ক্রিকেটার বিদ্রোহ: একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র

ক্রিকেট আর সিনেমার মিল কোথায়?- দুটোতেই দর্শক লাগে। ক্রিকেটারদের ধর্মঘটকে কূটনৈতিক দক্ষতার টেস্ট ম্যাচ গণ্য করে দুদিন আগে বিসিবি সভাপতির প্রেস কনফারেন্স শেষে সাময়িক প্রতিক্রিয়াসূচক একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম।

আলোকস্বল্পতা, এবং টানা নিম্নচাপের পূর্বাভাস থাকায় ম্যাচ বাতিল করা হয়েছে।

তবে আমার অনুমান হলো, এটি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের শুটিং ছিল, যা কান বা ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠানো হবে না, ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হল থেকে শুরু করে মানিকগঞ্জের নবীন সিনেমা হল পর্যন্ত দেশের সবকয়টি হলে একযোগে প্রদর্শিত হবে, কিংবা ইতোমধ্যে প্রদর্শিত হয়েও গেছে বলা যায়।

যে কোনো সিনেমার প্রধান সমস্যা এখানে নায়ক আর ভিলেন ২৪ ঘণ্টা একই চরিত্রে অভিনয় করে। দর্শকের সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়াও ২৪ ঘন্টার নায়ক-ভিলেন তত্ত্বের উপরই প্রতিষ্ঠিত। যে কারণে কোনো ঘটনা ঘটামাত্রই তার পক্ষে অথবা বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে নিজেদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে চায়। নির্মোহ পর্যবেক্ষণ এবং ঘটনা বুঝবার আকাঙ্ক্ষাবৃত্তিই তৈরি হয় না তাদের মধ্যে। তারা অনেকটা মেষশাবকের ন্যায় আচরণ করে।

আমি নায়ক আর ভিলেনকে বাই-রোটেশন নীতিতে দেখি, অর্থাৎ প্রতি ১৫ মিনিট পরপর নায়ক আর ভিলেনের ভূমিকা অদল-বদল হবে, ফলে প্রতি ঘণ্টায় ৪ বার ডিউটি শিফটিং; এতে যেটা হয়, কাউকে মহামানব, কাউকে মহাদানব ভাববার অবকাশ তৈরি হয় না।

স্বার্থ পূরণে আর সংরক্ষণে ক্ষমতাকে কে কতটা নিপুণভাবে প্রয়োগ করতে পারছে, এটাই নায়ক-ভিলেন খেলার মূল আকর্ষণ।

ক্রিকেটারদের আন্দোলনেও অভিন্ন নীতি অবলম্বন করেছিলাম। না ক্রিকেটার, না বিসিবি – কারো প্রতিই সমর্পিত না হয়ে ঘটনার শাখা-প্রশাখা উপভোগ আর অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছি।

উপভোগটা ব্যক্তিগতভাবে করলে সমস্যা ছিল না, যখনই তা লিখে অনলাইন কনটেন্ট আকারে প্রকাশ করতে যাবো, লাখো ভক্তের ফ্যানানুভূতিতে আঘাত লাগবে, তারা হয়ে উঠতে পারে প্রতিক্রিয়াশীল। তবু সিদ্ধান্ত নিয়েছি ‘ক্রিকেটার-বিদ্রোহ’ নামক সিনেমাটির একটি ক্রিটিকাল এনালাইসিস লিখবো; ফ্যান্ডম নিক্ষিপ্ত হোক তিস্তা নদীতে।

  • প্রতিষ্ঠান-স্কেলেটন

বিসিবি স্বায়ত্তশাসনের বাতাবরণে একটি তুমুল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তা কারো অজানা নয়। তবে যে ব্যাপারটি হয়তো অনেকেই খেয়াল করে না তা হলো, বিসিবির পরিচালনারীতি অন্য দশটা ব্যক্তিমালিকানাধীন দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মতোই। অধিকাংশ দেশীয় প্রতিষ্ঠানে কোনোরকম প্রসেস ওরিয়েন্টেশন নেই, ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছাতেই সবকিছু পরিচালিত হয়; রিসার্চ এবং ডেভেলপমেন্টে খরচ করাকে অপচয় মনে করে, স্বল্পদর্শী হওয়ায় তাৎক্ষণিক রেভিনিউ জেনারেশনই থাকে একমাত্র টার্গেট।

এই সুযোগে গড়ে উঠে লেজুড়বাহিনী যারা মালিকের ডান হাত-বাম হাত হিসেবে কাজ করে, মালিক তাদের কথামতোই সব সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের লুটতরাজকে প্রশ্রয় দেয়, ২০-২৫ বছর পরও প্রতিষ্ঠানের চেহারায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে না। মালিকপক্ষ চায় কর্মীকে কত কম বেতনে আর কম সুবিধা দিয়ে প্রফিটকে ম্যাক্সিমাইজ করা যায়।

