দশক সেরা ১৫ বাংলা ছবি

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

২০১০ থেকে ২০১৯। একটা দশক পার করলাম আমরা, একটা দশক পার করল বাংলা ছবি। এই দশকে বাংলা ছবির মান, নির্মাণ,পরিবেশ, বিপণন, সঙ্গীত সবকিছুই উন্নত হয়েছে পরিবর্তিত হয়েছে। বাঁধা গতের বাইরে বাংলা ছবি বানানো হচ্ছে। বলা ভালো, এই দশকে ছক ভাঙা গল্পের বাংলা ছবি গুলোই দর্শকের মনকে নাড়া দিয়েছে বেশি। যেসব বিষয় নিয়ে ছবি হবে তাও বাংলা ভাষায় কেউ ভাবতেই পারতো না, সেইছবি গুলোই এই দশকে উল্লেখযোগ্য। ফর্মুলার বাইরে এসব ছবি যেমন পেয়েছে বক্স অফিস সাফল্য, তেমনি পেয়েছে ফেস্টিভালে অকুন্ঠ প্রশংসা।

বেছে নিলাম দশকের সেরা পনেরো বাংলা ছবি। ২০১০ থেকে ২০১৯ দশ বছরের সেরা পনেরো বাংলা ছবি।

  • ১. দ্য জাপানিজ ওয়াইফ (জাপানি বউ) (২০১০)

চিঠির মাধ্যমে পরিচয়, প্রেম, বিয়ে কিন্তু যাতে নেই কোনো সহবাস, নেই কোনো রোজকার পাশ ফিরলে পরস্পরকে দেখতে পাওয়া। দুজন স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ভৌগলিক দুরত্ব বিস্তর। তবু তাঁদের ভালোবাসায় বিশ্বাসে ঘাটতি নেই। চিঠির অক্ষরে অক্ষরে দৈনন্দিন জীবনের গল্প একে অপরকে শুনিয়ে যায় পাত্র-পাত্রী। কখন চিঠি, কখন লং ডিসট্যান্ট টেলিফোন কল। কুণাল বসুর লেখা কাহিনী অবলম্বনে অপর্ণা সেন পরিচালিত ‘ দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’ ছবিটি যেন কবিতার মতো অপ্রতীম।

প্রেম কি শরীর,যৌনতা ব্যতীত হয়? নাকি দুরত্বকেন্দ্রিক বৈবাহিক সম্পর্কে বিশ্বাস বছরের পর বছর টিকিয়ে রাখা সম্ভব? সেসব উত্তর পেতে দেখতে হবে এই ছবি। ছবিটা নতুন করে ভাবায়। পত্রমিতালী দিয়ে পরিচয় জাপানের মিয়াগির সঙ্গে সুন্দরবনের স্নেহময়ের। শুধু চিঠির উপর একটা সম্পর্ক টিঁকে আছে। যেখানে স্বামীর মৃত্যুর পর জাপান থেকে ক্যান্সার আক্রান্ত জাপানি বউটি ছুটে আসে। দুটো মানুষের প্রচণ্ড ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে এই কবিতা-ছবি বাংলা ছবির ইতিহাসে রয়ে যাবে। রাহুল বোস এবং চিগুসা তাকাকু দুর্দান্ত।

অপর্ণা সেন – মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়ের আশির দশকে ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’ ছবির পর একসঙ্গে কাজ এ ছবিতে, যখন অপর্ণা পরিচালিকা মৌসুমী অভিনেত্রী। মৌসুমী ছবির সুর ধরে রাখেন তুখোড় অভিনয়ে … কি কমেডি কি আবেগ। সঙ্গে রাইমা সেন বিধবা লুকে কি ভীষন অপাপবিদ্ধা। রাইমাকে ভীষন সুন্দর ব্যবহার করেছেন অপর্ণা। জাপানি ঘুড়ি থেকে সুন্দরবন … ছবির দৃশ্যায়ন মনমুগ্ধকর। এই ছবি ক্রসওভার ছবি, ভাষাগত ভাবে বাংলার চেয়ে ইংরাজি বেশী তবু বাংলার স্রষ্টার সৃষ্টি তাই দশকের একটি সেরা ছবি হতেই হবে।

