পাপন সাহেব যা দোষ করেছেন ও যা করেননি

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন সাহেবের যেসব দোষ করেছেন, করে চলেছেন –

বিসিবি প্রেসিডেন্ট হতে এসে তাঁর দায়িত্ব ছিল তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করা। উনি প্রায় সর্বেসর্বা হয়ে বিসিবি চালাচ্ছেন সাত বছর ধরে।

নিজের ইচ্ছেমতো পছন্দের সব বোর্ড ডিরেক্টর নিয়োগ দিয়েছেন যেখানে বেক্সিমকো গ্রুপে চাকরি করেন এমন চাকুরিজীবী আছেন, তার বন্ধু লোকমান ভুঁইয়া এখনো আছেন। আবার পছন্দের কেউ কেউ একসাথে ৫-৬টা পদও আঁকড়ে ধরে বসে থাকেন। তাঁরা নিয়মিত ক্যাসিনোতে ভাত খেতে যান। কিন্তু পাপন সাহেব কিছু বলেন না। কিন্তু একই সিরিজে ক্রিকেটার আল আমিন দেরি করে হোটেল ফিরলে দেশে ফিরে যেতে হয়েছে।

তিনি বোর্ডের নিয়ম-কানুন খুব একটা অনুসরণ করেন না। তাঁর ইচ্ছে হলে খেলোয়াড়দের সাথে কথা বলে এয়ারপোর্টে বসে নিজের সিদ্ধান্তেই বেতন বাড়ানো কমানোর সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন।

তিনি জাতীয় দল ছাড়া সর্বস্তরের ক্রিকেটারদের খুব একটা গুরুত্ব দেন না। ক্রিকেটারদের দাবির মধ্যে মূলত ক্রিকেটের অবকাঠামোর উন্নতির কথা থাকলেও তিনি শুধুমাত্র এক-দুইটা পয়েন্ট নিয়ে কথা বলে, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত আক্রমণে চলে যান। তাঁর ক্রিকেটাররা চারদিনের ম্যাচে ৬০ হাজার টাকা পাবার জন্য আন্দোলন করে। অথচ বোর্ড পরিচালকরা ট্যুরে দিনে ৫০০ ডলার করে পান!

ক্রিকেট অবকাঠামোর দিকে তাঁর কোন নজর নাই। মিরপুর ইনডোরে অথবা দেশের অন্তত প্রত্যেকটা বিভাগের ক্রিকেট অবকাঠামোতে প্র্যাকটিস সুবিধা বাড়ানো সহ, অন্যান্য যা যা দরকার সেগুলো বাড়ানোর দিকে তাঁর অথবা বিসিবির তেমন কোন নজর নেই।

তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁর দল আবাহনীকে জেতানোর জন্য হেন কোন কাজ নেই যে করেননি। এর মধ্যে জাতীয় দল থেকে মোসাদ্দেক হোসেনকে বের করে এনে আবাহনীতে খেলানোর মতো জঘন্য কাজ করেছেন। আবাহনীকে আম্পায়াররা সবসময় অন্যায় সুবিধা দেন, এটা সবার অভিযোগ। সাথে দ্বিতীয়-তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেটে পাতানো ম্যাচের বিরুদ্ধেও তাঁর পরোক্ষ সম্মতির কথা শোনা যায়।

তিনি অনেক অনেক অনেক অনেক অনেক বেশি কথা বলেন। নিজেই স্বীকার করেন যে তাঁর মতো এতো কথা কেউ বলে না। অনেক কিছুতেই ‘আমিই বলেছিলাম’ বলে নিজের কৃতিত্ব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বেশ সমালোচনা এবং ট্রলের স্বীকার হন নিয়মিতই। তবু শোধরান না।

তিনি প্রচণ্ড ইগোইস্টিক একজন মানুষ। তাঁর এবং বিসিবির বিরুদ্ধে ক্রিকেটারদের আন্দোলন তিনি মানতে পারছিলেন না। সেখান থেকে ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত আক্রমণ তো করেছেনই, সাথে সাকিবের ব্যাপারটা জানতে পেরে মনে মনে প্রতিশোধের আনন্দে ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত ইগো বড় ছিল। সে কারণেই, সাকিব নিষিদ্ধ হবার দুই-তিন আগে তিনি বারেবার “খবর আসছে” বলে কেবল সাক্ষাতকার দিয়েছেন।