বিসিবির দিকে তাকালে অবিকল একই নীতির অনুসরণই দেখতে পাবো। যখন যে সভাপতি নির্বাচিত হয় বা হবে সে-ই মালিকে পরিণত হয়, এবং চিরায়ত ধারা অনুসরণ করে। যারা সভাপতি নির্বাচিত হয় তারাও কোনো না কোনো ব্যক্তি মালিকাধীন দেশী প্রতিষ্ঠানের মালিক বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সেইসব কোম্পানীতে যেসব কালচার দেখে অভ্যস্ত, বিসিবিতে কেবল তারই চর্চা করে মাত্র।

প্রশ্ন হলো, প্রফিট ম্যাক্সিমাইজেশন নীতির প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী। শোনামাত্রই বলবেন এটা শোষণ-নিপীড়ন বাড়ায়, সুদৃষ্টিতে দেখার প্রশ্নই আসে না।

এরকম ডাহা মিথ্যা কথা কীভাবে বলেন ভাই!

প্রাতিষ্ঠানিক থেকে ব্যক্তিগত – প্রতিটি পর্যায়ে মানুষ প্রফিট ম্যাক্সিমাইজিংয়ের চেষ্টা করে, কখনো অপটিমাইজেশনের নাম শুনেছেন? ওই শব্দ কেবল ডিকশনারিতেই পাওয়া যায়।

অদূরদর্শীতার ভূত আমাদের জিনে প্রবেশ করেছে, তবু আলাদা করে বিসিবি আর বাফুফে নজরে আসে, কারণ তাদের প্রোডাক্ট বা সার্ভিস দেশের বিভিন্ন বয়সের মানুষ অকাতরে গ্রহণ করে। আপনারা জেনে থাকবেন শ্রীলংকা আর ভারতের ম্যানেজাররা এদেশ থেকে প্রতিবছর কয়েকশো কোটি টাকা বেতন নিয়ে যায়। কিন্তু সেই ম্যানেজাররা কত শত কোটি টাকা কোম্পানীকে উপার্জন করে দেয় সেই ফিগারটা কোথাও আসে না। বেতনের একটি সাধারণ সূত্র হলো, কাউকে যদি ৫ হাজার টাকা বেতন দিই, তাকে দিয়ে ৬০ হাজার টাকার কাজ করিয়ে নিতে হবে। উপার্জন বনাম বেতনের অনুপাত ১২:১, ক্ষেত্রবিশেষে আরো বেশি হয়।

ম্যানেজারদের উদাহরণটি প্রাসঙ্গিকভাবেই এসেছে। আমরা বণিক বা সওদাগর প্রকৃতির জাতি, মাল কিনে মাল বেচবো; অত প্রসেস-প্ল্যানিং-স্ট্র‍্যাটেজি আমাদের পোষায় না। আমাদের ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগই ট্রেডার। বিসিবিতে একজন পেইড সিইও আছেন; তার কাজের ব্যাপ্তি এবং কাজের স্বাধীনতা কতটুকু, তার বাৎসরিক টার্গেটই বা কী?- অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বিসিবি সভাপতির পিএস এর দায়িত্ব পালন করাই তার চাকরির সার্থকতা।

স্রেফ এই একটা ব্যাপার থেকেই প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিসিবির দৈন্য বোঝা যায়। নেহায়েতই বাংলাদেশের কিছুসংখ্যক তরুণ/তরুণী– যাদের বয়স ৩০ এর নিচে – দয়া করে ক্রিকেট খেলাটা দেখে, এবং টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার প্রথম দশকে ৮-১০ জন ইনডিভিজুয়াল ব্রিলিয়ান্ট পাওয়া গেছে, যার উপর ভর করে বিসিবি কিছু করে খাচ্ছে। নইলে বিসিবির ধনী হওয়ার পেছনে তাদের নিজেদের সাংগঠনিক দক্ষতার কৃতিত্ব খুবই সামান্য।

পরের দশকে ইনডিভিজুয়াল ব্রিলিয়ান্টের সংখ্যা ২-৩ জনও হয়নি। ২০২০ এর দশকে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে বিসিবি, এখনো যদি ইনডিভিজুয়াল ব্রিলিয়ান্টের সংখ্যা এমন ২-১ জনেই আটকে থাকে, ৩০ এর নিচে থাকা জনগোষ্ঠীদের দায় পড়েনি তাদের লক্করঝক্কর প্রোডাক্ট কিনতে বা সময় দিতে, সেই সময়ে কয়েক পাতা চাকরির পড়াশোনা করা ভালো!