  • ২. আরেকটি প্রেমের গল্প (২০১০)

সমকামিতা কোনো রোগ নয়, আসলে রোগগ্রস্থ সমাজ।

সমকামিতা হঠাৎ করে উদয় হয়নি চিরকালীন সত্য এটি। একই লিঙ্গে দুজন দুজনকে ভালোবাসলে গোপন করতে হত, বলতে পারতনা তাঁরাও কাপল। কিন্তু ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ ছবি যেন সমাজকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখালো,ভুল ভাঙালো যে সমকামীরা অপরাধী নয়। স্বর্গীয় ঋতুপর্ণ ঘোষ , চপল ভাদুড়ি এবং কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ত্রয়ী মিলে সমাজকে দিলেন অন্যরকম ভালোবাসার বার্তা। সমকামকে রুপান্তরিত করলেন সমপ্রেমে। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের এ ছবিতে বলিউড নায়িকা রেখা-র মতো সেজে অভিনয় করলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। বললেন তাঁর এতদিনকার ইচ্ছের কথা।

অন্যদিকে চপল ভাদুড়ি ওরফে চপলরাণীর জীবনও আগেকার দিনে ব্যতিক্রম ছিলনা। সেই লড়াই ঋতুপর্ণ থেকে মানবী আরো সবাই লড়লেন লড়ছেন, কোনো উভকামী পুরুষকে ভালোবেসে কোনো সমকামী পুরুষ কখন যেন তাঁর রক্ষিতা হয়ে যাচ্ছেন … তবু ভালো কিছু ঘটবেই এই অপেক্ষায় প্রেমিকের সংসারে দাসীবৃত্তি – যুগ বদলেছে আজ ভাবনা বদলেছে সাহস বেড়েছে স্বীকৃতিও পাচ্ছেন অনেক সমকামী দম্পতি। তবে শুধু নারীসুলভ পুরুষ মানেই সে সমকামী , কিংবা সমকামী মানেই সে সহস্রভোগ্য এইসব মিথ ভাঙার আজও প্রয়োজন।

সমকামী সম্পর্কেও মান অভিমান,অপেক্ষা,মেসেজ লিখেও মুছে ফেলা সবই থাকে নেই শুধু স্বীকৃতি। ৩৭৭ ধারা এরপর পর ঘটল। ঋতুপর্ণ পরে ‘চিত্রাঙ্গদা’ বানিয়েছেন কিংবা ‘নগর কীর্তন’ এই দশকেই। শুরুটা করেছিল কিন্তু ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’। এই দশকের কেন সমগ্র ফিল্ম ইতিহাসে এ ছবি উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে।

  • ৩. ভূতের ভবিষ্যত (২০১২)

সত্যজিৎ রায়ের পর ভূতেদের নিয়ে কেউ সেরা ছবি বানালো যেটা স্যাটায়ারধর্মী কিন্তু হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাবে এমন। ছবির পরিচালক অনীক দত্ত। ভূতদের দেখে ভয় পাবার চেয়ে বেশী হাসি পাবে অথচ মজার ছলে পরিচালক সামাজিক পরিকাঠামোতে আঘাত হেনেছেন। এমন কেউ নেই যে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ দেখেননি।

ছবিটা যতবার দেখুন ততবারই মনকে রিফ্রেশ করে দেবে আবার নাড়িয়েও দেবে।

কদলীবালা কি হাতকাটা দিলীপ প্রতিটি যুগের ভূত চরিত্রকে আইকনিক করে তুলেছেন অনীক দত্ত। এমন একখান ছবি তিনি বানালেন এই ছবি টপকানো অন্য কারো পক্ষে মুশকিল। এই দশকে এই ছবি মাস্ট ওয়াচ। ভীষন ভীষন আধুনিক ছবি। আট থেকে আশি সবার ভালো লাগবে।

  • ৪. মেঘে ঢাকা তারা (২০১৩)

কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ এমন একটি ছবি যে ছবির প্রতিটি স্তর ভাবাবে। কোনো ফাঁকি নেই প্রতিটি চিত্রণে … অভৃতপূর্ব। এছবি বুঝতে ঋত্বিক ঘটকের ছবিগুলো দেখা থাকতে হবে। এ ছবি শুধু ঋত্বিক ঘটকের জীবনের ছবি নয়, এ ছবি বহু বছর পর একটি রাজনৈতিক ছবি, বাংলায়, যা আমাদের নিজেদের মধ্যে কিছু প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে।

