একজন ওয়ান ম্যান আর্মি ও ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোর গলদ

ক’দিন পরপরই বিসিবি সভাপতিকে বাংলাদেশ স্কোয়াড ও একাদশ নির্বাচন, খেলার পরিকল্পনা বিষয়ে কথা বলতে শোনা যায়! আমরা সেসব নিয়ে নিউজও করি! আফগানিস্তানের কাছে হারা টেস্ট ম্যাচের চতুর্থ দিনে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘এই টেস্টের কোনো পরিকল্পনাই ঠিক ছিল না।’

আচ্ছা, দল নির্বাচন এবং খেলার পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলার উনি কে? দুনিয়ার আর কোনো বোর্ডের সভাপতিকে এসব নিয়ে কথা বলতে দেখেছেন? এসব কী ওনার কাজ? ক্রিকইনফোসহ বড় বড় ক্রিকেট দলের দেশগুলোর গত এক বছরের ক্রিকেট নিউজ ঘেটে দেখেন তো, সেসব দেশের ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির কোট দিয়ে কয়টা নিউজ হয়েছে? যারা কাজ করেন, তারা কথা বলেন না। কাজই তাদের হয়ে কথা বলে।

আফগানিস্তানের কাছে টেস্ট হারা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। মাস ছয়েক আগে সাংবাদিকদের আড্ডায় বলেছিলাম, আফগানিস্তানের সঙ্গে টেস্ট খেললে বাংলাদেশ হারবে। তারা আমাকে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের ক্রিকেট যেভাবে চলছে, এটা হবারই ছিল।

সামনে আরও খারাপ দিন অপেক্ষা করছে। কারণ, সর্বাঙ্গে ক্যান্সার। কেনিয়া ২০০৩ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলেছিল। মনে আছে? জিম্বাবুয়ে দলে বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান ছিল। তাদের ১৯৯৯-২০০৩ সালের দলটা এখনকার বাংলাদেশ দলের মতই (বা এরচেয়ে অনেকখানি এগিয়ে) ছিল। সেই কেনিয়া, জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট এখন কোথায়? বোর্ডে দুর্নীতি আর শক্ত ক্রিকেট কাঠামো না থাকায় দল ক্রমাগত দুর্বল হয়েছে, স্পন্সররা চলে গেছে। আইসিসিও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশও কী সেই পথে হাঁটছে না?

  • ক্রিকেট কাঠামো

১. কাঠামো বলতে তেমন কিছু নেই। বোর্ডের সব ফোকাস জাতীয় দল কেন্দ্রিক। সিরিজ বাই সিরিজ এবং টুর্নামেন্ট বাই টুর্নামেন্ট পরিকল্পনা করা হয়। দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা নেই।

২. ১৯ বছরেও ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের কোনো কাঠামো বা চরিত্র দাঁড়ায়নি। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বলতে কিছু নেই। বোর্ডের কর্তারা সারাবছর বিপিএল নিয়ে ব্যস্ত। জাতীয় লিগ আর বিসিএল হওয়া দরকার বলে হয়। তেমন নজরদারি নেই। ক্রিকেটাররাও খেলেন পিকনিক মুডে।

৩. ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট যেভাবে হয়, তাতে খেলোয়াড়রা টেস্টের জন্যে প্রস্তুত হতে পারেন না। অধিনায়ক তৈরি হয় না। স্থানীয় কোচদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। কোনো দলই জেতার জন্যে খেলে না। সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করছে বোনাস পয়েন্ট সিস্টেম। প্রথম ইনিংসে লিড নিতে পারলে বোনাস, সাড়ে তিন/চারশ রান করতে পারলে বোনাস পাওয়া যায়।

যে কারণে জেতার প্রতি আগ্রহ কম। ক্রিকেটার এবং কোচদের বিরাট একটা অংশ টেস্ট ক্রিকেট কী, তা বোঝেন না। একটা উদাহরণ দেই। গত মৌসুমে জাতীয় লিগ চলাকালে একটি দলের সঙ্গে যুক্ত জাতীয় দলের একজন সাবেক অধিনায়কের কাছে গিয়েছিলাম। তৃতীয় দিন শেষে তাঁর দলের ৩১৩ রানের লিড ছিল। সেই দল শেষ দিন লাঞ্চেও ইনিংস ডিক্লেয়ার করেনি! আমার সামনেই উনি দলের কোচকে ফোন দেবার পর জানলেন, আট নম্বরে নামা এক ব্যাটসম্যানের সেঞ্চুরির জন্য অপেক্ষা করছেন! আর ইতোমধ্যে বেশ বোনাস পয়েন্ট পাওয়া গেছে!