সাকিবকে জনগণের সামনে ভিলেন বানানোর জন্য বেশ কিছু উল্টাপাল্টা কথা বলেছেন। ষড়যন্ত্র তত্ত্বও নিয়ে এসেছেন। সংবাদ সম্মেলনে ‘সব খবর অটো বের হবে।’ – বলে পক্ষান্তরে নিজের মনের অভ্যন্তরীণ কু-আনন্দ পেয়েছেন। তবে এতে আসলে সাকিব ভিলেন হবার বদলে মানুষের চোখে আরও সিম্প্যাথি পেয়েছে। তিনি মানুষের রিভার্স সাইকোলজি বুঝেন নাই।

এই সবগুলোই তাঁর দোষ। তিনি বিসিবির সর্বময় কর্তা।

এতোসব দোষের জন্য আমি এই বিসিবির এই কমিটির পদত্যাগ চাই। সত্যিকার অর্থে ভালো নির্বাচন হয়ে বিসিবিতে যোগ্য পরিবর্তন আসুক এইটা আমার চাওয়া।

এবার আসেন, পাপন সাহেব বা বিসিবি যে দোষ করেননি সেটা বলি –

তিনি কোনভাবেই সাকিবের এই নিষিদ্ধ ঘটনার সাথে জড়িত না। আকসু প্রচণ্ড গোপনীয়তার সাথে পুরো ব্যাপারটার তদন্ত করছে গত জানুয়ারি থেকে। তাঁরা ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, এবং ২৭ আগস্ট ২০১৯ সালে সাকিবকে জেরাও করেছে। সাকিব কাউকে এই ঘটনা জানাননি। পাপন সাহেবও জানতেন না। তিনি গত আইসিসি সভায় গিয়ে এই বিষয়ে একটা আঁচ পেয়ে আসেন। ওইটুকুই। আক্ষরিক অর্থেই এর বেশি জানতেন না। যখন থেকে জেনেছেন তখন থেকে বিসিবি বরং চেষ্টা করেছে আকসুর সাথে যোগাযোগ করে শাস্তির মাত্রা কমাতে। সমকালের রিপোর্টেও সেটি আছে। কালকে ইন্ডেপেন্ডেন্ট টিভির আলোচনা অনুষ্ঠানেও সেটা বলা হয়েছে।

এইখানে পুরোটাই সাকিবের দোষ। এই ঘটনা এক সপ্তাহের ঘটনা না! এইটা সম্ভব না। একটা সাধারণ অফিসের একটা স্প্রিন্টও দুই সপ্তাহ সময় নিয়ে হয়। আর এতো বড় একটা রিপোর্ট আকসু ১ সপ্তাহের বের করে ফেলবে- এইটা বলাটা এক ধরনের নির্বুদ্ধিতা। স্পষ্ট বলাই আছে সাকিবকে ২৩ জানুয়ারি আর ২৭ আগস্ট জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারপরেও আকসুর এই তদন্ত ২১ অক্টোবরের পরে, আন্দোলনের পরে ঘটেছে কীভাবে বলা হয় সেটাই মাথায় আসে না! সাবের হোসেন চৌধুরীও দেখলাম একই কথা বলেছেন। কিন্তু উনাকে জানুয়ারি আর আগস্টের জেরা সম্পর্কে কেউ জিজ্ঞেস করেছেন কিনা সেটা আমার জানার ইচ্ছা।

মিনিমাম ১০-১২ জনের গল্প পড়লাম যেখানে বলা আছে প্রেমিকা-বউয়ের বাইরে একজন প্রেম করার প্রস্তাব দেয়ার পরেও কেন বাবাকে জানাই নাই। তাঁর উপর বিশ্বাসী বন্ধু নাকি এটা বাবাকে বলে দিসে এইজন্য বাসা থেকে বের করে দিচ্ছে। এটা নিয়ে ট্রল গল্প হচ্ছে। ট্রল গল্প ভালো, কিন্তু ধরেন এই গল্পেই যদি বলা থাকে যে বাবা প্রতিদিন খাওয়ার আগে, ঘুমানোর আগে মনে করায় দেয়, বাসায় সাইনবোর্ড টানায় রাখে যে বাইরে কেউ প্রেমের প্রস্তাব দিলেই আমাকে জানাবা।

