বিসিএস, রিক্রুটমেন্ট, সোস্যাল ডায়নামিক্স প্রভৃতি

সামাজিক এবং গোষ্ঠীচিন্তা খুবই ইন্টারেস্টিং এক প্যাটার্ন অনুসরণ করে। এটা বুঝতে হলে আপনাকে পোলট্রি ফার্ম অথবা ভেড়ার পাল যেভাবে পরিচালনা করা হয় তা খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তবে সমগ্র ধারণার ভিত্তিই যে অর্থনীতি আর রাজনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত সেটাও স্বীকার করে নিতে হবে।

আমরা যখন কলেজ বা ভার্সিটি ফার্স্ট- সেকেন্ড ইয়ারে পড়তাম সময়টা খুব বেশিদিন আগের নয়, মাত্র ১৪-১৫ বছর।

সেই সময়ে বাবা-মা আর মুরুব্বিদের প্রত্যাশা ছিল সন্তান ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবে। সেইসময়ে টেলিকম ইন্ডাস্ট্রি বুম করতে থাকে, দেশীয় এফএমসিজি এর অবস্থা ঘুরতে থাকে, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের পাশাপাশি বিবিএ-এমবিএ এর কদর তৈরি হতে থাকে। কারণ ওই সকল ইন্ডাস্ট্রিতে প্রশাসনিক বা ম্যানেজারিল পদে মোটামুটি লোভনীয় বেতনে চাকরি পাবার ক্ষেত্রে বিবিএ-এমবিএ এর চাহিদা ছিল। প্রাইভেট মেডিকেল, কিংবা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে ফার্মাসি, জার্নালিজমের বাইরে বিবিএ-এমবিএ এর বিস্তার লক্ষ্য করা যেতে থাকে। ২০০৩-২০১০, মাত্র ৭ বছরেই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের সমান্তরালে বিবিএ-এমবিএ চলে আসে।

আমাদের কলেজ পড়াকালীন মেধাবী হিসেবে যাদের গল্প শুনতাম পড়াশোনা শেষে তারা বেসরকারী চাকরিতে ঢুকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতো, অথবা উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশে পাড়ি দিত, সরকারি চাকরির প্রতি আকর্ষণ বোধ করতো না, কারণ বেতন কম!

পরবর্তী এক দশকে তিনটি খুব সিগনিফিক্যান্ট ঘটনা ঘটে –

১. বেসরকারি চাকরিতে প্রচুর খাটায় এই তত্ত্বটি প্রতিষ্ঠা পায়। সেই সাথে চাকরির নিরাপত্তা নেই, যখন-তখন চলে যেতে পারে, বেতন দিতে গড়িমসি করে, ক্যারিয়ারে খুব উপরে উঠা যায় না, সামাজিক স্ট্যাটাস নেই প্রভৃতি প্রসঙ্গগুলো খুব জোরেশোরে আলোচিত হতে থাকে। আমাদের আগের প্রজন্মে সরকারি চাকরিই ছিল ভরসা, যেহেতু বেসরকারি খাতে শিল্পায়ন তখনো বিকশিত হয়নি; দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল বিধায় কম বেতনেও চালিয়ে নিতে অসুবিধা হয়নি। মধ্যবর্তী প্রজন্মের সোনালি যৌবনে বেসরকারি খাত রাইজিং অবস্থায় ছিল, যে কারণে সরকারি চাকরি থেকে ক্যালিবার সম্পন্ন ওয়ার্কফোর্সের দৃষ্টি ফেরাতে বেতন দিয়ে ব্যালান্স করতে হতো। কিন্তু মাত্র দেড়দশকেই বেসরকারি খাতের নিয়মহীনতা আর ভবিষ্যতহীনতা মধ্যবর্তী প্রজন্মকে হতাশাগ্রস্ত করে, তাদের চেনা পরিমণ্ডলে বেসরকারি খাতের ইতিবাচক দিকগুলো নয়, নেতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলোই গল্প হয়ে উঠে।

২. বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো দল একটানা ৩ মেয়াদে শাসনক্ষমতা অধিগ্রহণ করে। এর আগে শাসন কাঠামো ছিল ৫ বছরমেয়াদী ইজারাচুক্তির মতো। ৫ বছর পরপর পালাক্রমে দুই দল ক্ষমতার ইজারা নিত। কিন্তু ২০০৪ এর ২১শে আগস্ট দেশের রাজনীতি ধারায় সহিংসতার চর্চাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে, এবং পরবর্তীতে সেনা-নিয়ন্ত্রিত ২ বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করে দেয় ‘৫ বছরি ইজারা’ আর চলবে না, যে দলই ক্ষমতায় আসুক তারা চাইবে যে কোনো মূল্যে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখতে, এটা ছাড়লেই খুনোখুনির রাজনীতিতে চালান হয়ে যেতে হবে। অনুন্নত দেশগুলোতে কোনো দল দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকলে উন্নয়ন প্রক্রিয়া যেমন গতিশীল হয়, এর সমান্তরালে অসুবিধাও আসে রাশি রাশি। শাসকগোষ্ঠী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের মদদপুষ্ট পাতি নেতা এবং তাদের দোসররা দেদারছে ক্ষমতার অপব্যবহার করে, আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া নব্যধনিক শ্রেণির বিকাশ ঘটে, এবং পেশাজীবীতার প্রায় প্রতি স্তরে দুর্নোতির প্রাদুর্ভাব ঘটে। এতে সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেসামরিক মানুষ। তার তখন প্রশাসনিক অথবা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান কোনো মানুষের আনুকূল্য বা নৈকট্য প্রত্যাশা করে টিকে থাকবার প্রয়োজনে। পুলিশের এসপি-ওসি, জেলার ডিসি, জজ, ম্যাজিস্ট্রেট, সচিব, মন্ত্রীর পিএস কিংবা ক্ষমতাসীন দলের পদপ্রাপ্ত কোনো নেতা – কাউকে না কাউকে তার ব্যক্তিগত সার্কেলে প্রয়োজন। ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারের সামাজিক স্ট্যাটাসের চাইতে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা জীবনকে বেশি নিরুপদ্রব করে।

৩. সরকারি চাকরিতে বেতন বৃদ্ধি করা হয়, সেইসঙ্গে নানাবিধ ফ্যাসিলিটি যোগ করা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন ভার্সিটি মিলিয়ে প্রতিবছর যে পরিমাণ শিক্ষার্থী গ্রাজুয়েশন শেষ করে, তাদের মধ্যে বড়োজোর ১৫-২০% পড়াশোনা বা অন্য উদ্দেশ্যে বিদেশ যায়, বৃহত্তম অংশটিই দেশে রয়ে যায়। এই বৃহৎ গোষ্ঠীর খুব ক্ষুদ্র অংশই সরকারি চাকরিতে সুযোগ পাবে, বাকিরা নিয়তি মেনে বেসরকারি খাতে ঢুকতে বাধ্য হবে, কেউ কেউ স্বাধীন পেশায় যাবে, কেউবা দয়া-দাক্ষিণ্যে টিকে থাকবে।

কিন্তু ওই সীমিত সংখ্যক চাকরির টার্গেটেই ঝাঁপিয়ে পড়বে এই গোষ্ঠীর প্রায় পুরোটাই।

ফলে এখনকার মা-বাবা ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারের ফ্যাসিনেশনে না ভুগে ‘বিসিএস ক্যাডার’ হওয়াটাকেই সন্তানের টার্গেট বানিয়েছে বা বানাচ্ছে। আমাদের তারুণ্যে ব্যাংক এবং আর্মিতে ঢোকাও যথেষ্ট ফ্যাসিনেটিং ছিল, ‘বিসিএস ক্যাডার’-এর দাপটে সেগুলোও কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। বিসিএস এর মধ্যেও ক্যাডার বিভাজন বা প্রেফারেন্স রয়েছে; অ্যাডমিন-পুলিশ-ফরেন নিয়ে যতটা উচ্ছ্বাস, শিক্ষা ক্যাডার নিয়ে তুলনামূলক খুবই কম, উপরন্তু শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েও পরের বিসিএস এ আবারো পরীক্ষায় বসার রেকর্ড অহরহ।