  • দ্রোহের কুশীলবগণ

আলীচিত ক্রিকেটবিদ্রোহে তিনটি পক্ষ রয়েছে – বিসিবি, জাতীয় দলের প্রভাবশালী ক্রিকেটার, ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটার। ৩য় পক্ষ দুধভাত। মূল কনফ্লিক্ট জাতীয় দলের ৪ প্রভাবশালী ক্রিকেটার বনাম বিসিবির ‘একাই খাবো’ নীতি।

আমার একটা ব্যক্তগত থিওরি আছে৷ একজন মানুষ একটানা ১০ বছর কোনো দায়িত্বে থাকলে সে স্বেচ্ছায়-অনিচ্ছায় স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠে, পজিশনের প্রেমে পড়ে যায়। ব্যক্তি থেকে পরিবার, সমাজ, প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র – এই ক্রোনোলজিতে ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতার সর্বশেষ ধাপ হলো স্বৈরাচারীতা।

জাতীয় দলে বর্তমানে ৪ জন ক্রিকেটার রয়েছে যাদের ইন্টারন্যাশনাল ক্যারিয়ার একযুগের কাছাকাছি বা তার বেশি। দীর্ঘ সময়ের জন্য কেউ কখনোই বাদ পড়েনি। সাকিব ডিসিপ্লিন ইস্যুতে একবার সাময়িক নিষিদ্ধ হয়েছিল, মুশফিক আইসিএল এর পূর্বে ২-১ বার স্বল্পসময়ের জন্য বাদ পড়েছিল, তামিম কখনোই বাদ পড়েনি ( ২০১২ এর এশিয়া কাপে একবার বাদ পড়ার উপক্রম হয়েছিল)।

মাহমুদউল্লাহ বাংলাদেশের অন্যতম সৌভাগ্যবান ক্রিকেটার। এত সীমিত ক্যালিবার নিয়ে ২০১৫ পর্যন্ত সে টিমে টিকে ছিল মূলত নাঈম ইসলাম আর নাসির হোসেন প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ায়। এরপর হাতুরুসিংহের গ্যাম্বলিংয়ে ২০১৫ বিশ্বকাপে তার ক্যারয়ারের পুনর্জন্ম ঘটে, এবং প্রথম আলোর ‘পঞ্চপাণ্ডব মিথ’ তাঁকে সাকিব-তামিম-মুশফিকের কাতারে ঢুকিয়ে দেয়। যেভাবেই হোক, দল থেকে সে বাদ পড়েনি, এটাই ফ্যাক্ট।

আশরাফুল, মাশরাফি, শাহরিয়ার নাফিস, অলক কাপালি, নাফিস ইকবাল, আফতাব আহমেদ, এনামুল জুনিয়র— শূন্য দশকে বেশ কয়েকজন ইনডিভিজুয়াল ব্রিলিয়ান্ট এসেছে, কারো ক্যারিয়ারই নিরবচ্ছিন্ন হয়নি, যার সাথে উল্লিখিত ৪ জনের ক্যারিয়ারের প্যাটার্নে বিরাট পার্থক্য।

অন্যদিকে নাজমুল হাসান পাপনকে বিসিবিতে শুরুতে পাঠানো হয়েছিল তিন মাসের আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে, সেই তার মেয়াদও ৭ বছর পেরিয়ে গেছে। নিয়ন্ত্রণ, এক্সপোজার এবং রেভিনিউ স্কোপ – এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে মিসম্যাচ থেকেই কনফ্লিক্টের শুরু সম্ভবত (ব্যক্তিগত অভিমত)।

সেই কনফ্লিক্ট জিইয়ে রেখেই আরো ৪-৫ বছর নির্বিঘ্নে পার করে দেয়া যেত, কনফ্লিক্ট কেন বিস্ফোরিত হলো সেটা একটা ইন্টারেস্টিং গবেষণা হতে পারে।

  • দ্য পেসুডো মুভমেন্ট

বিশ্লেষকরা বলছেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশা আর ক্ষোভের বহি:প্রকাশ হলো এই আন্দোলন। এই মতামতের সাথে আমি ০% একমত।

আমি মনে করি এই আন্দোলনের একমাত্র ভিত্তি অর্থনৈতিক, এর পেছনে শক্তিশালী কোনো আদর্শিক অবস্থান ছিল না, এবং এটি একটি অর্গানাইজড মুভমেন্ট। আমি নিজের মতো করে একে এন্টারপ্রেট করি এভাবে-

আন্দোলনের দাবি মূলত দুটি – প্রথমত, প্রিমিয়ার লিগে খেলোয়াড় দের পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে দেয়া যাবে না, ওপেন মার্কেট সিস্টেম রাখতে হবে। এতে লাভবান হবে কারা? জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা। সাধারণ ক্রিকেটাররাও দরদাম করবে, তবু সেখানে ক্লাবই আপার হ্যান্ডে থাকবে সম্ভবত। দ্বিতীয়ত, বিপিএল আগের মতো ফ্র‍্যাঞ্চাইজি মডেলে করতে হবে। এবার বিপিএল ফ্র‍্যাঞ্চাইজিভিত্তিক হলো না কেন? আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি ফ্র‍্যাঞ্চাইজিগুলো রেভিনিউ শেয়ার চেয়েছে বলেই বিসিবি তাদের বাদ দিয়েছে। টুর্নামেন্ট যদি বিসিবি চালায় ফ্র‍্যাঞ্চাইজির তুলনায় হয়তো অর্ধেক বা তারও কম পারিশ্রমিক পাবে ক্রিকেটাররা, যা জাতীয় দলের তারকা ক্রিকেটারদের জন্য যথেষ্ট কম।

