ঢাকার গাড়ি মানব লিপু উপাখ্যান

লিপু নিজামুদ্দিন আউলিয়া – এই নামটা বললে হয়তো খুব কম লোকই চিনবেন। তবে, যদি বলা হয় ‘গাড়ির জাদুকর লিপু’ তাহলে তাঁর সাথে পরিচিত মানুষের সংখ্যাটা আরো বাড়বে। মানুষ নাম দিয়ে নয়, পরিচিত হয় কাজ দিয়ে। ঢাকার ছেলে লিপুও তাই স্রেফ গাড়ি বানিয়ে খ্যাতি পেয়েছেন বিশ্বব্যাপী।

  • কে এই লিপু?

লিপু হলেন একজন বাংলাদেশি অটোমোটিভ ইঞ্জিনিয়ার ও ডিজাইনার। পুরনো গাড়ির মডেল থেকে অত্যাধুনিক গাড়ি তৈরি করার জন্য তিনি এক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব।

  • ঢাকায় কাটানো শৈশব

১৯৬৮ সালে জন্ম নেও হয় লিপুর। তাঁর শৈশব কেটেছে ঢাকায়। পড়াশোনা ঢাকার রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজে। এখানে নবম শ্রেণি অবধি পড়াশোনা করে বাবার চাকরীর সুবাদে পাড়ি জমান সৈদি আরবে। সেখানেই মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রথম মোটর গাড়ির প্রদর্শনী দেখেন লিপু। নামকরা ব্র্যান্ডের দারুণ সব গাড়ি থেকে সেদিনই যেন গাড়ি বানানোর স্বপ্নটা মাথায় গেঁথে ফেলেছিলেন তিনি।

  • ল্যাম্বরগিনির স্বপ্নপূরণ

ওই সময় থেকেই স্পোর্টস কারের প্রতি ঝোঁক ছিল লিপুর। তবে, এত দাম দিয়ে গাড়ি কেনার সামর্থ তাঁর ছিল না। স্বপ্ন পূরণ করলেন ১৯৮৯ সালে। সাধারণ একটি সিডান কার ভেঙেচুরে গড়লেন ‘ল্যামবার্গিনি ক্রাউনটেশ’। নাম দিলেন ‘লিম-বিল’। মজার ব্যাপার হল, ওই সময় গাড়ির অভ্যন্তরীন ম্যাকানিজম সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। সম্বল বলতে ছিল কেবল একটা পোস্টার।

  • বাংলাদেশের লিমুজিন

২০০০ সালে তিনি তাঁর পছন্দের গাড়ি ল্যাম্বরগিনি ডিয়াবলো’র একটি সংস্করণ তৈরি করেন। বেশি কিছু গাড়ি আর ২.৮ লিটার ডিজেল ইঞ্জিনের সমন্বয়ে তিনি ২২ ফুট লম্বা লিমোজিন গাড়ি তৈরি করেছেন। ২৮০০ সিসির এই গাড়িটা তৈরি করতে তিনি সময় নিয়েছিলেন মোটে ৪০ দিন।

বিলাসবহুল লিমুজিন গাড়িতে সাধারণত যা থাকে, এতেও সেসব সংযোজন করা হয়। ছিল পানীয় রাখার কেবিনেট, টিভি, ইন্টারকম। ঢাকার রাস্তায় এই বিশাল গাড়ি যখন বের হত তখন সবাই হা হয়ে তাকিয়ে থাকতো। এমনকি মরচে ধরা টয়োটা আর হোন্ডাকে ফেরারি কিংবা ল্যাম্বরগিনিতে রুপান্তর করতে সক্ষম তিনি।

  • স্বাধীনতা এফ-৭১

এবার লিপুর নজর ফেরারিতে। ২০০২ সালের শেষ দিকে লিপু ফেরারি তৈরি শুরু করেন। তাঁর সকল কাজ তখন চলতো জিগাতলায় নিজের গ্যারেজে। সাহায্য করতো চারজন মেকানিক। ‘স্বাধীনতা এফ-৭১’ সেই গাড়িটি ‘দ্য বাংলাদেশি ফেরারি’ নামেও পরিচিত। ওই সময় বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম বিবিসিতে তাঁকে নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। রিপোর্টের সূত্র ধরে ফেরারি ওনার্স ক্লাব তাকে স্থান দেয় তাদের ওয়েবসাইটে।

