বলিউডের সেরা ‘খান’

খানদের মধ্যে সেরা কে?

বলিউড ভক্তদের কাছে এর চেয়ে বিতর্কিত প্রশ্ন আর হতে পারে না। ফিল্মফেয়ারে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কারিনা কাপুর তাঁর চোখে সেরা ‘খান’-এর কথা বলেছেন। চমকে দেওয়া ব্যাপার হল তিনি সালমান, শাহরুখ বা আমির – কারো কথাই বলেননি। এমনকি স্বামী সাইফ আলী খানের প্রসঙ্গও আসেনি। বেবোর মতে, বলিউডের সেরা খান হল ইরফান খান।

নিন্দুকেরা অবশ্য বলেন, ইরফান খান নাকি বলিউডের খানদের সাথে প্রতিযোগীতা করার মত কেউ না। তবে, তাঁর করা চরিত্রগুলো আবার মূলধারার খানদের দিয়েও হবে না। ‘লাঞ্চ বক্স’-এর সেই নি:সঙ্গ বুড়ো, ‘কারিব কারিব সিঙ্গেল’-এর সেই পাগলাটে কবি, কিংবা ‘পান সিং তোমার’-এ অ্যাথলেট থেকে ধুরন্ধর ডাকাত বনে যাওয়া – এই সবগুলো চরিত্রে ইরফান এতটাই দুর্দান্ত ছিলেন যে, তাঁর জায়গায় অন্য কাউকে ভাবাই দুস্কর।

সাম্প্রতিক সময়ে হয়তো ইরফান খানের মত প্রতিভাবান অনেকেই আছে। তবে, এক ইরফান খান নিজেই পুরো সিনেমা টেনে নিয়ে যেতে পারেন, যেটা হয়তো নওয়াজউদ্দীন সিদ্দিকী বা মনোজ বাজপায়ীরা পারেন না। এটাই ইরফানের ‘সেলিং পয়েন্ট’।

শুধু বলিউডেই নয়, তিনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেতাও বটে। হলিউডেও তাঁর সাফল্যের কমতি নেই। হলিউডের ছবিতে ইরফান এখন অনেকটা ভারতের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরের মত কাজ করেন। হলিউডে তিনি ‘দ্য নেমসেক’ (২০০৬), স্লামডগ বিলিয়নার (২০০৮), ‘লাইফ অব আ পাই’ (২০১২), ‘জুরাসিক ওয়ার্ল্ড (২০১৫) ও ‘ইনফার্নো’র (২০১৬) মত ছবি করেছেন।

খুব কম লোকই জানেন যে, তাঁর জন্ম হয় রাজ পরিবারে। ১৯৬৭ সালের সাত জানুয়ারি ইরফান জন্ম নেন রাজস্থানের জয়পুরে, এক মুসলিম পাঠান পরিবারে।

তাঁর মা বেগম ছিলেন ছিলেন হাকিম বাড়ির মেয়ে। বাবা টঙ্ক জেলার খাজুরিয়া গ্রামের জমিদার ছিলেন। একই সাথে পারিবারিক ব্যবসাও ছিলেন। ইরফান জয়পুরেই এমএ ডিগ্রি নেন। সেখান থেকে ১৯৮৪ সালে দিল্লীর ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামার (এনএসডি) স্কলারশিপ পান।

তবে, মজার ব্যাপার হল এনএসডির স্কলারশিপের জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন ইরফান। ইরফান কৈশোর থেকেই অভিনেতা হতে চাইতেন। তবে, স্কুল জীবনে খুব বেশি হলে একবার বা দু’বার মঞ্চে উঠেছেন। কিন্তু, এনএসডির আবেদনপত্র ইচ্ছামত গালগল্প লিখে রেখেছিলেন। ভেবেছিলেন, ধরা পড়ে যাবেন। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। কে জানে, সেদিন ধরা পড়লে হয়তো ভারত তাঁর ইতিহাসের অন্যতম সেরা অভিনেতাকে হারিয়ে ফেলতো!

এরপর মুম্বাইয়ে এসে শুরু হয় স্ট্রাগল। সোনার চামচ মুখে নিয়ে তাঁর জন্ম হয়েছিল বটে, তবে সিনেমার জগতে শুরুর দিনগুলোতে তাঁর মুখে সোনার চামচ ছিল না। ইরফান যখন এনএসডি’র শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী, তখন নির্মাতা মিরা নায়ার তাঁকে ‘সালাম বোম্বে’ ছবিতে কাস্ট করেছিলেন। ছবিটি সমালোচকদের দৃষ্টি কেড়েছিল। কিন্তু, ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, চূড়ান্ত সম্পাদনার সময় ইরফানের অংশটাই কেটে ফেলতে হয়েছিল।

নব্বই দশকের শুরুতে টেলিভিশনের পর্দায় কাজ করতেন। ‘ভারত এক খোঁজ’, ‘চানক্য’, ‘চন্দ্রকথা’ ইত্যাদি করেছেন। একই সময় সিনেমাতেও কাজ করেছিলেন। তবে, সেটা উল্লেখযোগ্য কিছু ছিল না। শাহরুখ খান ততদিনে ‘দিওয়ানা’, ‘ডার’, ‘বাজিগর’, কিংবা ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ করে ফেলে আকাশে উড়ছেন।

‘পান সিং তোমার’-এর জন্য সেরা অভিনেতার ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন ২০১২ সালে। তবে, ইরফান খানের ক্যারিয়ারের গতিপথ পাল্টে যায় ২০০১ থেকে ২০০৩-এর মধ্যে।

২০০১ সালে তিনি আসিফ কাপাডিয়া’র ‘দ্য ওয়ারিওর’ ছবিটি করেন। এটা তাকে আন্তর্জাতিক বাজারে ঠাই করে দেয়। এর দু’বছর বাদে উইলিয়াম শেকসপিয়ারের ‘ম্যাকবেথ’ অবলম্বনে বিশাল ভারদওয়াজের ‘মকবুল’ ছবির জন্য ফিল্মফেয়ারে তিনি সেরা ভিলেনের পুরস্কার জিতেছিলেন। তখন থেকেই ইরফানের নাম উঠতেই সবাই একটু নড়ে চড়ে বসেন।

বলিউডের তারার মেলায় ইরফান একজন ভিন্নধর্মী চরিত্র। তাঁর বিশাল কোনো ফ্যানবেজ নেই, আবার তাঁর সমালোচকও সেই অর্থে নেই। তাই তো, মস্তিষ্কের বিরল ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে যখন হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকেন, তখন তাঁর জন্য পার্থনা করে গোটা উপমহাদেশ। খানদের সাথে তাঁকে কেউ মেলাতে যায় না, কারণ সবাই জানে নিজের জায়গাটায় ইরফানই অনন্য, ইরফানই সেরা।

– হাফিংটন পোস্ট ইন্ডিয়া অবলম্বনে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।