চিন্তা করুন, আট নম্বর ব্যাটসম্যানের সেঞ্চুরির অপেক্ষায় এবং বোনাস পয়েন্ট পাওয়ার সন্তুষ্টিতে একটা দলের কোচ আর অধিনায়ক শেষ দিন সকালে ৪০০ রানের লিড নিয়েও ম্যাচটা জেতার তাড়না বোধ করেননি! জাতীয় লিগ আর বিসিএলে প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই এই চিত্র। পরিকল্পনা করে বা চ্যালেঞ্জ নিয়ে কোনো দলই জেতে না। কোনো দল খুব বেশি ভাল এবং প্রতিপক্ষ খুব খারাপ ক্রিকেট খেলে ফেললেই কেবল জয়-পরাজয় হয়। তো, এরকম ক্রিকেট খেলে ক্রিকেটাররা টেস্ট জিততে শিখবে কিভাবে, টেস্ট জেতার চ্যালেঞ্জই বা নেবে কিভাবে?

৪. জাতীয় দলের বেশিরভাগ ক্রিকেটারই ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির লিগে খেলেন না।

৫. একমাত্র লিস্ট এ লিগে আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে, কোন দল চ্যাম্পিয়ন হবে! সেই দলকে আম্পায়াররা নানা সুবিধা দেন। ওই দলে জাতীয় দলের বেশিরভাগ ক্রিকেটার খেলেন। সেকারণেই কিনা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এলবিডব্লিউ হলে ক্রিকেটাররা আম্পায়ারদের দিকে অবিশ্বাসের চোখে তাকান! রিভিউ নেবার সময় বোঝেন না, কি করবেন!

৬. তৃতীয় থেকে প্রথম বিভাগ পর্যন্ত তিনটি লিগে যে ক্রিকেট হয়, তা নৈরাজ্য ছাড়া কিছু নয়। লিগ শুরুর আগেই ঠিক করা থাকে কোন দুটি দল চ্যাম্পিয়ন আর রানার আপ হবে। সুপার লিগের বাকি চার দল কোনটি, তাও ঠিক করা থাকে। কারণে সুপার লিগের ছয়টি ক্লাবই বিসিবির নির্বাচনে কাউন্সিলরশিপ পায়। এসব করতে গিয়ে আম্পায়ারিং হয় যা-তা।

সুবিধা পাওয়া দলগুলোর ব্যাটসম্যানরা আউট হয়েও ক্রিজে থাকেন, বোলাররা প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানকে আউট না করেও উইকেট পান। সবচেয়ে বিপদ সুবিধার বাইরে থাকা দলগুলোর খেলোয়াড়দের। সবচেয়ে ভাল ব্যাটসম্যানরা ক্রিজে দাঁড়ানো মাত্রই এলবিডব্লিউ বা কট বিহাইন্ড! আর বোলাররা উইকেট পেয়েও পান না। এসবে তিনমুখী ক্ষতি হচ্ছে।

ক. ক্রিকেটারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সত্যিকার ম্যাচ অনুশীলন হয় না।

খ. মানসম্পন্ন আম্পায়ার তৈরি হচ্ছে না।

গ. মানসম্পন্ন ম্যাচ রেফারি তৈরি হয় না।

৭. দল নির্বাচনে কোনো ধারাবাহিকতা নেই। দু’-একটা উদাহরণ দেই। সুইং করানোর ক্ষমতার কারণে রাহীকে বিশ্বকাপ দলে নেওয়া হলো। তাকে একটি ম্যাচেও খেলানো হয়নি। সেই রাহীই পরের শ্রীলঙ্কা সিরিজের দলে নেই। এই যে ইয়াসিন আরাফাত নামের ২০ বছর বয়সী পেসারকে আফগানিস্তান-জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজে ডাকা হলো, তিনি টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের স্বীকৃত কোনো ম্যাচ খেলেননি। তিনি কোথায় নিজেকে প্রমাণ করলেন, নির্বাচকরাই ভাল বলতে পারবেন। রাহী, তাসকিন, রনি এই তিন পেসার গত তিনটি বিপিএলে যথেষ্ট নজরকাড়া পারফরর্ম করেছেন। এই তিনজনকে পাশ কাটিয়ে ইয়াসিনকে ডাকা হয়েছে।