কিন্তু এই দুই দাবিতে আন্দোলন হয় না, পাবলিক সেন্টিমেন্টও নিজেদের পক্ষে পাওয়া যাবে না, উপরন্তু মানুষ ক্রিকেটারদের অর্থলোভী ট্যাগ দিয়ে নিন্দামন্দ করবে।

বিসিবির উপার্জন তা তো ক্রিকেটারদেরসূত্রেই। বিসিবি ৪০০ কোটি টাকা উপার্জন করবে, অথচ জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা খেলাধুলাসূত্রে ১০ কোটিও উপার্জন করতে পারবে না, উপরন্তু বাড়তি আয়ের পথেও রাশ টেনে ধরা হবে এই বৈষম্য এবং শোষণের বিরুদ্ধে বড়ো প্রতিবাদের একটা উপলক্ষ প্রয়োজন ছিল। (৪০০ কোটি একটি রূপক, আক্ষরিক সংখ্যা নয়) ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করে এই সংকট কি সমাধান করা যেত?

বিসিবি যেটাকে বারবার সামনে এনে পাবলিক সেন্টিমেন্ট আদায়ের চেষ্টা করছে ( আমাদের কাছে প্রস্তাব না দিয়েই কেন মিডিয়াতে বললো), এটা একটা শুভংকরের ফাঁকি। আমার অনুমান হলো,বিসিবি যদি এবার নিজেরা বিপিএল চালিয়ে লাভ করতে পারে তাহলে ফ্র‍্যাঞ্চাইজিদের বাদ দিয়ে দিবে, অথবা আগামী বছরে আরো কঠিন শর্ত আরোপ করবে। রেভিনিউয়ের লভ্যাংশ চাওয়া ফ্র‍্যাঞ্চাইজিদের নৈতিক দাবি, বিসিবি সেটা কেন অগ্রাহ্য করবে? ফ্র‍্যাঞ্চাইজিগুলো কোটি কোটি টাকা খরচ করে দল গঠন করবে, এটা কি চ্যারিটি কার্যক্রম?

বিসিবির ‘একাই খাবো’ নীতি থামাতে পাবলিক শেমিং ছাড়া দ্বিতীয় কোনো অপশন ছিল না। পাবলিক শেমিংয়ের মাধ্যমে বিসিবিকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা অবস্থায় রাখা। এটার জন্যই এই সিনেমায় মিডিয়ার গুরুত্ব এত বেশি।

জাতীয় দলের পারফরম্যান্সও এমন আহামরি নয় যা নিয়ে উচ্চকণ্ঠে কথা বলা যাবে। ভারত সিরিজেও ভাগ্যচক্রে ১টা টি-২০ জেতা ছাড়া বিশেষ কোনো আশা নেই হয়তোবা। সঙ্গত কারণেই সিরিজ শেষে দল সমালোচনার মুখে পড়তে পারে। যা করার সিরিজ শুরুর আগেই করতে হবে। আমার মনে হয় না, ক্রিকেট অনুরাগীদের ১ জনের মধ্যেও শংকা তৈরি হয়েছে যে, আদৌ ভারত সফর হবে কিনা। প্রত্যেকেই যেখানে নিশ্চিত ভারত সফর হবেই, সেখানে আন্দোলন শব্দটা ব্যবহারে ঘোরতরে আপত্তি আছে, বরং কর্তৃপক্ষকে প্যাচে ফেলে নির্দিষ্ট দাবি পূরণের উপলক্ষ তৈরি করা। যেখানে রেজাল্ট নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে না, তাকে আন্দোলন বলা চলে না আর যা-ই বলা হোক।

জাতীয় লীগ এবছর বন্ধ থাকলেও বিসিবির কিছু যায়-আসে না, ভারত সফর মিস হলে বিরাট বেইজ্জতি।

এখানেই ছদ্ম-আন্দোলন থেকে সাধারণ ক্রিকেটারদের প্রাপ্তিহীনতা এবং গুরুত্বহীনতার বিষয়টা স্পষ্ট হয়।

অন্যদিকে বিসিবির ৪০০ কোটি টাকাতে কারো কোনো সমস্যা না থাকলেও জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের মাত্র ৫ জনের ৪ লাখ টাকা বেতনে চোখ টাটায় এমন মানুষের সংখ্যা নেহায়েত নগণ্য নয়।