এরপরেও যদি আমি না জানাই তাহলে সেটা আমারই দোষ। আমি যদি বাবার বাসায় থেকে, বাবার দেয়া বেতন নিয়ে বাবা যেই বিষয়টা নিয়ে সবচেয়ে বেশি কঠোর সেটা না মানি, তাহলে সেটা আমারই দোষ। কারণ আমি কাজের বিনিময়ে বাবার টাকা নেয়ার ক্ষেত্রে চুক্তিবদ্ধ। আর বিশ্বাসী বন্ধুকে আমি এই ব্যাপারে জানাইই নাই! পরের ট্রল গল্পটা লেখার সময় এইটা মাথায় রাখা জরুরি।

পাপনের দোষ আগেই বলেছি। উনি উনার ইগোইস্টিক জায়গা থেকে সাকিবকে আরও ভিলেন বানাতে চেয়েছেন। তবে তাঁর দৌড় বিসিবির ভেতরে আর মিডিয়াকে সাক্ষাতকার দেয়া পর্যন্তই।

ফিক্সিংয়ের এই পুরো ঘটনায় উনার কোনই যোগসাজশ নেই। বরং সাকিবের পাশে থাকার জন্য পজিটিভ কন্ট্রিবিউশন আছে।

পাপন সাহেবকে গালি দেয়ার জন্য, তাঁর পদত্যাগ চাইবার জন্য উপরে তাঁর সব দোষ লিখেছি যা আমার মনে পড়ছিল। আপনি চাইলে আরও যোগ করতে পারেন। আমি সেসব দোষের জন্য তাঁর পদত্যাগ চাই।

কিন্তু ২৯ অক্টোবরের ঘটনায় তার কোন নেগেটিভ অবদান নাই। উল্টো সাকিব যখন ২৩ অক্টোবর তাঁকে পুরো ঘটনা জানিয়েছেন তখন তিনি আকসুর কর্মকর্তার সাথে কথা বলে সাকিবের নিষেধাজ্ঞা ৬ মাস কমিয়েছেন! সেটাই ফ্যাক্ট! এবং আরও কিছু করা যায় কিনা সে বিষয়ে বিসিবি দেখছে।

__________

এইবার বলি, সাকিবের দোষ লঘু পাপে গুরুদণ্ড কিনা। রাহুল দ্রাবিড়ের যে টুইটের স্ক্রিনশট ঘুরে বেড়াচ্ছে সেটা ফেইক অ্যাকাউন্ট। আর সত্যি হলেও আগের অন্যান্য একই ঘটনায় অন্যান্য ক্রিকেটাররা আরও বেশি শাস্তি পেয়েছিলেন। সাকিবের শাস্তিটাই বরং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম। আপনি আইনটা অনেক বেশি কড়া কিনা, এই নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। সেটা বাঞ্ছনীয়ও। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে আইনে ন্যূনতম ছয় মাস নিষিদ্ধের কথা লেখা আছে, সেটা নিয়ে সন্দেহ নাই। আর তিনবার একই কাজ করার পরেও যদি কেউ ১ বছর নিষিদ্ধ হয় তাহলে সেটাকে আইন অনুযায়ী খুব একটা বেশি বলা যায় না।

এখন যেহেতু আপিলের সুযোগ নেই, তাই বিসিবিকে দোষ না দিয়ে বিসিবি কী করতে পারে সেটা নিয়ে বুদ্ধি দেয়া যায়। আইনের ফাঁকফোকর বের করা যায়। যেমন একজন আইনজ্ঞ লিখেছেন আইনটা করা হয় ২০১৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। সাকিবের প্রথম দুটি ঘটনা জানুয়ারি ২০১৯ এর। সেক্ষেত্রে সাকিবের ক্ষেত্রে কোন আইনগত ফাঁক বের করা যায় কিনা। আপিল যেহেতু করা যাবে না, একেবারে রায়ের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার কোন উপায় বের করা যায় কিনা। বিসিবি আইনজ্ঞ দিয়ে এগুলো খুঁজে বের করতে পারে।