৮. উঠতি ক্রিকেটারদের যত্ন নেয় গেম ডেভেলপমেন্ট বিভাগ। আফগানিস্তান গত কয় বছরে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করছে এই বিভাগে। গেম ডেভেলপমেন্টের ম্যানেজার ছিলেন বিসিবির সবচেয়ে মেধাবী ক্রিকেট ব্রেইন বলে পরিচিত নাজমুল আবেদীন ফাহিম। যিনি ক্রিকেটার গড়ার কারিগর। তার সময়েই সাকিব-মুশফিক-তামিমরা উঠে এসেছেন।

ওনাকে সরিয়ে নারী দলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। গেম ডেভেলপমেন্টের বর্তমান ম্যানেজার ক্রিকেটের টেকনিক্যাল কোনো লোক নন। ফাহিম স্যারের তত্বাবধানে গত এশিয়া কাপে মেয়েরা চ্যাম্পিয়ন হয়। তিনি এখন সেই দায়িত্বেও নেই। উনি সম্ভবত নিজেও জানেন না, ক্রিকেট বোর্ডে ওনার কাজ কী!

এরকম ভঙ্গুর সিস্টেম থেকে ক্রিকেটারা উঠে এসে স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পারফরর্ম করতে পারেন না। বোর্ড যেমন শক্তিশালী ক্রিকেট কাঠামো তৈরি করতে পারেনি, তাদের যেমন ভিশন নেই, তেমনি বেশিরভাগ ক্রিকেটারদেরই দূরদৃষ্টি বা ক্যারিয়ার নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে জাতীয় দলে ঢুকে বিসিবির বেতনভুক্ত হওয়া। বেতনভুক্ত হলে সেটা ধরে রাখার চেষ্টা করেন। আর কয়েকটা ম্যাচ ভালো খেললেই তারকাখ্যাতি হয়ে যায়।

বেতন, ম্যাচ ফি, ঘরোয়া ক্রিকেট সব মিলিয়ে বছরে কোটি টাকার বেশি আয় হয়। এতেই ব্যাপক আত্মতুষ্টি পেয়ে বসে। তখন তারা আর পরিশ্রম করতে চান না। দু’-একজন বাদে বিশ্বতারকা হবার চিন্তা কেউই করেন না। যে কারণে অভিষেকের পাঁচ/ছয় বছর পরেও তারা কেবল শিখে যান। আর রশিদ খান, বুমরারা বিশ্বসেরা হন।

যদি বাংলাদেশের ক্রিকেট কেনিয়া-জিম্বাবুয়ের কাতারে নেমে আসে, তাতে কিন্তু ক্ষতিটা ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট সবারই। আইসিসি থেকে রাজস্ব আসবে না, স্পন্সররা থাকবে না, বোর্ডে যে অর্থের ঝনঝনানি তার কিছুই থাকবে না। দুধের মাছি সংগঠকরা হাওয়া হয়ে যাবেন, ক্রিকেটাররা বেতনের জন্যে আন্দোলন করবেন, আর ক্রিকেটের সৌজন্যে সাংবাদিকদের এখানে-সেখানে সফর, টেলিভিশনে খেলাধুলার শো সবই বন্ধ হয়ে যাবে।

পাপন সাহেবদের মিডিয়ায় কথার ফুলঝুরি না ফুটিয়ে দেশের ক্রিকেট কাঠামো বদলের দিকে নজর দেওয়া জরুরী, নিজেদের প্রয়োজনেই ক্রিকেটারদের নিবেদিত হওয়া উচিত। আর ক্রিকেট নিয়ে রিপোর্ট করার বিষয়ের অভাব নেই। সাংবাদিকরা সেসব দিকে নজর দেবেন প্লিজ? পাপন সাহেবের মুখের সামনে বুম ধরলে একটা প্যাকেজ বানানোর রসদ পাওয়া যায় বটে, তাতে দেশের ক্রিকেটের কোনো উপকার হয় না।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।