বলিউড ২০১৮: বছরের সেরা ১০ সিনেমা

বলিউডে ২০১৮ সালে কিছু অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছে। আমিসহ অন্য অনেক দর্শক যে চারটি সিনেমা নিয়ে বহুল প্রতীক্ষায় ছিলাম, একটাও অতি প্রিয় হয়ে উঠেনি। আমার দুই প্রিয় নায়কের দু’টি ছবিই ভীষণভাবে হতাশ করেছে। প্রিয় দুই পরিচালকের সিনেমা দর্শকজয় করলেও ব্যক্তিগত ভাবে অত ভালো লাগেনি। বড় বড় বাজেটের ছবির হতাশার ভিড়ে কিছু ছোট বাজেটের সিনেমা মুগ্ধতা ছড়িয়েছে। এই বছর মুক্তি পাওয়া সিনেমাগুলো যা দেখা হয়েছে, এর মধ্যে সেরা ১০ হিন্দি সিনেমা নিয়ে এই আয়োজন।

  • অক্টোবর

সিনেমার নায়িকা শিউলি, আর তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী ড্যান। সুজিত সরকারের এই ‘অক্টোবর’ সিনেমা দিয়ে অনেকদিন পর ভালোবাসার সিনেমা হিসেবে মন ছুঁয়ে গেছে। প্রেমিক- প্রেমিকার কোনো বাহুল্যতা নেই,আছে আস্থা আর বিশ্বাস। বিশেষ ধন্যবাদ জুহি চতুর্বেদী কে। সুজিত সরকার তাঁর গল্প বলার স্টাইলে ছবিটাকে অন্যমাত্রায় নিয়ে গেছেন। এই ছবির অন্যতম প্রধান সম্পদ অভিনয়, নবাগতা ভানিতা সান্ধু তাঁর অভিব্যক্তিতেই বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁর অভিনয় প্রতিভা, মায়ের চরিত্রে গীতাঞ্জলি রাও বেশ অনবদ্য। তবে অভিনয়ে বরুন ধাওয়ান নিজেকে অন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। সে তাঁর সময়ের সবচেয়ে হিট নায়ক, ড্যান চরিত্রটি তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পালক হয়ে থাকবে।

  • আন্ধাধুন

বলিউড তো বটেই উপমহাদেশের অন্যতম ডার্ক- থ্রিলার হিসেবে খেতাব পাবে শ্রীরাম রাঘবনের এই দুর্দান্ত সিনেমা ‘আন্ধাধুন’। অন্ধ সেজে পিয়ানো বাজায় আকাশ, জীবনে এসেছে প্রেমিকা সোফি।ঘটনাক্রমে জড়িয়ে যায় এক বিখ্যাত নায়কের খুনের সঙ্গে। ওই নায়কের স্ত্রী সিমি সত্যিই একদিন আকাশ কে অন্ধ করে দেয়। তারপর ঘটতে থাকে নানা ঘটনা, সিনেমার শেষে রয়েছে দারুণ চমক, যা সিনেমাটিকে আরো ‘স্পেশাল’ করে তোলে। আকাশ চরিত্রে আয়ুষ্মান খুড়ানার সেরা কাজ এটি। দক্ষ অভিনেত্রী টাবুর ক্যারিয়ারে আরেকটি ভালো সিনেমা যুক্ত হল। রাধিকা আপতের অবশ্য বিশেষ কিছু করার ছিল না, তবে বিশেষ করে বলতে হয় অমিত ত্রিবেদীর দুর্দান্ত আবহ সংগীত।

  • বিয়ন্ড দ্য ক্লাউডস

সিনেমার প্রধান চরিত্র আমির একজন ড্রাগ ডিলার, একদিন পুলিশের তাঁড়া খেয়ে দেখা হয় বোন তারার সাথে। অনাথ এই ভাই- বোনের অনেকদিন পর দেখা, অনেক অভিমান ও। একদিন এক আচমকা ঘটনায় তারা জখম করে ফেলে তাঁর মালিক আক্সিকে, ফলে তারাকে যেতে হয় জেলে। ওদিকে মূমুর্ষ আক্সি বেঁচে তুলতে আমির চেষ্টা করে যাচ্ছে। কারণ তাঁর জবানবন্দিতেই ছাড়া পাবে, ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও সেবা যত্ন করতে হয়। একদিন হাজির হয় আক্সির মা ও দুই মেয়ে, আমিরই তাদের আশ্রয় দেয়। শুরু হয় অন্যরকম গল্প,কাছের মানুষ না হয়েও তাঁরা যেন হয়ে উঠে খুব আপন মানুষ। এদিকে জেলে তারাও অন্যরকম শান্তি খুঁজে পায়। সম্পর্কের বিশ্বাসের দোলাচলে শেষ পর্যন্ত পরিণতি কি হবে!

