তৈরী করা হয়েছে এই ছবির গল্প। তাই লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ দিতে মন চাইছে এইরকম একটা গল্প আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য।

আশুতোষ সিংহ তাঁর মেয়ের বৃষ্টির অনুরোধে বৃষ্টির বন্ধু সোহমের স্কোলারশিপের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু তার আগে ছোট্ট একটা পরীক্ষা নেন যে সে সত্যি স্কোলারশিপ পাওয়ার যোগ্য কি না? সেই পরীক্ষায় সঠিক উত্তর দিয়ে সোহম আশুতোষ বাবুকে মুগ্ধ করেন। আশুতোষ বাবু তখন সোহমকে একটা চিঠি দিয়ে বলেন যে তাঁর বন্ধু সোমনাথ অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার আগে তাঁকে চিঠিতে একটা ধাঁধা লিখে গেছিলেন। যদি সেই ধাঁধার সমাধান করতে পারেন তা হলে একটি ঐতিহাসিক বহুমূল্য জিনিস তিনি পাবেন।

এরপর সেই চিঠির ধাঁধা সমাধান করে সোহম ও বৃষ্টি পৌঁছয় ধাঁধা অনুযায়ী তাদের পরবর্তী গন্তব্যে। সেখানে তারা পায় আরও একটা চিঠি। এবং সেই চিঠিতেও লেখা থাকে আরও একটি ধাঁধা। নাহ্। এরপর আর বলবো না। এর জন্য যে ছবিটা দেখতে হবে। কারণ এই ছবিতে শুধুমাত্র রহস্য বা ধাঁধার সমাধান নেই আছে ইমোশনে ভরা একটি সুন্দর কাহিনী।

 

এই ছবির সিনেম্যাটোগ্রাফি দুর্দান্ত। মানে জমিদার বাড়ী বা কবরস্থানে প্রবেশের দৃশ্যগুলির ক্যামেরার কাজ সত্যি এক কথায় অনবদ্য। ‘ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি’ কে কুর্ণিশ জানাই। আয়নার সামনে যে দৃশ্যগুলো দেখানো হয়েছে তা সত্যি অতুলনীয়। ছবিতে ধাঁধা সমাধানের সময় সোহম যখন ইতিহাসের বর্ণনা দিচ্ছিল তখন যেভাবে পুরনো সব চিত্রগুলি দেখাচ্ছিল মনে হচ্ছিল যেন ইতিহাসের সব পুরনো পাতা গুলো দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।

কাস্টিং দুর্দান্ত। আশুতোষ সিংহের চরিত্রে কৌশিক তাঁর আগের ছবিগুলোর মতোই বড় সাবলীল অভিনয়। ওনার চোখ যেন অভিনয় করে, যেন কথা বলে। ছবি দেখতে গিয়ে যখনই জানতে পারি উনি অভিনয় করছেন দর্শক হিসেবে মন খুব খুশী হয়ে যায়। বৃষ্টির চরিত্রে পার্ণো বেশ ভালো। সাক্ষীগোপালের চরিত্রে পরাণ অসাধারণ অভিনয় করেছেন।

মানে বোঝাই যাচ্ছিল না যে উনি অভিনয় করছেন। সাক্ষীগোপালের স্ত্রীর ভূমিকায় তনিমা ও সাক্ষীগোপালের ছেলের কমিক টাইমিং মন্দ নয়। তবে এদের ড্রামাটা আরও একটু ছোট করলে ভালো হত ।

জাহ্নবীর চরিত্র খুব স্মার্ট লেগেছে যেটা এই ছবিতে প্রয়োজন ছিল আর ভালো লেগেছে সোমনাথের চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন। অল্প সময়ের জন্য হলেও বেশ ভালো লাগে সোমনাথের চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন। আর ভালো লেগেছে আমিরচন্দ মিত্তাল চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন। সত্যি খুব ভালো কাজ করেছেন ।

একি! নিশ্চয়ই ঘাবড়ে গেছেন সবাই যে অনির্বাণের নাম নিচ্ছি না কেন? আরে ওনার অভিনয়ের জন্য যে স্পেশাল প্যারাগ্রাফে লিখব ঠিক করেছি তাই । একজন ভালো ইতিহাসের ছাত্র যেমন ইতিহাসের সব তারিখ ও ঘটনা মুখস্থ থাকা উচিৎ ঠিক সেই জিনিসটাই সোহম চরিত্রের মাধ্যমে অনির্বাণ ফুটিয়েছেন। অসাধারণ অভিনয় মানে দেখে পুরো মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম। সোহম ও সাক্ষীগোপালের একটি বিশেষ দৃশ্য দেখে সত্যি গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল । অপূর্ব অভিনয় করেছেন বললে মনে হয় কম বলা হবে।

শেষ করার আগে একটা কথাই সেই সকল দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলব, এই ছবি মিস করার নয়। আর ধাঁধার সমাধানের সময় যখন বাংলার প্রাচীন ইতিহাসের সাহায্য সোহম নেবে খুব মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। এক সেকেন্ড ও ছবিতে অন্যমনষ্ক হবেন না নইলে ছবিটির মজা হারিয়ে ফেলতে পারেন।

আর পরিচালক ও অনির্বাণের উদ্দেশ্যে এটাই বলব, যে ধরনের ছবি আপনারা দেখিয়েছেন এরপর থেকে আমার ও বাকি সকল দর্শকদের প্রত্যাশা কিন্তু আরও বেড়ে গেল। ভবিষ্যতে রক্ষা করার দায়িত্ব কিন্তু এইবার থেকে সম্পূর্ণ আপনাদের। এই ছবিকে আমি ৫ এ ৫ দেব।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।