এই ঘা পেয়ে জেগে উঠতে হবে

পেশাদার ক্রিকেটারদের জন্য ক্রিকেটই রুটি-রুজি। জাতীয় পর্যায়ে যারা খেলেন, বা মোটামুটি তারকা, তাদের একটা অভ্যস্ত লাইফস্টাইল থাকে। জাতীয় ক্রিকেটারদের একটা মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করতে হয়। বিসিবির চুক্তি থেকে বাদ পড়া তাই সৌম্য, তাসকিন, কামরুল, ইমরুল, মোসাদ্দেক, সাব্বিরদের জন্য বেশ এক চোট ধাক্কা। সাব্বিরের বাদ পড়া যদিও আগেই ঠিক হয়েছিল ডিসিপ্লিনারি ইস্যুতে।

ধাক্কার জোর সবার কাছে একরকম হবে না। তবে ধাক্কা তো বটেই।

১৬ জন থেকে কমিয়ে এবার চুক্তিতে থাকা ক্রিকেটারের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে দশে। যদিও পরে ‘রুকি’ বা উঠতি ক্রিকেটার গ্রেডে তিনজন যোগ করা হবে।

১০ জন সংখ্যাটিকে ‘মাত্র’ মনে হওয়া স্বাভাবিক। এমনিতে ইংল্যান্ডে বরাবরই কেন্দ্রীয় চুক্তিতে থাকা ক্রিকেটারদের তালিকা খুব ছোট হয়। এখন অবশ্য একটু অন্যরকম করা হয়েছে, সংস্করণ ভেদে ভিন্ন তালিকা। টেস্টের জন্য কেন্দ্রীয় চুক্তিতে মাত্র ৮ জন, ওয়ানডে-টি-টোয়েন্টির জন্য ১৪ জন।

তবে সংখ্যায় কম হলেও তাদের পারিশ্রমিকের অংক চোখধাঁধানো। সেখানে ঢোকার প্রতিযোগিতা তাই তীব্র। তাছাড়া তাদের ম্যাচ ফি, ভাতা-টাতা অনেক বেশি। ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে আয়ও বেশি। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের বাস্তবতা কোনোভাবেই মেলে না। আমাদের এখানে বেতনও অনেক কম। তার পরও এবার সংখ্যা কমানো হলো বিস্ময়কর ভাবে।

আমি ব্যাক্তিগত ভাবে মনে করি, বাদ পড়া ৬ জনের মধ্যে অন্তত সৌম্য, তাসকিন ও মোসাদ্দেককে চুক্তিতে রাখা দরকার ছিল। মোসাদ্দেককে তো অবশ্যই।

এমনিতে বিসিবির যে যুক্তি, সেটিতে দ্বিমত করার ব্যাপার আছে সামান্যই- ‘ক্রিকেট অপারেশন্স ও নির্বাচকদের মনে হয়েছে, বাদ পড়াদের পারফরম্যান্স চুক্তিতে আসার মত ছিল না।’ মোসাদ্দেককে বাদ দিলে বাকি ৫ জনের ক্ষেত্রে কথাটি কম-বেশি সত্যি। চুক্তিতে থাকাটা যেন কেউ গ্রান্টেড ধরে না নেয়, সেই বার্তা দেওয়াও জরুরী।

যদিও বাংলাদেশের মতো সীমিত প্রতিভার দেশে পারফরম্যান্সই শেষ কথা নয়। সৌম্য ও তাসকিন, দুজনই আমাদের সম্ভাব্য ম্যাচ উইনার। অবশ্যই তাদের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স হতাশাজনক। তবে দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থাকে তো ভবিষ্যতও ভাবতে হবে! দু:সময়ে পাশে থাকতে হবে, ভরসা জোগাবে হবে। নিজেদের ফিরে পেতে, আরও উন্নতি করতে ইনসেনটিভ দিতে হবে।

পারফরম্যান্সে অবশ্যই দুজনের জায়গা হয় না চুক্তিতে। তবে তাদের নিয়ে দেশের ক্রিকেটের যে বাজী, সেটির কারণে হলেও রাখা যেত। হয়ত গ্রেডে ডিমোশন দেওয়া যেত। সৌম্য ছিলেন ‘বি’ গ্রেডে, তাসকিন ‘সি’। দুজনকেই ‘ডি’ গ্রেডে নামিয়ে দেওয়া যেত। এমনকি গতবার ‘বি’ গ্রেডে থাকা ইমরুলকেও ‘ডি’ গ্রেডে নামিয়ে রেখে দেওয়া যেত চুক্তিতে।

সঙ্গে যোগ করি, এবার অবশ্যই লিটন দাসকে রাখা দরকার ছিল। অন্তত ‘ডি’ গ্রেডে হলেও। ‘রুকি’ গ্রেডে যেমন নাজমুল হোসেন শান্তকে রাখতেই হবেই হবে।