স্ট্যস্টাসের চাইতে ক্ষমতা এখনকার সামাজিক ব্যবস্থায় অধিকতর জরুরী।

ভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ার থেকেই অনেকে বিসিএস এর প্রস্তুতি নেয়া শুরু করে। ভার্সিটির লাইব্রেরিগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই, এই সংবাদে আপনি খুশি হতেই পারেন শিক্ষার্থীদের একাগ্রতায়, কিন্তু যখন জানবেন এদের ৯০%ই লাইব্রেরিতে বসে বিসিএস এর প্রস্তুতি নিচ্ছে, ভ্যাবাচ্যাকা খেতে দেরি নাও হতে পারে আপনার।

বাঙালি কেন অদূরদর্শী এবং চ্যালেঞ্জ নিতে ভয় পায়, এর একটি নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা আছে; সে আলোচনা অন্য কোনোদিন। তবে কোনোকিছুতে প্রফিট দেখলে সর্বস্তরের বাঙালি যেভাবে সেখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই জায়গাটা নষ্ট না করা পর্যন্ত সেখান থেকে সরবে না। যাকাতের একটি কাপড়ের জন্য এদেশে পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে মানুষ মরে ফি-বছর।

বিসিএস এ যতগুলো পজিশন থাকে, সাথে কোটা যোগ করার পর যতটুকু বাকি থাকে, এর বিপরীতে যতজন প্রিলিতে অংশ নেয়, নিয়োগ শেষে যদি পারসেন্টেজ হিসেব করা হয়, সম্ভবত ২ বা ৩% হবে, অর্থাৎ অনিবার্য কারণেই ৯৭-৯৮% রেস থেকে ছিটকে পড়বে।

তারা কী করবে? আবারো পরের সার্কুলারের জন্য অপেক্ষায় থাকবে।

সরকারি চাকরির বয়সসীমা ৩০ নির্ধারণ করা, কিন্তু স্কুলে ভর্তির সময়ই আমাদের অভিভাবকেরা বয়স ২-৩ বছর কমিয়ে দেয়াতে একেকজন গড়ে ৪-৫টা বিসিএস এ অংশ নিতে পারে। এই নীতি যে কেমন বিধ্বংসী তা আগামী এক দশকের মধ্যে টের পাওয়া যাবে। সরকারি চাকরির প্রলোভনে দিন-রাত মুখ গুজে থাকা দরুণ গ্রাজুয়েটদের বৃহত্তম অংশ সফট-টেকনিকাল- কমিউনিকেশন কোনোরকম স্কিলই রপ্ত করতে পারে না, ওদিকে বয়সও ফুরিয়ে আসে। তখন তাদের অনেকেই ১০-১২ হাজার টাকার চাকরিতে ঢুকতে বাধ্য হয়, বাকিরা সেটাও পারে না।

এই মানুষগুলোর কারণে ভবিষ্যতে সমাজে বড়োরকম ইমব্যালান্স তৈরি হবে। হতাশ মানুষ আত্মহত্যা, সামাজিক বিশৃংখলা, সাইবার বুলিং এবং ক্রাইমের সংখ্যা বাড়াতেই থাকবে।

বুয়েটে একবারের বেশি পরীক্ষা দেয়া যায় না, আইএসএসবি থেকেও একটি নির্দিষ্ট সংখ্যকবার বাদ পড়লে আবেদন করার যোগ্যতা হারায়। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সসীমার চাইতে অধিকতর জরুরী কতবার পরীক্ষা দেয়া যাবে সেই নীতি। ধরা যাক, কেউ ২ বারের বেশি বিসিএস এ অংশ নিতে পারবে না নীতি জারি করা হলো। এর বিপক্ষে প্রচণ্ড আন্দোলন হবে হয়তো, কিন্তু সেই আন্দোলনের নৈতিক গ্রাউন্ড থাকবে দুর্বল। নৈতিক গ্রাউন্ড শক্ত না হলে জনসমর্থন পাওয়া যায় না। কেউ যখন ৩-৪বার একই পরীক্ষা দেয়, অভিজ্ঞতার কারণে হলেও সে কিছুটা সুবিধা পায়। সর্বশেষ ৫ বিসিএস এ নিয়োগ পাওয়া ক্যাডারদের ডেটা নিয়ে প্রথমবার আর একাধিকবার পরীক্ষা দিয়ে টিকবার অনুপাত করলে একাধিকবারে অংশ নেয়ারা বিরাট ব্যবধানে এগিয়ে থাকবে।

