জামাল ভূঁইয়া: আগুন পাখির ডানা

চলছে অভাবনীয় এক লড়াই। কে ভেবেছিল, কাতারের বিরুদ্ধে এমন প্রতিরোধ গড়ে তুলবে বাংলাদেশ। মূল সময়ের খেলা শেষে খেলা চলছে ইনজুরি টাইমের। বামপ্রান্ত থেকে আক্রমণে উঠছিলেন মাশুক মিয়া জনি। পাস দিলেন অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়াকে। তার ডান পায়ের কোনাকুনি শট পরাস্ত করল কাতারের গোলরক্ষককে।

বাংলাদেশ পেয়ে গেল জয়সূচক গোল। হারাল সেই কাতারকে যারা কিনা পরবর্তী বিশ্বকাপের আয়োজক। ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের মত এশিয়ান গেমসের নকআউট পর্বে পা রাখল বাংলাদেশ। লাইফ সাপোর্টে থাকা বাংলাদেশের ফুটবল যেন ফিরে পেল প্রাণশক্তি।

ষাটের দশকে জামালের বাবা মা পাড়ি জমান ডেনমার্কে। সেখানেই জন্ম জামালের। পুরো নাম জামাল হারিস ভূঁইয়া। বাবা মা তাকে বানাতে চেয়েছিলেন চিকিৎসক কিংবা আইনজীবী। কিন্তু ছেলেটার শিরা-উপশিরায় কেবলই ছিল ফুটবল। অগত্যা, বাবা মা হার মানেন ছেলের প্যাশনের কাছে।

একটি প্রবাদ আছে, ‘জীবন পুষ্পশয্যা নয়’। জামালের জন্য প্রবাদটা যেন একটু বেশিই সত্য। ২৮ বছরের ছোট্ট জীবনে কখনো হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েছেন, কখনো খেলেছেন ডেনমার্কের শীর্ষস্থানীয় লিগে, কখনো বা দ্বিতীয় চতুর্থ বিভাগের দলে, কখনো জাতীয় দলের প্রাথমিক দলেও নিজের নাম পাননি, আবার কখনো হয়েছেন ১৬ কোটির বাংলাদেশের ফুটবল দলের অধিনায়ক।

ডেনিশ ক্লাব ব্রন্ডবি আইএফের যুবদলে খেলতেন জামাল। ১৫ বছর বয়সে এফসি কোপেনহেগেনের যুবদলের বিপক্ষে তার করা একটি গোল মুগ্ধ করেছিল এফসি কোপেনহেগেনের কর্তাদের। এরপর যোগ দেন এফসি কোপেনহেগেনের যুব দলে। এই দলের মূল দলের হয়েই সিনিয়র ফুটবলে অভিষেক তাঁর।

ডেনমার্ক ছাড়াও তিনি খেলেছেন ফিলিপাইনের ক্লাব স্ট্যালিয়ন্সে। ২০১৩ সাল থেকে তিনি বাংলাদেশের ক্লাব ফুটবলে পরিচিত মুখ। খেলেছেন শেখ জামাল, শেখ রাসেল ও সাইফ স্পোর্টিং-এ। শেখ জামালের হয়ে ২০১৪ সালে ভুটানে জিতেছিলেন কিংস কাপের শিরোপা।

অথচ, এই জামালের জীবন থেমে যেতে পারতো মাত্র ১৭ বছর বয়সেই। সন্ত্রাসীদের গোলাগুলির মাঝে পড়ে চারটি গুলি খেয়েছিলেন জামাল ভূঁইয়া। মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ফিরে এসেছিলেন তিনি।

ডেনমার্কে যখন ফুটবল খেলতেন, তখন স্থানীয় হাইস্কুলে ইতিহাস ও ইংরেজির ক্লাস নিতেন আমাদের জামাল। বাংলাদেশে আসার পর শিক্ষকতা না করলেও পড়াশোনার সাথে সম্পর্ক রেখেছেন এই তরুণ।

ডেনমার্কে যখন থাকতেন, তখন থেকেই লাল সবুজ জার্সিটা গায়ে চড়ানোর ইচ্ছাটা অন্তরে লালন করতেন জামাল। ২০১১ সালে ট্রায়াল দিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন তিনি। খাপ খাওয়াতে পারেননি বাংলাদেশি আবহাওয়ার সাথে। ২০১৩ সালে আবার এসেছিলেন তিনি। ট্রায়ালে সবার মন জয় করে জায়গা করে নিয়েছিলেন জাতীয় দলে।

সেই বছর বাংলাদেশের তৎকালীন ডাচ কোচ ডি ক্রুইফের হাত ধরেই জাতীয় দলে অভিষেক হয় তাঁর। ২০১৩ সালের ৩১ আগস্ট আসে তার জীবনের সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। প্রথমবারের নেপালের বিপক্ষে বাংলাদেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন জামাল ভূঁইয়া। তিনিই প্রথম বিদেশে জন্ম নেওয়া ক্রীড়াবিদ, যিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করেছেন বাংলাদেশের।

