লক্ষ তারার মাঝে একটি চাঁদ

‘জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মন চায় প্রেমে পড়ি’ গানে বারো মাস ধরে মনের মানুষের খোঁজের গানে কিংবা তুমুল হিট গান ‘আকাশে লক্ষ তারা চাঁদ কিন্তু একটাই রে’ – গানে গানে দর্শকদের হৃদয়ে উন্মাদনা ছড়িয়েছিলেন এক নবীন অষ্টাদশী কন্যা। নব্বই দশকের শেষে বাংলা সিনেমায় আবির্ভাব ঘটলো তৎকালীন সবচেয়ে সেরা গ্ল্যামারাস নায়িকার। তিনি হলেন তখনকার জনপ্রিয় নায়িকাদের একজন পপি।

পুরো নাম সাদিকা পারভিন পপি। জন্ম ১৯৭৯ সালের ১০ সেপ্টেম্বর। সেরা ফটো সুন্দরী, বিজ্ঞাপনে মাতানোর পর চুক্তিবদ্ধ হন প্রথম সিনেমা ‘আমার ঘর আমার বেহেশত’৷ তবে প্রথমে মুক্তি পায় ‘কুলি’ ১৯৯৭ সালে।

সিনেমা যেমনই হোক কিংবা যতই নকল হোক তখন খুব বড় সাফল্য পেয়েছিল ছবিটি। নাম ভূমিকায় ওমর সানী থাকলেও অনেকেই মনে করেন সিনেমাটির সাফল্যের অন্যতম মূল কারণ হচ্ছেন পপি। নতুন নায়িকার গ্ল্যামারাস রুপ আর গান দেখতেই নাকি দর্শকরা বেশি বেশি হলে গিয়েছিলেন। একই বছরে মুক্তি পায় ‘আমার ঘর আমার বেহেশত’। হিন্দি ছবি ‘দিল’-এর রিমেক এই ছবিটিও সুপারহিট হয়েছিল।

পপির শুরুটা দারুণ হলেও এর রেশ বেশিদিন থাকেনি। একের পর এক ছবিতে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন, নির্মাতা থেকে প্রযোজক সবাই তাকে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, এমনকি দর্শকরাও। তবু্ও ভুল সিনেমা নির্বাচন, নিজের শরীর স্থুলতায় গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছিলেন।

একের পর এক অশ্লীল ছবির নায়িকা হয়েছিলেন। ‘বস্তির রানী সুরিয়া’ তাঁর ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বিতর্কিত ছবি৷ শাকিল খানের সঙ্গে জুটি তখন বেশ আলোচিত হয়েছিল। এই জুটির ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ সুপারহিট হয়েছিল।  শাকিলের সাথে পপির সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বলা যায়, ঢাকার ছবির ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত সম্পর্কগুলোর একটি ছিল এটা। বিয়ের গুঞ্জন,থানা-পুলিশ অনেককিছু করার পর সেই সম্পর্কের ইতি ঘটে।

রুবেলের সঙ্গেও একের পর এক ছবি করেছেন। ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত অনেক ছবিই করেছেন,বানিজ্যিক ভাবেও হয়তো বেশ সংখ্যক সিনেমা হিট আছে তবে পপিকে পপির মত ভাবে কোনোটাতেই পাওয়া যায়নি৷ পপির গ্ল্যামারাস রুপ তৎকালীন নির্মাতারা ব্যবহার করেছিলেন অশ্লীলতার রমরমায়। তিনি নিজেও সচেতন ছিলেন না। এর মাঝে সবাই বিস্মিত করে ‘কারাগার’-এর জন্য পেয়ে গেলেন প্রথম জাতীয় পুরস্কার।

‘আমার মাঝে নেই এখন আমি, স্বপ্নের সিঁড়ি বেঁয়ে যেন স্বর্গে নামি’ – রানী কুঠির বাকী ইতিহাসের এই গানে যেন নতুন ভাবে জন্ম নিলেন পপি। দর্শকদের মাঝে আবার প্রত্যাবর্তন করেছিলেন তিনি। পপির সৌন্দর্যের শৈল্পিক রুপ ধরা দিয়েছিল এই গানে। ভিন্নধারার ছবি বলে হয়তো সাফল্য পায়নি, তবে এই গানের কারণে দর্শকদের মাঝে বেশ আলোচনায় এসেছিলেন।

ছবিটির ‘স্বপ্ন তুমি সত্যি তুমি’ গানটাও সুন্দর। পপির গ্ল্যামারাস রুপে মুগ্ধ হলেও অভিনয়ের সমালোচনা হত প্রচুর। আর সেই সমালোচনাকে কাটিয়ে ‘বিদ্রোহী পদ্মা’ বিধবার চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করে সবাইকে চমকে দেন। একই বছরে এই রকম দুইটি ছবিই পপির ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অর্জন।

পপিকে নিয়ে ততদিনে বানিজ্যিক ছবির চাহিদা শেষ। গল্প নির্ভর ছবিতে অভিনয় করা শুরু করলেন৷ এর মাঝে তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা অভিনয় করলেন ‘গঙ্গাযাত্রা’ ছবিতে। মেথরানীর চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছিলেন। আবারো পেয়ে গেলেন জাতীয় পুরস্কার।

মাঝে এইডস নিয়ে সচেতনতামূলক ছবি ‘মেঘের কোলে রোদ’-এ অভিনয় করেও পেয়েছিলেন জাতীয় পুরস্কার। মোট তিনবার এই পুরস্কার পেয়েছিলেন৷ ‘দরিয়াপাড়ের দৌলতী’ আগ্রহ জাগানিয়া হলেও শেষ পর্যন্ত সন্তুষ্টি আনতে পারেনি।

মাঝে ‘গার্মেন্টস কন্যা’র সুবাদে অনেকদিন বাদে পেয়েছিলেন হিট ছবির স্বাদ৷ বছর দুয়েক আগে মুক্তি পায় অনেকদিন ধরে আটকে থাকা ‘পৌষ মাসের পিরিতি’ ছবিটি। এই ছবিতেও বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন। পপি এখনো অভিনয় করছেন দু’একটি ছবিতে তবে কোনোটাই আগ্রহ জাগানিয়া নয়।

সিনেমার বাইরে বিজ্ঞাপন করেছেন অনেক। বার্জার পেইন্টস থেকে লাক্স কিংবা জনি প্রিন্ট শাড়ী,সবগুলোই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। নাটক ও করেছেন বেশ কিছু সংখ্যক, এর মাঝে ‘মেমসাহেব’ আলোচিত হয়েছিল।

ক্যারিয়ারে পপির ভুলের কোনো কমতি নেই। তবে, ইতিহাস বলে তার মত বৈচিত্রময় ও সব্যসাচী অভিনেত্রী ঢাকার ছবির ইতিহাসে এসেছে খুবই কম। অথচ, নির্মাতারা খুব সামান্যই ব্যবহার করতে পেরেছেন পপিকে। এবার নির্মাতাদের ঘুম ভাঙুক, হোক পপির পুনর্জন্ম। লক্ষ তারার মাঝে একটি চাঁদ হয়ে তিনি আবার ফিরে আসুন!

Related Post

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।