মোহাম্মদ রফিক: আমাদের প্রথম বিশ্বসেরা

‘রফিক ভাই ছিলেন আমাদের বাঁ-হাতি স্পিনারদের আইডল।’ কথাটা নিজের ৫০ তম টেস্ট খেলে বলেছিলেন স্বয়ং সাকিব আল হাসান। সাকিব এক বিন্দুও বাড়িয়ে বলেননি, বাংলাদেশ ক্রিকেটে এই যে এক গাদা বাঁ-হাতি স্পিনারের মিছিল, তার শুরুটা করেছিলেন মোহাম্মদ রফিক। একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশের প্রত্যেকটি বাঁ-হাতি স্পিনার একেকজন মোহাম্মদ রফিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন।

মোহাম্মদ রফিক যে আমলে বাংলাদেশকে গণ্ডায় গণ্ডায় উইকেট এনে দিয়েছেন, সেই আমলে একটা জয় আসলেই রাস্তায় মিছিল হত। যে আমলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বে খুব সামান্য একটা দল বলেই পরিচিত ছিল তখন এই মোহাম্মদ রফিকের বিপক্ষে বাধ্য হয়েই সাবধানে ব্যাট চালাতেন বিশ্বের সেরা সব ব্যাটসম্যানরা।

ড্যানিয়েল ভেট্টোরি থাকার পরও ওই সময়ে অনেকের চোখে তিনিই ছিলেন বিশ্বের সেরা বাঁ-হাতি স্পিনার। আর সেটাও অধিকাংশ টেস্টে মাত্র এক ইনিংস বোলিং করার সুযোগ পেয়ে!

মোহাম্মদ রফিকের জন্ম ১৯৭০ সালের পাঁচ সেপ্টেম্বর। বাবা মারা যান স্বাধীনতার পরপরই। অনেক সংগ্রামের জীবন ছিল যৌথ পরিবারে। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেষে জিনজিরা বস্তিতে মাছ ধরে আর ক্রিকেট খেলে তাঁর শৈশব কেটেছে।

মজার ব্যাপার হল, ১৫ বছর বয়সে যখন পেশাদার ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু করেন, তখন তিনি ছিলেন মিডিয়াম পেসার। বাংলাদেশ স্পোর্টিং নামের দ্বিতীয় বিভাগের এক ক্লাবে খেলতেন। সেখান থেকে ১৯৮৮ সালে তাঁর ঠাই হয় এক কালের প্রতাপশালী দল বাংলাদেশ বিমানে। পাকিস্তানি ক্রিকেটার ওয়াসিম হায়দারের সংস্পর্শে এসে নিজেকে বাঁ-হাতি স্পিনার হিসেবে গড়ে তোলেন। সেই সিদ্ধান্তের সুবাদেই বাংলাদেশ ক্রিকেট পায় তাঁর ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক রত্নকে।

১৯৯৪ সালে ঢাকায় সার্ক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের হয়ে ভারতের ‘এ’ দলের বিপক্ষে ২৫ রানে তিন উইকেট নিয়ে দলকে জিতিয়ে দেন। এর ক’দিন বাদেই অভিষেক হয়ে যায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে।

১৯৯৭ সালটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য স্বর্নযুগ, আজকের বাংলাদেশের শুরুটা যে সে বছর থেকেই! আইসিসি ট্রফিতে কেনিয়াকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে পা দেয় বাংলাদেশ, যার পিছনের সবচেয়ে বড় কারিগর একজন স্পিন জাদুকর। পুরো টুর্নামেন্টে ১৯ উইকেট নেন। বৃষ্টিবিঘ্নিত ফাইনালেও নেন ৩ উইকেট, ব্যাট হাতে খেলেন ১৫ বলে ২৫ রানের ঝড়ো এক ইনিংস।