কাতারের বিপক্ষে সেই গোল

এরপরের গল্প এগিয়ে যাওয়ার। শেখ জামালের জার্সি গায়ে দেশের ক্লাব ফুটবলে অভিষেক হয় তাঁর। ঘরোয়া ফুটবলে তার ব্যক্তিগত নৈপুণ্য মুগ্ধ করত ঢাকার ফুটবল দর্শকদের। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ফুটবল টুর্নামেন্টে আইএফএ শিল্ড ২০১৪ এর ফাইনালে শেখ জামালকে তোলার পিছনে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। যদিও দুর্ভাগ্যজনকভাবে ট্রফি জিততে ব্যর্থ হয়েছিল তার দল।ওই বছরই ভুটানে অনুষ্ঠিত কিংস কাপে চ্যাম্পিয়ন হয় শেখ জামাল। ক্লাবের হয়ে জিতেন প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফি।

ক্লাবের হয়ে যেমন দেখিয়েছেন দুর্দান্ত পারফরমেন্স, ঠিক তেমনি লাল সবুজ জার্সিতেও দেখিয়েছেন অসামান্য ক্রীড়ানৈপুণ্য। দলের প্রথম একাদশে জায়গা করে নেন তিনি। হয়ে উঠেন দলের অপরিহার্য সদস্য। ২০১৫ সালে বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপের ফাইনালে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করলেও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন তিনি।

এরপরের গল্পটা হল চোট ও ফর্মের সাথে যুদ্ধ করা। সাবেক ডাচ কোচ ডি ক্রুইফ তাকে বাংলাদেশের রয় কিন বলতেন। সার্বিয়ান কোচ কাভাজোভিচের চোখে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সেরা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। আর দেহ গঠনের সাথে মিল থাকার দরুন তাকে দর্শকেরা বলতেন বাংলাদেশি মাশচেরানো।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে

এই জামাল চোট ও ফর্মের সাথে যুদ্ধ করে পার করেন কঠিনতম সময়। ২০১৬ সালে দলের দায়িত্ব নেন বেলজিয়ান টম সেইন্টফিট।জামালের ব্যাপারে তার ধারণা ছিল নেতিবাচক। কোচ সেইন্টফিট নাকি জামালকে বলেছেন, ‘ওহ জামাল, তুমি অনেক বেশি মোটা, তুমি ৯০ মিনিট দৌড়াতে পারবে না, তুমি খেল স্ট্রাইকারের মত, আমার দরকার মিডফিল্ডার!’ টম সেইন্টফিটের দলে উপেক্ষার স্বীকার হতেন ডেনমার্কে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার। ২০১৬ সালের সেই ভুটানের বিপক্ষে ৩-১ ট্রাজেডির ম্যাচে তাকে প্রাথমিক দলেও ডাকেন নি সেইন্টফিট।

ভুটানের বিপক্ষে সেই ম্যাচের পর ১৭ মাস স্বেচ্ছানির্বাসনে যায় বাংলাদেশ ফুটবল দল। লাওসের বিপক্ষে লাওসের মাটিতে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে বহুদিন পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফেরে বাংলাদেশ। মূল দলে ডাক পান জামাল ভুঁইয়া।

২০১৮ সালে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ পুরুষ ফুটবল দলের অধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করা হয় অভিজ্ঞ জামাল ভূঁইয়ার নাম। ততদিনে বাংলাদেশের কোচের চেয়ারটি টম সেইন্টফিটের পর অ্যান্ড্রু অর্ডের হাত থেকে এসেছে ব্রিটিশম্যান জেমি ডের কাছে। এই কোচের রয়েছে আর্সেনালের যুবদলে খেলার অভিজ্ঞতা। এশিয়ান গেমসের প্রথম ম্যাচে আর্মব্যান্ড হাতে নিয়ে মাঠে নামেন জামাল ভূঁইয়া।

উজবেকিস্তানের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ৩-০ ব্যবধানে পরাজিত হলেও ম্যাচের পারফরমেন্স প্রশংসা কুড়ায় দর্শকদের কাছ থেকে। পরের ম্যাচে এগিয়ে যেয়েও ১-১ গোলে ড্র করে থাইল্যান্ডের সাথে, যাদের সাথে সর্বশেষ মোকাবেলায় জাতীয় দল হেরেছিল ৫-০ ব্যবধানে। আর গ্রুপ পর্বের শেষম্যাচে তার গোলেই কাতারকে হারিয়ে নক আউট পর্ব নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশি ফুটবল ভক্তরা তাকে ‘বাংলার মাশচেরানো’ ডাকলেও লুকা মদ্রিচ আর টনি ক্রুসের ভক্ত আমাদের জামাল ভুঁইয়া।আর রোল মডেল হিসেবে মানেন ডেনিশ ফুটবলার মাইকেল লাউড্রপকে।

২০১৪ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে দ্বিতীয়ার্ধের ইনজুরি টাইমে গোল করে রিয়াল মাদ্রিদের সার্জিও রামোস দলকে দেখিয়েছিলেন শিরোপা জয়ের রাস্তা। ২০১৬ সালে ইউরো ফাইনালে পর্তুগিজ ফুটবলার এডার অতিরিক্ত সময়ে গোল দিয়ে দেশকে উপহার দিয়েছিলেন প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফি। ২০১৮ সালে বাংলাদেশের জার্সিতে ঠিক যেন এডার, রামোসের কাজটিই করেছেন জামাল ভুঁইয়া। বাংলাদেশের ফুটবল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এটা বললে অত্যুক্তি হবে না বোধ করি!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।