বাংলাদেশি ক্রিকেটার: কাকে কেমন লাগে!

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে আমার প্রিয় ক্রিকেটার পাঁচজন। আমার কাছে প্রিয়র দিক থেকে র‌্যাংকিং করলে সেই পাঁচজনের অবস্থান এমন দাঁড়ায় –

১. মুশফিকুর রহিম

২.সাকিব আল হাসান

৩.তামিম ইকবাল

৪.মাশরাফি মর্তুজা

৫.রুবেল হোসেন

সিনিয়রদের মাঝে মাহমুদউল্লাহ প্রিয় না হলেও তার প্রতি শ্রদ্ধা আছে। অন্যরা এখনো প্রিয় হওয়ার পর্যায়ে যায়নি।

মুশফিককে সবচেয়ে ভালো লাগার কারণের আগে একটা কথা বলি। ২০১১ সালের শুরুর দিকে তার একের পর এক বাজে পারফরমেন্স দেখে খুবই বিরক্ত ছিলাম তার ওপরে। ২০১১ বিশ্বকাপ শেষে যে খেলোয়াড়গুলোকে দলের বোঝা মনে করে বাদ দিতে বলেছিলাম তার মাঝে মুশফিকও ছিল।

একমাত্র মুশফিকই ওখানে টিকে গেছে, বাকিরা বোঝা বলেই প্রমাণিত হয়েছিলো, হারিয়ে গেছে সব। তাকে প্রথম ভালো লাগা শুরু করলো ২০১২ সালের শেষের দিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে সিরিজে যেখানে সে ম্যান অফ দ্য সিরিজ হলো। আর পুরোপুরি প্রিয় হয়ে গেলো ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কার সাথে টেস্টে ডবল সেঞ্চুরি করার পরে। তাঁকে সবচেয়ে ভালো লাগার কারণ হলো তার বিচক্ষণতা।

আমি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে একমাত্র তার ওপরেই ভরসা করি যে নিশ্চয়ই মুশফিক দারুণ কিছু করবে। খুব কমই সে এক্ষেত্রে হতাশ করেছে আমাকে। আমার মতে শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে অবিশ্বাস্য কিছু সাধন করা একমাত্র ক্রিকেটার পুরো বিশ্বে মুশফিক।

নাহলে চিন্তা করা যায় যে, ৫ ফিট ২ ইঞ্চি উচ্চতার একজন ব্যাটসম্যান বাংলাদেশের একমাত্র সত্যিকারের স্লগ করতে পারা ব্যাটসম্যান! এই উচ্চতা নিয়ে সে সবচেয়ে বড় বড় ছক্কা মারে। কতখানি পরিশ্রম একজন করলে এই উচ্চতা নিয়ে সেইরকম টাইমিং রপ্ত করে প্রায় প্রতি ম্যাচে এরকম বড় বড় ছক্কা মারা সম্ভব!

বাংলাদেশের একমাত্র ব্যাটসম্যান যে নিখুতভাবে রিভার্স সুইপ,সুইচ হিট,স্কুপ বা স্লিপের ওপর দিয়ে স্কুপের মত চরম কঠিন শট খেলতে পারে। আর প্রিয় স্লগ সুইপ তো আছেই যদিও এখন সেটা সে খেলে অনেক চিন্তা করে,বিচক্ষণতার সাথে। ২০১১ সালের বিশ্বকাপ পর্যন্ত মুশফিকের ওয়ানডেতে গড় ছিলো মাত্র ২১ এর মত।

সেই ব্যাটসম্যানের এখনকার গড় প্রায় ৩৬ এর মত। গত ৪ বছরে গড় ৫০ এর মত! আর মুশফিকের ক্লাস স্পেশাল বাংলাদেশিদের মাঝে। কারণ সে দুর্দান্ত ইনিংস খেলেছে সবখানে। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে একমাত্র বাংলাদেশি হিসেবে ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি তার, নিউজিল্যান্ডে আছে টেস্টে ১৫০ রানের ইনিংস, শ্রীলংকার মাটিতে টেস্টে ডবল সেঞ্চুরি, বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি আছে, আরব আমিরাতে সেঞ্চুরি আছে।

এরকম কঠিন কঠিন জায়গায় এত বেশি সংখ্যক দুর্দান্ত ইনিংস শুধু মুশফিকেরই আছে বাংলাদেশ দলে। সব সময় সে বিগ ম্যাচের খেলোয়াড়।এই সব মিলিয়েই মুশফিক আমার সবচেয়ে প্রিয়। আমার মতে বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিক।

সাকিব দ্বিতীয় প্রিয় কেন হবে না? বরং মনে হয় প্রশ্ন করা যায় যে সাকিব সবচেয়ে প্রিয় না কেন? মুশফিক এগিয়ে ব্যাটিং এ তার বিচক্ষণতার কারনে। ব্যাটিং এ এইটা একটু কম হওয়ায় সাকিব আমার কাছে দ্বিতীয়। সাকিবকে নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। একটা জিনিস বলি যে ব্যাপারে হয়তো অনেকেই একমত হবে না।