লিপুর বানানো গাড়ি
  • অটোমোবাইলে উচ্চশিক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল মোটরস ইনস্টিটিউটে লিপু অটোমোবাইলে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন। যদিও, থিওরিটিক্যাল পড়াশোনায় বিরক্ত হয়ে নিজেই একটা ওয়ার্কশপ চালু করেন। সেটা চালান তিন বছর। এরপর চলে আসে বাংলাদেশে। ফ্রান্সের ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘ইন্টারসেকশন’ ২০০৪ সালে লিপুকে নিয়ে একটি ফিচার করে, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচয় করিয়ে দেয়।

  • দ্য পিস কার ও যুক্তরাজ্যের আমন্ত্রণ

লিপুর বানানো স্পোর্টস কার ‘এম২৬’ ঢাকায় অনুষ্ঠিত মোটর শো-তে প্রদর্শিত হয় ২০০৬ সালের এপ্রিলে। ২২ বছরের পুরনো টয়োটা স্প্রিন্টারকে মডিফাই করে গাড়িটি বানানো হয়। পরের গাড়ি ‘দ্য পিস কার’ মে মাসে, জাতীয় জাদুঘরে।

২০০৬ সালের জুনে লিপুকে আবাসিক গাড়ি ডিজাইনার হিসেবে গাড়ি রূপান্তরের কাজে লিপুকে আমন্ত্রণ জানানো হয় যুক্তরাজ্যে। দু’মাস ধরে কাজ করে লিপু একটি ফোর্ড ক্যাপ্রিকে আরো স্টাইলিশ গাড়িতে পরিণত করেন। ‘কার’ নামের সেই গাড়ি বানানোর একটি প্রামাণ্যচিত্রও বানানো হয়। গাড়িটি পরে পূর্ব লন্ডনের ‘দ্য রিচ মিক্স সেন্টারে’ প্রদর্শিত হয়।

ঢাকার রাস্তায় লিপুর গাড়ি
  • ডিসকভারিতে প্রামান্যচিত্র

ডিসকভারি চ্যানেলে ‘বাংলা ব্যাঙ্গারস’ নামক অনুষ্ঠানে ফিচার করা হয় এই লিপুকে। সেখানে তিনি তাঁর সঙ্গী বার্নি ফাইনম্যানের সাথে ঢাকার রাস্তায় কোনোরকম আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই বিভিন্ন গাড়ি রূপান্তরের কাজ করেন।

২০০৬ সালে ডিসকভারি চ্যানেল আট সপ্তাহের মধ্যে তাঁকে দু’টি গাড়ি তৈরির অনুরোধ করে। বার্নি ফাইনম্যানের সাথে মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই তিনি গাড়িগুলো তৈরি করেছিলেন।

  • অ্যাঞ্জেল কার

২০০৭ সালের মে মাসে ব্রিক লেনের ‘বৈশাখী মেলা’ অনুষ্ঠানে তাঁর অ্যাঞ্জেল কার উদ্বোধন করা হয়েছিল। লিপু ও ফাইনম্যান এই গাড়িটি তৈরি করতে সময় নেন মাত্র তিন সপ্তাহ।

  • সাধারণ মানুষের গাড়ি

লিপু শুধু নামী-দামী মডেলের গাড়িই নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও গাড়ী বানানোর পরিকল্পনা করেন। যুক্তরাজ্য ২০১১ সালে তিনি দেশে ফেরেন। ওই সময়ে বানিয়ে ফেলেন এমন একটি গাড়ি। নিজের দাদার নামে গাড়িটির নাম রাখেন ‘সুরুজ’। গাড়িটি গ্যাস, তেল কিংবা বিদ্যুতেও চলবে। আর দাম পড়বে মাত্র আড়াই লাখ টাকা মাত্র।

  • লিপু অ্যান্ড পিটবুল

২০১৫ সালে স্টিভ ‘পিটবুল’ ট্রিম্বলি’র ফ্রিপোর্ট কাস্টম কার গ্যারেজ নিয়ে হিস্টোরি চ্যানেলের রিয়েলিটি শো ‘লিপু অ্যান্ড পিটবুল’-এ ফিচার করা হয় লিপুকে। এই শো-তে তারা পুরনো অব্যবহৃত গাড়িকে বানিজ্যিক উদ্দেশ্যে রীতিমত ‘সুপার কার’-এ পরিণত করেন।

পিটবুলের সাথে লিপু
  • আমেরিকায় অভিভাসন

বাংলাদেশের পাশাপাশি তিনি বিশ্বের গাড়ি তৈরি শিল্পেও নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। লিপু এখন নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ড সিটিতে থাকছেন। তাঁর ‘অতিমানবীয়’ কৃতীত্বের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার লিপু এবং তার পরিবারকে সর্বোচ্চ মর্যাদার অভিবাসন সুবিধা দিয়েছে।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।