মোসাদ্দেকের সঙ্গে আমি মনে করি ভীষণ অন্যায় হয়েছে। ছেলেটা সেভাবে সুযোগই পেল কোথায়? যেটুকু পেয়েছে, খুব খারাপ করেনি। চুক্তিতে বিবেচনায় থাকার কথা গত বছরের পারফরম্যান্স। অভিষেক টেস্টে সে দারুণ ইনিংস খেলেছে। ওয়ানডেতে ব্যাট করেছে ৭ ইনিংস। ছয়তেই ছয়-সাত-আট নম্বরে। তিনটিতে অপরাজিত। ডাম্বুলায় শ্রীলঙ্কাকে হারানোর ম্যাচে ৯ বলে অপরাজিত ২৪ করেছে। মে মাসে আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ৪১ রানের ইনিংস আছে।

চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেই বল হাতে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া স্পেল। পারফরম্যান্স খুব খারাপ কোথায়? আর কী করবে! তার পর তার চোখের ইনফেকশন হলো। এবছর একটি টেস্ট খেললেন। তার ৫৩ বলে ৮ রানের অপরাজিত ইনিংস দলকে ম্যাচ ড্র করতে সাহায্য করল। প্রতিদান পেলেন পরের টেস্টে দলে জায়গা হারিয়ে। এবার চুক্তি থেকেই বাদ।

জানি না অন্য কোনো কারণ আছে কিনা। থাকলে সেটিও বলা উচিত খোলাসা করে, বার্তাটা দেওয়া জরুরী। নইলে খুব ভুল বার্তা যাচ্ছে।

এবার মু্দ্রার উল্টো পিঠের কথা বলি। সৌম্য-তাসকিনদের যে প্রতিভা, যে সামর্থ্য, যেভাবে আবির্ভাব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে, যতটা সমর্থন পেয়েছেন বোর্ড, টিম ম্যানেজমেন্ট, অধিনায়ক ও মিডিয়ার কাছ থেকে, তাদের কেন আজ এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে যে চুক্তির বাইরে রাখা হবে এবং সেটা নিয়ে জোর গলায় প্রশ্ন তোলার অবকাশ থাকবে না!

গত বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ব্যর্থতার পরও পর এই দুজনের ডেডিকেশনের প্রশংসা করে অনেক কথা লিখেছিলাম। কিন্তু ওদেরকে বুঝতে হবে পরিশ্রম-ডেডিকেশন, এসব প্রবাহমান স্রোতের মত রাখতে হবে। কখনও চললাম, কখনও থামলাম, এভাবে হবে না।

দুজনকেই নিজেদের ওজন বুঝতে হবে। বুঝতে হবে, তারা দেশের ক্রিকেটের সম্পদ। নিজেদের প্রতি অবিচার করলে দেশের ক্রিকেটের প্রতিই বড় অবিচার করা হবে। প্রতিভা অনেক আসবে। কিন্তু এরকম বিশেষ প্রতিভা কিংবা ম্যাচ জেতানোর সহজাত ক্ষমতা সবার থাকে না। থাকবে না। ওদেরকেই সেটা সবচেয়ে বেশি বুঝতে হবে।

আরও পরিশ্রম করতে হবে, আরও নিবেদন দেখাতে হবে, আরও ফোকাসড হতে হবে, স্বপ্নের সীমানা বড় করতে হবে, মানসিক ভাবে শক্ত হতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা অনেক অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। ক্রিকেটে সাফল্যের কোনো শর্টকাট নেই। অনুপ্রেরণার জন্য দূরে তাকাতে হবে না। নিজেদের ড্রেসিং রুমেই এমন কজন আছেন, তাদের জীবনটা সত্যিকার অর্থে অনুসরণ করলেই হবে। শুধু বলার জন্য নয়, মনে-প্রাণে ও কাজে অনুসরণ করতে হবে।

চুক্তি থেকে বাদ পড়ার ধাক্কা একটি সুযোগও। এই ঘা পেয়ে জেগে উঠতে হবে। এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে সেটি জয়ের প্রত্যয় দেখাতে হবে।

চুক্তি থেকে বাদ পড়া মানে দুনিয়ার শেষ নয়। খুব ভালো করলে বছরের মাঝেই চুক্তিতে ঢুকতে পারেন। সেই সুযোগ সবসময়ই আছে। রুবেল হোসেন যেমন বাদ পড়েছিলেন, নিজের প্রতি অবহেলার শাস্তি হিসেবে। পারফরম্যান্স দিয়ে বছরের মাঝেই আবার ঢুকেছিলেন চুক্তিতে। এবার বাদ পড়াদের জন্যও সেই সুযোগ আছে।

গত বছরের চুক্তিতে শীর্ষ ক্যাটেগরিতে রাখা হয়েছিল না মাহমুদউল্লাহকে। তিনি সেটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। তার পর তার যা পারফরম্যান্স, এবার শীর্ষ ক্যাটেগরিতে জায়গা না পাওয়ার কারণ নেই। উদাহরণগুলো চোখের সামনেই আছে। আশা করি ৬ জনই সেই চ্যালেঞ্জ জিতবে।

খারাপ সময়ই একজন ক্রিকেটারের সত্যিকারের পরীক্ষা। উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াইয়ে যারা জিততে পারে, সামনে বয়ে চলা তাদেরই মসৃণ হয়। জীবনে যেমন, তেমনি ক্রিকেটেও।

– ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।