সাকিবের টেকনিক বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মাঝে সবচেয়ে ভাল। অনেক সময় পাগলা ব্যাটিং করে বলে এটা নিয়ে কেউ কথা বলে না কিন্তু সত্য এটাই। এই বিশ্বকাপে এত সফলতার অন্যতম বড় কারণ তার টেকনিক। টেস্টে মাত্র একটা বাউন্ডারিতে তার ফিফটি আছে।

অসম্ভব ভালো টেকনিক না হলে টেস্টে দৌড়ে এত রান নেয়া সম্ভব না। দারুণ টেকনিক বলেই তার ইনিংসে রান ও বলের মাঝে পার্থক্য খুবই অল্প থাকে। সাকিব বয়সে কিছু ছোট আমার চেয়ে কিন্তু তাও বলবো যে আমি সাকিবের মত প্রফেশনাল হতে চাই। সাকিবের কোন তুলনা ওয়ানডে ইতিহাসে নেই,টেস্টেও ওরকম ক্লাসের দিকেই এগোচ্ছে।

সবার মতে বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান তামিম। তাকে নিয়েও নতুন করে বলার কিছু নেই। কোনকালেও কখনো তার সামর্থ্যের ব্যাপারে আমার প্রশ্ন জাগেনি,তার কোন বিকল্প আছে বলেও মনে হয়নি। গত চার বছরে আমাদের ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ের উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান বলা যায় তামিমের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স।

মাশরাফি বিন মুর্তজাকে নিয়েও আর কি-ই বা বলবো। তার কীর্তির চেয়েও আসলে সে বড়। বাংলাদেশের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পেসার ও অধিনায়ক মাশরাফি। এই শেষবেলার তার যেমনই ফর্ম থাকুক, তার অবদান একটা ফোটাও তাতে ম্লান হবে না। বাংলাদেশকে ফাস্ট বোলিং করতে শিখিয়েছে বলা যায় মাশরাফি।

রুবেল গত ৪ বছর ধরে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ উইকেট টেকিং বোলার। এই কারণেই সে আমার প্রিয়। মানুষ আসলে ক্রিকেট ভালো বোঝে না বলে তার রান দেয়াটাই দেখে। কিন্তু যাদের বোঝার তারা ঠিকই খেয়াল করে যে, রুবেল অনেক অনেক ম্যাচে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট নিয়ে ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়েছে।

তারা এটাও দেখে যে প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যানকে আউট করায় সবচেয়ে সিদ্ধহস্ত রুবেল। আর আমার জীবনে স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছেন রুবেল। ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তাঁর হ্যাটট্রিক দেখেছিলাম মাঠে বসে। এরকম সৌভাগ্য আমার হবে তা কখনোই ভাবিনি। এজন্য রুবেল বোলিং এ এলেই সব সময় খুব আশা করি।

মাহমুদউল্লাহর প্রতি তার গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসগুলোর কারণে অসীম শ্রদ্ধা। কিন্তু সে আমার প্রিয় বলতে যা বোঝায় তা হতে পারেনি ক্লাস একটু কম আছে বলে। আমার প্রিয় হতে গেলে একটু বেশি ক্লাস থাকা লাগে। আমার প্রিয় হওয়া জরুরী কিছু না,বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন অবশ্যই মাহমুদউল্লাহ।

জুনিয়রদের মাঝে মুস্তাফিজ মাঝে প্রিয় ছিলো, কিন্তু পরে আগের মত পারফর্ম করতে না পারায় সেই তালিকা থেকে নেমে গেছে। টিকে থাকতে পারলে আবারও প্রিয় হয়ে যাবে সে সামনে। লিটন এখনকার পারফরমেন্স ধরে রাখলে তার আমার কাছে প্রিয় হয়ে যেতে আর বেশি সময় লাগবে না।

তবে তার চেয়েও বেশি আগে আমার প্রিয় হয়ে যেতে পারে মোসাদ্দেক। লিটনের চেয়েও বেশি আশা করি তাকে নিয়ে।মিরাজকে দিয়ে টেস্টে ভরসা পাই, ওয়ানডেতে তার এমন কোন অর্জনই নেই বলা যায়। টেস্টে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে প্রিয় হবে একসময়। সৌম্য আজও আমাকে হতাশই করে যাচ্ছে। অথচ ২০১৫ সালে মনে হয়েছিলো যে, সে অচিরেই আমার প্রিয় হয়ে যাবে।

দীর্ঘ হতাশার পরে আয়ারল্যান্ডের টুর্নামেন্টের ফাইনালের পরে আবার আশা করেছিলাম। কিন্তু লাভ হচ্ছে না। আর সাইফুদ্দীন প্রিয় আদৌ কখনো হতে পারবে কি না সন্দেহ আছে। হার্দিক পান্ডিয়া ধরণের অল রাউন্ডার হতে পারলে সে প্রিয় হবে আমার।

সাব্বির রহমান রুম্মান কোনকালেও আমার প্রিয় ছিলো না। শহীদ আফ্রিদি যার প্রিয় ব্যাটসম্যান তার পরিণতি যা হওয়ার তাই হয়েছে। মিঠুনের প্রিয় হওয়ার কোন কারণই নেই। রাহিকে দেখতে হবে সামনে কিন্তু তার যে সামর্থ্য তাতে প্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।