সেরা তিন বাংলাদেশি থ্রিলার

বাংলাদেশের মুভি ইন্ডাস্ট্রি এমন এক আজব কারখানা যে এখানে থ্রিলার মুভি নির্মিত হয়েছে এটা শুনলেও অনেকের চোখ কপালে উঠার দশা হয়। ৬০ বছরের উপর বয়স হওয়া সত্ত্বেও এই ইন্ডাস্ট্রির সাবালকত্ব নিয়ে অনেকেই সন্দিহান।

যাই হোক সে বিতর্ক পেছনে রেখে যেটা নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি তাতেই থাকি। হ্যাঁ, ঢাকাই মুভি ইন্ডাস্ট্রিতেও কালেভদ্রে কিছু পারফেক্ট থ্রিলার তৈরী করার চেষ্টা হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি মুভি চেষ্টা করেছে থ্রিলার জনরায় ভালো কিছু উপহার দিতে। তো আমার দেখা বাংলা মুভিগুলোর মধ্যে সেরা বা পছন্দের দু’তিনটাকে নিয়ে এখানে সংক্ষেপে কথা বলবো।

  • ঢাকা অ্যাটাক (২০১৭)

নিঃসন্দেহে এটাই ঢাকায় নির্মিত সেরা অ্যাকশন থ্রিলার মুভি। দীপংকর দীপনের ‘ঢাকা অ্যাটাক’! এই ছবির দূর্দান্ত গল্পের গাঁথুনি রয়েছে। কালার গ্রেডিং, এডিটিং ছিল বাংলা ছবি হিসেবে আন্তর্জাতিক মানের! চিত্রনাট্য ছিল ফ্রেম টু ফ্রেম টানটান। ডিরেকশান দারুন।

অভিনয়, সংলাপ আর ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট মুভিটাকে বাংলাদেশরই অন্যতম আধুনিক ও আপ টু ডেট মুভিতে পরিণত করেছে। ভিএফএক্সের কাজ নিয়ে কিছু খুঁতখুঁত ভাব মনে কাজ করতে পারে কিন্তু বাংলাদেশী বাস্তবতায় পারফেক্ট পুলিশ এ্যাকশান থ্রিলার বলতে এটাকেই বুঝাতে হবে।

বাংলা মুভিতে যা বিরল থাকে সেই গল্পের ট্যুইস্ট মুভিতে যথাযথ দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। নায়কদের পাশাপাশি ভিলেনকে দেওয়া হয়েছে অন্যরকম গুরুত্ব ও প্রভাবশালী রূপে। একটা টানটান ও অনেকটাই মৌলিক গল্পের জন্য মুভিটা আলাদা সম্মান পাবে।

  • আয়নাবাজি (২০১৬)

‘আয়নাবাজি’ নিয়ে আমার বলার মতো ক্ষমতা খুব সীমিত। অন্যরকম ও দূর্দান্ত একটা গল্পকে নিয়ে পরিচালক অমিতাভ রেজা সকল বাংলাদেশী দর্শকদেরেই কাঁপিয়ে দিয়েছেন। চঞ্চলের আয়না চরিত্রের নানান ডাইমেনশন উপস্থাপনের যে অসাধারণ অভিনয় সেটাও এই মুভিটাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।

গল্পটায় যদিও কিছুটা ‘প্লটহোল’ রয়েছে কিন্তু নির্মাণ শৈলী আর উপস্থাপন কৌশলের কারণে সেগুলো কারুও মনে রাখার প্রয়োজনই পড়েনি। এই মুভিটার একটা বিশেষ দিক হলো এতে একটা ধীরস্থীর আর আয়েশি ভাব আছে। থ্রিলার জনরা হওয়া সত্ত্বেও অতিরিক্ত টানটান ভাব বা অতি রোমাঞ্চকে এড়িয়ে গিয়ে ভিন্নমাত্রায় কিছু দেবার চেষ্টা করছেন অমিতাভ রেজা।

দৃশ্য গঠন বা সিকোযেঞ্চ বিল্ডআপে চমৎকার কিছু কাজ করেছেন তিনি। তবে মুভিটা থ্রিলার হিসেবে আরেকটু গতিময়তা পেতে পারতো। তবে এই মুভিতে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা ঢাকার মুভিতে আগে কখনো পাওয়া যায়নি এবং কটু শুনালেও সত্য এর পরের অন্য মুভিগুলোতেও সেই আলাদা বৈশিষ্ট্য কেউ দেখাতে পারেননি। বৈশিষ্ট্য বলতে এমন কিছু যা আসলে আপনি কখনোই বাংলাদেশী মুভির হিসেবে গৎবাঁধা বা পরিচিত কাঠামোতে দেখেননি। ‘আয়নাবাজি’ এই জায়গাতেই সফল।