অনেক দশকের সিনেমার ভাষা বদলে দিল এ ছবি। শাশ্বত চ্যাটার্জ্জী, অনন্যা চ্যার্টার্জ্জী, শুভাশীষ মুখার্জ্জী এবং প্রায় সকলেই এই ছবির মূল স্পিরিট বজায় রেখে অভিনয় করেছেন। বাংলা ছবিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে এগিয়ে দিল কমলেশ্বরের ‘মেঘে ঢাকা তারা’।

  • ৫. সহজ পাঠের গপ্পো (২০১৬)

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘তালনবমী ’ ভেঙে পরিচালক মানস মুকুল পাল তৈরি করেছেন ‘সহজ পাঠের গপ্পো’। প্রথম ছবিতেই দুই শিশুর মাধ্যমে দর্শকদের সহজ পাঠ শিখিয়েছেন পরিচালক। ছবিটা প্রথমদিকে প্রচার না পেলেও কিছু হপ্তা পরে দর্শকরা হল হাউজফুল করে দেখে এবং মন্ত্রমুগ্ধ হয়। ছবিটা দেখে মনে পড়ে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’।

গ্রামবাংলার বুকে দুই শিশুর শৈশবযাপনের দুর্দান্ত দলিল এ ছবি। সামিউল আর নুর, দুই শিশু অভিনেতাই জাতীয় পুরস্কার পান। মানস মুকুলের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ছবি এটি ,পান ভবিষ্যতের আশাপ্রদ পরিচালকের বিএফজেএ পুরস্কার। মানস পুকুল পাল এ দশকের আশাপ্রদ পরিচালকই বটে।

এ ছবি সহজ পাঠের হাত ধরে কঠিন পাঠ শেখায়, চক্রান্তর পৃথিবীর গালে সপাটে চড় মারে। ‘তালনবমী’ এত বছর আগে প্রকাশিত একটি গল্প। কিন্তু সেই গল্প যে এখনও প্রাসঙ্গিক, তারচেয়েও বিস্ময়ের সেটা নিয়ে এই সময়ে দাঁড়িয়ে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক সিনেমা বানিয়ে ফেলা যায়।ছবিটি সবার দেখা উচিত। শেখার, বোঝার, ভাবার।

  • ৬. মুক্তধারা (২০১২)

‘মুক্তধারা’ এক আবিস্কারের ছবি। যা ভাবতে পেরেছিল শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়। সংশোধনাগার থেকে সাজা শেষ করে বেরনো এক মানুষকে মূলস্ত্রোতে ফেরানো এবং তাঁকে সমাজে স্বীকৃতি দেওয়া। ‘মুক্তধারা’ সেই গল্প বলে। আর যাকে নিয়ে গল্প সে নাইজেল আক্কারা ভিকি। যাঁর জীবনের গল্প ‘মুক্তধারা’।

শিবপ্রসাদ-নন্দিতা আবিস্কার করেন নাইজেলকে। ‘মুক্তধারা’ ছবি হিসেবেও উন্নতমানের যা শুধু প্রশংসিত নয় বক্সঅফিস রের্কড করে এই ফর্মুলার বাইরের ছবি। সঙ্গে অবশ্যই দেবী সরস্বতীর মতো ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত যিনি ছবিতে নাইজেল ওরফে ইউসুফকে রত্নাকর থেকে বাল্মিকীতে উত্তরণ ঘটাচ্ছেন। একজন লাইম লাইটে থাকা মহাতারকা নায়িকা আর তাঁর নায়ক একজন সংশোধনাগার ফেরত মানুষ (কয়েদী বললাম না , অন্ধকার জগত শেষ করেই এসছেন), এই দুই বিপরীত মেরুর মানুষকে নিয়ে ছবি এবং তা সুপারহিট।

