সুন্দরী প্রতিযোগীতা: রুপের বাজারের কুৎসিৎ সত্য

সুন্দরী প্রতিযোগীতা যেকোনো সময়ই বেশ আলোচনার খোড়াক যোগায়? বিশ্বে এমন দেশ খুব কমই আছে, যাদের নিজস্ব কোনো সুন্দরী প্রতিযোগীতা নেই।

চলুন, এবার একটু শুরুর আলোচনা করি।

আচ্ছা, এই সুন্দরী প্রতিযোগীতার শুরু হয় কোথা থেকে?  একটা সময়ে ইংল্যান্ডেই মে দিবসে একজন করে ‘মে কুইন’ নির্বাচন করা হত। তাকে ‘উদারতার প্রতীক’ হিসেবে দেখা হত। সেটা সেই অর্থে কোনো সুন্দরী প্রতিযোগীতা না হলেও আদতে তরুণী আর আকর্ষণীয় নারীরাই এই প্রতিযোগীতায় অংশ নিত।

১৮৩৯ সালে এলিংটন টুর্নামেন্টে একটা সুন্দরী প্রতিযোগীতার নজীর পাওয়া যায় স্কটল্যান্ডে। আর্কিবাল্ড মোন্টগোমেরি, এলিংটনের ১৩ তম আর্লের আয়োজন ছিল সেটা। ডাচেস অব সামারসেট, জর্জিনা সেয়মোওর সেবার বিজয়ী হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ১২ তম ডিউক অব সামারসেন এডওয়ার্ড সেয়মোওরের স্ত্রী ও ক্যারোলিন নর্টনের বোন। তাকে তখন বলা হত ‘কুইন অব বিউটি’ বা ‘রূপের রানী’।

জর্জিনা সেয়মোওর

ব্যবসায়ী ফিনিয়েস টেলর বার্নুম আধুনিক আমেরিকায় প্রথম সুন্দরী প্রতিযোগীতার আয়োজন করেছিলেন ১৮৫৪ সালে। তবে, জনবিক্ষোভের মুখে সেই আয়োজন ভেস্তে যায়।

১৮৮০-এর দশকে সুন্দরী প্রতিযোগীতা বেশ জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ১৮৮৮ সালে ‘কুইন অব বিউটি’ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৮ বছর বয়সী এক আদিবাসী তরুণী। ওই সময় প্রত্যেক প্রতিযোগীকে নিজের একটা ছবি ও নিজের ব্যাপারে ছোট একটা বর্ণনা লিখে পাঠাতে হত। চূড়ান্ত তালিকায় নেওয়া হত ২১ জনকে। সেখান থেকে একজন সেরা নির্বাচিত হতেন।

১৯২১ সালে ‘মিস আমেরিকা’ প্রতিযোগীতার সূচনা হয়। আধুনিক সময়ের সুন্দরী প্রতিযোগীতাগুলো এরই পরিবর্তীত ও পরিবর্ধিত রূপ। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৃহৎ আকার ধারণ করে এই সুন্দরী প্রতিযোগীতাগুলো। যদিও, এই সময় পুুঁজি হয় নারীর রূপ ও যৌনতা।

১৯২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সুন্দরী প্রতিযোগীতা

মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগীতা যাত্রা ‍শুরু করে ১৯৫১ সালে। ‘বিকিনি কনটেস্ট’ হিসেবে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্যের এরিক মোরলে। সেবার বিজয়ী হন সুইডেনের কিকি হাকানসুন। যদিও, প্রতিযোগীতা আয়োজন করতে গিয়ে সামাজিক কিছু সংঘের বিরোধীতার মুখে পড়তে হয়েছিল আয়োজকদের। আর আধুনিক মিস ওয়ার্ল্ডের স্বত্বাধিকারী এরিকের বিধবা স্ত্রী জুলিয়া মোরলে।

ইংল্যান্ড কিছু একটা কররে, আর আমেরিকা হাত-পা গুঁটিয়ে বসে থাকবে তা কী হয়! ইংল্যান্ডের দেখাদেখি ১৯৫২ সালে আমেরিকায় চালু হয় মিস ইউনিভার্স। চালু করেন উইলিয়াম মরিস এনডেয়াভোর। শুরুতেই তিনি বিকিনিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। প্রথম খেতাব জেতেন ফিনল্যান্ডের অ্যার্মি হেলেনা কুসেলা।

প্রথম মিস ওয়ার্ল্ড কিকি হাকানসুন

বর্তমানে এর মালিক মিস ইউনিভার্স অর্গানাইজেশন। একইভাবে মিস আর্থ ও মিস ইন্টারন্যাশনাল নামেও আলাদা বৈশ্বিক সুন্দরী প্রতিযোগীতা আছে।