  • ক্ষতিপূরণ (১৯৮৯)

সেই ১৯৮৯ সালের ড্রামা, থ্রিলার মুভি। নির্মাতা মালেক আফসারি। আর এই মুভিও তিনি ‘হত্যা’ নামের এক হিন্দি মুভির গল্পের ছায়া অবলম্বনে তৈরী করেছিলেন। আবার ওই হিন্দি মুভিটাও আরেকটা দক্ষিণ ভারতীয় মুভির আদলে তৈরী। তো প্রশ্ন আসে এটা আমার কেনো সবচেয়ে পছন্দের বাংলাদেশী থ্রিলার হবে?

কারনটা হলো- থ্রিলার মুভির মূল যে জিনিসটা সেই ‘রোমাঞ্চ’। আর দূর্দান্ত নির্মাণশৈলীতা। প্রায় ৩০ বছর আগের মুভি অথচ মালেক আফসারি একটা আধুনিক ভাবনার ও উপস্থাপন কৌশলের মুভি দেবার চেষ্টা করেছেন তখনই। হিন্দি যে মুভিটার ছায়া অবলম্বনে তিনি ‘ক্ষতিপূরণ’ বানিয়েছিলেন সেটাও আমার দেখা ছিলো।

গোবিন্দ, নিলম অভিনীতি সেই মুভিটার গল্পটাকে মাথায় রেখে মালেক আফসারি ‘ক্ষতিপূরণ’ মুভিতে বাংলাদেশের পটভূমি ও সীমাবদ্ধতায় এতো বছর আগে গতিশীল ও রোমাঞ্চকর থ্রিলার দেবার চেষ্টা্ করেছেন। বোবা শিশুর বাবা-মাকে হত্যাকারীকে দেখে ফেলার কারণে সেই হত্যাকারী দ্বারা মেয়েটাকে সব সময় অনুসরণ ও তাঁকে নায়কের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা এই যে প্লট তার মধ্যেই যে কতভাবে দর্শকদের বিভিন্ন সিকোয়েন্সে রোমাঞ্চিত করার চেষ্টা করেছেন মালেক আফসারি তা যারা দেখেছেন তারাই ভালো বলতে পারবেন।

মুভিটা এতো বছর আগে নির্মিত হওয়া সত্ত্বেও এর কালার, ক্যামেরার কাজ, এডিটিং, সাউন্ড, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর, ডিরেকশন সব মিলিয়ে একটা সুপার প্যাকেজ ছিলো। বোবা মেয়ে থেকে শুরু করে ঠান্ডা মাথার খুনী, মাতাল নায়ক, পুলিশ অফিসার এমনকি কৌতুককর কামারের চরিত্রে যাকে যে জায়গায় দেওয়া হয়েছে সবার কাছ থেকেই জেনুইন অভিনয়টা বের করে এনেছিলেন আফসারি সেটাও এই মুভির আরেকটা বিশেষ দিক। আলমগীর, রোজিনা, খলিল, আহমেদ শরীফ, দিলদার, রোজী আফসারি সবাই দারুণ ছিলেন। তবে বোবা মেয়েটির চরিত্রে যে অভিনয় করেছিলো আর প্রায় সংলাপবিহীন ঠান্ডা মাথার খুনী চরিত্রে ড্যানি সিডাক ছিলেন সেরার সেরা।

ওই সময়ের স্বল্প বাজেটে ও সীমিত কারিগরি সহায়তায় নির্মিত ‘ক্ষতিপূরণ’ ছবিটির কাছে আজকের কোটি কোটি টাকার ঢাকাই মুভি পাত্তা পাবার কথা না। থ্রিলার মুভি কিন্তু শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরীব কারুর মাথার উপর দিয়ে যায়নি মুভিটি। টান টান উত্তেজনা নিয়ে টপ টু বটম এই মুভিটা সবাই উপভোগ করেছে। আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো এটাই সম্ভবত মালেক আফসারির সবচেয়ে ক্রিয়েটিভ মুভি। কপিরাইট হওয়া সত্ত্বেও ‘ক্ষতিপূরণ’ মুভিতে তিনি তার সর্বোচ্চ মেধার প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছিলেন।

একটু যোগ করা উচিৎ যে, এই তালিকায় অজ্ঞাতনামা, মুসাফির ইত্যাদি মুভিও জায়গা পেতে পারতো। তবে পছন্দের শীর্ষ তিনটা বাংলাদেশি থ্রিলার তাই ওগুলোকে একটু আলাদা রাখতেই হলো।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।