চলচ্চিত্র মাধ্যমে ‘বাল্মিকী প্রতিভা’ মঞ্চস্থ করে চিত্রনাট্যের মধ্যে দিয়ে দেখানো এবং দর্শককে চোখ ফেরাতে না দেবার ম্যাজিক দেখালো প্রথম ‘মুক্তধারা’। যে ছবিটা বক্সঅফিস হিট হবার পর নাইজেল সমসাময়িক অন্য সুপারস্টার নায়কদের ঈর্ষার কারন অবধি হন। ‘গোত্র’র তারেক ওরফে নাইজেল নিজে এখন আরো অনেক জেল ফেরত মানুষের আলোর দিশারী। ‘মুক্তধারা’ শুধু তো ছবি নয় সমাজ সংস্কার করার ভাষা।

  • ৭. হৃদ মাঝারে (২০১৪)

ছবির চিত্রনাট্য এবং পরিচালনা রঞ্জন ঘোষ। ওথেলোর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে এবং ম্যাকবেথ ও জুলিয়াস সিজারের উপাদানগুলিকে একত্রিত করে, এটি উইলিয়াম শেক্সপিয়রের রচনার উপর ভিত্তি করে বাংলা ভাষায় প্রথম চলচ্চিত্র এবং এটি আন্তর্জাতিকভাবে ওথেলোর শীর্ষ পাঁচটি বিশ্ব অভিযোজনগুলির মধ্যে একটি হিসাবে বিবেচিত হয়। ছবিটিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক একাডেমিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সমালোচকরা এটিকে ভারতীয় চলচ্চিত্রে শেক্সপিয়ারের সেরা দশটি অভিযোজনগুলির মধ্যে বিবেচনা করেন। পরিচালক রঞ্জন ঘোষ তাঁর এই প্রথম চলচ্চিত্রে ওথেলো, হ্যামলেট, ম্যাকবেথ, জুলিয়াস সিজারের সার্বজনীনতাকে সালাম জানিয়েছেন … ক্লাসিকগুলি নিজের ছন্দে মান অক্ষুন্ন রেখে লেখা সবসময়ই একটি চ্যালেঞ্জ যা করে দেখিয়েছেন রঞ্জন ঘোষ। আবীর চ্যাটার্জ্জী-রাইমা সেন এই ছবিতে প্রথম জুটি বেঁধেছিলেন।

আবীরের একটি সেরা চরিত্র এই ছবিতে। রাইমাকেও দারুন ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। ইন্দ্রাশীষ রায় চোখে পড়েন। অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ এবং আরএসএ পরীক্ষা বোর্ড ‘হৃদ মাঝারে’কে তাদের ‘হিরোস এবং ভিলেনস – ওথেলো’ থিম সহ ‘আ লেভেল ড্রামা অ্যান্ড থিয়েটার’ কোর্সের জন্য অন্তর্ভুক্ত করেছে। ছবিটির চিত্রনাট্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত ‘বাংলার শেক্সপিয়ার’ প্রকল্পের মাধ্যমে ইউজিসি সাহিত্যের সংরক্ষণাগারভুক্ত করা হয়। তিন দশকেরও বেশি সময় পার হওয়ার পরে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে শ্যুটিং করা প্রথম বাংলা ছবি হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেছে ‘হৃদ মাঝারে’। সর্বশেষ ১৯৭৯ সালে তপন সিনহা অ্যাডভেঞ্চার ফিল্ম ‘সবুজ দ্বীপের রাজা’ ছবির পোর্ট ব্লেয়ারে শুটিং করেছিলেন।

রঞ্জন ঘোষের ২০১৯ রিলিজ ছবি ‘আহা রে’ ছবিটিও প্রশংসা ও সাফল্য দুই পেয়েছে। চোখ রাখতেই হবে রঞ্জন ঘোষের পরবর্তী কাজে।

  • ৮. আসা যাওয়ার মাঝে (২০১৪)

এইসময়ে দাঁড়িয়ে নির্বাক ছবি বানিয়ে দেখিয়েছেন আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত, অথচ যে ছবি অত্যন্ত সবাক।

স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কাজে বেরোন একজনের ডে-শিফট অন্যজনের নাইট-শিফট। দুজন শুধু দুজনকে ডেকে দিয়ে যান আর সারাদিন রাতে যাদের দেখা হয়না। এমন একটি বিষয় নিয়ে ছবি অভূতপূর্ব। ছবিটা কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে যেকজন দেখেছিলেন তাঁদের মন ছুঁয়ে যায়। পড়ে খুব অল্প হল রিলিজ হলেও টিকিট পাওয়া হটকেক হয়ে ওঠে।

