ইতিহাস কাঁপানো এক খল অভিনেত্রী

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  জন্মবার্ষিকীর দিনে জন্ম তাঁর। জন্মেছিলেন ১৯৩১ সালে। চলচ্চিত্র কিংবা নৃত্য আপন মেধায় নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য স্থানে। তিনি বাংলাদেশের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী রওশন জামিল।

৫০-এর দশকের কথা। তখন মেয়েরা অভিনয় করতো। সামাজিক একরকম ট্যাবু ছিল। ছেলেরাই মেয়ে সেজে অভিনয় করতো। সেটা ভাঙেন রওশন জামিল। জগন্নাথ কলেজে (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) শরৎচন্দ্রের দেবদাসে অভিনয় করেন।

সেই থেকে শুরু। তবে, স্বনামধন্য এই অভিনেত্রী পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করেন নৃত্য দিয়ে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ টেলিভিশনে সেই ৬০-এর দশকে ‘রক্ত দিয়ে লেখা’ নাটকে অভিনয় করে সবার নজরে আসেন। ১৯৬৭ সালে ‘আলীবাবা চল্লিশ চোর’ সিনেমার মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় এই অভিনেত্রীর।

১৯৭০ সালে জহির রায়হানের কালজয়ী চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’য় অসাধারণ অভিনয়ের স্বরুপ বেশ পরিচিতি পান। তৎকালীন রাজনীতি, সমাজ ব্যবস্থা ওনার এই বিখ্যাত চরিত্রের মাধ্যমে ফুটে উঠে। এতটা বাস্তব, প্রাণবন্ত অভিনয় তিনি ছিলেন বলেই হয়তো সম্ভব হয়েছিল।

কোমলমতী কিংবা কুটিল সব চরিত্রেই তিনি সাবলীল ছিলেন। অভিনয় করেছেন টাকা আনা পাই, তিতাস একটি নদীর নাম, আবার তোরা মানুষ হ, সুজন সখি, নয়ন মনি, গোলাপী এখন ট্রেনে, সূর্য দীঘল বাড়ী, সূর্য সংগ্রাম, মিস লোলিতা, দহন, পেনশন, প্রফেসর, রামের সুমতি, পোকামাকড়ের ঘর বসতি, শ্রাবন মেঘের দিন, চিত্রা নদীর পাড়ে, প্রেমের তাজমহল সহ আরো বেশ কিছু বিখ্যাত ও জনপ্রিয় ছবিতে।

রওশন জামিল একমাত্র অভিনেত্রী যিনি একাধারে জহির রায়হান, ঋত্বিক ঘটক, শেখ নিয়ামত আলী, আমজাদ হোসেনের মতো কিংবদন্তি পরিচালক প্রত্যেকের নির্দেশনায় কাজ করেছেন। সু-অভিনয় দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন চলচ্চিত্র অঙ্গনের অন্যতম সেরা অভিনেত্রী হিসেবে। শুধু চলচ্চিত্র নয়, নৃত্য, নাটকেও ছড়িয়েছেন নিজের প্রতিভা। বিজ্ঞাপনের মডেল ও হয়েছিলেন। রক্সি পেইন্টের বিজ্ঞাপনে তাঁর ‘ইশ,রঙ দেখে আর বাঁচি না’ ডায়লোগটা বেশ বিখ্যাতও হয়।

বর্ণিল অভিনয় জীবনে তিনি দু’বার জাতীয় পু্রস্কার অর্জন করেন। এবং ১৯৯৫ সালে নৃত্যকলায় দেশের সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদকে ভূষিত হন। এছাড়া বাচসাস পুরস্কার ও অর্জন করেন এই অভিনেত্রী।

রোকনপুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় লক্ষ্মীবাজার সেন্ট ফ্রান্সিস মিশনারি স্কুলে। পরবর্তীতে তিনি ইডেন কলেজে পড়াশোনা করেছেন।

মাধ্যমিক পরীক্ষা পাসের পর ওয়ারী শিল্পকলা ভবনে নাচের প্রাতিষ্ঠানিক যোগ দেন। সেখানেই প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যকলার শিক্ষক গওহর জামিলের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সেখান  থেকে প্রেম। গওহর ধর্ম বদলে মুসলিম হবার পর ১৯৫২ সালে তাকেই বিয়ে করেন রওশন জামিল।

চলচ্চিত্রঅঙ্গনের সুখী দম্পতির উদাহরণ ছিলেন তাঁরা। তাঁদের ছিল দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। এই দম্পতি মিলে ১৯৫৯ সালে রাজধানীর স্বামীবাগে প্রতিষ্ঠা করেন নৃত্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘জাগো আর্ট সেন্টার’। প্রতিষ্ঠানটিতে এখন ৫০০’র বেশি শিক্ষার্থী আছেন।

প্রখ্যাত এই অভিনেত্রী ২০০২ সালে ১৪ মে মৃত্যুবরণ করেন। নিভে যায় একটি প্রদীপ! তাঁর মত খল অভিনেত্রী বাংলাদেশের ইতিহাসে আর আসেনি। আদৌ আর আসবে কি?

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।