দেশসেরা অ্যাকশন হিরো থেকে নিছক ট্রলের পাত্র

রুবেল নামটা বললে এই প্রজন্ম বুঝে ক্রিকেটার রুবেলের কথা। কিন্তু আমরা যারা আশি বা নব্বই এর বাচ্চা, তাদের কাছে রুবেল নামটা অন্য আরেকজন মানুষের কথা মনে করায়। তিনি চিত্রনায়ক মাসুম পারভেজ। ডাকনাম রুবেল।

নায়িকা বিপদে পড়েছে আর গুন্ডা বদমাশরা একসাথে বসে মদ খাচ্ছে, ঠিক তখনই রুবেল হাজির হয়ে সবাইকে সাইজ করতেন- এই সিনটা সবচেয়ে বেশি মনে আছে। রুবেল যখন হাজির হতেন, তখন ক্যামেরাটা নিচে থেকে উপরে টিল হতো, তখন একটা জিনিস কমন দেখা যেত সবসময় আর সেটা হচ্ছে কেডস- জি, পায়ে পরার কেডস। রুবেল মানেই সাদা কেডস থাকবেই। রুবেল ছাড়া কেডস যেন পাতা ছাড়া গাছ, পানি ছাড়া মাছ আর গ্যাস ছাড়া সিলিন্ডারের মতো ছিল।

লড়াকু নামের সিনেমা দিয়ে তার ক্যারিয়ার শুরু। সিনেমার নামটা তার জন্য পারফেক্ট ছিল কারণ রুবেল মানেই একশন, রুবেল মানেই মার্শাল আর্ট। রুবেল বলতে গেলে আমাদের জন্য গরীবের জ্যাকি চেন বা ব্রুসলি। এখনও মনে আছে, পাড়ায় পাড়ায় আলাদা মার্শাল আর্ট ক্লাব খোলা হইসিল শুধুমাত্র রুবেলের মার্শালআর্ট দেখার পরে। ১৯৮২ আর ১৯৮৩ সালে পরপর টানা দুইবার জাতীয় কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণ পদক লাভ করেন রুবেল- মুখের কথা না কিন্তু এটা!

রুবেল আর পরিচালক শহিদুল ইসলাম খোকন মানেই তখন সিনেমা হিট, আর সাথে হুমায়ূন ফরীদি থাকা মানে চেরি অন দ্যা কেক! এত দুর্দান্ত একটা জুটি ছিল এই তিনজনের, এত দারুণ কেমিস্ট্রি অনেক প্রথম সারির নায়ক নায়িকাতেও দেখা যায় না। এরা তিনজন থাকা মানেই প্রতিবার ভিন্ন গল্প, ভিন্ন পথে হাঁটা। নব্বই তে এই তিনজন যা করেছেন, ভাবলে অবাক হতে হয়।

মার্শাল আর্টে রুবেল এতটাই ভালো ছিলেন, সিনেমাতে এত দারুণ সব মারামারি দেখাতেন যে খোকন সিনেমার পোস্টারে ওপেন চ্যালেঞ্জ করতেন যে পুরো দক্ষিণ এশিয়াতে এইরকম অ্যাকশন এর আগে কেউ করেননি। কতটা কনফিডেন্স আর কাজের প্রতি নিষ্ঠা থাকলে এই ধরনের কথা বলা সম্ভব! একসাথে দুইজনে ২৭ টা সিনেমা করেছেন। দুইজনের করা একসাথে শেষ কাজ- চাই ক্ষমতা।

আমরা পাশের দেশের অক্ষয় কুমারের কথা বলি, এখন বলি টাইগার শ্রফের কথা, আর জ্যাকি চেনরা তো আছেনই। নিজেদের সব স্টান্ট তারা নিজেরা করেন আর এগুলো করতে গিয়ে অনেকবার বিপদের মুখে পড়েছেন। এসব নিয়ে অনেক নিউজ খুঁজলেই পাবেন। আমাদের রুবেলও কিন্তু কম ঝুঁকি নেননি। বিপ্লব সিনেমার একটি দৃশ্যের জন্য রুবেল একটি জ্যান্ত ইঁদুরে কামড়ে দেন! বিলিভ ইট অর নট!

খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটা কাজ ছিল এটা। বড় ভাই সোহেল রানা আর নিজের মায়ের কাছে এই দৃশ্যটা করার জন্য প্রচণ্ড বকা খেতে হয় তাকে। এতকিছু করেও শেষরক্ষা হয়নি, সেন্সর বোর্ড সিনেমা থেকে এই সিনটাই ফেলে দেয়! দিনমজুর সিনেমাতে আগুন লেগে গেছে এমন একটি ঘর থেকে বের হতে হবে রুবেলকে- এই সিনে সেই ঘরটা থেকে বের হতে জাস্ট কিছু সেকেন্ড দেরী হওয়াতে রুবেলের গোঁফের কিছু অংশ পুড়ে যায়, ভ্রূতেও সম্ভবত খানিকটা আগুন লাগে। ভাগ্য ভালো যে বড় কোন ক্ষতি হয়নি।

অ্যাকশন ছিল রুবেলের ইউএসপি। তার সবচেয়ে শক্তির জায়গা ছিল এটা, সেটাকেই তিনি দারুণভাবে ইউজ করেছেন। বিপরীতে রোমান্সে তিনি ছিলেন দুর্বল। এরপরেও হিন্দি স্বজনের রিমেক স্বজন আর বিশ্বপ্রেমিক সিনেমাতে ভালো লেগেছিল তাকে। অপহরণ সিনেমার কমেডিতে দারুণ ছিলেন তিনি। অকর্মা নামের একটি সিনেমাতে রুবেলকে গোঁফ ছাড়া দেখা যায়- কি যে অদ্ভুত দেখাচ্ছিল তাকে!