ছবিটা ইউটিউব প্ল্যাটফর্মেও সবার পছন্দের সেরার তালিকায়। ঋত্বিক আর বাসবদত্তা তাঁদের জীবনের অন্যতম সেরা অভিনয়টা করে ফেলেছেন। এই ছবি এই দশকের প্রাপ্তি। আদিত্য বিক্রমের দ্বিতীয় ছবি ‘জোনাকি’ হল রিলিজ হয়নি কিন্তু আরেকটি মাস্টারপিস। স্বর্গীয় ললিতা চট্টোপাধ্যায়ের সারাজীবনে সেরা চরিত্র এ ছবিতে। তবে প্রথম বাঁক বদল ঘটালো ‘আসা যাওয়ার মাঝে’।

  • ৯. চতুষ্কোণ (২০১৪)

চারজন পরিচালক, চারটি গল্প এবং একজন প্রযোজক যে বানাবেন একটি ফিল্ম। যার গল্প হবে সেরা তার গল্পেই হবে সিনেমা। কিন্তু প্রতিটা গল্পের শেষে একটা কমন জিনিস থাকতে হবে। তা হলো মৃত্যু। ছবি শেষের টুইস্টটা ছবিটাকে আরো উন্নত করে তোলে এটাই সৃজিত মুখোপাধ্যায় ম্যাজিক।

ছবিতে অপর্ণা সেন, গৌতম ঘোষ, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় এবং কৌশিক গাঙ্গুলীর দুরন্ত অভিনয়। এমন ধারার অভিনয় আগে বাংলা ছবিতে হয়নি। অনেক যুগ পর চিরঞ্জিত চক্রবর্তীকে দুর্দান্ত ব্যবহার করেন সৃজিত। চিরঞ্জিতের অন্যতম সেরা অভিনয়। চিরঞ্জিত নিজেও বাস্তবে একজন সফল পরিচালক।

এমন মেকিং, সিনেমাটোগ্রাফি ও স্ক্রিনপ্লে বাংলা ছবিতে খুবই বিরল। অনুপম রায়ের সঙ্গীতে লগ্নজিতার ‘বসন্ত এসে গেছে’ গান বাংলা ছবির ইতিহাসে আইকনিক।

পরমব্রত’র চরিত্রটি আগে স্বর্গীয় ঋতুপর্ণ ঘোষের করবার কথা ছিল। সৃজিতের সেরা কাজ ‘বাইশে শ্রাবণ’ কিংবা ফিল্ম হিসেবে ‘এক যে ছিল রাজা’ ও থাকবে এই দশকে। কিন্তু দশকে একটা ধরলে অভিনবত্বে ‘চতুষ্কোন’ সেরা। সেরা পরিচালক ও সেরা চিত্রনাট্যে জাতীয় পুরস্কার পান সৃজিত। সেরা সিনেমাটোগ্রাফিতেও জাতীয় পুরস্কার পান সুদীপ চ্যাটার্জ্জী।

  • ১০. বাকিটা ব্যক্তিগত (২০১৩)

মোহিনী গ্রাম। যে গ্রামে গেলে প্রেমে পড়া যায়। প্রকৃত প্রেম খুঁজে পাওয়া যায়। যারা খুঁজছেন প্রকৃত প্রেমিক প্রেমিকা তাঁদের প্রেমে ফেলবেই এই মোহিনী গ্রাম। এমন এক গ্রামের সন্ধান দিয়েছেন পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য। যা আগে আমরা দেখিনি। ঋত্বিক চক্রবর্তী আর অপরাজিতা ঘোষ দাস ওঁদের জীবনের সেরা কাজটা করে ফেলেছেন এ ছবিতে।

‘বাকিটা ব্যক্তিগত’-র একটা জাদু গল্প আছে। ছবিটা দর্শকের কাছে যাতে পৌঁছোয় তাই সৃজিত মুখার্জ্জী প্রদীপ্তর পাশে দাঁড়িয়ে পরিবেশনা করেছিলেন এ ছবি। প্রদীপ্ত ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’ করলেন প্রশংসাও পেয়েছেন কিন্তু ‘বাকিটা ব্যক্তিগত’ আর মোহিনী গ্রাম একটাই হয়।