বিশ্বখ্যাত নির্মাতা মাজিদ মাজিদিকে প্রথমেই ধন্যবাদ এইরকম গল্প বেছে নেবার জন্য, চাকচিক্যের আড়ালে এ যেন অন্য মুম্বাইয়ের গল্প। আমির চরিত্রে নবাগত ঈশান খাট্টার এককথায় অনবদ্য, নবাগতের পুরস্কার গুলো যেন তাঁর জন্য তুলে রাখা হয়, তারা চরিত্রে মালবিকাও ভালো। এর বাইরে আক্সির মায়ের চরিত্রে অভিনয় করা দক্ষিন ভারতের জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত অভিনেত্রী জি.ভি.সারদাও মন ছুঁয়ে গেছেন, বয়স হলেও অভিনয়কে ম্লান হতে দেননি। সব মিলিয়ে এটা মাজিদ মাজিদির সেরা ছবি অবশ্যই না,তবে এটিও বেশ ভালো সিনেমা। যারা ক্যানভাসে আঁকা ছবির মত সুন্দর সিনেমা খুঁজেন, তাদের জন্য এটা দেখা বাঞ্চনীয়।

  • তুম্বাড়

এই সিনেমার কাহিনী গড়ে উঠেছে তুম্বাড় নামের একটি গ্রামকে ঘিরে। তুম্বাড় গ্রামের ক্ষমতাধর এক ব্রাহ্মণ জমিদার পরিবারের এক কালো অধ্যায়কে কেন্দ্র করে সিনেমার গল্প প্রবাহিত হয়েছে। সিনেমার প্রেক্ষাপট তিনটি আলাদা সময় উঠে এসেছে। ঐতিহাসিক ও হরর-ফ্যান্টাসি ঘরানার মিশেলে নির্মিত এই সিনেমা প্রথম চিত্রধারণ করা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ছয় বছর আগে। রাহি অনিলের পরিচালনায় প্রধান ভূমিকায় ছিলেন সোহম শাহ, যিনি এই ছবিটির অন্যতম প্রযোজক। সঙ্গীতে ছিলেন অজয়-অতুল। উপমহাদেশের ‘সুপার-ন্যাচরাল’ ঘরানায় এই ছবিটি অন্যতম সেরা সংযোজন।

  • কারওয়ান

বাবার সঙ্গে বেশ দূরত্ব অবিনাশের, একদিন অফিস থেকে ফিরে এসে সংবাদ পায় তীর্থে যাবার সময় তাঁর বাবা মারা গেছেন। বন্ধু শওকতকে নিয়ে নিতে আসেন বাবার লাশ। কিন্তু ঘটনাক্রমে লাশ বদল হয়ে যায়। নিজের বাবার লাশ আনতে শওকতকে নিয়ে পাড়ি জমায় অনেক দূরের পথ, সঙ্গে যোগ দেয় আরেকটি লাশের নাতনী তানহা। তিনজনই নতুনভাবে পৃথিবীকে জানতে শুরু করে। আকর্ষ খুড়ানার এই ছবিটি দেখলে সত্যিই সুন্দর অনুভূতির সৃষ্টি হবে। ইরফান খানের অনবদ্য অভিনয়, সঙ্গে রয়েছে দুলকার সালমান ও মিথিলা পালকারের সরব উপস্থিতি। এই ছবির ফ্রেমিং আর স্টোরি টেলিংয়ের কোনো তুলনাই হয় না।

  • প্যাডম্যান

ভারতের মধ্যপ্রদেশের একটি গ্রামের সাদাসিধে যুবক লক্ষ্মীকান্ত চৌহান। গায়ত্রীর সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর লক্ষ্মী জানতে পারে মেয়েদের পিরিয়ড সম্পর্কে। একে ঘিরে নানা কুসংস্কার নজরে আসে তার। গায়ত্রীকেও একই কাজ করতে দেখে লক্ষ্মী।

স্ত্রীর জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে গিয়ে লক্ষ্মী দেখে, এর দাম অত্যন্ত বেশি। সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে,তাই গায়ত্রীর জন্য নিজের হাতে ন্যাপকিন তৈরি করে লক্ষ্মী। পিরিয়ড নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার জন্য লক্ষ্মীকে সমাজচ্যুত হতে হয়।নিজের পরিবারও তাকে ছেড়ে চলে যায়, এমনকি গায়ত্রীও। সাধারণ মানুষ থেকে ন্যাপকিন বানিয়ে বিখ্যাত হয়ে উঠার সত্য কাহিনী থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে স্বনামধন্য নির্মাতা আর বালকি নির্মান করেন ‘প্যাডম্যান’। নাম ভূমিকায় অক্ষয় কুমারের অভিনয় এক কথায় অনবদ্য।