ফলে আন্দোলনটাকে একটি সর্ববিস্তারী রূপ দেয়ার প্রয়োজন ছিল। বিসিবির অদক্ষতা এতো বেশি যে, এক ঘণ্টা চিন্তা করলেই যে কোনো বুদ্ধিমান মানুষ ২০-২৫ টা সমস্যা নিয়ে দাবি তুলতে পারে, যেগুলোর প্রতিটিকেই যৌক্তিক মনে হবে। কিন্তু দাবির সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে গেলে তা গুরুত্ব হারায়। ক্রিকেট যেহেতু ১১ জনের খেলা, দাবিসংখ্যা ১১টা হলে তা প্রচারণার ক্ষেত্রে এডভান্টেজ দিবে।

২ দাবির সাথে আরো ৯ টি দাবি যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা ছিল। সেই ৯ টি দাবিই মূলত টোপ বা গেমপ্ল্যান যা দিয়ে পাবলিক সেন্টিমেন্ট আদায় করা যাবে, আন্দোলনকে বৃহত্তর রূপ দেয়া সম্ভব হবে। পরে যে ২ টি দাবি সংযুক্ত হয়েছে ওটা ফেসবুকে বিভিন্ন মানুষের পোস্টসূত্রে অথবা নিযুক্ত ব্যারিস্টারের মস্তিষ্কপ্রসূত। বিসিবির প্রতি আরেকটু চাপ প্রয়োগের চেষ্টা হিসেবেই ওটার আবির্ভাব। রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের টাকা দিয়ে ক্রিকেটারদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, পেনশন প্রভৃতির যে আইডিয়া দেয়া হয়েছে এটা নিয়ে সিরিয়াসলি চিন্তা করার মন আর মনন এই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত নয়, বিসিবি যদি রাজি হয়েই যায় তাহলে বোনাস।

এমনকি ব্যারিস্টারের অন্তর্ভুক্তিও প্ল্যান বি এর অংশ; সম্ভবত আন্দোলনের ২য় দিনে বা তার আগেই ব্যারিস্টারের সাথে তাদের আলোচনা হয়েছিল, ক্রিকেটাররা হয়তোবা প্রত্যেকে চাঁদা দিয়ে ব্যারিস্টারের ফি পরিশোধ করেছে। পাপনের সংবাদ সম্মেলনের পরদিনই প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করবেন এটা বোধহয় তাদের হিসাবে ছিল না। চিত্রনাট্যে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ অবধারিত ছিল, তবে সেটা হয়তো আরো ১ বা ২দিন পরে হবে অনুমান ছিল তাদের।

যে কারণে মিসটাইমিং হয়ে গেছে কিছুটা। বিসিবি আগেভাগেই সারেন্ডার করায় ব্যারিস্টারের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গিয়েছিল, যে কারণে সংবাদ সম্মেলনে সে নতুন কিছু বলতে পারেনি, একই কথাই বলেছে, সাথে ২টি দাবি যুক্ত করে নিজের উপস্থিতিটুকু জানিয়েছে মাত্র। ব্যারিস্টারকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল সিনেমায় বড়ো চরিত্রে অভিনয় করানোর উদ্দেশ্যে, অতর্কিত স্ক্রিপ্ট বদল হওয়ায় সে পেয়ে গেল কমেডিয়ানের চরিত্র।

এই ২ দাবির সাথে সাধারণ ক্রিকেটাররা একমত হবে কেন? তাদের ভাগ্য তো এতে খুব বেশি পরিবর্তিত হবে না, বরং আন্দোলনে নামলে এখন যা উপার্জন করে সেটাও হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারে; তাদের স্বার্থ কী এতে?

সুতরাং আন্দোলনজুড়ে তাদের কথাই থাকবে। একারণেই ১ নম্বর দাবি কোয়াব নিয়ে। জাতীয় দলের প্রভাবশালী ক্রিকেটাররা কোয়াবের থাকা না থাকাকে বিন্দুপরিমাণ আমল দেয়, তা মনে হয় না। কোয়াব বিসিবি পরিচালিত কোনো সংগঠনও নয়, বিসিবির বিরুদ্ধে আন্দোলন অথচ প্রথম দাবিটাই এমন যেটা পূরণের এখতিয়ার বিসিবির নেই। এটা ১০ বা ১১ নম্বর দাবি হতে পারে, কখনোই ১ নম্বর নয়। অন্যদিকে মূল দাবি দুটোই যদি প্রথমে থাকে তা সাধারণ ক্রিকেটারদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করবে, পাবলিক সেন্টিমেন্ট বিপক্ষে চলে যাবে।

এমন একটা দাবিকে ১ নম্বরে রাখতে হবে যেটা নিয়ে প্রচুর কথা হবে, কিন্তু গুরুত্ব পাবে পরের দাবিটা – এটা একটা মাস্টারস্ট্রোক। ধর্মঘটে যাচ্ছেন, কিন্তু প্রথম দাবিটাই বিসিবির পূরণ করার এখতিয়ার নেই; সাংঘর্ষিক হয়ে গেল না ব্যাপারটা?