এই চারটির মধ্যে প্রথম দু’টোকেই সবচেয়ে মর্যাদার লড়াই হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দু’পক্ষের মধ্যে রেশারেশিও আছে। প্রতিবছর মিস ওয়ার্ল্ড যে হন তাকে এক বছর গিয়ে কাটাতে হয় লন্ডনে, একই ভাবে মিস ইউনিভার্সকে গিয়ে থাকতে হয় নিউ ইয়র্কে।

এখন অবধি কোনো নারীই একাধারে এই দু’টি প্রতিযোগীতার বিজয়ী হতে পারেননি। তবে, একই বছর একটি দেশের দু’টো প্রতিযোগীতাই জিতে যাওয়ার নজীর আছে পাঁচটি। ১৯৫৩ সালে ফ্রান্স, ১৯৭২ সালে অস্ট্রেলিয়া ও ১৯৮১ সালে ভেনেজুয়েলা এই বিরল কীর্তি গড়ে।

প্রথম মিস ইউনিভার্স অ্যার্ম হেলেনা কুসেলা

১৯৯৪ সালে একই বছরে ভারতের সুস্মিতা সেন জেতেন মিস ইউনিভার্স আর ঐশ্বরিয়া রায় জেতেন মিস ওয়ার্ল্ডের খেতাব। এরপর ২০০০ সালে আবারো ভারতে যায় জোড়া খেতাব। সেবার লারা দত্ত হন মিস ইউনিভার্স আর প্রিয়াঙ্কা চোপড়া হন মিস ওয়ার্ল্ড।

যদিও, এসব সুন্দরী প্রতিযোগীতা নিয়ে অবশ্য সমালোচনাও কম না।

গবেষকরা বলেন, যখন যে অঞ্চলের বাজারকে নিজেদের দখলে নেওয়ার প্রয়োজন হয়, তখন সে অঞ্চল থেকে সুন্দরী নির্বাচনের প্রবণতা বেশি থাকে। কারণ, একজন বিশ্ব সুন্দরী বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির নানারকম পণ্যের দূত হিসেবে কাজ করেন। ফলে, তিনি যে জনগোষ্ঠী থেকে আসেন তাদের আকৃষ্ট করা খুব সহজ হয়।

সুস্মিতা সেন ও ঐশ্বরিয়া রায়

উদাহরণ হিসেবে ভারতের কথা বলা যায়। সুস্মিতা-অ্যাশের পর ১৯৯৭ সালে ডায়ানা হেইডেন ও ১৯৯৯ সালে যুক্তা মূখী হন মিস ওয়ার্ল্ড। এরপর আসেন লারা-প্রিয়াঙ্কা।

এর আগে সেই ১৯৬৬ সালে বিশ্ব সুন্দরী হন রিটা ফারিয়া। মানে মাঝের ২৮ বছরে কোনো বিশ্বসুন্দরী হয়নি। অথচ, ছয় বছরেই আসলো ছয়জন। আবার এরপর ১৭ বছরের বিরতি দিয়ে আসলো আরেকজন।  মনে করা হয়, নব্বইয়ের দশকে ভারতের বিরাট ভোক্তার বাজারে প্রবেশের একটা কৌশলের হাতিয়ার ছিলেন এই ছয় সুন্দরী। এমনকি সুন্দরী প্রতিযোগীতা টিকে আছেও এই বাজার ধরার জন্যই, অন্তত গবেষকরা তেমনটাই দাবী করেন।

এর বাইরেও কথা আছে।

ধরেন একজন নারী সরু অন্তর্বাস পরতে সংকোচ করেন, বিকিনি শরীরে চাপিয়ে র‌্যাম্প করতে পারেন না – তাহলেই কি তিনি অসুন্দর হয়ে যাবেন? আর গুণের কথা বলবেন! পৃথিবীতে অসংখ্য নারীরা ‘কে কি বলবে’ ভেবে নিজেদের প্রতিভা লুকিয়ে রাখেন। বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম হাফিঙটন পোস্ট দাবী করে নারীদের অন্তত ৫০ শতাংশ নিজেদের জানাশোনাটাকে গোপন করে। কারণ তারা ভাবে, এতে করে বাকিরা তাদের হেয় করবে। তাহলে সেরা নির্ধারণের মানদণ্ড গুলো কি আদৌ ঠিক আছে?

সবাই মাথায় টায়রা পরতে পারে না। এর মানে তারা রানী কিংবা রাজকন্যা নয় – এমন ভাবার কিছু নেই।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।