  • বাধাই হো

নকুল সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে, সহকর্মী রিনিকে সে ভালোবাসে। পরিবারে আছে বাবা,মা,ছোট ভাই আর দাদী। সব মিলিয়ে তাদের ছোট পরিবার । হঠাৎ করেই নকুলের মা একটু অসুস্থ বোধ করলো। চিকিৎসক বললেন তিনি মা হতে যাচ্ছেন । নকুলের বাবা পরে গেলেন ঝামেলায়। এই বয়সে এসে লোকে কি বলবে। নকুলের মাও বিব্রত। এখন কি হবে!

ডাক্তার বলে দিয়েছে যদি অ্যবরেশন করতে হয় তবে যেন দ্রুত করে নেয় । কিন্তু না নকুলের মা বাচ্চা জন্ম দেবেন বলে ঠিক করেন।এই খবর শোনার পর পরিবারে শুরু হয় ঝামেলা, প্রতিবেশীরাও দেখছে ভিন্ন চোখে। এইসব বাধা পেরিয়ে নকুলের মায়ের আবার মা হবার গল্পই অমিত শর্মার ‘বাঁধাই হো’। নকুল চরিত্রে আয়ুষ্মান ভালো। তবে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছেন যথাক্রমে বাবা, মা ও দাদীর চরিত্রে অভিনয় করা দক্ষ অভিনয়শিল্পী জগরাজ রাও, নীনা গুপ্তা ও সুরেখা সিক্রি।

  • মুল্ক

বেনারসের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের একটি ছেলে সন্ত্রাসবাদী পরিচয়ে নিহত হওয়ার পর পুরো পরিবারের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়। মুহুর্তেই বদলে যায় চারপাশের মানুষগুলো। পাল্টে যায় তাঁদের ব্যবহার, তাঁদের মনোভাব। নির্মাতা অনুভব সিনহা এই গল্পটাই তুলে ধরেছেন সেলুলয়েডের পর্দায়। প্রধান ভূমিকায় জীবনের অন্যতম সেরা কাজ করেছেন ঋষি কাপুর। আর তাকে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছেন তাপসী পান্নু।

  • রাজি

কাশ্মীরের মুসলিম তরুণী সেহমত, যার নিষ্পাপ জীবন পাল্টে দেয় বাবা হিদায়াত খানের সিদ্ধান্ত। তাঁর নির্দেশে তাকে দেশের হয়ে চরবৃত্তির মতো বিপজ্জনক কাজে নামতে হয়। ভারতীয় গোয়েন্দা এজেন্ট খালিদ মিরের অধীনে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরে পাক সেনা অফিসার ইকবাল সাইদের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। সীমান্ত পেরিয়ে ইকবালের পরিবারের সঙ্গে বসবাসের সময় নিজের আসল উদ্দেশ্য গোপন করে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সে সন্ধান করতে থাকে। স্পাই থ্রিলার ভিত্তিক এই সিনেমায় সেহমতের চরিত্রে আলিয়া ভাটের অনবদ্য অভিনয়, মেঘনা গুলজারের নির্মান সিনেমাটিকে প্রানবন্ত করে তুলেছে।

  • মুক্কাবাজ

উত্তর প্রদেশের তরুণ মুষ্টিযোদ্ধা শ্রাবণ সাফল্যের প্রত্যাশায় কঠোর অনুশীলন করে। মুক তরুণী সুনয়নাকে সে ভালোবাসে। সে পরিশ্রম করে যাচ্ছে, কিন্তু সে জানে না বর্ণ প্রথা, স্বজনপ্রীতি, ডোপিং, সাম্প্রদায়িকতা আর লাগাতার শ্রেণি বৈষম্য তার জন্য কতটা বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এই গল্প নিয়েই অনুরাগ কশ্যপের সিনেমা ‘মুক্কাবাজ’। মুষ্টিযোদ্ধা চরিত্রে ভিনিত কুমার সিং নিজেকে বেশ ভালোভাবে মানিয়ে নিয়েছেন। মজার ব্যাপার হল অনুরগাগ কাশ্যপের পরিচালনায় সিনেমাটির স্ক্রিপ্ট এই ভিনিতেরই লেখা। জিমি শেরগিলও নিজের প্রতিভা দেখিয়েছেন।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।