কিন্তু ক্রীড়াদর্শক এতো কিছু চিন্তা করবে না, কোয়াবের সভাপতি, সহ-সভাপতি বিসিবিতে দায়িত্বশীল পোস্টে আছে এই তথ্যটুকু দিয়েই কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট তত্ত্ব তুলে মানুষকে দিয়ে সোস্যাল মিডিয়ায় লাইনের পর লাইন লিখিয়ে নেয়া যাবে। সাধারণ ক্রিকেটারদের জীবনযাপনে কত ক্রাইসিস তা আলোচনায় আনা যাবে। সুতরাং কোয়াব-ই ১ নং দাবির জন্য উপযুক্ত।

ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটের ফ্যাসিলিটিস এসেছে ৪ আর ৫ নম্বরে, যে দুটো উত্থাপন করানো হয়েছে সাকিবকে দিয়ে। সাকিব যে কিনা ফার্স্ট ক্লাস একেবারেই খেলে না, সে বলছে ফ্যাসিলিটি নিয়ে, অন্যদিকে ফরহাদ রেজা যার পক্ষে বড়ো কোনো টি২০ লীগে ডাক পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, সে দাবি তুলছে ২ এর অধিক ফ্র‍্যাঞ্চাইজি লীগের বিধি তুলে দিতে। এটাকে একাত্মতা আর সংহতির প্রতীক বলা হলেও আমি দেখছি এক্সচেঞ্জ অব ইন্টারেস্ট হিসেবে। সাকিব ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটারদের হয়ে বলবে, ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটাররা বলবে সাকিবের হয়ে৷ সাকিব বলাতে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটারদের ইস্যুটা বাড়তি গুরুত্ব পাবে।

চুক্তিবদ্ধ ক্রিকেটারসংখ্যা বাড়ানো, গ্রাউন্ডসম্যান-আম্পায়ার-দেশি কোচ এগুলো গ্ল্যামারাস পয়েন্টমাত্র, যা দিয়ে গণমানুষের ইমোশনকে স্পর্শ করা যাবে অনায়াসে।

টুর্নামেন্ট সংখ্যা বাড়ানো, ফিক্সড ক্যালেন্ডার, বকেয়া পরিশোধ এগুলো কি আদতেই ধর্মঘটে যাওয়ার মতো দাবি? আমার সন্দেহ আছে। এদের শো-পিস বলা যায় বড়োজোর।

আন্দোলনের দাবি আদতে ৩টি- এর মধ্যে ২টি জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের জন্য, ১টি ফার্স্ট ক্লাস বা সাধারণ ক্রিকেটারদের জন্য। ৩টি দাবিই সকল ক্রিকেটারের জন্য প্রযোজ্য মনে হলেও মাইক্রোস্কোপের নিচে ২:১ বিভাজনটা সহজেই দৃশ্যমান হয়ে যায়। কেবলমাত্র মার্কেটিং স্কিলের কাছে ধরাশায়ী হয়ে মানুষ একে দেশের ক্রিকেটের বৃহত্তর কল্যাণের স্মারক হিসেবে দেখে খেয়ে না খেয়ে ক্রিকেটারদের সমর্থন অথবা গালিগালাজ করেছে। আন্দোলনের রাজনীতি এবং মাস্টারপ্ল্যান বুঝবার চেষ্টাই করেনি।

যে আন্দোলন মাত্র কয়েকমিনিট আলোচনার মাধ্যমেই নিষ্পত্তি হয়ে যায়, যার ভবিষ্যত পূর্বনির্ধারিত সেটার কোনো আদর্শিক ভিত্তি থাকতে পারে না।

পাপনও সেটা অনুভব করেছে। কিন্তু সে বাঁচাল এবং আত্মরতিপরায়ণ মানুষ হিসেবে নিন্দিত। প্রেস কনফারেন্সে ঘুরেফিরে সে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের উদাহরণ টেনেছে, কারণ বোর্ডের কারোরই বুঝতে বাকি নেই আন্দোলনটা কেন হচ্ছে। সেটা বললে আরো নিন্দিত হতে হবে। সে কারণে পাপন কৌশল অবলম্বনের চেষ্টা করেছিল, বাঁচালপনা আর হম্বিতম্বির কারণে উল্টো হাসির পাত্র হয়েছে।

  • দ্য মাস্টার প্ল্যানার

জনগণ ইতোমধ্যেই সাকিববন্দনায় মেতে উঠেছে। বন্দনাকারীদের মাস্টারপ্ল্যানের ‘ডিসিসন ট্রি’ সম্বন্ধে তেমন কোনো ধারণাই নেই সম্ভবত।