অথবা সাকিবের কাউকে কিছু না বলার পিছনের কারণ কী? উনি পুরো ঘটনা কেন চেপে গেলেন? উনি কি কোন পারিবারিক হুমকি পেয়েছিলেন? উনি ২০১০ সালে সব বলে এখন কেন চেপে গেলেন? বব উলমার মারা গিয়েছেন। ২০১১ সালেও দুইজন এই বুকির সাথে যোগাযোগে আত্মহত্যা করেছিলেন বলে একটা নিউজ লিংক টাইমলাইনে ঘুরতে দেখছি। পুরোপুরি পারিবারিক হুমকির ভয়ে কি সাকিব চুপ থাকছেন? সেটা হলে সাকিবের সাথে কথা বলা যায়। তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব নেবার চেষ্টা করা যায়। সাকিবকে বিসিবি বা সরকার এই ধরনের আশ্বাস দিতে পারে কিনা সেটা নিয়ে চিন্তা করা যায়। তারপর পুরো ঘটনা আবার আকসুর কাছে তুলে ধরা যায়।

আবার সাকিব কেন হোয়াটসআপের মেসেজ মুছে দিলেন? আর মুছলেনই যখন, তখন পুরো কনভার্সেশন কেন মুছেন নাই? কয়েকটা মেসেজ ডিলেট দিয়েছে শুনলে সাকিবকে সন্দেহ হয়। কিন্তু পুরো চ্যাট হিস্ট্রিই ডিলেট দেন নাই, ভাবলে মনে হয় যে সেখানে ডিলেটেড মেসেজগুলোতে সাকিবের জন্য কোন থ্রেট ছিল, যেটা সাকিব দেখানো সমীচীন মনে করেন নাই। তাই তিনি যে রিপ্লাই দেন নাই বুকিকে সেটা পর্যন্তই দেখিয়েছেন। আবার উলটোটাও ভাবা যায়। আমরা জানিনা কিছুই।

আপাতত আগের কিছু ঘটনা থেকে আশা করা যায়। সাকিবের নিষিদ্ধের সময়ে যদি সাকিব ভালোমতো চলতে থাকেন, তাহলে আইসিসি নিজে হয়তো সাকিবের নিষিদ্ধের সময় কমিয়ে আনতে পারে। গতকাল একাত্তর টিভির আলোচনা অনুষ্ঠানে শুনলাম পাকিস্তানের এক ক্রিকেটারের ব্যান নাকি কমিয়ে আনা হয়েছে তাঁর ভালো সহযোগিতার কারণে। গুগল করে পেলাম না। তবে এমন সুযোগ থাকলে বিসিবি আইসিসির সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখতে পারে, আপিল ছাড়াই বিশেষ ঘোষণায় যদি সাকিবের ব্যান কমে সেই আশায়!

বিসিবির এখন অ্যাক্টিভ থাকাটা খুব জরুরি। সময়টা বিসিবিকে উল্টাপাল্টা দোষারোপ করার নয়। সহযোগিতা করে শাস্তি কমানোর কোন একটা উপায় বের করার। তবে, বাস্তবতা হল – সাজা এখন আর কমানো প্রায় অসম্ভব!

আরেকটা ব্যাপার, সাকিবের অন্ধ ভক্ত, এমনকি কিছু সেন্সিবল ভক্ত এবং পাপন বিরোধীরা যেমন বলার পরেও পাপনের দোষ খুঁজে পাচ্ছেন, তেমনি সাকিব বিরোধীরা দেখলাম এই ঘটনায় সরাসরি সাকিবকে ফিক্সারও বলছেন! অথচ আইসিসির রিপোর্টে এটাও পরিষ্কার আছে যে সাকিব ফিক্সিং তো করেননি নাই, আগারওয়ালকে তাঁর কথামতো কোন তথ্যও সরবরাহ করেন নাই! এরা ঠিক কী কারণে অন্ধ সাকিব হেটার সেটাও আবার মাথায় ঢুকে না। তবে এই জিনিসটা মাথায় ঢুকায় নেন – ‘সাকিব ফিক্সিং করে নাই! সাকিব ফিক্সিং করে নাই! সাকিব ফিক্সিং করে নাই!’

__________

আপাতত সাকিবের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন, বিসিবির সহযোগিতার আশা করা, তাঁদের ভুল দোষ দেওয়া থেকে বিরত থাকা, সাকিবের নিষিদ্ধের সময় কমানোর ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া, আর সর্বোপরি সাকিবের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ দলের সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জনের আশা করাই আমাদের মতো ক্রিকেটভক্তদের মূল কাজ!

আর মাশরাফির মতোই বলি, ২০২৩ এর ফাইনাল খেলে ওয়ানডে বিশ্বকাপটা সাকিবের হাতেই দেখতে চাই। দেখতে চাই ২০২১ এর টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপাও!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।