  • ১১. পিউপা (২০১৭)

স্বচ্ছ, সৎ শিল্প আছে এই পরিচালকের ভাবনায় ও তাঁর ছবি গুলিতে। তিনি হলেন ইন্দ্রাশিস আচার্য। কর্পোরেট কর্মজগতেও থেকেও, পেছনে বড় ব্যানার না থাকা সত্বেও অভিনব ভাবনার ভালো ছবি তৈরী করে চলেছেন। তাঁর প্রথম ছবি ‘বিলু রাক্ষস’ নাড়িয়ে দেবার মতো ছবি। কিন্তু দ্বিতীয় ছবি আরো একধাপ এগিয়ে ‘পিউপা’।

ছবির বিষয় মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে কলকাতায় ফিরে আসে ছেলে শুভ্র। সমস্ত কাজকর্ম শেষে ফিরে যাওয়ার পথে বাবার অসুস্থতা আটকে দেয় শুভ্রকে। হঠাৎ কোমায় চলে যায় তার বাবা। এ দিকে বাবাকে ফেলে কলকাতা ছাড়তে চায় না শুভ্র। বিদেশে গবেষণারত বান্ধবীও তাঁকে ছেড়ে দেয়। এরমধ্যে ভিন্নধর্মী দর্শন ছবিটাকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। স্বেচ্ছামৃত্যু না স্বাভাবিক মৃত্যু? শুধু এই বিষয়েই এছবি নয় ছবিটা আরো অনেক বিষয় খুঁড়ে আনে। ইন্দ্রাশীষ আচার্যর দিকে আমাদের আগামী দশকে চেয়ে থাকতে হবে।

  • ১২. ফড়িং (২০১৩)

বয়ঃসন্ধির যৌন ফ্যান্টাসি ‘ফড়িং’ ছবির মূল উপপাদ্য বিষয়। শুধু সেখানেই আটকে নেই ছবিটা প্রাণের টান কতদূর পর্যন্ত সাহস যোগায় সেটাও দেখার মতো। ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর প্রথম ছবি ‘ফড়িং’। দিদিমণি রূপে সোহিনী সরকার তো বটেই সঙ্গে ছবির প্রাণ ধরে রেখেছে কিশোরশিল্পী ফড়িং ওরফে আকাশ অধিকারীর অভিনয়।

সব টিনএজ বয়েজ স্কুলের ছেলেদের প্রবল কৌতুহলের বিষয় হল নারীশরীরচর্চা। সেই ফ্যান্টাসি যদি হয় ছাত্রের দিদিমণির প্রতি। যে দিদিমণির খোঁজে ফড়িং বাড়ি থেকেও উড়ে যায় অজানার জগতে। এমন একটা কনসেপ্ট নিয়ে ছবি প্রচারের অভাবে বানিজ্য সফল অতটা না হলেও টেলিভিশন কি ছোটো প্ল্যাটফর্মে বিশাল জনপ্রিয়তা পায় ‘ফড়িং’।

  • ১৩. ছোটদের ছবি (২০১৪)

বামন মানুষরা আমাদের কাছে হাসির পাত্র। যাদের বাংলা ছবি হিন্দি ছবি ব্যবহার করেছে জোকার হিসেবে। আশির দশকের অনেক নাচের দৃশ্যে, হোলির গানে এই বামনদের বাঁধা জায়গা ছিল। তাঁরা শীতকালে সার্কাসে খেলা দেখাত দেখায় আজও। জীবনের বেসিক চাহিদা মেটাতে সার্কাসে নানা খেলা দেখিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জীবন যাদের।