মাস্টারপ্ল্যানের পুরো নকশাটা মাত্র একজনের মাথায় থাকে। সে-ই জানে কাকে কোথায় কোন রোলে ব্যবহার করতে হবে। সে কেবল প্রসেসটা ডিজাইন করতে হবে, এবং উপযুক্ত লোকগুলোর সাথে যোগাযোগ করতে থাকে, তারপর ঘটনা আপন গতিতে চলতে থাকে। যারা ঘটনা ঘটায় তারাও জানে না তারা ডিসিসন ট্রি এর একটি শাখা কিংবা প্রশাখা মাত্র, অথচ নিজেদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। দলের মধ্যে থাকা মানুষও জানে না এদের মধ্যে মাস্টারপ্ল্যানার কে। যে লিডার সেও যে ডিসিসন ট্রি এর একটি অংশমাত্র সেটা অন্যদের, এমনকি স্বয়ং লিডারেরও কল্পনাতেও আসে না।

এই আন্দোলনের মাস্টারপ্ল্যানে সাকিবের ব্রেইন এবং ইমেজ ব্যবহারের চিন্তা ছিল, তাকে সামনে রাখার চিন্তা ছিল। তাতে দোষ বা কৃতিত্ব সবই সাকিবের হোক সমস্যা নেই, টার্গেট পূরণই আসল কথা।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের গেইল, রাসেল, নারাইন বোর্ডের সাথে চুক্তিবদ্ধ নয়, তারা ফ্রিল্যান্স ক্রিকেটার। সাকিবের বর্তমান যা বয়স তাতে সেও সম্ভবত ফ্রিল্যান্স ক্রিকেটার হতে চায়। ফ্র‍্যাঞ্চাইজি লিগে এফোর্ট, কমিটমেন্ট, প্রেসার কম, তুলনায় উপার্জন অনেক বেশি। সুযোগ থাকলে একজন ক্রিকেটার সেখানে খেলবে না কেন? একজন দর্শকের জন্য ক্রিকেট এন্টারটেইনমেন্ট বা দেশপ্রেম হলেও ক্রিকেটারের জন্য চাকরি। বাঁধা মাইনের চাকরির চাইতে ফ্রিল্যান্সিংয়ে উপার্জনের সুযোগ অনেক বেশি।

বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা যখনই সুযোগ পেয়েছে, ফ্রিল্যান্সিংয়ের দিকে ঝুঁকেছে। আইসিএল এর কথা মনে আছে? জাতীয় দলের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে হুমকি সত্ত্বেও জাতীয় দলের বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারআইসিএল এ গিয়েছিল। সে ঘটনার পেছনে আশরাফুলের দায় আছে শোনা যায়, সেই সাথে উৎপল শুভ্র এর লেখা ‘এগারো’ বই থেকে জানতে পারি আইসিএল এ জড়িয়ে পড়ছিল আরো বড়ো নাম। যদিও বইতে নাম ইঙ্গিত করা হয়নি, তবু সেই নামটি কে অনুমানের জন্য অপশনও খুব বেশি লাগবে না। মাশরাফি, সাকিব আর তামিমের মধ্যে যে কোনো একজন হবে এটা নিশ্চিন্তেই অনুমান করা যায়।

বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে ফ্রিল্যান্স ক্রিকেটার কনসেপ্টটি নিন্দিত হবার সম্ভাবনা প্রবল। যার বাইরের দেশের সবগুলো লীগে খেলার যোগ্যতা আছে সে খেলুক, বিশেষত যাদের ক্রিকেট অবকাঠামো উন্নত নয় এবং দল হিসেবেও শক্তিশালী নয় সেখানকার ক্রিকেটাররা বাইরে বেশি খেললে অভিজ্ঞতা বাড়বে।

বাংলাদেশে সাকিব ছাড়া কোনো ক্রিকেটারই নিয়মিত বাইরের লিগে সুযোগ পায় না। অন্যরা বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লিগ খেলেছে বিভিন্ন সময়ে। এদের মধ্যে মুশফিকের বাইরের দেশে খেলার সুযোগ পাওয়ার সংখ্যা প্রভাবশালী ক্রিকেটারদের মধ্যে সবচাইতে কম।

আমার অনুমান সাকিব ফ্রিল্যান্স ক্রিকেটার হিসেবেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে, সাথে গুরুত্বপূর্ণ মনে হওয়া ইন্টারন্যাশনাল সিরিজে খেলবে। এই বয়সে এসে ঢালাওভাবে সব সিরিজ খেলতে সে সম্ভবত আর আগ্রহী নয়। কিন্তু অধিনায়ক হলে তাকে সব সিরিজই নির্বিচারে খেলতে হবে। এটা নিয়ে তার অসন্তোষ আছে তা বিশ্বকাপের পর থেকে তার ইন্টারভিউগুলো পড়লেই বোঝা যায়। সিস্টেমের সমালোচনা করে সে একের পর এক ইন্টারভিউ দিয়ে গেছে। মাঝে কয়েকজন ক্রিকেট সাংবাদিকের ফেসবুক স্ট্যাটাসে এমন ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে, আফগানিস্তান সিরিজ শেষেই অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিচ্ছে সে, টেস্টের অধিনায়ক হবে মিরাজ অথবা মোসাদ্দেক। তার প্ল্যান শুধুমাত্র নিজেকে নিয়েই আবর্তিত হচ্ছিল।