এই সিনেমার একটি সিনে এমন মার দেয়া হয় তাকে- মারের চোটে মুখ দিয়ে লালা ঝড়তে থাকে! গোঁফ ছাড়া কিছুক্ষণের জন্য ভণ্ড সিনেমাতেও দেখা গিয়েছিল তাকে। ভণ্ড সিনেমাটা রুবেলের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সিনেমা, এখনও আমি মাঝে মাঝেই দেখি। টানা ২৯ সপ্তাহ হলে চলেছিল সিনেমাতে, প্রচণ্ড ব্যবসাসফল হয়। উল্কা নামের একটি সিনেমাতে রুবেলকে নেগেটিভ রোলে দেখেছিলাম, ভালো করেছিলেন কাজ। মানুষ নামের আরেকটা ডিফারেন্ট সিনেমা আছে তার।

রুবেলের অন্যতম সেরা আরেকটা সিনেমা হচ্ছে মালেক আফসারির পরিচালনায় ঘৃণা। ভিলেন হিসেবে এই সিনেমাতে ছিলেন তিন জাঁদরেল- ফরীদি, খলিল, এটিএম শামসুজ্জামান- এই তিনজন রুবেলের জীবনটা জাহান্নাম বানিয়ে দিয়েছিলেন জাস্ট। রুবেলও পরে কড়ায় গণ্ডায় হিসাব বুঝে নেন! আহারে, কীসব অসাধারণ দিন যে গেছে রুবেলের কারণে!

রুবেল বাংলা চলচ্চিত্রের আশি ও নব্বই দশকের সব চেয়ে বেশি পারিশ্রমিক প্রাপ্ত নায়ক।তিনি কিন্তু শুধু পর্দার সামনের না, পেছনেরও নায়ক! নায়ক রুবেল একাধারে নায়ক, প্রযোজক, কণ্ঠশিল্পী ও চিত্রপরিচালক, ফাইট ডিরেক্টর । শুরু থেকেই তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি ফাইট ডাইরেক্টর হিসেবেও সফল ছিলেন। তাঁর সবগুলো ছবিতেই নিজস্ব ফাইটিং গ্রুপ ‘দ্য অ্যাকশন ওয়ারিয়রস’ নামে একটি ফাইটিং গ্রুপ ছিল।

তিনি এ পর্যন্ত প্রায় ১৭ টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। একটি সিনেমার কথা না বললেই না আর সেটি হচ্ছে- বিচ্ছু বাহিনী! ২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাতে একদল বাচ্চাকাচ্চাকে দিয়ে রুবেল যা অভিনয় বের করিয়ে এনেছেন আর যে লেভেলের মার্শালআর্ট দেখিয়েছেন, বিশ্বাস করেন আর নাই করেন, ঐ সময়ে বলিউডও ঐ জিনিস করতে পারতো না। এই সিনেমাটা এখন মুক্তি পেলে দারুণ সাড়া ফেলত, এরকম অ্যাকশন সিনেমা খুবই কম হয়েছে বাংলাদেশে।

রুবেল সম্ভবত একমাত্র নায়ক যার নিজের নামে সিনেমা আছে- রুবেল আমার নাম। রুবেলের একটা সিনেমা একবার দেখছিলাম টিভি তে, বাবা এসে হুট করে জিজ্ঞাসা করলেন- কি সিনেমা দেখিস? নাম কি? আমি বললাম- টর্নেডো কামাল। বাবার মুখ শক্ত হয়ে গেল, এমনভাবে আমার দিকে তাকালেন যেন আর একটু পরেই একটা আছাড় মারবেন। এটার কারণ ছিল। আমার মরহুম বাবার নাম ছিল কামাল।

একটা সময় নিজের লেভেলের চেয়ে অনেক নিচুস্তরের সিনেমা করেছেন রুবেল। সেসব সিনেমার নামও ছিল ভয়ংকর, নাম মুখে আনলে চাকরি থাকবে না! অনেক আহত হয়েছি ছেলেবেলার হিরোর এই ধরনের কাজ দেখে। এরপরেও তার প্রতি আলাদা একটা ভালোবাসা সবসময়ই রয়ে গেছে।

প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি বয়স তাঁর, কিন্তু এখনও বয়সের তুলনায় তিনি এখনও অনেক ফিট। চুল ফেলে দেয়ার কারণে বয়সটাও সেভাবে বোঝা যায় না। কারাতে নামের বিদ্যাটা তিনি ছোট ছেলেমেয়েদের শেখান আত্মরক্ষার জন্য। আমাদের নতুন প্রজন্মের ডিরেক্টররা একশন সিনেমা বানালে নতুন করে রুবেলের কথা ভাবতে পারেন।

ভেবেছিলাম রুবেলকে নিয়ে লেখার সময় পাব না। এলোমেলো কি লিখলাম জানিনা। কীভাবে যেন লিখে ফেললাম শেষ মুহূর্তে। যত ব্যস্তই থাকি না কেন, প্রিয় মানুষকে নিয়ে লেখার জন্য সম্ভবত কোনোভাবে টাইম বা সময় হয়েই যায়। এই সময় নিয়েও রুবেলের একটা সিনেমা আছে, নাম- টাইম নাই! আজব এক কাকতালীয় দুনিয়াতে আমাদের বসবাস!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।