ওরাও কিন্তু সমাজে প্রান্তিক মানুষ। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ঘটালেন বিস্ফোরণ, বামনদের নায়ক নায়িকা করে করলেন ছবি। ‘ছোটদের ছবি’। ওঁদের জীবন ওঁদের চোখ দিয়ে দেখালেন কৌশিক। আগে যেভাবে কেউ ভাবেনি। বামন মানুষদের সব মাপ আলাদা। ওদের বাসের সিড়ি দিয়ে ওঠা কতটা কষ্টসাধ্য, রোজকার কর্মক্ষেত্রে কি কি উপহাসের শিকার হতে হয় ওদের। দুলাল সরকার ও দেবলীনা রায় দুই বামন অভিনেতা অভিনেত্রী প্রধান চরিত্রে। বামন ছোটো সাইজের মানুষের জীবন কাহিনি দশক কেন ভারতীয় চলচ্চিত্রে আগে হয়নি।

  • ১৪. সমান্তরাল (২০১৭)

আরেকটি প্রেমের গল্প,নগর কীর্তন র থেকে এ ছবি আলাদা। ভাবনায় বিপ্লবে মিল থাকলেও এ ছবি শুধু তৃতীয় লিঙ্গের গল্প বলেনি। তৃতীয় লিঙ্গের ছাতায় রূপান্তরকামী থেকে নারীসুলভ সমকামী অনেককেই আজকাল ধরা হয়। ‘সমান্তরাল’ রূপান্তরকামী পুরুষের গল্প বলেনি বলেছে হিজড়া সন্তানের গল্প। যেটা ছবির কিছু ডায়লগে মেনশানড, খেয়াল করে না দেখলে অনেক দর্শকই রূপান্তরকামীর সঙ্গে গোলাবেন।

আগে বাংলা ছবি হিজড়া সন্তান পরিবারে জন্মালে কি প্রভাব, ফলাফল হয় এই নিয়ে হয়নি। এই সাহসী ভাবনার ছবি করে দেখালেন পরিচালক পার্থ চক্রবর্তী। হিজড়া সন্তানের পিতার ভূমিকায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় ডায়লগ চোখে জল আনবে। ঋদ্ধি সেন অপরাজিতা আঢ্য দুর্দান্ত। আর হিজড়ার ভূমিকায় পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের আকুতি দেখলে রুমাল বার করতেই হবে চোখের কান্না মুছতে। হিজড়া মানে শুধু তালি নয়! শুধু ট্রাফিক সিগনালে দাঁড়ানো নয়!

কেন তাঁরা সমাজে থেকেও প্রান্তিক? সর্বোপরি ‘সমান্তরাল’ দুর্বল প্রান্তিক মানুষদের কথা বলেছে। একটা পারিবারিক ছবি কিন্তু বিষয়ে কত কত এগিয়ে কত আধুনিক। যা পরিবার সমাজ চাপা দিয়ে রাখে সেই কঠিন সত্যি দেখিয়েছে এই ছবি। পরিচালককে কুর্ণিশ।

আরো এমন ছবি আনুন যা সমাজকে নাড়াবে।

  • ১৫. পুনশ্চ (২০১৪)

একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত নামী বয়স্ক লেখক আসছেন তাঁর প্রাক্তন ভালোবাসার নারীর বাড়ি বহু যুগের ওপার হতে জীবনের প্রান্তবেলায়। দুজনেই বিবাহিত সন্তান আছে দুজন দুজনের মতো প্রতিষ্ঠিত। এখন হয়তো প্রাক্তনের প্রতি সেই প্রেম অতো আর নেই কিন্তু বন্ধুত্বটা রয়ে গেছে। কিন্তু একজন পুরুষ তাও যে সেলিব্রিটি লেখক সে একজন একলা নারীর বাড়ি আসছেন সেটা কি চোখে দেখবে সমাজ? তাই তাঁরা গোপনে দেখা করবেন এক রাত কাটাবেন শুধু গল্প করেই ঐ মহিলার বাড়িতে ঠিক করেন। আর কাকপক্ষীতেও যেন টের না পায়।

মহিলাটি রান্না করেন লেখক বন্ধুর পছন্দের সব পদ, লেখক আসেন, সব তৃপ্তি করে খান কিন্তু তাঁদের গোপনীয়তার ঘোমটা খুলে যায় সেই রাতেই লেখকের হৃদরোগে আকস্মিক মৃত্যুতে। জানাজানি হয়ে যায়,পুলিশ কেস,সব খাবার পরীক্ষা তাঁদের বন্ধুত্বের বাইরে কতদূর গোড়ায় সম্পর্ক … সবার কৌতুহলের শিকার হয় মহিলাটি। শেষে লেখকের বর্তমান সাধাসিধে স্ত্রী আসেন এই প্রাক্তন প্রেমিকার বাড়িতে … তিনি কি ভাবে রিয়্যাক্ট করলেন স্বামীর প্রাক্তন প্রেমিকার কাছে? এই একদিনের ঘটনা নিয়েই শৌভিক মিত্রর ছবি ‘পুনশ্চ’।