২ বার অংশ নেয়ার নিয়ম জারি করলে বহুসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীই সরকারি চাকরির ভরসায় বসে না থেকে অন্যান্য দক্ষতা অর্জনে সচেষ্ট হবে, নিজেদের যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে। অন্যরকম গ্রুপে যখন ফ্রিল্যান্স কনসালট্যান্ট ছিলাম, বা এখন হিউম্যানল্যাবসূত্রে যখন বিভিন্ন কোম্পানীতে রিক্রুটমেন্ট কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করতে যাই, প্রার্থীদের দেখে প্রচণ্ড হতাশ হতে হয়, ৫০ জনের ইন্টারভিউ নিয়ে ১ জনকেও পাওয়া যায় না যাকে প্রমিজিং মনে করে সুযোগ দেয়া যেতে পারে। উদ্যোক্তারা কোয়ালিটি রিসোর্সের অভাবে হাহাকার করে, আর সরকারি চাকরির আফিমের নেশায় চাকরির গাইড পড়ে পড়ে বুকিশ তথ্য অর্জন করা প্রজন্ম ঢালাও অভিযোগ করে চাকরিহীন মার্কেটের।

গলদটা যে নীতির সেটাই বোধগম্য হচ্ছে না।

আমাদের প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বলতার প্রধান কারণ মধ্যমেধার মানুষেরা গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে সিস্টেম অকেজো করে রেখেছে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে মেধাবীদের পক্ষেও সিস্টেম আমূল বদলানো সম্ভব হবে না, তবে এখনকার চাইতে তুলনামূলক কম খারাপ এক সিস্টেম দাঁড় করানো সম্ভব হবে।

কিন্তু, অতিমেধাবীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিসিএস এর প্রতি অনাগ্রহী মূলত পরীক্ষা পদ্ধতি আর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রীতার কারণে। আবার, হীনম্মন্যতায় ভোগা একটা গোষ্ঠী বিসিএসকে ট্রল করে তারও ভিত্তি পরীক্ষা পদ্ধতি। ইথিউপিয়ার মুদ্রার নাম কী, সাবমেরিন কে আবিষ্কার করেছে– এসব তথ্য মুখস্থ রাখা নিশ্চয়ই মেধার স্মারক হতে পারে না, কিংবা ‘preposition’-এর ব্যবহার পারি কিনা, এইট-নাইনের ম্যাথ কতটুকু জানি এসব দিয়ে যোগ্যতা যাচাই করা উচিত না – বিসিএস বিরোধীতার মূল পয়েন্ট আদতে এটাই।

যেহেতু ৯-১০ বছর ধরে রিক্রুটমেন্ট বিষয়টাতে গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ করছি, বিসিএস রিক্রুটমেন্ট বিষয়ে আমার ভিন্ন একটা এন্টারপ্রেটেশন রয়েছে।

রাষ্ট্র চায় মূলত মধ্যমেধার ম্যানেজার, পলিসি মেকিংয়ের জায়গায় থাকে খুবই সীমিত সংখ্যক মানুষ, যদি ২ লাখ মানুষ কোনো একটি জায়গায় অংশ নেয় পরিসংখ্যানের সূত্রেই সেখানে উচ্চমেধাবী মানুষের একটি অংশ থাকবে, তারা যে কোনো সিস্টেমেই বেরিয়ে আসবে।

কিন্তু মধ্যমেধার ম্যানেজারের বৈশিষ্ট্য কী?

সে যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, চাহিদা মোতাবেক নিজেকে বদলে নিবে এবং নিয়মের সুষ্ঠু অনুসরণ করবে। তার কমফোর্ট জোন বলতে কিছু থাকবে না।

ইথিওপিয়ার মুদ্রার নাম শেখানো রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নয়, বরং অর্থহীন আদেশ বা নিয়ম পালনে আপনি কতটা আন্তরিক সেই বৈশিষ্ট্য গড়ে তোলার প্রশিক্ষণ হিসেবেই এটা অন্তর্ভুক্ত করা।

আর এইট-নাইনের ম্যাথ বা প্রিপোজিশন বিষয়ক সমীকরণ হলো, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় রাখা। বিসিএস জেনারেল ক্যাডারে সায়েন্স-আর্টস-কমার্স ব্যাকগ্রাউন্ডের সকলেই অংশ নেয়, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিভাগ বিভাজন শুরু হয় নবম শ্রেণি থেকে। এই ইস্যুটা মাথায় রাখতে হয়।

