তাপস পাল: বিরাট প্রতিভার বিরাট ভুলের মাশুল

| শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা থেকে |

ভুল পদক্ষেপ, রগচটা স্বভাব কিংবা ভুলভাল বক্তব্যের জন্য একালে তিনি ট্রল কিংবা লোকের ব্যাঙ্গের শিকার হন তিনি। তবে, একথা ঠিক যে মহানায়ক উত্তম কুমারের মৃত্যুর পর যে অভিনেতারা বাংলার দর্শকদের পর্দায় টেনে আনতে পেরেছেন তাঁদের একজন হলেন তাপস পাল। আশি ও নব্বই দশকে প্রজেনজিৎ, চিরঞ্জিতের সাথে তাপস পালের নামটিও তখন সমান মর্যাদা পেত।

এই তাপসই পালই কিন্তু মাধুরী দীক্ষিতের প্রথম নায়ক। ১৯৮৪ সালের ছবি ‘অবোধ’। এ ছবিটাও কি মিষ্টি। তিনিও প্রসেনজিতের মত ইন্ডাস্ট্রি হতে পারতেন। সব গুনই ছিল। কিন্তু হয়নি, ভুল সময়ে ভুল পথে হেঁটেছেন তিনি!

তাপস পাল – নামটা আজ পাপোস পাল বলে লোকে। যারা বলে তারা ‘অদ্দেকজন ওর অদ্দেক ছবি দেখেওনি’। তাপস পালকে তরুণ বাবুর সহকারী শ্রীনিবাস চক্রবর্তী রেল স্টেশনের কাছ থেকে ধরে আনেন। তাপস পালকে তিন দিন চুপচাপ বসিয়ে রাখেন তরুণ মজুমদার।

কারণ, কেদারের সাইলেন্ট রিয়্যাকশান গুলো দেখতে চেয়েছিলেন। তাপস পাশ করেন। ‘দাদার কীর্তি’র কেদার তো মুখ দিয়ে কথা বলেনা চোখ দিয়ে কথা বলে। নবাগত হিসেবে ওত শক্ত অভিনয় উত্তম কুমারও পারেননি সফল হননি।

মহুয়া আর তাপস জুটি দর্শককে উত্তম আর সুচিত্রা জুটির ফাঁকা জায়গা পূরণ করে। দেবশ্রী-প্রসেনজিৎ জুটির চেয়েও দেবশ্রী-তাপস কি তাপস-শতাব্দী জুটি বেশি সফল। গান গুলোর জন্য আর ডি বর্মন আর বাপ্পী লাহিড়ী আজও সুপার হিট।

তাপসের একটা অনন্য অভিনয়ের ছবি ‘সাহেব’। এর জন্য মাধবী মুখার্জ্জী জোর করে টাকা দিয়ে বিজয় বসুকে রাজি করান। কলকাতার বাংলা ছবির সফল হিন্দি ভার্সন ‘সাহেব’-ই শেষ ছবি।

নিজের চেহারা কন্ট্রোল করলেন না, ভুল স্টেটমেন্ট , ভুল ছবি সাইন। ব্যাস, শেষ হয়ে গেলেন তাপস পাল। কি বাজে ভাবে একটা প্রতিভার অপমৃত্যু হল!

জানেন কি, রাজেশ খান্না অমিতাভ বচ্চনের ‘আনন্দ’র বাংলা ছবি ‘জীবন’-এ তাপসই নায়কের রোলটা করেন। মহুয়া চিরঞ্জিত সবাইকে নিয়ে চোখে জল আনবে এমন ছবি। ছবিটা আর দেয় না চ্যানেলগুলোতে।

গুরুদক্ষিণা,পারাবত প্রিয়া, অজান্তে, আর্শীবাদ, অনুরাগের ছোঁয়া, কড়ি দিয়ে কিনলাম, চোখের আলোয় শেষে উত্তরা – তেও কি ভালো অভিনয় করেছিলেন। ভুল পথে হেঁটে বিলীন হলেন। রুপালি পর্দার নায়ক হতে গিয়েছিলেন রাজনীতির নায়ক। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও তাঁর বিতর্কিত সব বক্তব্য খুব সমালোচিত হয়। সিবিআই তাঁকে একবার গ্রেফতারও করেছিল, ১৩ মাস জেলও খাটতে হয়েছিল।

এত কিছু’র পরও তিনি সিনেমার ভূবনে ফিরতে চেয়েছিলেন। অঞ্জন চৌধুরী কন্যা রিনা চৌধুরীর নতুন ছবি ‘ছায়াসূর্য’ দিয়ে ফেরার মঞ্চটা প্রস্তত হয়েই ছিল। কিন্তু, এত সময় তাঁর হাতেই ছিল না। অসুস্থতায় সবার চোখের আড়াল হয়ে গেলেন। আর চূড়ান্ত দু:সংবাদটা আসলো ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি।  ভোর বেলায় ৬১ বছর বয়সে জীবন নদীর ওপারে চলে গেলেন আলোচিত, বিতর্কিত আর একরাশ আক্ষেপে ভরা এই মানুষটি।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।