ছবিটা দেখতে বসলে ওঠা যায়না। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়,রূপা গঙ্গোপাধ্যায়,অঞ্জনা বসু, সায়নী ঘোষ সবার অভিনয়ই দুর্দান্ত। শৌভিক মিত্র র এমন একটি বিষয় নিয়ে সম্পর্কের ছবি সম্পর্ককে নতুন করে চেনায়। ছবিটা সিনেমাহলে প্রচার না পেলেও ছোটো প্ল্যাটফর্মে প্রশংসিত।

  • দশকের বিস্ময় – গান্ডু (২০১০)

দশক সেরা পনেরোটা বাংলা ছবির তালিকা শেষ কিন্তু আরো একটি ছবিকে ‘দশকের বিস্ময়’ বলে রাখতেই হবে। যে ছবিকে এক দুই তিনে ফেলার প্রয়োজন নেই। সব ছবির থেকে অন্যধারার। ছবির নাম ‘গান্ডু’। আঁতকে উঠলেন? ছবিটা সমাজের গালে চড় মাড়ে!

গান্ডু (২০১০) ছবিটাকে অনেকেই নাম শুনে কি কিছু যৌন দৃশ্য দেখে পর্ণ মুভির আওতায় ফেলছেন কিন্তু এমন একটা সাহসী ছবি ভারত বলেই ব্যান হয় , কিন্তু এই বিকৃত সমাজকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন পরিচালক কিউ ওরফে কৌশিক মুখোপাধ্যায়। বাংলা ভাষায় ‘গান্ডু’ ছবিটি অত্যাশ্চর্য চাক্ষুষ এবং আখ্যান উৎসব।

একটা একুশ বাইশ বছরের ছেলে হতাশায়,নেশায়,অবদমিত কামনায়, বেকার হবার দুশ্চিন্তায় নিমজ্জিত। পাশের ঘরে যার মা বাঁধা বাবু গোছের লোকের সঙ্গে যৌনতায় লিপ্ত হয়। ছেলেটিকে অথচ তাঁদের থেকেই টাকা চাইতে হয়। এই ছেলেটির ভূমিকায় অনুব্রত বসুর অভিনয় নজিরবিহীন। ঋ ওরফে ঋতুপর্ণা সেন এই সাহসী ছবি করতে কিউ এর পাশে দাঁড়ান সেই সময়। ঋতুপর্ণা সেন , কমলিকারা,শিলাজিৎও চমকপ্রদ।

কিন্তু, সবার উপর দিয়ে যায় গান্ডু রূপী অনুব্রত। ছবিটা এই সময়ের দলিল। গান্ডু নিজেকে ঘেন্না করে নিজের বিকৃত অবস্থার জন্য কিন্তু নোংরা সমাজেও গান্ডু স্বপ্ন দেখে রকস্টার গায়ক হবার। বাবা-মা র জীবনের ভুল পদক্ষেপ সন্তানের জীবনেও প্রভাব ফেলে এই ছবি শেখায়। ‘গান্ডু’ নিউ ইয়র্ক সিটিতে সাউথ এশিয়ান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ও বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছিল। এছাড়াও ছবিটি স্লামড্যান্স চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে।

ছবিটাকে পর্ণ ছবি বলে হাসাহাসি না করে ছবির বিষয়বস্তু ধরলে ছবিটা সময়ের থেকে এগিয়ে। বছরের বিস্ময়ে তাই থাকবেই ‘গান্ডু’। প্রতিটি ছবি ছক ভাঙা ছবি। এই ছবি গুলোকে আঞ্চলিক ছবি বলে প্রান্তিক করে না রেখে গত দশকের ভারতীয় শ্রেষ্ঠ ছবি বললেও অত্যুক্তি হয়না।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।