১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ ওয়ানডেতে নিজেদের প্রথম জয় তুলে নেয়, সেই ম্যাচে এই লোকটা উইলো হাতে ৭৭ করার পাশাপাশি প্যাভিলিয়নে পাঠান তিন জন কেনিয়ান ব্যাটসম্যানদের। বাংলাদেশ প্রথম টেস্ট খেলে ২০০০ সালে ভারতের বিপক্ষে, সেই ম্যাচে নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথম শিকার করেন ‘দ্য ওয়াল’ খ্যাত রাহুল দ্রাবিড়ের মূল্যবান উইকেট। তেমনি ভাবে ২০০৫ এ বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়েও তার অবদান অনস্বীকার্য! প্রথম ইনিংসে ৬৫ রানের পাশাপাশি তুলে নিয়েছিলেন জিম্বাবুয়ের পাঁচ জন ব্যাটসম্যানকে।

অথচ, অভিষেক টেস্টের পর বছর তিনেক ‘টেস্টে অচল’ বলে মোহাম্মদ রফিককে খেলানো হয়েছে কেবল সীমিত ওভারের ক্রিকেট। ফিরেই অবশ্য দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হোম সিরিজে ছয় উইকেট নিয়ে তাঁক লাগিয়ে দিয়েছিলেন।

২০০৭ সালে বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের সেই ঐতিহাসিক জয়ের অন্যতম কারিগরও তিনি, মায়াবী জাদুতে তুলে নিয়েছিলেন, ‘রাহুল দ্রাবিড়, মহেন্দ্র সিং ধোনি ও গাঙ্গুলীর মতো ব্যাটসম্যান দের।’

আমাদের প্রথম বোলার হিসেবে টেস্ট ও ওয়ানডে উভয় ফরমেটেই ১০০ উইকেট নিয়েছিলেন, প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে টেস্ট ও ওয়ানডে দুই ফরমেটেই ১০০০ রানের পাশাপাশি ১০০’র অধিক উইকেট শিকার করা জাদুকরও তিনি।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতিটা প্রথমের সাথে তিনি ছিলেন, তাকে চিনতে হলে আপনাকে দেখতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তার বুক চিতিয়ে লড়াই করে তুলে নেওয়া একমাত্র টেস্ট সেঞ্চুরি, শেন ওয়ার্নের বলে ছক্কা মেরে নাক উঁচু অস্ট্রেলিয়ান দের জবাব দেওয়া, কিংবা সেই সময়েও বাংলাদেশের হয়ে একা হাতে বিশ্ব ক্রিকেটের পরাশক্তিদের বিপক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়া। ২০০৫ সালে বাংলাদেশের বর্ষসেরা ক্রিকেটার হন, পরের বছরই হন বর্ষসেরা অলরাউন্ডার, একই বছরই বর্ষসেরা বোলারের পুরষ্কারও তার শোকেজে ঠাই পায়।

১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জেতার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সবাইকে জমি আর একটা করে গাড়ি পুরষ্কার দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে নিজের ভাগের জমিটা তার এলাকার় স্কুলের জন্য আর গাড়ি বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে স্কুল ঘর তুলে দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে সেই ক্রিকেটার বলছিলেন, ‘ভাই আমি তো পড়া লেখা কিছু শিখিনি, খুব গরীব ঘরের ছেলে। আমার মহল্লার ছেলে মেয়েরা যেন পড়াশোনাটা অন্তত শিখতে পারে।’

আমাদের ক্রিকেটে আজ একজন সাকিব আল হাসান আছে, উদিয়মান মিরাজ আছে, রাজ ভাইও ছিলো! কিন্তু তখন এত তারকা ছিলো না, একা হাতে লড়াই করে সবসময় সাফল্য পাওয়া যেতো না। আমাদের ক্রিকেটের সর্বপ্রথম বড় তারকা ছিলেন তিনি, বড় মনের অধিকারী একজন মোহাম্মদ রফিক।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) অবশ্য কখনোই এই কিংবদন্তির প্রতি খুব একটা সুবিচার করেননি। টেস্টে ১০০ টি ও ওয়ানডেতে ১২৫ টি উইকেটের মালিককে অবসরের আট বছর পর ২০১৬ সালে হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) ইউনিটে স্পিন বিশেষজ্ঞের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এর আগে-পরে কখনোই  তাঁকে কাজে লাগায়নি বিসিবি!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।