অন্যদিকে প্রিমিয়ার লিগের কিছু ম্যাচে আর বিপিএল পুরোটাই সাকিব খেলে। এই ইস্যুতে সাকিবকে যুক্ত করাটা সহজ। একবার যুক্ত হলে তার ব্রেইন থেকেই ইনপুট আসবে।

সাকিবের পারসোনালিটি ট্রেইট আইএনটিপি, এই ট্রেইটের মানুষের প্রধান শক্তিমত্তা থিংকিং, এবং দুর্বলতা ল্যাক অব এমপ্যাথি আর অর্গানাজিং অদক্ষতা। সাকিব তাই প্রসেসের দিক থেকে ফ্যান্টাস্টিক ইনপুট দিলেও অর্গানাইজড মুভমেন্ট প্ল্যান করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা এবং অনীহা কাজ করার কথা।

জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের এনসিএল, বিসিএল এ অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করে দেয়া হচ্ছে। সেখানে পারিশ্রমিক তাদের তুলনায় খুবই কম।

মাস্টারপ্ল্যানার এমন একজন হবে যার ফার্স্ট ক্লাস খেলাসূত্রে সাধারণ ক্রিকেটারদের সাথে কথা হয়েছে প্রচুর, যার সাথে সাকিবের আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভালো, জাতীয় দলের বাইরে যার উপার্জনের বড়ো অংশ আসে দেশের লিগ থেকে, এবং মূল দাবির মধ্যে কোনো একটি অথবা পাবলিক সেন্টিমেন্টকে স্পর্শ করে এমন একটি দাবি উপস্থাপন করেছে। সে প্ল্যান করে দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গেছে। কারণ তার মাস্টারপ্ল্যানের ডিসিসন ট্রি ঠিকমতো কাজ করেছে।

এভাবে ন্যারো ডাউন করলে দুজনের নাম আসে- তামিম এবং মুশফিক। তবে তামিমের চাইতে মুশফিকের সম্ভাবনা অনেকাংশে বেশি। কারণ, জাতীয় দলের ৪ প্রভাবশালী ক্রিকেটারের মধ্যে ইন্টারপারসোনাল রিলেশনশিপের ভেনচিত্র আঁকলে একমাত্র মুশফিককেই পাওয়া যাবে সবগুলো বৃত্তে ইন্টারসেক্ট করা অংশ হিসেবে। মুশফিকের মেধা আর প্রজ্ঞাও একটি বাড়তি পয়েন্ট।

  • সিনেমার সম্ভাব্য সিক্যুয়েল

পাপনের মতো ইগো অন্ধ মানুষ এভাবে প্যাচে ফেলে দাবি আদায়ের শোধ নিশ্চিতভাবেই তুলবে। কিন্তু যেহেতু সে বাঁচাল এবং কূটনৈতিকভাবে অদক্ষ, শোধ তুলতে গিয়ে সে আবারো জনরোষে পড়বে। ভারতের বিপক্ষে অন্তত একটি টি-টোয়েন্টি জয় এবং জানুয়ারিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে সাফল্যই হয়তোবা পাপনকে সাময়িক ব্যাকফুটে খেলতে বাধ্য করবে৷ তবে দুই সিরিজেই যদি ভরাডুবি ঘটে মুশফিক আর তামিমকে বেশ চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। সাকিব আসলে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। মাহমুদুল্লাহ এমনিতেই মেয়াদ উত্তীর্ণ, তার জন্য খুব জটিল কোনো মাস্টারপ্ল্যান হয়তো করতে হবে না।

আদর্শবিহীন আন্দোলনের প্রধান সমস্যাই এটা। সাময়িক উত্তেজনা তৈরি করা গেলেও দীর্ঘস্থায়ী কোনো ইমপ্যাক্ট রাখা যায় না। তবু একেবারেই কিছু না হওয়ার চাইতে ২৫% পরিবর্তনই বা কম কিসে!

এই আন্দোলনকে মহিমাণ্বিত, প্রশ্নবিদ্ধ কোনোটাই করছি না। একটি দুর্বল স্ক্রিপ্টের গল্প অভিনয় আর সিনেমাটোগ্রাফির গুণেও যে উপভোগ্য হয়ে উঠতে পারে তা বোঝার জন্য ভবিষ্যত সমাজতাত্ত্বিকদের জন্য উৎকৃষ্ট এক কেইস স্টাডি হতে পারে এটি।

প্রমিথিউস ব্যান্ডের ২ লাইন গান লিখে বিশ্রামে যাচ্ছি –

বাত্তি জ্বলে না আমার ঘরের বাত্তি জ্বলে না

কুপি জ্বালাইলাম বন্ধু, সকাল তো আর হয় না।।

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।