তবে, মেধার সংজ্ঞা বিষয়ক অস্পষ্টতা থেকেই মূলত রাষ্ট্র ভুল রিক্রুট বেশি করছে, মধ্য মেধার ম্যানেজার পাওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতা বাড়ছে।

আমাদের সমাজে মেধার সংজ্ঞা, কে কত বেশি তথ্য মনে রাখতে পারে বা তথ্যভিত্তিক জ্ঞান প্রক্রিয়াজাত করতে পারে।

মেধার এই সংজ্ঞার অসুবিধা হলো, মানুষ তখন কোনোকিছু নিয়ে গভীর চিন্তার পরিবর্তে সেটার রেডিমেড সমাধান কী সেই কৌশল রপ্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠে।

অন্যদিকে মেধার সংজ্ঞা হওয়া উচিত, কোনোকিছু বোঝা, বিশ্লেষণ, এন্টারপ্রেট এবং ডেলিভার করার ক্ষমতা। এই ক্ষমতা গড়ে তুলতে তাকে এমনিতেও প্রচুর পড়তে হয়, মানুষের সাথে মিশতে হয়, সমকালীন বিশ্ব সম্বন্ধে গভীর ধারণা রাখতে হয়, এবং জগত সম্বন্ধে তীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ তৈরি করতে হয়।

প্রিলিমিনারিতে যদি তথ্যভিত্তিক MCQ এর পরিবর্তে ক্রিটিকাল রিজনিং, অ্যানালিটিকাল অ্যাবিলিটি, আন্ডারস্ট্যান্ডিং এবিলিটি বিষয়ে MCQ রাখা হয় এবং ৪টি অপশনেই গুরুত্বভেদে ১,২,৩,৪ নম্বর বন্টন করা হয়, সেখানে ভুল উত্তর বলতে কিছু থাকবে না, বরং বেটার উত্তরকেই এপ্রিসিয়েট করা হবে। তখন ইথিউপিয়ার মুদ্রার নাম কী প্রশ্নের পরিবর্তে ইথিউপিয়ার কোনো একটি রাজনৈতিক ঘটনার নেপথ্য কারণ হিসেবে ৪টি অপশন দেয়া থাকবে।

এতে মধ্যমেধার লেভেল আপগ্রেডেশন ঘটবে।

আর রিক্রুটমেন্ট বিষয়ে কাজ করাসূত্রে জানি, ফিল্টারিং প্রসেসে যত বেশি ধাপ থাকবে, কোয়ালিটি রিসোর্স পাওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়ে। প্রিলির পরে রিটেন, এর পরে ভাইভার আগে বরং আরো একটি ধাপ যুক্ত করা উচিত ইউনিকনেস এক্সিবিশন নামে। সেখানে প্রত্যকে নিজের এক্সট্রা কারিকুলার কোনো দক্ষতা থাকলে তা প্রদর্শন করবে। তাতে অপেক্ষাকৃত লিবারেল চিন্তাধারার কর্মী পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

যেহেতু সামাজিক জীবন যাপন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে বিসিএস দিয়ে, এর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সামান্য নীতিগত পরিবর্তন থেকেই সামাজিক পরিবর্তনের ইশতেহার রচিত হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু আমাদের পলিসি মেকাররা তা কি করবেন? সম্ভাবনা দেখি না। তার চাইতে বরং কোচিং, চাকরির গাইড, কারেন্ট এফেয়ার্সে বাজার ছেয়ে যাক, পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ফি এর টাকা দেশের অর্থনীতিতে কন্ট্রিবিউট করুক; লো- আইকিউয়ের ম্যানেজার বরং দুর্নীতির জন্য ভালো, তাতে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বাড়ে, আনুগত্য কালচার প্রতিষ্ঠিত হয়। মেধাবী মানুষ নিজে কম খায়, অন্যদের খাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রশ্ন করে। প্রশ্নই যতো নষ্টের গোড়া।

সুতরাং বিসিএস পাগল বনাম বিসিএস বিরোধী গ্রুপের মধ্যবর্তী মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত পর্যবেক্ষণ করে ইমপ্রেসন তৈরি করাই কর্তব্য বিধান হোক।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।